ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা বরাবরই ছিল। এবার দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে সেই উত্তেজনা যেন এক অন্য রাজনৈতিক উত্তেজনারও জন্ম দিল। ভারত পাকিস্তানকে হারানোর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্রিকেটের জয়কে সামরিক অভিযানের সঙ্গে তুলনা করে লেখেন, “খেলার মাঠে অপারেশন সিঁদুর। ফলাফল একই — ভারত জিতেছে!” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার প্রত্যত্তরে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানকে ইঙ্গিত করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ্য, এবার এশিয়া কাপের শুরু থেকেই ভারত আর পাকিস্তান ক্রিকেট দলের মধ্যে অ-সৌজন্যতা এবং সংঘাত শুরু হয়েছিল। যার শুরুটা অবশ্য করেছিল ভারত। গ্রুপের ম্যাচে তাঁরা পাকিস্তান ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাত না মেলানোয় পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা বিষোয়টিকে ভাল ভাবে নেয়নি। কেবল তাই নয়, খেলা শেষে ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব প্রকাশ্যেই বলেন, এই জয় তাঁরা পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় নিহতদের পরিবারকে উৎসর্গ করলেন। একইসঙ্গে তিনি ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেন। বোঝা গেল ক্রিকেট ম্যাচের রোমাঞ্চকর উত্তেজনা রাজনৈতিক উত্তেজনায় পরিণত হয়েছে। আর এই পরিণতির জন্য ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রী কারও অবদান কম নয়। দুজনেই প্রায় একই সুরে ক্রিকেট ক্রিজে পহেলগাঁওয়ের রক্তাত্ত স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনলেন সেইসঙ্গে জঙ্গি হামলা অপারেশন সিঁদুর ইত্যাদি প্রভৃতিকে মিশিয়ে দিলেন ক্রিকেট উত্তেজনায়।
ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ ঘিরে খেলোয়ার এবং দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড-এর এত অভিযোগ পালটা অভিযোগের ঘটনার কথা কেউ মনে করতে পারবেন না। যদিও ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা এর আগেও ছিল আর তা এবারের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রাতেই। সাজঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া, ম্যাচ ফি-র ৩০ শতাংশ জরিমানা, ম্যাচ রেফারির বিতর্কে জড়ানো, অর্ধশতরান করে ব্যাটসম্যান ব্যাটকে স্টেনগান-এর মতো দেখিয়ে উল্লাস প্রকাশ করছেন কিংবা কোনো বোলার প্লেন ক্র্যাশ সেলিব্রেশন করছেন, জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার সময় খোশগল্প করছিলেন অথবা অশ্লীল ভঙ্গী… না স্মরণকালে ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ প্রবল উত্তেজনা মুহুর্তেও এমন মাত্রায় পৌঁছেছে বলে কেউ বলছেন না। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন করছেন খেলার মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জঙ্গি হামলা, রক্তপাত, যুদ্ধ ইত্যাদি টেনে আনা সে কি কেবল ক্রোধ বা হতাশা প্রকাশ নাকি খেলোয়াড়চিত চেতনার অভাব, আর তার থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয় এক কথায় অবমাননাকর আচরণ? ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সেও তো খেলা নিয়ে নয়। সাধারণত ক্রিকেট ম্যাচে বোলিং-ব্যাটিং-নো বল-ওয়াই বা আউট নিয়েই বিতর্ক হয় কিন্তু এক্ষেত্রে তার কোনো একটিও ঘটেনি তাই বিতর্ক জয় পরাজয়তে শেষ হবে না তা বোঝাই গিয়েছিল। হলও তাই।
খেলা শেষে পাকিস্তানের ক্রিকেটারেরা সাজঘরে ঢুকে গেলেন। পর পর তিনটি ম্যাচে ভারতের কাছে পরাজয় মেনে নেওয়াটা তো সহজ ব্যাপার নয়। তাছাড়া গোটা প্রতিযোগিতাতেই ভারত পাকিস্তানকে বয়কট করে। সেটা ও তো অপমানের সমান। পাকিস্তানের ক্রিকেটারেরা মাঠে নামতে দেরি করায় সলমনরা অনুষ্ঠান বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলেন কিনা এমন জল্পনা শুরু হয়েছিল। অবশেষে দেখা গেল ভারতীয় ক্রিকেটারেরা পিসিবি-র সভাপতি মহসিন নাকভিকে পাত্তা দিলেন না, এশিয়া কাপ জিতেও ট্রফিই নিলেন না। এই প্রত্যাখানও কিন্তু রাজনৈতিক এবং তা রাজনৈতিক উত্তাপের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতী অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বয়কট করে বলেন যে এই সিদ্ধান্ত “ওপরের মহল” থেকে এসেছিল, যা কেন্দ্রীয় সরকার ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত। ভারত ও পাকিস্তান অতীতেও রাজনৈতিক কারণে সম্পর্ক স্থগিত রেখেছে, এবং এই ঘটনাও সেই রাজনীতিরই একটি প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে সমালোচনা চলছে। অন্যদিকে খেলার মাঠে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা ভারতীয় অধিনায়ক যিনি এশিয়া কাপ ২০২৫-এর শীর্ষ ১৫ রান সংগ্রহকারীদের মধ্যেও নেই। গোটা প্রতিযোগিতার ছটি ম্যাচে তাঁর অবদান রান মাত্র ৭১, গড়ে ২৩.৬৬ এবং স্ট্রাইক রেট ১০৭.৫৭। ভারত পাকিস্তান ছটি ম্যাচে একজন ব্যাটসম্যান হয়ে মোট ৭১ রান করার কারণেই হয়তো তিনি ‘অপারেশন সিঁদুর’ প্রসঙ্গের উত্থাপন করেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেন।
তবে প্রতিপক্ষের অধিনায়ক কিংবা খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন না করাটা অ-সৌজন্যতা তো বটেই এবং তা কোনো ভাবেই খেলোয়াড়সুলভ পরিচয় নয়। কোনো জয়কে শোকাপ্লুত পরিবারের প্রতি উৎসর্গ করে কিংবা কোনো অপারেশনের জন্য সেনাবাহিনীর প্রশংসা করে নিজেকে অথবা নিজেদের মহান প্রতিপন্ন করা গেলেও খেলার মাঠে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে সম্মান না করলে কিংবা সৌজন্যতা না দেখালে সেই মহত্ব ধূলায় মেশে, বিজয়ের অলংকারও মলিন হয়। দুবাইয়ে এশিয়া কাপ ম্যাচে ভারতীয় ক্রিকেট অধিনায়ক ও তাঁর সাথীদের আচরণে ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনীতির স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে এবং তা নিশ্চিতভাবে উপরের নির্দেশেই কিন্তু সব মিলিয়ে তা কি খুব প্রশংসনীয় না অত্যন্ত নিন্দনীয়?