বাবুমশাই, আপনারা লেখাপড়া জানা মানুষ। পরিবেশ নিয়ে বক্তৃতা দিলে ফাটিয়ে দেন। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিসরে মনে রাখেন না পরিবেশের কথা। মনে রাখেন না নদী, বন, পাহাড়, বাতাস, সমুদ্রের কথা। শুনেও শোনেন না তাদের কান্না। উন্নয়নের নামে, ব্যক্তিগত লোভের তাগিদে ক্রমাগত তাদের উপর জুলম করে চলেছেন। কাটছেন তাদের, ফাটাচ্ছেন, চৌচির করে দিচ্ছেন। মনে মনে ভাবছেন, আপনারা বুঝি এই জগতের শেষ কথা। আপনাদের শুধু বাঁচার অধিকার, ওদের নেই। ভুল ভুল। আপনারা আমাদের উপর জুলুম চালিয়ে কবর খুঁড়ছেন নিজেদেরই।
এবার আমার কথা বলি। বলি আমার মরণযন্ত্রণার কথা।
আমি আরাবল্লি পর্বতমালা। সেই কবে, প্রাক ক্যামব্রিয়ান যুগে জন্ম আমার। বিজ্ঞানীরা বলবেন আমি এক ক্ষয়জাত পর্বত। গুজরাট থেকে রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে দিল্লি পর্যন্ত ছড়িয়ে আছি আমি। প্রায় আটশো মাইল। মাউন্ট আবুতে যে গুরুশিখর আছে, সেটাই আমার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। তার উচ্চতা ১৭২২ মিটার।
বাবুমশাইরা, দীর্ঘদিন ধরে আমি তো আমার ভারতবাসীকে মায়ের মতো যত্নে লালন করে আসছি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নীরব প্রহরীর ভূমিকা পালন করে গেছি। ওই যে থর মরুভূমি, যে বিকট রাক্ষসীর মতো গিলতে আসছে গঙ্গা-যমুনার সমভূমিকে, আমি সেই থর মরুভূমির বিস্তারকে ঠেকিয়ে রেখেছি দাঁতে দাঁত চেপে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে বাধা দিয়ে সহায়তা করেছি বৃষ্টিপাতের।
জানেন বাবুমশাইরা, কিছুদিন আগে সংকলা ফাউণ্ডেশনের সদস্যরা এসেছিল গুরুগ্রাম জেলার সাকাতপুর গ্রামের কাছে আমার পর্বতমালার বনভূমির কাছে। পরিবেশ পুনরুদ্ধার তাদের কাজ। সেই দলে ছিল উৎকর্ষ রাঠির মতো মেয়ে। সে আমার অতীতকে অনুভব করার চেষ্টা করেছে দরদ দিয়ে। এখানকার এক বয়স্কা নারী তাকে বলেছে : জানো, শ্রাবন মাসে (বর্ষাকালে) এখানে ময়ূর ডাকত, গাছে বাঁধা ঝুলায় দোল খেত মেয়েরা। হরিয়ালি তীজের সময় সুন্দর পোশাক পরে লোকসংগীত গাইত। চিতাবাঘের কলরব শোনা যেত বনে। নীলগাইএর ডাক শুনতাম। বনে পাওয়া যেত কত রকমের ওষধি, পাওয়া যেত গিলয় আর অশ্বগন্ধা। কিছুটা দুঃখে, কিছুটা রাগে কি বলেছে জানো উৎকর্ষ রাঠি? বলেছে — আরাবল্লি পর্বতমালা কেবল একটি বন নয়, বরং প্রকৃতি ও এর বাসিন্দাদের মধ্যে এক অনন্য সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক মিলনের সঙ্গমস্থল। এতে বসবাসকারী পশুপালক গোষ্ঠী ও কৃষিজীবীরা জীবিকা, ওষধি ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের জন্য এই বনের উপর নির্ভর করে। তাই এই পর্বতকে, এই বনভূমিকে ধ্বংস করা শুধু পরিবেশের ধবংস নয়; সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করা।
হলে কি হবে, লোভে চক চক করা চোখগুলোকে কে দমাবে? লোভী মানুষগুলো জানতে পেরেছে আমার পর্বতমালা খনিজ সম্পদে ভরা। স্যাণ্ডস্টোন, লাইমস্টোন, গ্রানাইট, মার্বেল পাথরের বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে আমার। তাছাড়া আছে সোনা, তামা, দস্তা, লেডের মতো সব মিনারেল।
দেশের কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক আমাকে পাহাড় বলে গণ্য করতে চায় না। তাদের কথা : তাকেই পাহাড় বলে গণ্য করতে হবে, আশপাশের জমির তুলায় যার উচ্চতা ১০০ মিটারের বেশি। দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় তাদের কথাকে মান্যতা দিল। ব্যাস, আর পায় কে?
অবশ্য, অনেক আগে থেকেই আমার হৃদপিণ্ডকে ফুটো করার কাজ শুরু হয়েছে। রাজস্থান আর হরিয়ানার সীমান্তে চলেছে অনিয়ন্ত্রিত খনন। মার্বেল, কোয়ার্কজাইট, মূল্যবান পাথরের লোভে কেটে ফেলা হয়েছে আমার একের পর এক পাহাড়। এর মধ্যে আমার ৩১টা পাহাড় অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারপরে আছে নগর গড়ার হিড়িক। দিল্লি-এন সি আর অঞ্চলে আমার পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে রিয়েল এস্টেট প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, চওড়া সব সড়ক।
উন্নয়নের নামে আমাকে মারো, কাটো, ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দাও; কিন্তু ভবিয্যতে কি হবে সেটাও জেনে রাখো। আমকে ধ্বংস করলে সমগ্র উত্তর ভারতে তার প্রভাব পড়বে, পরিবেশ ও জনজীবন বিষিয়ে যাবে। তাপমাত্রা বাড়বে। বায়ু দূষণ বাড়বে। প্রাকৃতিক জলধারন আর বনভূমি নষ্ট হবে। জীববৈচিত্যের রক্ষাকবচ আর থাকবে না।
ও মন্ত্রীমশাই, ষড়যন্ত্রী মশাই, আপনি সাফাই দেবেন না! সাফাই? হ্যাঁ, কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী যোগেন্দ্র যাদব মশাই বলেছেন, আরাবল্লি পর্বত নিয়ে মিথ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প মশাই জলবাবু পরিবর্তন নিয়ে বলেছিলেন — ওসব চাইনিজ হোক্স। যোগেন্দ্র যাদব আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, আরাবল্লির মোট এলাকা ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার; এর মধ্যে মাত্র ০’১৯ শতাংশ এলাকায় খননের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন বটে, কিন্তু সেসব বিশ্বাস করবেন না।
কেন বিশ্বাস করবেন না?
শুনুন তবে।
বড় কর্পোরেটদের ব্যবসা করার সমস্ত সুযোগ-সুবিধে দেওয়ার শপথ নিয়েই বিশ্বগুরু নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তারা বড় কোম্পানিগুলিকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য যাবতীয় পদ্ধতিকে সরল ও বিজনেস-ফ্রেন্ডলি করে তুলেছে। অনলাইনে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন নেওয়ার ব্যবস্থা, দ্রুত তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে তারা। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে প্রায় ১৫০০ প্রজেক্টকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। EIA প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত দুর্বল ও নিছক ফর্মালিটির স্তরে নামিয়ে আনার সুবাদে শেষতম Environmental Performance Index (EPI)–এ ভারত শেষের দিক থেকে ৪র্থ হয়েছে। ১৮০টা দেশের মধ্যে ২০১৬ তে যেখানে ভারতের স্থান ছিল ১৪১, ২০১৮তে এসে ১৭৭তম স্থান অর্জন করেছে।
বাবুমশাইরা, আমাদের দেশের কোন সরকারই পরিবেশের দিকে ঠিক ঠিক নজর দেয় নি; কিন্তু বর্তমান সরকারের মতো কর্পোরেট সংস্থার হাতে এমন করে নিজেদের অন্য কোন সরকার সমর্পণ করে নি।
আমার কান্না শুনতে শুনতে এসব কথা মনে রাখবেন। আর নিজেদের বাঁচানোর জন্য আমাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন।