এই গ্রন্থের নাম নিয়ে আমার প্রবল আপত্তি আছে। প্রথম কথা হল, গ্রন্থটির লেখক অশোক মজুমদারকে ভুজাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, ফুচকাওয়ালাদের মতো ‘ছবিওয়ালা’ বলে দেগে দেওয়া যাবে না। লেখক বিনয় দেখিয়েছেন কিন্তু তার প্রায় চার-পাঁচ দশক ধরে তোলা ছবিগুলো অন্তত সে কথা বলে না! নামটুকু ছাড়া এই বইটা সম্পর্কে আমার তেমন কোন সমালোচনা নেই। ‘ছবিওয়ালার গল্প’ বইটিতে জায়গা পাওয়া ঘটনাগুলি মোটেই গল্প নয় বরং তা ভঙ্গ বঙ্গের জীবন, সমাজ এবং মানুষের বদলে যাওয়ার এক অন্তরঙ্গ চিত্রকথা।
অশোকের ছবির সঙ্গে পরিচিত বাংলা সংবাদপত্রের পাঠক মাত্রেই জানেন, তার ছবির আয়নায় ধরা পড়ে বাংলার মানুষের জীবনযাপন এবং সমাজের একটু একটু করে বদলে যাওয়ার এক অন্তরঙ্গ ছবি। যা প্রকৃত অর্থেই একেবারে অন্যরকম। তা কখনও আমাদের চমকে দেয়, কখনও ফেলে অস্বস্তিতে। যাইহোক না কেন, তাকে অস্বীকার করা যায় না। আমাদের সবার চেনা একটা ঘটনাকেও একেবারে অন্যরকমভাবে লেন্সবন্দী করে চলেছে অশোক – ভাবনার এই অভিনবত্ব এবং দৃষ্টিকোণই ছবিগুলিকে যেন ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাৎক্ষণিকতার বাইরে বার করে দিয়েছে। জল জমা রাস্তার ওপর দিয়ে চলা মিছিলকে এই আলোকচিত্রী ধরেন গর্ত ভরা রাস্তার টুকরো টুকরো জমা জলের ওপর ফুটে ওঠা ছবিতে। এ যেন জীবনের এক অবিশ্বাস্য জলছবি! নিছক সংবাদচিত্রের বাইরে বেরিয়ে মানুষের প্রতিবাদকে তা এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

নিসর্গ নয়, বিপ্লব নয়, রাজনীতি নয়, সেলিব্রিটি নয় – জনপ্রিয় গানের কথা ধার করে বলা যায়, সে যেন দেখে চলেছে ‘শুধুই মানুষ’। নানা রঙের, নানা ঢঙের ছবির চরিত্রগুলির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটুকু ধরাই অশোকের ছবির বৈশিষ্ট্য। বহু সময়ে এর পিছনে অশোকের আগের থেকে ঠিক করা কোন ধারণা বা preconceive notion থাকে না, দর্শকদের ওপর তেমন কিছু চাপিয়ে দেওয়ার দায়ও তার নেই। সে যেন সযত্নে আমাদের বুকের গভীরে ছবিগুলিকে বসিয়ে দেয়। ঠিক যেমনটি ঘটেছিল তাকে নিজের মতো করে ক্যামেরাবন্দী করে সে। এক অন্যরকম পরিবেশে, অন্যরকম মুহূর্তে একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব বা সাধারণ মানুষকে নতুন করে নীরবে আবিষ্কার করে চলে সে। এই গ্রন্থে জায়গা পাওয়া সরোদসম্রাট ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ’র ছবিটাই তার একটা প্রমাণ। বিস্মিত হওয়ার মতো ছবি কিন্তু এই বিস্ময়ে কোন চোখ কপালে ওঠার মতো চমক নেই। প্রায় কিছুই হয়নি এমন একটা আটপৌরে ভঙ্গীতে ছবিটা তোলা! এই নিজের মতো করে দেখা এবং বিষয় নির্বাচন অশোকের ছবিকে তাৎক্ষণিকতায় বন্দী সংবাদচিত্রের সরগরম পৃথিবীতেও একটা আলাদা জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে।

কালীর কাছে কম্পিউটারের পুজো করা থেকে ভাইফোঁটায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শাঁখ বাজানো কিংবা সাজগোজ করা অবস্থায় বহুরূপীদের পাইস হোটেলে ভাত খাওয়ার মতো বিচিত্র সব মুহূর্ত ধরা পড়েছে অশোকের ক্যামেরায়! ছবি তোলাই শুধু নয়, অশোকের ছবি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা বহু অনিয়মও বন্ধ করে দিয়েছে। একসময় দশমীর দিন নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়া ছিল বহু দুর্গাপুজোয় চালু নিয়ম। উড়িয়ে দেওয়ার পর কাক, চিলের ঠোক্করে মারা যেত পাখিগুলি। তার ছবি সহ নানা ক্যাপশন স্টোরির কারণে এখন এই কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মায়ের চোখের সামনে খাঁচার মধ্যে অসহায় নীলকণ্ঠের ছবিটা সেই পুরনো ইতিহাস মনে করিয়ে দিল।

অশোকের ছবির একটা বড় জোর ওর আন্তরিকতা। খবরের কাগজের ব্যস্ত পৃথিবীতেও তাড়াহুড়ো করে কোনমতে একটা ছবি তুলে ফেলার মতো কাজ ও খুব একটা করেনি। এই আন্তরিকতা এবং একেবারে নিজের মতো করে ভাবাই ওর সবচেয়ে বড় পুঁজি। এই পুঁজি নিয়েই ও আরও অনেকটা পথ ক্যামেরা নিয়ে হাঁটবে। ওর ঝুলিতে জমবে আরও বিচিত্র সব গল্প, ছবির বৈচিত্র্যের চেয়েও যা মোটেই কম আকর্ষণীয় নয়। বিষয় ও উপস্থাপনায় ‘ছবিওয়ালার গল্প’ বাংলা প্রকাশনার জগতে এক ব্যতিক্রমী সংযোজন হয়ে রইলো। স্যালুট মান্দাস।