আজ পৌষ মাসের আম্রবকুল অমাবস্যা। এই পৌষ অমাবস্যাকে দর্শনা অমাবস্যাও বলা হয়। এবছরের শেষ অমাবস্যা তিথি। নামটা শুনে বেশ কৌতূহল জাগছে না মনে, এ কেমন অমাবস্যার নাম! জানলে অবাক হবেন শুধুই এই বঙ্গে নয়, ওড়িশার জগন্নাথদেবের মন্দিরেও এই অমাবস্যা তিথি নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। আজকের দিনটির গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্যও প্রচুর৷
আমাদের বঙ্গ কৃষিপ্রধান দেশ। এখানকার জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে কৃষির প্রভাব অপরিসীম। আর এই কৃষিভিত্তিক সমাজেই ফসলের সমৃদ্ধি, পরিবারের মঙ্গল ও সুস্থ জীবন কামনায় গ্রামবাংলার নারীরা নানা ধরনের উৎসব পালন করেন। এই অমাবস্যার নামটি ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, আম্রবকুল মানেই তো আমের মুকুল। আজকের এই বিশেষ দিনে মা কালীর পূজাবিধি অন্যান্য অমাবস্যার মতো হলেও, এই তিথিতে আম্রবকুলকে উৎসর্গ করে পৌষকালীর পুজো হয়।
এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে আমের বকুল দেখা দিতে শুরু করে। তিথির এই রূপ নামকরণের তাৎপর্য হল এই যে- আসন্ন গ্রীষ্মে যে সুমিষ্ট ফলপ্রাপ্তি ঘটবে, তার সম্ভাবনা শুরু হল। এই দিনটি থেকে সাধক ভাবী কালের সুসিদ্ধাবস্থার ভাবে জাগ্রত হয়ে এই কঠোরতম তান্ত্রিক সাধনায় বৃত হয়। আবার সাধক সাধনায় পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়ে পুনরায় ফলহারিণীতে নিজ সর্বসিদ্ধি কালীতে সমর্পণ করে দেন।
পৌরাণিক শাস্ত্র অনুযায়ী, অমাবস্যায় চাঁদ থাকে না বলে একে অশুভ ও অন্ধকারের সময় মনে করা হয়। কারণ এই সময়ে প্রেতাত্মারা সক্রিয় থাকে এবং নতুন কাজ করা অনুচিত বলে মনে করা হয়। তবে এই দিনে পূর্বপুরুষদের শ্রাদ্ধ (পিতৃতর্পণ), দান, কালী পূজা, তারা পূজা (কৌশিকী অমাবস্যায়) এবং শনি দেবতার পূজা করা হয়, যা গোপন সাধনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার প্রায় সবকটি সতী পীঠেই এদিন বিশেষ পুজো ও মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনে দেবী পৌষালী মমতাময়ী রূপে ধরা দেন।
হিন্দু পঞ্চাঙ্গ অনুসারে, পৌষ অমাবস্যা তিথি ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে ভোর ৪টে ৫৯ মিনিটে শুরু হয়ে ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে ভোর ৭টা ১২ মিনিটে শেষ হবে। তাই, যারা পৌষ অমাবস্যা ব্রত পালন করতে চান তারা ১৯ ডিসেম্বর উপবাস রাখতে পারেন।
পৌষ অমাবস্যায় মা কালীকে মূলো, কমলালেবু ও নতুন গুড়ের মিষ্টি (যেমন রসগোল্লা) নিবেদন করার রীতি আছে, বিশেষত মূলোর মাধ্যমে ভক্তরা তাঁদের পাপকর্ম দেবীর চরণে উৎসর্গ করেন বলে বিশ্বাস। আর শীতের মরশুমি ফল ও গুড়ের মিষ্টি ভোগে মা সন্তুষ্ট হন, যা সৌভাগ্য ও বাধা মুক্তির জন্য নিবেদন করা হয়। এই দিনে দরিদ্র ও দুস্থ মানুষকে খাদ্য, বস্ত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করা শুভ বলে মনে করা হয়। অমাবস্যা উপলক্ষে, বিশেষ করে তিল, কম্বল এবং খাদ্যদ্রব্য দান করা সেরা বলে মনে করা হয়।
শুধুই এই বঙ্গে নয়, ওড়িশার কৃষকরা এই দিনে ভগবান জগন্নাথ দেবকে বকুল (আমের ফুল) নিবেদন করেন, যাতে ভালো ফলন হয়। এই পুজোর সাথে জড়িত থাকে নতুন ফলনের আশা, তান্ত্রিক সাধনা, এবং লোকজ আচার-অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ওড়িশা ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে। ‘ধলা মান্দা পিঠা’ ও ‘গাইন্থা পিঠা’ (এক ধরনের পিঠা) তৈরি করে আম গাছে দেওয়া হয়। এই পুজো প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগের এক প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করে।
ওড়িশার উপজাতীয় সম্প্রদায়, যেমন সাবর ও বিনঝাল, এই দিনটি ‘টঙ্কু ওড়া’ বা ‘আম্বা নুয়া পারবা’ হিসেবে পালন করে, যেখানে তারা গান, নাচ ও বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আজকের দিনে তারা আম গাছে পাথর ছোঁড়ে, ফুল সংগ্রহ করে মেয়েদের চুলে সাজায় এবং বিবাহের প্রতিশ্রুতি দেয়।
গাইন্থা পিঠা এবং ধলা মান্দা পিঠা বাড়িতে কিভাবে তৈরি করবেন সেটা বলি।
গাইন্থা পিঠা তৈরীর প্রয়োজনীয় উপকরণ : ডো-এর জন্য — চালের গুঁড়া, লবণ, সামান্য ঘি/তেল, জল।
দুধের ক্ষীরের জন্য : দুধ, চিনি, এলাচ গুঁড়া, জাফরান, এবং অল্প নারকেল কুচি ও বাদাম।
পরিমাণ মতো চালের গুঁড়া, লবণ ও জল মিশিয়ে নরম ও মসৃণ ডো তৈরি করুন, প্রয়োজনে সামান্য ঘি বা তেল দিতে পারেন। এরপর ডো থেকে কেটে কেটে ছোট ছোট গোল বল তৈরি করুন। ডোগুলি ঢাকা দিয়ে অন্তত মিনিট কুড়ি রেখে দিন।
একটি পাত্রে দুধ ফুটিয়ে ঘন করুন, তাতে চিনি ও এলাচ মিশিয়ে সুগন্ধযুক্ত করুন। হাতের কাছে নারকেল আর জাফরান থাকলে এর সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন, ভালো ফ্লেভার আসবে।
ফুটন্ত দুধে ঢেকে রাখা গোল বলগুলি ছেড়ে দিন এবং হালকা আঁচে ১০-১৫ মিনিট বা বলগুলো নরম ও ভাসা পর্যন্ত রান্না করুন। কাজু, নারকেলের কুচি বা ভাজা বাদাম দিয়ে সাজিয়ে গরম বা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।
ধলা মান্দা পিঠা হলো ওড়িশার একটি ঐতিহ্যবাহী ভাপা পিঠা, যা চালের গুঁড়ো বা সুজির নরম ডো দিয়ে তৈরি হয় এবং পিঠের ভেতর স্টাফিং করা হয় নারকেল ও গুড়ের মিষ্টি পুর দিয়ে। ওড়িশার পশ্চিমাঞ্চলে সুজি দিয়ে তৈরি মণ্ডা পিঠা ডুবো তেলে ভাজা হয়, যা দেখতে মোদকের মতো হয়। এটি প্রথমাষ্টমী ও মানাবাসা গুরুবার-এর মতো উৎসবে জনপ্রিয় খাবার।
এটি আমাদের ভাপা পিঠার মতোই বাষ্পে সেদ্ধ করা হয়। এটি দেখতে অনেকটা মহারাষ্ট্রের ‘মোদক’ বা দক্ষিণ ভারতের ‘কোঝাক্কাত্তাই’-এর মতো।
উপকরণ : চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড়, এলাচ গুঁড়ো। কিছু ক্ষেত্রে সুজি বা রাগি আটাও ব্যবহার করা হয়।
পুর (Filling) : মিহি নারকেল কোরা, গুড়, এবং এলাচ ও গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে পুর তৈরি করা হয়।
তৈরির পদ্ধতি : চালের গুঁড়ো বা সুজির ডো মেখে ছোট বল তৈরি করে তাতে পুর ভরা হয়।তারপর এটিকে ভাপিয়ে বা ডুবো তেলে ভেজে তৈরি করা হয়।
প্রস্তুতিতে কিছু টিপস : পুরের মধ্যে সামান্য আদা বাটা বা ঘি যোগ করলে স্বাদ বাড়ে। এটি ভাপানোর পর পরিবেশনের আগে সামান্য ঘি দিয়ে পরিবেশন করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আম্রবকুল অমাবস্যা কেবল একটি তিথি নয়, এটি প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও সংস্কৃতির এক মেলবন্ধন, যা আসন্ন সমৃদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির বার্তা বহন করে। সাধকও আমের মুকুলের মতোই কুঁড়ি অবস্থায় তার সাধনা শুরু করেন। এরপর সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে আমের মতো পরিপক্ক হন। পরিপক্ব অবস্থায় নিজেকে সমর্পণ করেন মায়ের চরণে। এ যেন ভক্তি, সাধনা আর পূর্ণতার মহামিলন।