শনিবার কলকাতার প্রেসক্লাবে শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের পুনঃনির্মাণ নিয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিল্পী, অভিনেতা ও বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, নাটকের সম্পাদনা ও পরিচালনা করেছেন চৈতি ঘোষাল। তিনি অভিনয়ও করেছেন এ নাটকে। ‘রক্তকরবী’ নাটকের পুনঃনির্মাণ নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবুল বাশার, সঙ্গীত শিল্পী দেবজ্যোতি মিশ্র, প্রচেত গুপ্ত ও অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা। আগামী ৫ এপ্রিল থেকে এই নাটকের শুভ সূচনা হচ্ছে একাডেমীতে।
প্রসঙ্গত, আলোচনা সভায় মুখ্য বিষয় ছিল শতবর্ষে এসে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নানা মাত্রায় বিবেচনাযোগ্য একটি নাটক; বহুমাত্রিক-এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় শোষণের যে বহুমাত্রিক রূপ এবং সেখানে মানবসভ্যতার যে বিপর্যয় ও বিপন্নতা তাকেই রবীন্দ্রনাথ এ-নাটকে মূল উপজীব্য করে তুলেছেন। কেউ কেউ এই নাটকের মধ্যে শ্রেণি-সংগ্রাম চেতনার ছায়া খুঁজেছেন। নানা প্রশ্ন, নানা যুক্তি নিয়ে নাটকটি রচনার পর থেকে সমসাময়িক সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এ নাটকের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক-পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ঘোষণা করেছেন। নাটকের বহু সংলাপে খুব স্পষ্ট করে প্রকৃতিকে বিনাশের বিরুদ্ধে নিন্দা করা হয়েছে।
নাটকটি প্রধান দুটি চরিত্র রাজা আর নন্দিনী। রাজা প্রতিনিধিত্ব করছে পরিবেশ ধ্বংসের পক্ষে আর নন্দিনী তার বিরুদ্ধে কথা বলছে। নন্দিনী এই নাটকে সেদিক থেকে এক অদ্বিতীয় চরিত্র, নন্দিনীর মধ্যে মানবিক গুণাবলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির ছন্দ। নন্দিনী এ নন্দিনী বিশ্ব নাটকে সেদিক থেকে এক অদ্বিতীয় চরিত্র, নন্দিনীর মধ্যে মানবিক গুণাবলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির ছন্দ। নন্দিনী এ নাটকে প্রকৃতির প্রতীক হিসেব উপস্থাপিত। মানুষের প্রকৃতি বিরুদ্ধ কিছু করার ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ সর্বদাই ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। যখন পরিবেশ নিয়ে তেমন কোনো চিন্তাভাবনা সভ্য সমাজে দেখা যায়নি, রবীন্দ্রনাথ তখনই সে প্রশ্নটিকে জোরালোভাবে সামনে এনেছিলেন।
যন্ত্রসভ্যতার অগ্রগতির মধ্যেই তিনি দেখেছিলেন পরিবেশ বিনাশের কারণ। বক্তারা জানান, “রক্তকরবী”-র এই শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয় আজকের দেশকাল এতো সাম্প্রতিক, এতো আপন নাটক আর কী-ই বা আছে, যা এই সময়কে এতো গভীর ও বহুস্তরিভূত সত্যতায় খুঁড়ে আনতে পারে। শোষণে, অত্যাচারে, জোরজুলুমে, আজকেও আমরা এক উৎকট যক্ষপুরীর নাগপাশে বন্দী। সর্বগ্রাসী তার ক্ষমতা। সেখানে নন্দিনী আসে প্রাণের বার্তা নিয়ে। সেই প্রাণের যাত্রায় ওতোপ্রোতো জড়িয়ে আছে ফাগুলাল, বিশু, চন্দ্রা, কিশোর, গোকুলের মতো জনমানুষ। আবার সহজাত বোধ জ্ঞান বুদ্ধি অধ্যাপকও আছেন। একদিকে তাদের সংশয়, সন্দেহ, ভয়, বিষাদের জ্বালা, পারস্পরিক অবিশ্বাসের তিক্ততা, মাতালের বিলাপ যেমন আছে, তেমনি আর একদিকে কেমন এক অজানা রহস্য নন্দিনী, তার কাছে যক্ষপুরীর জনমানুষ যেন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া কোনো জিয়নকাঠির খোঁজ পায়। তাই চূড়ান্ত মুহূর্তে নন্দিনীর জয়ের প্রেরণায় অপ্রতিরোধ্য তাদের প্রতিবাদের ব্যাপ্তি ধরা পড়েছে এ নাটকে ।
এই উল্লেখযোগ্য নাটকে অভিনয় করছেন চৈতি ঘোষাল ছাড়াও দেবেশ রায়চৌধুরী, জীবন সাহা, পার্থ মুখোপাধ্যায়, পবিত্র কুমার, সুরজিৎ চক্রবর্তী, পার্থসারথি উপাধ্যায়, রজত মুখার্জি, অশোক মজুমদার প্রমুখ।