কান পাতলেই এখনও শোনা যাচ্ছে কান্নার শব্দ। নীরবে শোকের ছায়া জঙ্গলমহলে । কেন্দুপাতা আন্দোলনের নায়ক, শিক্ষার দিশারী, নারী শিক্ষায় অগ্ৰণী ভূমিকা, কিংবা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অগ্ৰদূত কে হারিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন জঙ্গলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ। একটা সময় এই সমস্ত মানুষের ত্রাতার ভূমিকা পালন করেছেন । তিনি হলেন উপেন কিস্কু । বাম মনোভাবাপন্ন ও স্বচ্ছতার মানুষ চলে যাবেন — এটা এখনও ভাবতে পারছে না মানুষ। গত ২৪ ডিসেম্বর নিঃশব্দে চলে গেলেন প্রাণের মানুষ উপেন কিস্কু। তবে দাগ কেটে রেখে গেলেন ।
উল্লেখ করতেই হয় উপেন কিস্কুর কেন্দুপাতার আন্দোলনের কথা। খুব বেশি করে মনে পড়ছে তাঁর তিনটে কথা। একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জঙ্গলের প্রথমত, যে সমস্ত আদিবাসী কেন্দুপাতা তৈরি ও সংগ্ৰহ করে তারা কেউ ন্যায্য মূল্য পায় না। কষ্ট করে কিন্তু ঠিকমতো খাবার জোটে না । একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী আসল মুনাফা করছিল । এর বিরুদ্ধে শুরু প্রথম লড়াই। দ্বিতীয়ত , জঙ্গলমহলে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চাই । এজন্য তিনি কলেজ ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের থাকা খাওয়ার হোস্টেল তৈরি করেছেন। তৃতীয়ত , জঙ্গলমহলে মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। তাঁর এই অবদানের কথা স্মরণ করলেই আদিবাসীদের চোখের কোণা থেকে জল ঝরে পড়ছে। বাম নেতৃত্বে তিনবার বিধায়ক ও মন্ত্রী হয়েও তাঁর সাদা কাপড়ে কেউ কাদা লাগাতে পারেনি। সকল রাজনৈতিক দলের কাছে তিনি ছিলেন প্রাণের ও মনের মানুষ।

গত ২৪ ডিসেম্বর চলে যাবার পর বাঁকুড়া, পুরুলিয়া,পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্ৰাম থেকে জঙ্গলমহলের মানুষ ছুটে এসেছেন সহমর্মিতার পরশ দিয়ে বিদায় জানাতে। তাছাড়া উল্লেখ করতেই হয় রাজনৈতিক জীবনের কথা। সত্তরের দশকে বাঁকুড়া জেলার জঙ্গলমহলে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা রক্ষায় কেন্দু পাতা সংগ্রহ ও বিক্রির ন্যায্য মূল্য, বিড়ি শিল্পের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং শ্রমিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল। ‘কেন্দু পাতা আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিত সেই কর্মসূচির অন্যতম মুখ ছিলেন উপেন্দ্র কিস্কু।৮৩ বছর বয়সে চলে গেলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা উপেন কিস্কু। বাঁকুড়া শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। সম্প্রতি বাড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি।
প্রসঙ্গত, উপেন কিস্কু ছিলেন আদিবাসী সমাজের অন্যতম পরিচিত মুখ। রাইপুর ব্লকের সার্বিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাঁর উদ্যোগে ওই এলাকায় একাধিক কলেজ ও স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি, আদিবাসী সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং উন্নয়নমূলক রাজনীতির জন্য তিনি বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন।তাঁর প্রয়াণে রাজনৈতিক মহল ছাড়াও সমাজের সর্ব স্তরে গভীর শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোকবার্তা জানানো হয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার বাঁকুড়ায় উপেন কিস্কুর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। প্রবীণ এই নেতার প্রয়াণে রাজ্য রাজনীতিতে এক শূন্যতা তৈরি হল বলে মত রাজনৈতিক মহলের।
ঘটনাচক্রে, উপেন ছিলেন এমনই একজন মন্ত্রী যিনি বামফ্রন্টের দুই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে মন্ত্রী হিসাবে কাজ করেছিলেন।

২০১১ সালের বামফ্রন্ট সরকারের পতনের সময় বামেদের যে ৬২ জন বিধায়ক জয়ী হয়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন উপেন। বাঁকুড়া জেলার রাইপুর (তফসিলি উপজাতি সংরক্ষিত) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ১৯৭৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত তিনি ছিলেন একটানা আট বারের বিধায়ক। তিনি ১৯৯১ সালে তফসিলি জাতি ও উপজাতি কল্যাণ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ২০০১ সালে তিনি অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের পূর্ণ মন্ত্রী হন। উপেন কিস্কুর ছাত্র নদীয়াচাঁদ মূর্মু জানান, একটা সময় জঙ্গলমহল ও সংলগ্ন এলাকায় আদিবাসী সমাজ পিছিয়ে পড়েছিল। উপেন কিস্কুর হাত ধরেই আদিবাসীদের উন্নয়নযজ্ঞ শুরু হয় । এই এলাকার একেবারে বাঁকুড়ার মাটির সন্তান হওয়ায় আদিবাসীদের সমস্যা সহজেই বুঝতে পারতেন তিনি ।স্কুল জীবন থেকেই তিনি অধিকারের লড়াই শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক ও আদিবাসী সমাজমহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।