২৯. ভাষাবিদ কে? হরিনাথ দে
বর্ধমানের মহারাজা ইতালির ভ্যাটিকান সিটিতে গেছেন মহামান্য পোপের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর সঙ্গে আছেন বাংলার এক তরুণ অধ্যাপক। পোপের সঙ্গে কথা বলতে চান যুবক। কিন্তু আলাপ হবে কোন ভাষায়? ইংরেজি? না, পোপ ইংরেজি ভাষায় বলবেন না কিছু। যুবকটি কি লাতিন ভাষা জানেন? পোপ নিশ্চিত যে যুবক লাতিন জানেন না।
এবার পোপকে অবাক করে দিয়ে যুবকটি লাতিন ভাষায় অভিবাদন করলেন পোপকে। কিছুটা অবাক পোপ, বেশ খুশিও। ভারতবর্ষের এক যুবক শুদ্ধ লাতিনে কথা বলছেন তাঁর সঙ্গে। পোপ যুবককে বললেন, ‘বাঃ, চমৎকার। তুমি লাতিন বেশ ভালো শিখেছ। এবার ইতালীয় ভাষাটাও শিখে নাও।’
এবার যুবকটি পরিষ্কার ইতালীয় ভাষায় কথা বলতে লাগলেন পোপের সঙ্গে।
কে এই যুবক?
যুবকের নাম হরিনাথ দে (১৮৭৭-১৯১১)। তাঁর জীবনের আয়ু মাত্র ৩৪ বৎসর। অথচ এই স্বল্প আয়ুর মধ্যে তিনি ৩৪টি ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। তাঁর ভাষাশিক্ষার কথা বলতে গিয়ে অরিত্র সোম বলেছেন :
‘সবজি কাটতে কাটতে ছোট্ট হরিনাথকে তরকারির খোসা দিয়ে বর্ণমালা চিনিয়েছিলেন মা। কিছুক্ষণ পরে সেই খোসা আর কয়লা নিয়ে তিনি গোটা বাড়ি ভরিয়ে দিয়েছিলেন বর্ণমালায়। এভাবেই ভাষার সঙ্গে আত্মীয়তা হয়ে গিয়েছিল হরিনাথের। সে তো ছিল নিজের ভাষা, মাতৃভাষা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ঘটতে থাকে সেই ছোট বয়েস থেকেই। স্থানীব চার্চ থেকে বাইবেল নিয়ে পড়তে শুরু করেছিলেন। কয়েকদিন পরে চার্চের ফাদার দেখেন, ছোট ছেলেটা গোটা বাইবেল হিন্দিতে অনুবাদ করে ফেলেছে।’
চব্বিশ পরগণার আড়িয়াদহে হরিনাথের জন্ম। রায় বাহাদুর ভূতনাথ দে তাঁর বাবা। মায়ের নাম এলোকেশী। ছোটবেলায় ছিলেন মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে। বাবার কর্মস্থলে। সেখান থেকে মিডল স্কুল পরীক্ষায় পাশ করে চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় এন্ট্রান্স ও এফ .এ পরীক্ষায় পাশ করে লাতিন ও ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাতিনে এম.এ পাশ করেন।
১৮৯৭ সালে বিলাতে গিয়ে ভর্তি হন কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে। ক্ল্যাসিকাল ট্রাইপসে উত্তীর্ণ হন। লাভ করেন নানা পুরস্কার।
১৯০১ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এখানে ঢাকা সরকারি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। অধ্যক্ষ হয়েছেন হুগলি কলেজের। ১৯০৭ সালে কলকাতা ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক হয়েছেন।
অবাক হতে হয় তাঁর কথা ভেবে। মাত্র ৩৪ বছরের মধ্যে তিনি কি করে আয়ত্ত করলেন গ্রিক, লাতিন, ফরাসি, জার্মান, পর্তুগিজ, স্প্যানিস, ডাচ, রুমানীয়, ইতালীয়, গথিক, হিব্রু, চিনা, আরবি, ফারসি, জেন্দ, তিববতি, সংস্কৃত, পালি, গুজরাতি, মারাঠি, ওড়িয়া, হিন্দি, উর্দু – এই সব ভাষা।
তাঁর অকাল মৃত্যুর পরে এশিয়াটিক সোসাইটির স্মৃতিসভায় প্রাচ্যতত্ত্ববিদ আবদুল্লা সুরাবর্দী বলেছিলেন : ‘একজন মহারাজার মৃত্যুর পরে আর একজন মহারাজা তাঁর উত্তরাধিকার গ্রহণ করেন। কিন্তু হরিনাথের মনীষার উত্তরাধিকার গ্রহণ করার মতো ব্যক্তি আগামী এক শতাব্দীর মধ্যে জন্মগ্রহণ করবে না।’
হরিনাথের মৃত্যুর পরে কবি সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন এক মর্মস্পর্শী কবিতা :
আজ শ্মশানে বহ্নিশিখা অভ্রভেদী তীব্রজ্বালা,
আজ শ্মশানে পড়ছে ঝরে উল্কাতরল জ্বালার মালা।
যাচ্ছে পুড়ে দেশের গর্ব, শ্মশান শুধু হচ্ছে আলা,
যাচ্ছে পুড়ে নতুন করে সেকেন্দ্রিয়ার গ্রন্থশালা।
আজ শ্মশানে বঙ্গভূমির নিবল একটি উজল তারা,
রইল শুধু নামের স্মৃতি রইল কেবল অশ্রুধারা।
নিবে গেল অমূল্য প্রাণ, নিবে গেল বহ্নিশিখা,
বঙ্গভূমির ললাট ’পরে রইল আঁকা ভস্মটীকা।
সত্যেন্দ্রনাথ হরিনাথের নামের স্মৃতি থাকার কথা বলেছিলেন। না, সে স্মৃতিও আজ নেই।
অসাধারণ!