চব্বিশ পরগণা ইজারা দেওয়া বিষয়ে ক্লাইভের কর্তাদের পাঠানো মন্তব্য চলছে “দেখা গেছে খামার, বা চুক্তিতে চাষ করা জমির অধীনে, ১,৯৮,৩০৫ বিঘা ১৯ কাঠা ১২ ছটাক জমি রয়েছে। এই জমিগুলোর পরিমাণ সর্বদা অনিশ্চিত থাকবে, কারণ জমির উৎপাদিত ফসল দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা হয় এবং খাজনার মূল্য সম্পূর্ণরূপে সেই ফসলের বিক্রয় মূল্যের উপর নির্ভরশীল। তবে, এ পর্যন্ত যা উৎপাদিত হয়েছে তার গড় হিসাব করলে, এর খাজনার পরিমাণ হওয়া উচিৎ ২,৯১,৮৪২ টাকা ১০ আনা ১১ পাই।
“এগুলো ছাড়াও টাকার বাট্টা (বিভিন্ন প্রকার রুপির উপর বিনিময় চার্জ। এই শব্দ সৈন্যদের প্রদত্ত ভরণপোষণ ভাতা বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়), বুজি জমা (বাজি-জমা, অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের স্বত্বে অধিষ্ঠিত কিন্তু রাজস্ব থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত জমি।) বা পরগনা কাছারিগুলোতে সংগৃহীত খাজনা, বিবাহ ও দেশ পরিদর্শনের উপর সালামি (সালামি, সৌজন্যমূলক উপহার বা কোনো অনুগ্রহের বিনিময়ে প্রদত্ত উপহার।) যাকে দিদেরি (ডিহি) বলা হয়, তাফাউলের (ভেরেলস্ট একটা তাফাউলকে ‘খালারি বা লবণক্ষেত্রের সমষ্টি’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।) ইজারা, বাজার ও ঘাটে সংগৃহীত খালাড়ি (যেসব জমিতে সমুদ্রের লোনা জল ঢুকিয়ে শুকনো করে লবণ তৈরি করা হয়) ও মোমের শুল্ক, চাষাবাদের জন্য প্রদত্ত অর্থের সুদ, বাঁধ ও সেতু মেরামতের খরচ, কলকাতার ১৫টি ডিহি ইত্যাদির খাজনা — এর কোনোটিই আমি আপনার সামনে পেশ করা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করি নি। এগুলোর পাশাপাশি আদায় সংক্রান্ত খরচগুলোও বিশেষভাবে পরীক্ষা প্রয়োজন; আমি পুরোপুরি সচেতন যে, বহু মানুষ অনেক জমি এখনও কম আর অযৌক্তিক অঙ্কের খাজনায় ভোগ করছে, যদিও এই বিষয়গুলোর সাথে জড়িত জটিলতা ও বিলম্বের কারণে আমি সেগুলো খুঁজে বের করতে পারিনি।
যেহেতু জমি পরিমাপ আর তার উৎপন্ন ফসল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জমির ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা অসম্ভব, তাই আমি সুপারিশ করব যে, যত বেশি সম্ভব যোগ্য সার্ভেয়ারকে এই কাজে নিয়োগ করা হোক। তাদের নির্দেশ দেওয়া হোক তারা যেন সমস্ত রায়তের একটা রেজিস্টার তৈরি করতে; প্রত্যেকের কাছে কী পরিমাণ জমি আছে এবং তার সাধারণ উৎপন্ন ফসল কী, সেটা বিশদে লিপিবদ্ধ করবে। এরপর প্রত্যেক রায়তের পট্টায় তার জমির পরিমাপ এবং তাকে প্রদেয় বার্ষিক বা মাসিক খাজনা উল্লেখ করাতে হবে; এই তালিকা আবশ্যিকভাবে দেশীয় কর্মচারীদের প্রতারণা প্রতিরোধ করবে, অথবা যদি আপনি জমি ইজারা দেন, তবে ইজারাদারদের যেকোনো অত্যাচার থেকেও রক্ষা করবে।
এইচ. ভেরেলস্ট। (লং: সিলেকশনস, নং ৯৪৬। বিখ্যাত ফুল-চিত্রশিল্পী কর্নেলিয়াস ভেরেলস্টের নাতি ভেরেলস্ট, ১৬ই জুলাই, ১৭৪৯-তে বাংলায় এসেছিলেন, ১৭৫৬-য় জুগদিয়ার কাউন্সিলের দ্বিতীয় সদস্য ছিলেন এবং ১৭৫৭-য় ফোর্ট উইলিয়ামের সাব-সেক্রেটারি ছিলেন। ১৭৬০-এ তাকে অঞ্চল প্রধান হিসেবে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। ১৭৬২-তে (১১ই মার্চ), ভ্যান্সিটার্টের নীতির বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদপত্রে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে তার নামটি শেষ স্থানে দেখা যায়। ১৭৬৩-তে তিনি মণিপুরে একটা অভিযানের চেষ্টা করেন, কিন্তু কাছাড়ের খাসপুরের বেশি দূর যেতে পারেননি। ১৭৬৫-তে তিনি কলকাতায় আসেন এবং সিলেক্ট কমিটির সদস্য হন। একই বছরে তিনি বর্ধমানের সুপারভাইজার এবং পরের বছর মেদিনীপুরের সুপারভাইজার নিযুক্ত হন। ১৭৬৬-র শেষের দিকে কলকাতার জমি সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয়। — অনুবাদক)
বর্তমান অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ লেনদেনগুলোর মাধ্যমে সুষ্পষ্টভাবে বোঝা না যাওয়ার কোনও কারনই নেই, ইংরেজ সরকারের কৃষক কল্যাণে গভীর মনোযোগ ছিল। ১৭৫৯-র ২১শে মে প্রকাশিত চাষ ভূমি নিয়মাবলীতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়—সেখানে এই দলিলটা উদ্ধৃত করা হয়েছে। ১৭৬৭-র কালেক্টরের আদেশাবলীতে দেশীয় কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হল: “হস্তবুদ (জমির উৎপাদন ও রাজস্বের হিসাব) বৃদ্ধির বিষয়টি আপনারা কঠোরভাবে তদন্ত করবেন, এবং প্রজাদের কোনো ক্ষতি না করে যা কিছু সংগ্রহ করা সম্ভব, তা সংগ্রহ করে আমার কাছে পাঠাবেন, এবং আপনারা আপনাদের পরগনার অবস্থা সম্পর্কে আমাকে একটা বিস্তারিত হিসাব দেবেন; সেখানে কী কী উন্নতি করা সম্ভব, এবং প্রজাদের কোনো কষ্টের মধ্যে না ফেলেই কোম্পানির জন্য আর কী কী সুবিধা অর্জন করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে জানাবেন, কারণ কোম্পানির উদ্দেশ্য হলো প্রজারা যেন স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামে থাকতে পারে।” (লং: সিলেকশনস, নং ৯৫৭।)
খাতায় কলমে যাদের জমিদার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, সেই সব ব্যক্তির কাজকর্ম এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইংরেজরা এই সময়ে গুরুতর আশঙ্কা পোষণ করতে শুরু করে। কাউন্সিল ১৭৬০ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর কোর্টকে লেখে:
“জমিদারদের দীর্ঘদিনের বকেয়া রাখার এবং বিভিন্ন অজুহাতে সরকারকে প্রতারণা করা থেকে বিরত রাখার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন না করলে, আপনাদের রাজস্ব শীঘ্রই এমন এক পর্যায়ে নেমে আসবে যা নিজেদের খরচ মেটানোর জন্যও পর্যাপ্ত হবে না, প্রশাসনের কর্তৃত্ব অবহেলিত হবে, এবং বিভিন্ন রাজা ও জমিদাররা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে এবং সরকারি কোষাগারের লুটের মালে পুষ্ট হয়ে নিজেদের জন্য স্বাধীন ক্ষমতা গ্রহণ করবে।” (লং, নং ৮৮৫)
১৭৬৭-তে বোর্ড রাজা নবকৃষ্ণ এবং ঘোষাল পরিবারের এক সদস্য যৌথভাবে বার্ষিক তেরো লক্ষ টাকার বিনিময়ে তিন বছরের জন্য কলকাতার টাউনগুলোর ইজারা নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বোর্ড এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে এই যুক্তিতে যে, “নবকৃষ্ণের বর্তমান পরিস্থিতি তাকে দেশে এতটাই প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ দিতে পারে যে, তাতে প্রজারা শঙ্কিত হতে পারে এবং অত্যাচারের আশঙ্কা করতে পারে।” (ঐ, নং ৯৫১)
ভেরেলস্টের সরবরাহ করা নিম্নলিখিত পরিসংখ্যান থেকে কলকাতা জমিদারি অঞ্চল, যার মধ্যে তিনটি শহরের পুরোনো জমিদারীও অন্তর্ভুক্ত ছিল জমি, সেখান থেকে ইংরেজদের প্রাপ্ত “সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে নিট রাজস্ব” সম্পর্কে জানা যায়। (ভেরেলস্ট: ভিউ, ইত্যাদি, পৃষ্ঠা ৭৩। ১৭৭৩ সালের Fourth Report of the Committee of Secrecyর সাথে তুলনা করুন)

ভেরেলস্টের বক্তব্য ১৭৬০-১৭৬৬-এর মধ্যে রাজস্ব আদায় পরিমানের দৃশ্যমান পার্থক্যের কারণ ছিল ২,১২,৩৩২ সা. টাকার অঙ্কের অনিয়মিত পরিশোধ, যা প্রথমে নবাবকে এবং পরে, লর্ড ক্লাইভকে দেওয়া হতো, “কারণ রাজস্বের পরিমাণে কোনো বড় পরিবর্তন ঘটেনি।” শেষ তিন বছরের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিকে অবশ্যই ১৭৬৬-এর ভেরেলস্টের রাজস্ব ব্যবস্থাকে সংগঠিতভাবে গড়ে তোলার ফল হিসেবে গণ্য করতে হবে।
উপসংহারের আগে লর্ড ক্লাইভের জায়গিরের বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। (জাগির (জাই-স্থান, গির-গ্রহণ)। ১৭৭৬-এ হেস্টিংস ভূমি রাজস্বের উপর প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য নিযুক্ত কমিশনাররা জাগিরকে দুই ভাগে ভাগ করেন:
১. রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহের জন্য নির্দিষ্ট জমির বরাদ্দ, যেমন, ঢাকার নৌবহরের জন্য।
২. ব্যক্তিদের ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দ- আলতামঘা- বংশানুক্রমিক এবং শর্তহীন। জাতি – “জাতি,” ব্যক্তিগত এবং এক জীবনের জন্য। মাশরুত “মাশরুত,” নির্দিষ্ট পরিষেবা সম্পাদনের শর্তে। হ্যারিংটন: এলিমেন্টারি অ্যানালাইসিস, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৬৬। এছাড়াও ডব্লিউ. আরভিন-এর একটা প্রবন্ধ দেখুন: জার্নাল, রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৮৯৬, পৃষ্ঠা ৫২০-২১।) সাম্রাজ্যের একজন ওমরাহ [আমীর একবচন, ওমরাহ্ বহুবচন – এখানে আমীর হওয়া উচিৎ ছিল] হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর, ক্লাইভ আশা করেছিলেন যে তার নব-অর্জিত মর্যাদার ভরণপোষণের জন্য তাকে সে কোনও একটা নির্দিষ্ট জেলার রাজস্বের স্বাভাবিক জায়গির বা বরাদ্দ প্রদান করা হবে, এবং ১৭৫৯-র প্রথম দিকে তিনি মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত ব্যাংকার শেঠদের চিঠি লিখে হতাশা প্রকাশ করেন এবং তাদের কাছে তার জন্য একটা জায়গির জোগাড় করে দেওয়ার জন্য প্রভাব ব্যবহার করতে অনুরোধ করেন। ২০শে ফেব্রুয়ারি শেঠরা উত্তর দেয় যে তারা নবাবের কাছে আবেদন করেছে, কিন্তু নবাব বাংলা বা উড়িষ্যায়, “খুব গরীব,” কোনো জায়গির দিতে রাজি হননি, বরং বিহারে দিতে চেয়েছিলেন। (Calendar of Persian Correspondence, Calcutta, 1911, No. 48. এছাড়াও দেখুন Auber; Rise and Progress of the British Power in India, 1837, Vol. I., p. 75, and A letter to the Proprietors of the East India Stock from Lord Clive to which are added the opinions of the Hon. Charles York and Sir Fletcher Norton on his Lordship’s Faghire, London, 1764 (Reprinted 1764), and The Opinions of Mr. James Eyre, Mr. Edward Haskins, Mr. E. Thurlow and Mr. John Dunning on the subject of Lord Clive’s Jaghire; to which are added his Lordship’s letter, etc. London. (No date). For the Sanad, etc., connected with the Jagir see Aitchison: Treaties, etc., Vol. I., Appendix.)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ