২৮. শশীচন্দ্র দত্ত : রামবাগানের গায়ক পাখি
বর্ধমান থেকে নীলমণি দত্ত কলকাতায় এসে রামবাগানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তারপরে সেটাই রামবাগানের দত্ত পরিবার নামে পরিচিত হয়েছে। নীলমণির বড় ছেলে রসময় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির স্মল ক্লেমস কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সংস্কত ও হিন্দু কলেজের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন তিনি। রসময় ও তাঁর ছোট ভাই পীতাম্বরের ছেলেরা সাহিত্য সাধনা করেছেন। তাই হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ ডি.এল. রিচার্ডসন রামবাগানের দত্ত পরিবারকে ‘গায়ক পাখির বাসা’ (‘A Nest of Singing Birds’) বলেছিলেন।
রসময়ের বড় ছেলে কৈলাসচন্দ্র ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র। বহু প্রবন্ধ ও গল্প তিনি রচনা করেন ইংরেজি ভাষায়। তাঁর একটি বিখ্যাত গল্প হল ‘A Journal of Forty-Eight Hours of the Year 1945’ . হরচন্দ্র, গোবিন্দচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র ছিলেন কৈলাসের ভাই। এঁরাও ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র এবং এঁরাও সাহিত্য সাধনা করেছেন। কৈলাসের ছেলে উমেশচন্দ্রের উদ্যোগে এই পরিবারের সদসস্যদের কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে, যার নাম ‘Dutta Family Album’ .এই পরিবারেরই সদস্য কবি তরু দত্ত এবং ঐতিহাসিক ও ঔপন্যাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত।
পীতাম্বর দত্তের ছেলে শশীচন্দ্র দত্ত (১৮২৪-১৮৮৬)। হিন্দু কলেজের ছাত্র তিনি। তাঁর উপরেও ক্যপ্টেন ডি .এল. রিচার্ডশনের গভীর প্রভাব পড়েছিল। কৈলাসচন্দ্রের ছেলেদের মতো তিনিও ইংরেজি ভাষায় দারুণ দক্ষতা অর্জন করেন। ‘Reminiscences of a Kerani’s Life’, ‘Shunkur : a tale of the Indian Mutiny of 1857’, ‘The Street Music of Calcutta’ — এই সব রচনাই তাঁর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ।
কিন্তু ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হয়ে, ইংরেজ অধ্যাপকের প্রশংসা লাভ করে তিনি ইংরেজের পদলেহী হয়ে যান নি। ইংরেজ রাজ্যাধিকারের সেই প্রথম যুগে, পরাধীনতার প্রথম প্রহরে, শশীচন্দ্রের স্বাভিমান, সাহস ও স্বাধীনতার চেতনা আমাদের অবাক করে। বেদনার বিষয় এই যে, এই রকম এক মানুষের জীবন ও কর্মের বিস্তৃত পরিচয় বাংলায় নেই। নটিংহ্যাম টেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেক্স টিকেল বিদেশি হয়েও যেভাবে শশীচন্দ্র দত্তের রচনা সংকলন করেছেন (সেই সংকলনে কৈলাসচন্দ্রের একটি রচনাও আছে), আমরা তা পারি নি, চেষ্টাও করি নি।
‘জো-হুকুম’ মানসিকতা শশীচন্দ্রের ছিল না। জুতো খুলে খালি পায়ে তিনি ইংরেজ ‘হুজুর’দের কাছে যেতেন না। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে এইখানে তাঁর মিল। ইংরেজের জাতিগর্ব, জাতি-বৈষম্য তাঁকে পীড়া দিত এবং তিনি সক্রিয়ভাবে তার প্রতিবাদও করেছেন। বিচার বিভাগে জাতিগত বৈষম্য প্রকট ছিল। লঘু অপরাধে দেশীয় গুরুদণ্ড হত, আর শ্বেতাঙ্গরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছাড় পেয়ে যেত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন কেন একজন অত্যাচারী নীলকর সাহেবকে মফস্বলের ইংরেজ বিচারক ছাড় দেন! দেশীয় জুরি নিযুক্ত করা হলেও তাঁদের যোগ্যতা ও মেরুদণ্ড ছিল না বলে আক্ষেপ করেছেন শশীচন্দ্র।
সিপাহি বিদ্রোহ সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্যে ইংরেজ শাসকরা নিদারুণ অসন্তুষ্ট হন। সিপাহি বিদ্রোহের যে সব অকথিত কাহিনি শশীচন্দ্র তুলে ধরেছেন তাঁর ‘আ টেল অব দ্য ইণ্ডিয়ান মিউটিনি’তে, তাতে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন স্যার আরস্কিন পেরি ও স্যার অ্যাসলি ইডেন। এই রচনায় শশীচন্দ্র বলেছেন যে সিপাহী বিদ্রোহ দমনের নামে ইংরেজরা শুধু সিপাহীদের উপর নির্যাতন করেন নি, তাদের সোনা-রুপোর অলঙ্কার এবং অন্যান্য আসবাবপত্র লুঠ করেছেন। সেই লুঠের মালের মধ্যে মেয়েদের নাকছাবি দেখে ক্ষুব্ধ শশীচন্দ্র বলেছেন যে ইংরেজরা এদেশের মেয়েদের উপর অত্যাচার করতেও দ্বিধা করেন নি।
শশীচন্দ্রের আর একটি বক্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব আছে।
তিনি মনে করতেন এ দেশের মানুষের সামরিক শিক্ষার বিশেষ দরকার আছে। তাঁর উক্তি : ‘The occasion may arise when it will be of inestimable value to them’. এমন একটা সময় আসবে যখন সামরিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে। তবে কি শশীচন্দ্র অস্ফুটভাবে পরাধীনতার নাগপাশমুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখতেন? তিনি কি তাহলে সুভাষচন্দ্র বসুর পূর্বসূরী?
দেশকে স্বাধীন করার জন্য, দেশের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, প্রশিক্ষিত সেনাদলের প্রয়োজন। কারণ শাসকেরা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ করে না। তাই নেতাজি সুভাষচন্দ্র গঠন করেছিলেন ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’। সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে, ‘দিল্লি চলো’ ধ্বনি দিয়ে, দেশপ্রেমিক সেই সেনাদল প্রকম্পিত করে তুলেছিলেন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কর্তাদের।
শশীচন্দ্র দত্ত আপামর মানুষের কাছে বহুল প্রচারিত নাম না হলেও আপনার এই লেখার মাধ্যমে তাঁর কৃতির কথা জানা গেল।
তরু দত্ত, রমেশ চন্দ্র দত্ত যথেষ্ট খ্যাতিমান ও গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলেন, এবং তাঁরা শশীচন্দ্র দত্তের পরিবারের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন । তরু দত্ত ও রমেশ চন্দ্র দত্ত এই দুই মহৎ ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে লেখাটি প্রকাশিত হলে বিভিন্ন পাঠকের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় হত মনে হয়।