১৬৯৮-তে ইংরেজদের তিনটে শহরের রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হয়েছিল, পূর্ববর্তী জমির মালিকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়েই। তবে, [পলাশীর পর] চব্বিশ পরগনার জমিদারির হাত বদলের ফলে যে সব জমিদার-মালিক অধিকারচ্যুত হলেন, তারা কোনও ধরনের ক্ষতিপূরণ পান নি, এবং যথেষ্টরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১৭৭২-এর ৩রা নভেম্বর কোর্টকে লেখা চিঠিতে ওয়ারেন হেস্টিংস এবং তার কাউন্সিল লিখল :-
১৭৬৯-এর ৩০শে জুনের আপনার আদেশাবলিতে এবং সেই তারিখের পর থেকে আপনার বহু চিঠিতে পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির জমিদারদের অধিকারের প্রতি যে মানবিক অভিপ্রায় দেখানো হয়েছে, তা আমাদেরকে ২৪-পরগনা বা কলকাতা অঞ্চলের প্রাচীন মালিকদের জন্য আপনার করুণা প্রার্থনা করতে উৎসাহিত করুক। এই জমিগুলো পলাশীর চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানির জমিদারিতে পরিণত হয়েছিল এবং এর ফলে তারা সেই জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন। এই জমিগুলোর একটা ক্ষুদ্র অংশ তার আগে বর্ধমান ও নদীয়ার জমিদারির সাথে যুক্ত ছিল। এই জমিদারদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপরোক্ত জমিদার ও তালুকদাররা সেই সময় থেকে চরম দারিদ্র্যে জীবনযাপন করছেন; তাদের কারো কারো বড় পরিবার রয়েছে, সে সব সদস্য, কর্মচারীর ভরণপোষণ করতে হয়। মুঘল সরকারের প্রচলিত নিয়ম ছিল জমিদারকে তার জমিদারি পরিচালন অধিকার বঞ্চিত করা হলে তার জমিদারির খাজনা থেকে বার্ষিক আয়ের অনুপাতে তাকে জীবিকা নির্বাহের ভাতা দেওয়া হবে; এই অনুপাত সাধারণত এক-দশমাংশ ছিল। আমরা এই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য এত বড় ভাতার সুপারিশ করছি না; আমরা নিশ্চিত যে তারা আরও অনেক কম আয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন এবং কৃতজ্ঞতার সাথে সেটি গ্রহণও করবেন। যেহেতু এই সুবিধা উভয় প্রদেশের অন্য সব জমিদারের প্রতি আপনার সরকারের অধীনে আসার পর থেকে প্রসারিত হয়েছে, তাই আমরা মনে করেছি যে, যারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের এই বিষয়টি আপনার কাছে তুলে ধরাটা অগ্রহণযোগ্য হবে না। (দৃশ্যত এবাবদে কোনও কিছুই করা হয়নি, কারণ, অক্টোবর ১৭৭৬-এ হেস্টিংস লিখছেন:- “আমি উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যে, ২৪ পরগনার বাঁধগুলির রখণাবেক্ষণের জন্য একজন সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগের প্রস্তাব করছি না, বরং একে কেবল একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবেই দেখছি। যখনই প্রাচীন জমিদারদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে, অথবা জমিগুলো স্থায়ী ইজারা দেওয়া হবে, তখন এই ধরনের একটা পদের আর প্রয়োজন হবে না, কারণ বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের হাতেই সবচেয়ে ভালোভাবে অর্পণ করা যাবে যাদের স্বার্থ থাকবে সেগুলোকে ঠিকঠাক রাখার। আইনি মালিকদের উচ্ছেদ করে ২৪ পরগনা বর্তমানে কোম্পানির জমিদারী। তাদের কঠিন পরিস্থিতি আমি অনেক আগেই কোম্পানিকে বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেছি। যখনই নতুন বন্দোবস্তের বিষয় বিবেচনাধীন হবে, তখনই আমি এটি বোর্ডের বিবেচনার জন্য প্রস্তাব করতে চাই, এবং এই উদ্দেশ্যে আমি পুরনো পরগনাগুলোয় মূলত অধিকৃত সম্পত্তির সাথে পুরানো মালিক এবং তাদের বংশধরদের নাম সংগ্রহ করতে কিছুটা শ্রম দিয়েছি।” ফ্রান্সিস: মিনিটস, ইত্যাদি, পৃ. ১৩৩-৩৪।
মি: জে. ওয়েস্টল্যান্ড (Report on the District of Jessore, 2nd ed., 1874) ২৪ পরগনার এক উচ্ছেদ হওয়া মালিকের ইতিহাসে আকর্ষণীয় আলোকপাত করেছেন। যশোরের রাজা মনোহর রায় ১৭০৫ সালে মারা যান এবং উত্তরাধিকারী পুত্র কৃষ্ণ রাম রায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। কৃষ্ণ রাম রায়ের উত্তরাধিকারী সুখ দেব রায়কে মনোহরের বিধবা স্ত্রী রাজি করিয়েছিলেন সম্পত্তির চার আনা অংশ সুখ দেব রায়ের ভাই শ্যাম সুন্দরের নামে লিখে দিতে। ১৭৫৬-র দিকে শ্যাম সুন্দরের মৃত্যুর পর চার আনা অংশটি উত্তরাধিকারীহীন হয়ে পড়ে। মি. ওয়েস্টল্যান্ড লিখেছেন, ‘সেই সময়ে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের থেকে কলকাতার কাছে কিছু জমি অনুদান পায়, এবং এই অনুদান দেওয়ার জন্য নবাব যে জমিদারদের উচ্ছেদ করেছিলেন, তাদের মধ্যে একজনের নাম ছিল সালাহ-উদ্দিন খান। এই ব্যক্তি, শ্যাম সুন্দরের সম্পত্তির কোনো উত্তরাধিকারী নেই এমন দাবি করে, তার পূর্বের জমিদারি হারানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে সম্পত্তিটি নিজের নামে দেওয়ার অনুরোধ করেন, এবং এই সম্পত্তি যেহেতু নবাবের নিজের ছিল না, সেটা দিতে অনিচ্ছুক না হয়ে, তাকে রাজার সম্পত্তির চার আনা অংশ দান করেন… চার আনা অংশ বেশিরভাগই সৈয়দপুর পরগণার মধ্যে অবস্থিত ছিল, এবং তাই এটি চার আনা এস্টেট বা সৈয়দপুর এস্টেট নামে পরিচিত ছিল, যার উভয় নামই আজও বিদ্যমান… চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় এটি এক মুসলিম মহিলা মানা জানের (সালাহ-উদ্দিন খানের বিধবা) দখলে ছিল এবং তিনি তার সম্পত্তির অত্যন্ত সুদক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরবর্তী সংকটময় সময়ে সম্পত্তি নিরাপদে রক্ষা করেন এবং প্রায় অন্য সব জমিদারদের গ্রাস করা বিপদ থেকে এটিকে বাঁচান। ১৮১৪-য় আমরা এস্টেটটি মানা জানের সৎ ভাই হাজী মুহাম্মদ মহসিনের দখলে দেখতে পাই, যিনি সেই বছর মারা যান। তার কোনো উত্তরাধিকারী না থাকায়, তিনি উইল করে তার সম্পত্তি হুগলির ইমামবাড়ায় কাজের জন্য ট্রাস্টে দান করেন; তারা সেই সময় থেকে এই জমির রাজস্ব ভোগ করে আসছে।” হাজী মুহাম্মদ মহসিন এবং হুগলি ইমামবাড়া সম্পর্কে জানতে দেখুন বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, দ্বিতীয় খণ্ড, সংখ্যা ১, জানুয়ারি ১৯০৮-এ সৈয়দ হোসেনের প্রবন্ধ))
ইংরেজরা তাদের নতুন অধিগ্রহণ করা অঞ্চল সুরক্ষিত করতে একটুও দেরি করেনি। ২৬শে জুলাই ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ থেকে কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে লিখলেন:
“নদী আর হ্রদের (লবণ হ্রদগুলো সাম্প্রতিক কালে আয়তনে অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে। ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় পর্যন্ত ঢাকা যাওয়ার প্রচলিত পথটি এই হ্রদগুলোর উপর দিয়েই যেত। দেখুন: বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, পঞ্চম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭১-৭৩।) মধ্যবর্তী অঞ্চলের বিস্তৃতি সম্পর্কে ইউরোপীয়রা সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকায়, এই মুহূর্তে মঞ্জুর করা জমি থেকে আপনাদের কত আয় হবে তা অনুমান করা অসম্ভব; কিন্তু এর মূল্য সম্পর্কে আপনাদের একটা ধারণা দেওয়ার জন্য, আমি এর বার্ষিক আয় দশ লক্ষ টাকা হবে বলে অনুমান করার সাহস করছি। আপনাদের একজন প্রতিনিধির সাথে জরিপ কাজ শুরু করার জন্য নবাবের পক্ষ থেকে একজন কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যেই কলকাতায় পাঠানো হয়েছে।”
ইম্পেরিয়াল রেকর্ড ডিপার্টমেন্টে সংরক্ষিত প্রাচীন নথিগুলির প্রেস লিস্টে “মুরাদাবাদ” থেকে ক্লাইভ এবং কাউন্সিল সদস্যদের লেখা ২৭শে জুলাই তারিখের একটা চিঠির নিম্নলিখিত সারসংক্ষেপ দেওয়া আছে:
“জানানো হচ্ছে যে, নবাবের পক্ষ থেকে কানুনগোর একজন ব্যক্তিকে কলকাতা থেকে পূর্ব দিকে অবস্থিত বৃহৎ হ্রদ থেকে দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত অঞ্চলের জমি, গ্রাম, জেলা, রাজস্ব এবং অন্য বিবরণ নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে; যদি এই ব্যক্তিরা উপযুক্ত সীমানা নির্ধারণ করতে সক্ষম না হয়, সুপারিশ করা হচ্ছে, হ্রদটি জরিপ করার জন্য যোগ্য ব্যক্তিকে আমাদের জন্য পাঠালে ভালো হয়, কারণ, যেমনটা অনুমান করা হয়, হ্রদটি কুলপি পর্যন্ত বিস্তৃত; তাহলে কোম্পানির সমগ্র অঞ্চল প্রায় জলে ঘেরা থাকবে, এবং বাগবাজার (বাগবাজার কলকাতার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। ১৭৫৬-র অবরোধের সময় এই স্থানের একটা দুর্গচৌকি ছিল এখানে একটা খণ্ডযুদ্ধের ঘটনাস্থল ঘটেছিল) থেকে হ্রদের তীরে অবস্থিত কৃষ্ণপুর পর্যন্ত একটা যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কলকাতাকে যেকোনো স্থলশত্রু থেকে সুরক্ষিত করবে, এবং বলা হচ্ছে যে যদি সীমানাটি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়, তবে তারা বিশ্বাস করেন যে নবাব কেবল এতে সম্মতিই দেবেন না, বরং আমাদের এর দখলও দেবেন এবং পর্যাপ্ত অনুদানের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করবেন।”
অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে সদ্য অধিগ্রহণ করা ভূমিগুলোর জন্য একজন জরিপকারী সরবরাহ করার অনুরোধ করা হয়েছিল, ১৭৫৭-র ৩রা আগস্ট তারিখের একটা চিঠিতে, তিনি উত্তর দিলেন:
“আমার কাছে মনে হচ্ছে এটি এমন একটা কাজ যার জন্য অনেক যত্ন এবং নির্ভুলতার প্রয়োজন, এবং আমি স্কোয়াড্রনে এমন কাউকে চিনি না যে এই কাজটি সম্পাদন করতে সক্ষম হবে; এবং, যদি কেউ থেকেও থাকে, আমি খুব নিশ্চিত যে এই ধরনের একটা কাজ সম্পন্ন করতে আমার এখানে থাকার সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। কিন্তু যদি স্কোয়াড্রনে অনুসন্ধান করে আপনি এমন কাউকে খুঁজে পান যিনি আপনার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবেন এবং ভারতে থাকতে ইচ্ছুক, তবে আমি তাকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আদেশ দেব।” (লং: সিলেকশনস, নং ২৪৫)
তবে, কাউন্সিল ক্যাপ্টেন রবার্ট বার্কার এই পরিষেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন; এবং, অ্যাডমিরালের চিঠি পাওয়ার পরের দিনই বার্কারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল “কোম্পানিকে দেওয়া অঞ্চলের জরিপের জন্য কানুনগোর লোকেদের সাথে যেতে, তার সাথে শিল্পী ও নাবিক ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সোয়ালোকে নিতে এবং মহান হ্রদের গতিপথের একটা পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে, এবং এর জলের গভীরতা পরিমাপ করতে,” ইত্যাদি। (Press List, Imperial Record Department, 4th August, 1757. India Office Records, Letter received from Bengal, vol. IV., p. 101)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ