ষষ্ঠ অধ্যায়
ইংরেজদের চব্বিশ পরগনা অধিকার
১৭৫৭-র ৯ই ফেব্রুয়ারী সিরাজ-উদ-দৌলা, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন আর কর্নেল ক্লাইভের মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়, সেটা আদতে “সম্মানজনকও ছিল না অথবা নিরাপদও ছিল না”। চুক্তি সম্মানজনক ছিল না কারণ “যুদ্ধে তৈরি হওয়া ক্ষোভ সত্ত্বেও নবাবকে শাস্তি পায়নি, অথবা কোম্পানি যুদ্ধের জন্য যে খরচ করেছিল তার ক্ষতিপূরণও পায়নি;” এই চুক্তি নিরাপদ ছিল না, কারণ সন্দেহ হচ্ছিল যে নবাব, ফরাসিদের সঙ্গে জোট করতে অতি উৎসাহী এবং মনে হচ্ছিল তারা যে কোনও সময়েই রাজনৈতিক পরিবেশে আবির্ভূত হবে, এই চুক্তি আগামী দিনে ইংরেজদের উপর নবাব আর ফরাসি জোটের সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ। (এলফিনস্টোন: দ্য রাইজ অফ দ্য ব্রিটিশ পাওয়ার ইন দ্য ইস্ট, পৃ. ২৯০)
ক্লাইভের প্রতি সুবিচার করতে হলে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ১৭৫৭-র প্রথম পাদে তার পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক ছিল এবং তিনি বুঝতে পারছিলেন, “যদি কিছু সদর্থক পদক্ষেপ করা না হয়, তবে নৌবহর এবং স্থলবাহিনীকে শীঘ্রই দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হবে।” ৫ই ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা ক্লাইভ বর্তমান কলকাতার শিয়ালদহ এলাকায় নবাবের শিবিরে দুর্দান্ত আক্রমণ পরিচালনা করেন; এবং এই প্রচেষ্টার সাফল্য এতটাই প্রবল ছিল যে সিরাজ-উদ-দৌলা তার বাহিনীকে লবণ হ্রদের ওপারে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বিশ্বাস করতেন নবাব তার বিপুল সংখ্যক সৈন্যের কারণে তখনও এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে তিনি সিলেক্ট কমিটির শান্তি প্রস্তাবে কানে তুলতে প্রস্তুত ছিলেন না, তাই তিনি তার ফ্ল্যাগ ক্যাপ্টেনকে চিঠি দিয়ে ক্লাইভের কাছে পাঠান, যেখানে আলোচনা শুরু করার আগে আরেকটা আঘাত হানার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। (“যতক্ষণ না তাকে ভালোভাবে শায়েস্তা করা হচ্ছে, স্যার, ততক্ষণ এই ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভুগবেন না যে সে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার দিকে ঝুঁকবে। অতএব, আসুন আমরা তার কূটনীতিতে প্রতারিত না হই, বরং আমাদের কাছে যে সব অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য অস্ত্র আছে সে সব ব্যবহার করি, এবং আমি নিশ্চিত যে সেই পদ্ধতি যেকোনো চুক্তি বা আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে।” ক্লাইভকে ওয়াটস, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭। হিল: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২১৫) তবে, ৯ই ফেব্রুয়ারি নবাব ক্লাইভের তৈরি করা শান্তির শর্তাবলী মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতির কথা জানান। যে পরিস্থিতিতে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল — সেখানে সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাবাহিনীর সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব, বুসির সৈন্যবাহিনী অথবা একটা শক্তিশালী ফরাসি নৌবহরের দ্রুত আগমনের প্রত্যাশা, এবং ইংরেজদের রসদের অভাব—এই বিষয়গুলো মনে রাখলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে নবাবের সাথে সমঝোতায় আসার সুযোগটি লুফে নেওয়ার জন্য ক্লাইভের যথেষ্ট কারণ ছিল। তবে, এই বিষয়টাও লক্ষ্য করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে ইংরেজদের মূল দাবি ছিল যুদ্ধপূর্ব স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া এবং “দিল্লি থেকে পাঠানো ফরমান আর হুকুমনামা” বলে অতীতে প্রাপ্ত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সম্পূর্ণরূপে ভোগ করার অনুমতি পাওয়া।
৯ই ফেব্রুয়ারির চুক্তির পাঠ্য মি. এস. সি. হিলের ‘বেঙ্গল ইন ১৭৫৬-৫৭’ গ্রন্থে সর্বোত্তমভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: “নবানের দখলনেওয়া কোম্পানির সমস্ত কুঠি ফেরত দেওয়া হবে। কোম্পানি, তাদের কর্মচারী ও প্রজাদের সমস্ত অর্থ, পণ্য এবং সম্পত্তি, যা নবাব বাজেয়াপ্ত এবং গ্রহণ করেছে, পুনরুদ্ধার করা হবে। তাঁর লোকেরা যা কিছু লুটপাট করা হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ বাবদ এমন অর্থ দেওয়া হবে, যা তাঁর বিচারবুদ্ধিতে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়।”
এই শর্ত অত্যন্ত অসন্তোষজনক মনে যে নবাব মেনে নিয়েছেন সে বিষয়টি লেখা হয়েছে এইভাবে: “আমার আদেশে যা কিছু বাজেয়াপ্ত ও গ্রহণ করা হয়েছে এবং আমার হিসাবপত্রে যার হিসাব রাখা হয়েছে, সে সব আমি ফিরিয়ে দিতে সম্মত।” (সিঙ্কানি, আইভস, A Voyage from England to India, পৃষ্ঠা ১১৫) ব্যাখ্যা করেন, এর অর্থ হলো “সরকারি নথিপত্র”।) তবে, নবাব মৌখিক এবং ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবং সম্ভবত এইটি এবং নবাবের পক্ষ থেকে অন্য মৌখিক প্রতিশ্রুতির জন্যই চুক্তিতে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এত দায়সারাভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
মৈত্রীর বিষয়ে, ক্লাইভ নবাবের প্রতিনিধিদের কাছে ফরাসিদের বিরুদ্ধে নবাব এবং ইংরেজদের মধ্যে একটা মৈত্রী চুক্তিতে উপনীত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু সিরাজ-উদ-দৌলা এই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। তবে, নবাব ক্লাইভ এবং ওয়াটসনকে লিখেছিলেন, তাদের শত্রুরাও তাঁর শত্রু হবে, এবং এই আশ্বাস যথেষ্ট বলে মনে করা হয়েছিল। (হিল। পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা cxlviii-ix) অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭-য় ইংরেজরা যা চেয়েছিল, সেটা যদি সংক্ষেপে বলতে হয়, তা ছিল কলকাতা অবরোধের আগে তাদের যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থায় ফিরে আসা, তাদের টাকশাল পরিচালনা জরতে দেওয়ার জন্য অনুমোদন, এবং “যে গ্রামগুলো ফরমান মার্ফত কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সুবাদার হস্তান্তর আটকে রেখেছিল, সেগুলোও তাদের হাতে তুলে দেওয়া; এবং জমিদাররা যেন তাদের উপর কোনো বাধা বা বিধিনিষেধ আরোপ না করে সেটা নিশ্চয় করা।” (Hill: Bengal in 1756-57, vol. ii. pp. 215-17, and Aitchison: Collection of Treaties, Engagements, etc., vol. I., p. 181)
১৭৫৭-র ৩রা জুন মীর জাফরের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি (অর্থাৎ, পলাশীর যুদ্ধ বিজয়ের আগে) সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে নিম্নলিখিত দিকে আলাদা ছিল:
১. ফরাসিদের বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যায় বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
২. এটাকে নিশ্চিতভাবেই মৈত্রী চুক্তি বলা যায়।
৩. এটায় শর্ত দেওয়া হয়েছে, নবাব “হুগলির ভাটি অঞ্চলে, গঙ্গা নদীর কাছে নতুন দুর্গ নির্মাণ করবেন না,” অর্থাৎ, এটি কার্যত বাংলার বিশাল নদীপথের প্রবেশপথ ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা এবং এর মাধ্যমে বাংলায় মুঘল সামরিক শক্তি ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
৪. সুনির্দিষ্টভাবে সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে যুদ্ধের সময় কোম্পানির ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।
কোম্পানির জমি সংক্রান্ত বিষয়ে, মীর জাফরের সাথে চুক্তির প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো নিম্নরূপ:
“৮. কলকাতা শহরের সীমানা ঘিরে থাকা খাদের (১৭৪২-এর মারাঠা বর্গির আক্রমণের আতঙ্কের বাসিন্দাদের খনন করা পরিখা। উইলসন: বাংলার ওল্ড ফোর্ট উইলিয়াম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৬।) মধ্যে বেশ কিছু জমি বিভিন্ন জমিদারের মালিকানাধীন ছিল; এছাড়াও, আমি ইংরেজ কোম্পানিকে খাদের বাইরে ছয়শ গজ জমি প্রদান করব।
“৯. কলকাতা থেকে কুলপি (কাল্পী আদতে কুলপি — সনদে উল্লিখিত জমি প্রকৃতপক্ষে আজিমাবাদ পরগনার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এইভাবে কুলপির চেয়েও আরও দক্ষিণে ছিল। দেখুন Major R. Smyth: Statistical and Geographical Report of 24 Pergunnahs District, Calcutta, 1857, p. 68) পর্যন্ত দক্ষিণের সমস্ত জমি ইংরেজ কোম্পানির জমিদারির অধীনে থাকবে এবং সেই অঞ্চলের সমস্ত কর্মকর্তা তাদের এখতিয়ারে থাকবেন। অন্য জমিদারদের মতোই তাদের রাজস্ব প্রদান করতে হবে।”(২ আইচিসন: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, খণ্ড ১, পৃ. ১৮৬। হিলের ‘বেঙ্গল ইন ১৭৫৬-৫৭’ গ্রন্থে প্রদত্ত চুক্তির পাঠ্যটি নিম্নরূপ: “কলকাতার দক্ষিণে অবস্থিত, নদী ও হ্রদের মধ্যবর্তী এবং কাল্পী পর্যন্ত বিস্তৃত দেশটি ইংরেজদের চিরস্থায়ী শাসনাধীনে থাকবে, যেভাবে বর্তমানে দেশীয় জমিদারদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে, এবং ইংরেজরা এর জন্য প্রচলিত খাজনা রাজকোষে প্রদান করবে।”)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ