শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | দুপুর ১২:৩০
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান

সাইফুর রহমান / ১৮২ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত দিনগুলোতে লিও তলস্তয় নিজেকে নিয়ে লিখেছেন, একই সঙ্গে নিজেকে আখ্যায়িত করেছেন ‘একজন প্রতিভাবান কিন্তু বিশৃঙ্খল যুবক’ হিসাবে। ডায়েরির পাতায় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন-‘আমি জানি আমার কী করা উচিত, কিন্তু প্রতিদিন তার বিপরীতটাই করি।’ এ আত্মস্বীকারের মধ্যেই একদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি ভর্তি হন হাসপাতালে। বাইরের কোলাহলবিহীন জীবনে শুরু হয় ভেতরের মানুষটির বিচার। সেই নিঃসঙ্গ সময়েই তার হাতে আসে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের আত্মজীবনী। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, একটি বই একজন মানুষকে কীভাবে বদলে দিতে পারে। ডায়েরিতে তলস্তয় লেখেন-‘আমি এমন একজন মানুষের কথা পড়ছি, যে নিজের চরিত্রকে নিজের হাতেই গড়ে তুলেছে।’ ফ্রাঙ্কলিনের নৈতিক তালিকা, প্রতিদিন নিজের দোষ চিহ্নিত করার অভ্যাস-এসব পড়ে তলস্তয় যেন প্রথমবারের মতো নিজের জীবনের দিকে নির্মহোভাবে তাকান। ডায়েরিতে তিনি লিখলেন-‘আমার জীবনে কোনো নিয়ম নেই। নিজেকেই নিজের ওপর আইন হতে হবে।’ হাসপাতালের সেই শয্যায় তলস্তয় একটি তালিকা তৈরি করলেন-অলসতা, কামনা, অহংকার, ক্রোধ। ডায়েরিতে তিনি নোট করেন-‘আজ আমি অলস ছিলাম। আজ আমি নিজের কাছে মিথ্যা বলেছি।’ এই ভাষা কোনো সাধুর নয়, এ ভাষা একজন সংগ্রামরত মানুষের। ফ্রাঙ্কলিন তাকে শেখালেন পাপ স্বীকার করতে নয়, পাপ গণনা করতে হয়। এক জায়গায় তলস্তয় লেখেন-‘আমি প্রতিদিন ভালো হতে চাই, কিন্তু প্রতিদিনই ব্যর্থ হচ্ছি। তবু এ ব্যর্থতার হিসাব রাখাটাই আমাকে মানুষ করে তুলছে।’ এ হাসপাতাল-পর্বে তলস্তয়ের কাছে নৈতিকতা আর বিমূর্ত ধারণা থাকে না-তা হয়ে ওঠে দৈনন্দিন অনুশীলন। ডায়েরির আরেকটি লাইন এরকম-‘নৈতিক জীবন মানে মহৎ কথা বলা নয়, বরং ক্ষুদ্র ভুলগুলো লক্ষ্য করা।’ এ অভ্যাসই বহু বছর পরে তলস্তয়কে নিয়ে যাবে আরও গভীর সংকটে-জীবনের অর্থ কী? কেন বাঁচব? কিন্তু সেই বড় প্রশ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল এখানেই-একটি হাসপাতালের ঘরে, একটি ডায়েরির পাতায়, আর ফ্রাঙ্কলিনের একটি বইয়ে। ফ্রাঙ্কলিন তাকে শিখিয়েছিলেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। আর তলস্তয় পরে লিখবেন-‘নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেই আমি ঈশ্বরকে খুঁজতে শুরু করেছি।’

যুগে যুগে লিও তলস্তয়কে বহু বই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। যেমন ‘ওয়ার এন্ড পিস’ উপন্যাসটি লেখার ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’ থেকে। আর ‘পুনরুজ্জীবন’ উপন্যাসটি লেখার ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বাইবেল থেকে। ‘হাজী মুরাদ’ বইটিও তিনি বাইবেলের অনুপ্রেরণাতেই লিখেছিলেন। তো তার জীবনে শৃঙ্খলার যে আত্মোপলব্ধি সেসব তো তিনি বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের আত্মজীবনী থেকে পেয়েছিলেন বটেই, কিন্তু আমার মনে হয় আরেকটি বিশ্ববিখ্যাত বই রুশোর আত্মজীবনী ‘দ্য কনফেশনও’ তলস্তয়ের জীবনে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিলেন। রুশোর ‘দ্য কনফেশন’ বইটি তিনি পড়েন ঊনিশ, বিশ বছর বয়সে। ফ্রাঙ্কলিনের বইটি তিনি রুশ অনুবাদে পড়লেও রুশোর বইটি তিনি সম্ভবত মূল ফরাসিতেই পড়েছিলেন। কারণ লিও তলস্তয় রুশ ছাড়াও ফ্রেঞ্চ, জার্মান, আরবি, তাতার, তুর্কী, তুরানি, ইংরেজি এমনকি ল্যাটিন ভাষা পর্যন্ত তিনি শিখেছিলেন। এগুলোর মধ্যে ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষায় তিনি ছিলেন বেশ পারদর্শী। পাঠকবৃন্দ জেনে অবাক হবেন, তলস্তয়ের যে চাকরটি তার জীবনের শেষ পর্যন্ত সঙ্গী হয়েছিল। ধীরে ধীরে সে তলস্তয়ের বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল। সেবার সন্নিষ্ঠ এ চাকরটি প্রায়ই অবসরে তলস্তয়ের সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ভাষায় রসালাপে মেতে উঠত। একই সঙ্গে সে অপটু গোটা গোটা অক্ষরে তলস্তয়ের অনেক রচনার প্রতিলিপি করে দিত। দার্শনিক রুশো তার আত্মজীবনী ‘দ্য কনফেশন’ বইটিতে কিন্তু কিছুই লুকোননি। অসম্ভব দক্ষতায় দার্শনিক রুশো চিত্রিত করেছেন উচ্ছৃঙ্খল ও পাপচারযুক্ত নিজের জীবন কাহিনি। ঠিক তেমনি লিও তলস্তয় তার উচ্ছৃঙ্খল জীবনের কাহিনিগুলো কখনো লুকোননি; বরং ডায়েরি ও আত্মস্বীকারের মাধ্যমে সেগুলো নির্মম ও সততার সঙ্গে লিখেছেন। তরুণ তলস্তয় ছিলেন ভয়ংকর জুয়াড়ি। কাজান ও মস্কোতে তিনি রাতের পর রাত কাটিয়েছেন তাসের টেবিলে। একবার তিনি নিজের অর্থ হারালেন, তারপর জমিদারির বন ও কৃষিজমি পর্যন্ত বাজি ধরলেন এবং সেগুলোও হারালেন। ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন: ‘আমি জানতাম এটা সর্বনাশ, তবু থামতে পারিনি।’ এই জুয়ার দেনা শোধ করতেই তিনি পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তার ভোগ ও যৌন উচ্ছৃঙ্খলতার কথা তলস্তয় নিজেই স্বীকার করেছেন অকপটে। তিনি তরুণ বয়সে যৌন সংযম মানতেন না। গ্রামাঞ্চলে কৃষক নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক। শহরে পতিতালয়ে যাতায়াত এ সম্পর্কগুলো নিয়ে পরে গভীর অনুশোচনা করে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন — ‘আমি নারীদের ভালোবাসিনি, আমি তাদের ব্যবহার করেছি।’ এ স্মৃতিগুলো তাকে আজীবন তাড়া করেছে এবং তার নৈতিক কঠোরতার পেছনে এ অপরাধবোধ বড় ভূমিকা রেখেছে। অহংকার ও ‘আমি শ্রেষ্ঠ’ এ ধরনের চিন্তা-চেতনায় তরুণ তলস্তয় ছিলেন ভীষণ অহংকারী। অন্য বন্ধুদের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতেন। শিক্ষক ও অধ্যাপকদের তুচ্ছ মনে করতেন। কাজান বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন এই ভেবে যে ‘ওরা আমাকে শেখানোর মতো কিছু জানে না’ ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন: ‘আমার প্রধান দোষ-আমি নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় ভাবি।’ ককেশাসে সেনাবাহিনীতে থাকার সময় মদ্যপান, ঝগড়া, শৃঙ্খলা ভঙ্গ ছিল নিয়মিত ঘটনা। একবার এক সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে প্রায় দ্বন্দ্বযুদ্ধ (duel) পর্যন্ত গড়ায়। তিনি নিজেই লিখেছেন — ‘আমি সেনা ছিলাম, কিন্তু শৃঙ্খলা মানতাম না।’ ‘ভাল মানুষ হব’ আর পাহাড় সমান ব্যর্থতার মধ্যে সবচেয়ে মানবিক কাহিনি হলো, তিনি বারবার নিজেকে বদলাতে চেয়েছেন। আবার বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। ডায়েরিতে দেখা যায়, তিনি লিখেছেন — আজ থেকে সংযমী হব। আজ থেকে মদ ছাড়ব। আজ থেকে জুয়া আর নয়। কিন্তু কয়েক দিন পরই লিখেছেন — ‘আজ আবার সব ভেঙে পড়ল।’ এ ব্যর্থতার ধারাবাহিকতাই পরে তাকে অস্তিত্বগত সংকটে ঠেলে দেয়। কেন এ উচ্ছৃঙ্খলতা গুরুত্বপূর্ণ? এ উচ্ছৃঙ্খল জীবন না থাকলে — A Confession লেখা হতো না। Sermon on the Mount-ভিত্তিক নৈতিক দর্শন আসত না, গান্ধী তলস্তয়ের মধ্যে এমন গভীর মানবিকতা খুঁজে পেতেন না। তলস্তয় আগে পথভ্রষ্ট ছিলেন বলেই তিনি পরে পাপ নিয়ে এত কঠোর ছিলেন। লিও তলস্তয় কোনো জন্মগত সাধু নন — তিনি ছিলেন এক উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। যিনি নিজের পতনের গভীরতা থেকেই নৈতিকতার উচ্চতা তৈরি করেছিলেন।

লিও তলস্তয় হঠাৎ করে ধার্মিক হননি। বরং এক দীর্ঘ, গভীর ও যন্ত্রণাময় আত্মিক সংকটের ভেতর দিয়ে তিনি ধার্মিকতায় পৌঁছান। ‘হঠাৎ’ বলে মনে হলেও এর পেছনে কয়েকটি নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক কারণ ছিল। প্রায় ৫০ বছর বয়সে তলস্তয় প্রবলভাবে উপলব্ধি করেন — মৃত্যু অনিবার্য হলে জীবনের অর্থ কী? এ প্রশ্ন তাকে এতটাই গ্রাস করে, তিনি আত্মহত্যার চিন্তাও করেছিলেন। এ সংকটের বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন তার গ্রন্থ A Confession-এ। বিশ্বখ্যাত লেখক হওয়া সত্ত্বেও তিনি বুঝতে পারেন — খ্যাতি, সম্পদ, সাহিত্যিক সাফল্য মৃত্যুর সামনে অর্থহীন। এ শূন্যতা তাকে বস্তুগত জীবনের বাইরে অর্থ খুঁজতে বাধ্য করে। তলস্তয় লক্ষ করেন — অশিক্ষিত কৃষক দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও বিশ্বাসের শক্তিতে টিকে থাকে, কিন্তু শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি অর্থহীনতায় ডুবে থাকে। এখান থেকেই তার মনে হয়, সত্য বুদ্ধিতে নয়, বিশ্বাসে নিহিত। তিনি চার্চের গোঁড়ামিকে প্রত্যাখ্যান করে যিশুর শিক্ষাকে নৈতিক দর্শন হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন — অহিংসা, প্রতিশোধ বর্জন, সম্পদের মোহ ত্যাগসহ সব মানুষের জন্য সমতা তার এসব দর্শনই পরবর্তীকালে পরিচিত হয় Tolstoyan Christianity নামে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তলস্তয় চার্চমুখী হননি; বরং ছিলেন চার্চবিরোধী। চার্চের ক্ষমতা, আচার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্কে তিনি ধর্মের বিকৃতি বলে মনে করতেন। এ কারণেই রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ তাকে পরবর্তীকালে বহিষ্কার করে। তলস্তয়ের ধর্ম ছিল আচরণভিত্তিক — তার কাছে ধর্ম মানে শুধু প্রার্থনা নয়, তলস্তয় মনে করতেন ধর্ম মানে ভালো মানুষ হয়ে ওঠা।

তলস্তয়ের দর্শন পরবর্তীকালে তার লেখাগুলোতেও ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। তার অনেক লেখার মধ্যে দুটি গল্প সম্পর্কে একটু আলোচনা করছি। প্রথম গল্পটির নাম ‘একজন মানুষের কতটুকু জমি দরকার’ আর দ্বিতীয় গল্পটি হলো, ‘বোকা আইভান’।

একজন মানুষের কতটুকু জমি দরকার গল্পে আমরা দেখি পাহোম নামের এক কৃষকের সম্পদের প্রতি ভীষণ দুর্বলতা। বিশেষ করে জমি কেনার প্রতি। ধীরে ধীরে সে বেশকিছু জমির মালিক হয়, কিন্তু তাতেও তার লোভ মেটে না। আরও বেশি জমির আশায় সে দূরবর্তী অঞ্চলে চলে যায়। সেখানে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় সূর্য ওঠা থেকে ডোবার আগ পর্যন্ত সে যতটা জমি হেঁটে ঘিরে নিতে পারবে, সবই তার হবে। লোভে পড়ে পাহোম অতিরিক্ত জমি ঘিরতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সূর্যাস্তের ঠিক আগে সে ফিরে আসে, কিন্তু প্রচণ্ড পরিশ্রম ও উত্তেজনায় সেখানে সে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়। শেষ পর্যন্ত তার জন্য দরকার হয় মাত্র ছয় ফুট লম্বা একটি কবর।

অন্যদিকে বোকা আইভান গল্পে আইভান ছিল একজন সহজ সরল, পরিশ্রমী ও নিঃস্ব মানুষ। সবাই তাকে ‘বোকা আইজান’ বলত, কারণ সে লোভী ছিল না, চতুরতার আশ্রয় নিত না এবং যা উপার্জন করত, তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিত। তার দুই ভাই ছিল। তারা ছিল বেশ চালাক ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তারা ক্ষমতা ও সম্পদের পেছনে ছুটত। শয়তান বারবার আইভানকে প্রলোভিত করত। সে আইভানকে ক্ষমতা, ধন-সম্পদ ও রাজ্য দেওয়ার লোভ দেখাত। কিন্তু আইভান প্রতিবারই তার সরলতা, শ্রম আর সত্যনিষ্ঠ আচরণে শয়তানের সব কৌশল ব্যর্থ করে দেয়। অবশেষে আইভানের সততা ও সহজ জীবনযাপনেই একটি শান্তিপূর্ণ রাজ্য গড়ে ওঠে। সেখানে নেই যুদ্ধ, নেই শোষণ, নেই লোভ। অন্যদিকে, চালাক ভাইয়েরা নিজেদের লোভের ফলেই ধ্বংসের মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়, সবাই যাকে ‘বোকা আইভান’ বলে, সেই আইভানই আসলে সবচেয়ে জ্ঞানী, কারণ সে লোভ ও ক্ষমতার মোহে পড়েনি। এ গল্পের মূল শিক্ষা হলো, সরলতা, পরিশ্রম ও সত্যনিষ্ঠাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। লোভ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাই মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে।

তলস্তয়ের লেখাগুলো পড়লে বোঝা যায়, তার লেখা গল্প কিংবা উপন্যাস যাই হোক না কেন, তার লেখার ভাষা কতটা সরল ও বাহুল্য বর্জিত।

‘শৈশব’ উপন্যাসের একটি প্রাথমিক খসড়ায় তিনি নিজেই বলেছেন-তিনি কখনো প্রবালের মতো টকটকে লাল ঠোঁট দেখেননি; ঠোঁট দেখলেই তার মনে পড়েছে পোড়া ইটের রং। চোখের নীলে কখনো নীলকান্ত মণির দীপ্তি আবিষ্কার করেননি; সেখানে তার কাছে ধরা দিয়েছে কাপড় ধোয়ার নীলের সাদামাটা আভা।

লেখালেখির শুরু থেকেই তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও কঠোর। ভাষায় কোনো রকম জাঁকজমক তিনি মানতে চাননি। কৃত্রিম উপমা, সাজানো অলংকার-এসবের প্রতি ছিল তার অনীহা; যা বাস্তব, যা রুক্ষ, যা সামান্য কিংবা তথাকথিত অসুন্দর-ঠিক জায়গায় যদি সেটিই যথার্থ শব্দ হয়, তবে তাকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। শিল্পের প্রচলিত সৌন্দর্যবোধে তা নিন্দিত হলেও তিনি তাতে বিচলিত হননি। ভাষা কাব্যিক হলো না, গড়ন মসৃণ হলো না, এ অজুহাতে তিনি কখনো সত্যকে বিসর্জন দেননি।

রহস্য কিংবা রোমাঞ্চ ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি কোথাও ঢোকাননি। তার বিশ্বাস ছিল, জীবনে যদি রহস্য না থাকে, কাহিনিতে তা আসবে কোত্থেকে? আর জীবন যদি রহস্যে ভরা হয়, তবে কাহিনি নিজেই রহস্যে আবৃত হয়ে উঠবে, কারণ কাহিনি তো জীবনেরই প্রতিবিম্ব। এ নিরেট সত্যকে আঁকড়ে ধরে তিনি পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন চোখ সদা খোলা, কান সদা সতর্ক, নাক ইন্দ্রিয় জুড়ে উন্মুক্ত। গন্ধ, শব্দ, দৃশ্য কিছুই যেন বাদ না পড়ে।

পাতার সামান্য কম্পন, চাষ দেওয়া জমির মাটি-গন্ধ, বরফে ঢাকা কাচের জানালার শীতল স্পর্শ, জিভে পাকা ফলের রস, গ্রামবাংলার শেয়াল-কুকুরের ডাক এসব অনুভূতি তার ইন্দ্রিয়ে ঢেউ তুলত, মস্তিষ্কে সেসব এসে মিশে এক গভীর ও তৃপ্তিকর অনুভবের জগৎ তৈরি করত। প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে তার সত্তা ছিল একই তালে বাঁধা। তাই গরু, বিড়াল, কুকুর, ঘোড়া কিংবা পাখি যে প্রাণীই হোক না কেন, তারা কী অনুভব করছে তা কল্পনা করতে তার বিশেষ পরিশ্রম লাগত না।

এ একই সততার সঙ্গে তিনি মানুষকেও দেখেছেন। কখনো মালিক, কখনো ভূমিদাস, কখনো নারী, শিশু, যুবতী কিংবা বৃদ্ধা যে কোনো চরিত্রে তিনি অনায়াসে নিজের মতো করে রূপান্তরিত করতে পারতেন। এ রূপান্তরের মধ্য দিয়েই তিনি পৌঁছে যেতেন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তার গভীর সত্যবোধে। সেখান থেকেই তার উপলব্ধি-তিনি জীবনে এমন কাউকে দেখেননি যে, সম্পূর্ণ মন্দ বা সম্পূর্ণ সৎ, সম্পূর্ণ অহংকারী কিংবা সম্পূর্ণ বুদ্ধিমান। অতিশয় বিনয়ীর মধ্যে তিনি টের পেয়েছেন চেপে রাখা অহংকার। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত লেখার ভেতর খুঁজে পেয়েছেন নির্বুদ্ধিতার ছায়া। আবার একেবারে মূর্খ বলে চিহ্নিত মানুষের কথায়ও তিনি আবিষ্কার করেছেন নির্মল বুদ্ধির স্পর্শ।

তেইশ বছর বয়সেই তিনি একপেশে চরিত্র আঁকার পথ ছেড়ে দেন। তার হাতে কখনো শুধু আলোয় ভরা জীবন, কিংবা কেবল অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনো মানুষ জন্ম নেয়নি। চরিত্রের প্রতিটি উপাদান তিনি আলাদা আলাদা করে দেখিয়েছেন ঠিক যেন একজন দক্ষ অভিনেতা, যে বিপরীত স্বভাবের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করে। সেই বিচ্ছিন্ন রেখাগুলোকেই তিনি শেষে যথাস্থানে বসিয়ে গড়ে তুলেছেন এক পূর্ণ মানুষ, যে মানুষ হয়ে ওঠে অনন্য এক চরিত্র।

ঠিক যেমন ‘শৈশব’-এর নায়ক নিকোলেনকা। নাচ থেকে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে দেখে চুল এলোমেলো, মুখ ঘামে ভেজা, দেখতে সুন্দর নয়। তবু সে অনুভব করে, তার মুখের সামগ্রিক অভিব্যক্তি উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। নিজের সেই প্রতিচ্ছবি দেখে তার মনে গভীর এক তৃপ্তি জন্মায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন