নথিগুলোর মধ্যে বিশেষ করে পাওয়া গিয়েছে an Account of the several persons who have been prosecuted in the Court of Quarter Sessions in Calcutta, for criminal offences according to the Laws of England, from the 1st of January, 1762, to the 1st of October, 1774 অর্থাৎ ১৭৬২-র ১লা জানুয়ারী থেকে ১৭৭৪-এর ১লা অক্টোবর পর্যন্ত ইংল্যান্ডের আইন অনুসারে ফৌজদারি অপরাধের জন্য কলকাতার কোয়ার্টার সেশনস কোর্টে মামলা দায়ের করা বেশ কয়েকজন ব্যক্তির বিবরণ। (পরিশিষ্টে দেখতে পারেন। স্যার জে. এফ. স্টিফেন এই প্রবন্ধ উদ্ধৃত করেছেন, কিন্তু ভুল সূত্র উল্লেখ করে) লক্ষ্য করা উচিত প্রথম মামলার তারিখ ২৭শে আগস্ট, ১৭৬২, অর্থাৎ পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ঘোষণার পরবর্তী সময়ের। পঁয়তাল্লিশটা মামলায় জড়িয়ে থাকা বাষট্টি জন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল স্থানীয়রাই এবং একুশটা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দুটো মামলা আদালতের প্রয়োগ করা আইনের দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এই মামলাগুলো আমি নিয়েছি ভেরেলস্টের View of the Rise, Progress and Present State of the English Government in Bengal শীর্ষক গ্রন্থ থেকে। উল্লেখ্য যে প্রথম মামলা উপরোক্ত তালিকায় নেই। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেরেলস্ট বলছেন: “আমরা যেমন একটা পূর্ণাঙ্গ ওক গাছকে গঙ্গার তীরে রোপন করার কথা ভাবতেই পারি না, তেমনই এই [ইংলন্ড] দ্বীপে বিচারক আর আইনপ্রণেতাদের ধৈর্যশীল পরিশ্রমে পরিপক্ক এবং ধারাবাহিকভাবে বিকশিত বিধিসংহিতার কোনো অংশই বাংলার রীতিনীতির সাথে মিশতে পারে বলে স্বপ্ন দেখাও উচিত নয়।”(ভেরেলস্ট: ভিউ, ইত্যাদি, পৃষ্ঠা ১৩৪।) বক্তব্য প্রমাণে তিনি যে প্রথম মামলা উদ্ধৃত করেছেন তা নিচে তুলে দেওয়া গেল —
১. “১৭৬২-তে, এক স্থানীয় ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ব্যভিচারে লিপ্ত অবস্থায় ধরে ফেলেন। সমগ্র প্রাচ্যে নারীরা সম্পূর্ণরূপে তাদের স্বামীর ইচ্ছার অধীন এবং প্রত্যেক স্বামী নিজেই, তার স্ত্রীর অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণকারী ব্যক্তি। তাই, লোকটি তার স্ত্রীর অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত হয় এবং তার নাক কেটে দেয়। তাকে কলকাতা সেশনস আদালতে অভিযুক্ত করা হয়। সে ঘটনা স্বীকার করেও যুক্তি দেয় যে, সে যে দেশিয় আইন ও রীতিনীতির মধ্যে বড় হয়েছে, সেই প্রথা, আইনে এই কাজ আইন লঙ্ঘন নয়; নারী তার সম্পত্তি ছিল এবং সেই দেশের রীতি অনুসারে, তার কলঙ্কের ফলে চিরকালের জন্য মহিলার দেহে দাগ ছাপিয়ে দেওয়ার অধিকার তার ছিল; যে আইনে তার বিচার করা হচ্ছে, সে আইন সম্পর্কে তার কোনও ধারণা নেই; এবং যদি সে জানত এই ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তবে সে কি কখনও এমন কাজ করত, যে কাজকে শাসকেরা এখানে অপরাধ হিসেবে দাগিয়ে দিচ্ছে? এই আত্মপক্ষ সমর্থনের পরেও লোকটি দোষী সাব্যস্ত হয় এবং তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়; কারণ, এটাই আদালতের এখতিয়ার, তাই তাদের আবশ্যিকভাবে ইংরেজি আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে।” (ভেরেলস্ট : ভিউ, ইত্যাদি, পৃষ্ঠা ২৬)
২. দ্বিতীয় ঘটনা আরও কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ এই মামলা আদতে জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা হয়েছিল। নন্দ কুমারের (“নানকুমার”) বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের জালিয়াতি সংক্রান্ত রায় এ দেশে এক উল্লেখযোগ্য নজির স্থাপন করেছিল। ১৭৭৩-তে ভেরেলস্ট লিখেছেন, “গ্রেট ব্রিটেনে সরকারি এবং ব্যক্তিগত ঋণের অবিশ্বাস্য ব্যাপকতাই আমাদের আইনপ্রণেতাদের জালিয়াতির মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান জারি করতে প্ররোচিত করেছে [ইংলন্ডে এই প্রেক্ষিতটি কেন বিকশিত হল, তা নিয়ে আমি আগের কিস্তিতে বিশদে আলোচনা করেছি — অনুবাদক]। এই আইনে ১৭৬৮-তে বাংলার এক অধিবাসীকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু এই নীতি সম্পর্কে এ দেশের মানুষের বিন্দুমাত্র পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, তাই তাদের এই দণ্ড এতটাই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল, এবং তাদের চোখে শাস্তি আর অপরাধের এতটাই অসামঞ্জস্য ছিল যে, কলকাতার প্রধান বাসিন্দারা গভর্নর আর কাউন্সিলের কাছে আবেদনের মাধ্যমে তাদের বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন; এবং যথাযথ উপস্থাপনার পর রাধা চরণ মিত্র ক্ষমা লাভ করেন।” (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৪১ এবং পরিশিষ্ট পৃষ্ঠা ১৭৭। আরও দেখুন সংগ্রহ নং ৮, ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ড ডিপার্টমেন্ট, পার্লামেন্টারি শাখা, এবং লং: সিলেকশনস, নং ৮৪০। রাধা চরণ মিত্র ছিলেন হলওয়েলের পুরোনো শত্রু, কলকাতার ‘ব্ল্যাক কালেক্টর’ গোবিন্দরাম মিত্রের নাতি)
ভেরেলস্ট ‘ভিউ, ইত্যাদি’ গ্রন্থটিতে “বাংলায় ইংরেজ আইন প্রবর্তনের অসম্ভবতা” প্রমাণ করার জন্য একটা সম্পূর্ণ অধ্যায় উৎসর্গ করেছেন। তিনি এমন কিছু দেশীয় রীতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন যা ইংরেজ নীতির সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ — যেমন বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, হারেমের রীতিনীতি ইত্যাদি; এবং তিনি স্পষ্ট বলেন যে গ্রেট ব্রিটেনে “সংসদের আইনে অন্তত একশ ষাট অপরাধকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।” তিনি স্বীকার করেন যে ভারতীয় বসতিগুলি ইউরোপীয়দের ব্রিটিশ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের অধীন হতে হবে, এবং এই কারণে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, কোম্পানির কয়েকটা জেলা কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো ইউরোপীয়কে কোম্পানির আঞ্চলিক সীমার বাইরে বসবাস করার অনুমতি না দিক। যে নীতি তার অতিরিক্ত আড়ম্বরপূর্ণ বাক্যবিন্যাসের কারণে পাঠকের পক্ষে অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, সেগুলি কার্যত নিম্নরূপ :
১. ইংল্যান্ডের আইন বিকশিত হয়েছে শত শত বছরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং সূক্ষ্ম জ্ঞানের ফলে, এবং এই আইনটা কেবল একটা স্বাধীন জাতির জন্যই উপযুক্ত।
২. বাংলার অধিবাসীরা স্বাধীন সরকার গ্রহণের যোগ্য নয়, এবং তাই তারা একটা স্বাধীন জাতির আইনও গ্রহণ করতে পারে না।
৩. যেহেতু স্থানীয়রা নিজস্ব রীতিনীতি আর আইন নির্ভর, তাই বিচার অবশ্যই দেশীয় বিচারকরা পরিচালনা করবেন, কিন্তু “স্বাধীনতা” রোধ করার জন্য গভর্নর-জেনারেল এবং কাউন্সিলকে সময়ে সময়ে আদেশ জারি করতে হবে, কারণ “ক্ষমতা অবশ্যই বিজয়ীদের হাতে থাকতে হবে।”
৪. যোগ্য স্থানীয়দের সহায়তায় ইংরেজ বিচারপতিদের একটা আদালত আপিল এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু “সারা দেশে ইউরোপীয়দের মূল বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করা হলে তা অসীম নিপীড়নের কারণ হবে।”
১৭৯০-তে কালেক্টরদের কাছে পাঠানো জিজ্ঞাসার উত্তরে দেখা যায় যে, ভারতে একটা ব্রিটিশ সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সাথে দেশীয় আইনকে কার্যত অপরিবর্তিত রাখা ছিল ভ্রান্ত ধারণা, যেটা মুসলিম সভ্যতার প্রকৃতি এবং দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি উভয় সম্পর্কেই অপর্যাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। ভেরেলস্ট মনে করতেন, ইংরেজ আইন ছিল পরিপূর্ণতার একটি উৎকৃষ্টতম নিদর্শন — সেই সময়ে ইংরেজদের মধ্যে এই ধারণাটাও ব্যপ্ত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর ফৌজদারি আইন আলোচনা আমাদের কাছে সুখকর বিষয় নয়। এই আইন তার তৎকালীন রূপে যেভাবে বিকশিত হচ্ছিল, সেভাবে কলকাতায় প্রবর্তন করার ফলে নিশ্চিতভাবেই শোচনীয় পরিণতি হওয়ার কথা ছিল, যেমন জালিয়াতি বা ছোটখাটো চুরির জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান। অন্যদিকে, বাংলাতে (ব্রিটিশ প্রজা এবং তাদের নির্ভরশীলদের জন্য) ইংরেজ আইনকে তার সমস্ত ত্রুটি ও বাড়াবাড়ি সহকারে প্রবর্তন করা ছিল একটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে একটা সুচিন্তিত ফৌজদারি আর দেওয়ানি বিধিসংহিতা প্রবর্তন করা সম্ভব হয়েছিল। এই বিধিসংহিতা ছিল উদ্দিষ্ট জনগণের জন্য উপযোগী এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও দেশীয় জীবনের অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে সম্প্রসারণ ও সংশোধনের সুযোগসম্পন্ন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ