কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে এক সুরভরা সন্ধ্যায় আবার ফিরে এলো আমাদের বাংলা গানের সোনালি সময়। প্রবাসে থেকেও বাংলা সংস্কৃতির উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে দিতে “সুরালাপ: হারানো দিনের গান” শীর্ষক এক ব্যতিক্রমধর্মী সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন করে প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি।
গত ৩১ জানুয়ারি শনিবার ৭৯৫৫ ১২২ টাউনহোম ক্লাবহাউসে অনুষ্ঠিত (বিকেল ৫–সন্ধ্যা ৭টা) এই আয়োজন ভ্যাঙ্কুভারের প্রবাসী বাঙালিদের জন্য হয়ে ওঠে এক আবেগঘন মিলনমেলা। চল্লিশ থেকে নব্বই দশকের বাংলা আধুনিক, চলচ্চিত্র ও স্বর্ণযুগের গান ঘিরে সাজানো এ অনুষ্ঠান কানাডার প্রবাসী শ্রোতাদের ফিরিয়ে নেয় বাংলার ঐতিহ্যস্নাত স্মৃতিময় এক আপন সময়ে।
২০০৪ সাল থেকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের নিরিখে নিরলস উদ্যমে কাজ করে যাচ্ছে প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি। কবিপক্ষ, বাংলা নববর্ষ, মঞ্চনাটক, সংগীত সন্ধ্যাসহ বাংলার উৎসব ও কৃষ্টির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তারা প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। সংগঠনটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ। তাঁদের শুদ্ধ আদর্শ কানাডার মাটিতে বাংলার ঐতিহ্য ও কৃষ্টির প্রসার ও প্রচার।
বর্তমানে বোর্ড সদস্য হিসেবে নিবেদিত আছেন অনন্যা শিলা শামসুদ্দিন, ডা. লুবনা আলম, মাইকেল দীপায়ন মিত্র, নবমিতা গুহ, পৌষালী পাল ও রিকলিনা রায়চৌধুরী। বোর্ড মেম্বার ও সাধারণ সব সদস্যরা যে কোনো আয়োজনে একযোগে ব্যক্তিগত তহবিল ও উদ্যোগে অনুষ্ঠান ও আয়োজনকে সফল করতে একত্রিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন শম্পা চন্দা কর্মকার। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় তিনি পুরো অনুষ্ঠানকে বেঁধে রাখেন অনুষ্ঠানের নামের সার্থকতা নিয়ে এক সুরের আলাপে।
শিল্পীদের মধ্যে গান পরিবেশনায় অংশ নেন ওম, শুভজিৎ, নীলাভ তামিম আজিজ, মানন্যা কর্মকার, মাইকেল দীপায়ন মিত্র, ডা. লুবনা আলম, ডা. মো. আজিজুল বারী আশিক, সুদীপ মুখার্জী, হ্যাপি দাস এবং তাপস বিশ্বাস।

Screenshot
অনুষ্ঠানের শুরুতেই শিশু শিল্পী ওমকে আমন্ত্রণ জানানো হয় মঞ্চে। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে জনপ্রিয় ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’ গানটিতে বন, নীল নদী, ঝর্না এবং বাঙ্গমা-বাঙ্গমি (কাল্পনিক পাখি) এর গল্প শোনানোর মাধ্যমে বাংলার প্রকৃতির এক শান্তিময় ও মনোরম চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
এরপর দর্শকশ্রোতারা ফিরে যান আশির দশকের বাংলাদেশে। সত্য ঘটনার আদলে নির্মিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ছুটির ঘণ্টার গান “আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী” নীলাভ তামিম আজিজের সুন্দর পরিবেশনার মাধ্যমে সন্ধ্যার আবহ তৈরি হয় নস্টালজিয়ায় ভরা এক আবেশে।
কিশোর শিল্পী শুভজিৎ পরিবেশন করেন “পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে” গানটি, যা দর্শকদের ফিরিয়ে নেয় কবিগুরুর বাংলার ঋতুগানের আবহে। তাঁর সাবলীল সুন্দর গায়কী দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
মানন্যা কর্মকার গেয়ে শোনান পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী “আজ মন চেয়েছে হারিয়ে যাব”। তাঁর সুন্দর কণ্ঠ উপস্থাপনায় দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে বাংলা গানের আবহে একান্ত প্রিয়জনের সঙ্গে অজানায় হারিয়ে যাওয়ার অসামান্য অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তাঁর অপর পরিবেশনা ছিল ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়’।
মাইকেল দীপায়ন মিত্র পরিবেশন করেন কয়েকটি গান “এই মেঘলা দিনে”, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের “কেন দূরে থাকো”, “তুমি কি কেবলি ছবি”সহ একাধিক জনপ্রিয় গান। তাঁর হৃদয়স্পর্শী দরাজ কণ্ঠে বাংলা গানের প্রেম, স্মৃতি ও আবেগের মেলবন্ধনের এক সুরেলা চিত্র দর্শকদের গভীরভাবে স্পর্শ করে; ফলে উপস্থিত দর্শকদের কাছ থেকে বারবার অনুরোধ ধ্বনিত হয়। উপস্থিত শ্রোতা এবং তাঁর সুযোগ্য সহধর্মিণী মিতা মিত্র তাঁর উপস্থাপিত বিভিন্ন গানের বিষয়ে সুন্দর মতামত দেন।
ডা. লুবনা আলম এককভাবে গেয়ে শোনান “আর যেন নেই কোনো ভাবনা”, যা ১৯৫৯ সালের চলচ্চিত্র দীপ জ্বেলে যাই–এর কালজয়ী গান। তাঁর পরিবেশনায় সুর ও কণ্ঠের অনুপম মাধুর্য এবং স্মৃতিমাখা আবেগের গভীর স্পর্শের সমন্বয় ঘটে, যা উপস্থিত শ্রোতাদের মাঝে বিশেষ আলোড়নের সৃষ্টি করে। এরপর তিনি প্রখ্যাত গীতিকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক খান আতাউর রহমানের একটি কালজয়ী বাংলা রোমান্টিক গান “একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে” সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেন।
“এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়” জনপ্রিয় বাংলা গানটি প্রেমিক যুগলের কুঞ্জবনের রোমান্টিক মুহূর্তের প্রত্যাশার চিত্র তুলে ধরে। প্রাণবন্তভাবে এই গানটি যৌথভাবে উপস্থাপন করেন ডা. লুবনা খানম ও ডা. মো. আজিজুল বারী আশিক।
সুদীপ মুখার্জী পরিবেশন করেন “সে আসে ধীরে”, আর হ্যাপি দাস সুরেলা কণ্ঠে গেয়ে শোনান “কি নাম ডেকে বলবো তোমাকে” ও “সাগরের তীর থেকে”। প্রেম ও রোমান্টিক আবহে দর্শকরা ডুবে থাকেন পুরো সময়জুড়ে। “নিঙাড়িয়া নীল শাড়ি শ্রীমতি চলে” ১৯৫৪ সালের ঢুলি চলচ্চিত্রের একটি জনপ্রিয় বাংলা গান, যা প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় গেয়েছিলেন। সেই গানটি ফিরিয়ে আনেন সুদীপ মুখার্জী তাঁর সুন্দর কণ্ঠে ধ্রুপদী ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে।
হ্যাপি দাস ও মাইকেল মিত্র যৌথভাবে পরিবেশন করেন বিশ্বকবির “আগুনের পরশমণি” এবং “শ্রাবণের ধারার মতো”, তাঁদের সুরেলা অপূর্ব কণ্ঠের আবেদন অনুষ্ঠানের উপস্থিত শ্রোতা সবার মাঝে প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক আবহকে আরও গভীর করে তোলে। সকলের শ্রদ্ধাভাজন ও বয়োজ্যেষ্ঠ সুরেখা মিত্র র সুমধুর কণ্ঠে একটি গান এবং ম্যাডোনা ঘোষালের সাবলীল কণ্ঠে একক কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানে নতুন গতিশীল সুন্দর মাত্রা যুক্ত করে।
তবলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তাপস বিশ্বাস। তাপস বিশ্বাস এক পর্যায়ে তাঁর অনবদ্য কণ্ঠে উপস্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে শোন শোন পিতা”। গানটির মূলভাব জাগতিক দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত মানুষের পরম সর্বশক্তিমানের কাছে শান্তি, আশ্রয় ও মুক্তির আকুল প্রার্থনা, যা তাঁর কণ্ঠে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
গানের যন্ত্র সহযোগিতায় ছিলেন সুদীপ মুখার্জী। অনুষ্ঠানের সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনায় ছিলেন ডা. মো. আজিজুল বারী আশিক। অনুষ্ঠানটির স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণ করেন অভিষেক কর্মকার। মঞ্চসজ্জা ও আপ্যায়ন আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন অনন্যা শিলা শামসুদ্দিন, মাইকেল মিত্র ও ডা. লুবনা আলম।

Screenshot
আয়োজনের মঞ্চের পিছনের দেয়াল সাজানো হয়েছিল নকশিকাঁথা ও রঙিন কারুকাজে, যা অনুষ্ঠানে এনে দেয় বাংলার নারীদের সুচিশৈলীর শৈল্পিক রেশ। কাগজে সুন্দর বর্ণিল পোস্টার সজ্জার দায়িত্বে ছিলেন শামীম হারুন। তাঁর বর্ণিল কারুকাজে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও বাংলার দেশজ ঐতিহ্য ফুটে উঠেছিল।
আমি নিজে প্রথমবারের মতো উপস্থিত থেকে কানাডার কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্কের কবিতার আবহে আমার ভাবানুবাদকৃত বাংলা কবিতা আবৃত্তি করি এবং কবি জয়দীপ ভট্টাচার্যের কণ্ঠে রেকর্ডকৃত আমার কবিতা উপস্থাপন করা হয়। অতিথি অরুনাভ চ্যাটার্জি সস্ত্রীক কবিগুরুর “আগুনের পরশমণি” সুন্দরভাবে পরিবেশন করেন এবং সমাজ উন্নয়ন ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
এই অনবদ্য সুর, ছন্দ ও কণ্ঠের মিলনমেলায় সন্ধ্যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকরা ডুবে ছিলেন ফেলে আসা বাংলার গানের স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আবেগে। কানাডার প্রবাসে বাংলা গানের ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে রাখার এই প্রয়াস উপস্থিত সবাইকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে। এই প্রয়াসের সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার দিকটি সত্যিই অনন্য।
সেদিন ভ্যাঙ্কুভারের আকাশে ভেসে ছিল হারানো দিনের বাংলা গানের আলো। অভিবাসী জীবনের প্রতিদিনের কঠোর বাস্তবতা ভুলে সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন বাংলার আমাদের শেকড়ের স্মৃতির কাছে।
আমারা প্রত্যাশা করছি বাংলার কৃষ্টি বিকাশের এই প্রত্যয়ের শক্তিতে এভাবেই যত দূর আমাদের বাংলা ভাষা, তত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে এই আলোর উজ্জ্বলতা বিশ্বের সবখানে। এই বিশেষ ফিচারটি লেখার সময় আয়োজনের বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন ডা. লুবনা খানম ও মাইকেল দীপায়ন মিত্র। তাঁদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।