২৬. খেজুরির মহেন্দ্রনাথ করণ, আঞ্চলিক ইতিহাসে মন উচাটন
ভাইয়ে ভাইয়ে যাওরে মিলে
ওড্র বঙ্গ একই অঙ্গ একই শোণিত শিরায় খেলে।
অতি ক্ষুদ্র তৃণের গাছি মিলনেতে পুষ্ট হলে
ও তায় বিশাল দেহ ঐরাবতি যায়রে বাঁধা অবহেলে।
যে ওড্রজ সেই বঙ্গজ সবাই পুণ্ড্র রাজার ছেলে
দেশ বিভেদে প্রাণের বিভেদ হবে না রে কোন কালে।
কথাগুলি লিখেছিলেন মহেন্দ্রনাথ করণ। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে মানুষ বলে দেখতেন তিনি। তাই ব্রাহ্মণ- কায়স্থের সঙ্গে যেমন যোগাযোগ রাখতেন, তেমনি যোগাযোগ রাখতেন প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে। তন্তুবায়, নাপিত, ক্ষত্রিয়, গোপ, কংসবণিক, সুবর্ণ বণিক, মালী, নমৎশূদ্র, মাহিষ্য, তিলি, বৈশ্য — সব সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে ছিল তাঁর সখ্যতা। আঞ্চলিক মানুষের পরিচয় তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁর আঞ্চলিক ইতিহাসে।
মহেন্দ্রনাথ করণ (১৮৮৬-১৯২৯) মেদিনীপুরের খেজুরির ভাঙনমারি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এক জমিদার বংশে। ক্ষেমানন্দ তাঁর বাবা, আর সুভদ্রা তাঁর মা। জমিদার বংশ হলেও তাঁর পূর্বপুরুষ নাক-উঁচু মানুষ ছিলেন না। ক্ষেমানন্দ ছিলেন প্রজা দরদী মানুষ। শুধু তাই নয়, দেশভক্ত মানুষও। তাই স্বাধীনতা আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। আজানবাড়ি হাটে বঙ্গভঙ্গবিরোধী বিশাল জনসভার আয়োজন তিনিই করেছিলেন।
মহেন্দ্রনাথ গ্রামের পাঠশালা ও খেজুরির জালিয়াবাটা এম.ই স্কুলে পড়ার পরে ভর্তি হন কাঁথি হাই স্কুলেল মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯০৫ সালে শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন। মহেন্দ্রনাথ তাঁর সহপাঠীদের নিয়ে গঠন করেন ‘বন্দেমাতরম ভিক্ষু সম্প্রদায়’। তরুণ এই ছাত্ররা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বঙ্গভঙ্গের কুফলের কথা প্রচার করত। বিলি করত প্রচার পুস্তিকা। তরুণ মহেন্দ্রনাথ দেশপ্রেমিক আবেগে লিখে ফেললেন ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’।
১৯০৬ সালে তিনি ভর্তি হন কলকাতার হেয়ার স্কুলে। স্বদেশি আন্দোলনে মেতে ওঠার ফলে ছাড়তে হয় হেয়ার স্কুল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরে প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করেন। আই.এ পড়ার সময়ে বাবার মৃত্যু হলে তাঁকে পড়া ছাড়তে হয়।
পত্র পত্রিকা প্রকাশ ও সমাজসেবায় তাঁর আগ্রহ ছিল। ‘ব্রাত্যক্ষত্রিয় বান্ধব’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় সমাচার’, ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হত তাঁর লেখা, এগুলি পরিচালনার সঙ্গেও জড়িয়েছিলেন তিনি ঘনিষ্ঠভাবে। ‘হিজলি সাহিত্য সমিতি’, ‘দ্য করোনেশন সার্ভে ইন্সটিটিউট’, ‘ক্ষেমানন্দ লাইব্রেরি’, ‘আলেকজান্দ্রা দাতব্য চিকিৎসালয়’, ‘খেজুরি সম্মেলনী’, ‘খেজুরি সাধারণ পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন মহেন্দ্রনাথ।
এবার আসি মহেন্দ্রনাথের আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা প্রসঙ্গে। আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনি’র (১৮৯৭) রচয়িতা নিখিলনাথ রায়, ‘গৌড়ের ইতিহাস’ (১৩০৯) রচয়িতা রজনীকান্ত চক্রবর্তী, ‘বিক্রমপুরের ইতিহাস’ (১৩১৬) রচয়িতা যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, ‘ঢাকার ইতিহাস’ (১৯১২-১৩) রচয়িতা যতীন্দ্রমোহন রায়, ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ (১৩২১-২৯), ‘বীরভূমের বিবরণ’ (১৩২৩-৩৪) রচয়িতা মহিমারঞ্জন চক্রবর্তী, ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস. (১৩২৮) রচয়িতা যোগেশচন্দ্র বসু, ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ (১৯১৭) রচয়িতা অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি ও বৈদ্যনাথ দে, ‘নদিয়া কাহিনি’ (১৩১৭) রচয়িতা কুমুদনাথ মল্লিক, ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ (১৯২৩) রচয়িতা রাধারমণ সাহা, ‘নবদ্বীপ মহিমা’ (১৯৩৭) রচয়িতা কান্তিচন্দ্র রাঢ়ী, ‘শান্তিপুর পরিচয়’ (১৯৩৭-৪২) রচয়িতা কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য প্রভৃতিদের সঙ্গে মহেন্দ্রনাথ করণের নামও উচ্চারিত হয়। এ ব্যাপারে তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, নলিনীকান্ত ভট্টশালীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়দের সম্বন্ধে তাঁর গবেষণা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়রা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় যারা ঐতিহ্যগতভাবে চারস্তরীয় বর্ণপ্রথার বাইরে ছিল। এরা নিজেদেরকে পৌণ্ড্ররাজা বাসুদেবের বংশধর বলে মনে করে। মহাভারতের সভাপর্বে বাসুদেবের কথা আছে। বাসুদেব বঙ্গ, পুণ্ড্র, কিরাত দেশের অধিপতি ছিলেন। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়রা ছিল প্রান্তিক মানুষ, অস্পৃশ্য। নিজেদের আত্মপরিচয় ও সামাজিক মর্যাদার জন্য এরা সংগ্রাম করেছে।
মহেন্দ্রনাথের জনপ্রিয় বই ‘খেজুরি বন্দর’, ‘হিজলির মসনদ-ই-আলা’ এবং ‘কসবা হিজলির বিবরণ’। খেজুরি ছিল এক প্রাচীন জনপদ, বন্দর ও নিমক মহল। পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতা লাভ করলে খেজুরিতে তাকে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ঐতিহ্য খেজুরির। এখানে ভারতের প্রথম ডাকঘর স্থাপিত হয়; দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং রামমোহন রায় খেজুরি বন্দর থেকে যাত্রা করেন বিলাতে। খেজুরিতে কিছুকালের জন্য অবস্থান করেছিলেন জোব চার্নক। ১৯৪২ সালে এই খেজুরিতে স্থাপিত হয় প্রথম জাতীয় সরকার।
খেজুরির অন্তর্গত হিজলির মসনদ-ই-আলার এক বিশ্বস্ত ইতিহাস রচনা করেছেন মহেন্দ্রনাথ। এই বইএর মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন :
‘ভাগীরথী বাগ্দা বাহুবেষ্টিত সাগরতরঙ্গবিধৌতচরণা শ্যামাঙ্গিনী কসবা হিজলি বহু শোভার আধার। ইহার অনতিদীর্ঘ জীবননাট্য মুসলমান ও কোম্পানির রাজত্বের বহু সুখ দুঃখের কাহিনি অভিনীত হইয়া গিয়াছে। ভাগীরথীর পলিতে সংগঠিত — কাউখালি নদীদ্বারা বিচ্ছিন্ন খেজুরি ও হিজলি দ্বীপময় কালক্রমে পরস্পর সংযুক্ত হইয়া কসবা-হিজলি পরগণা নামে আখ্যাত হইয়াছে। এই যমজ ভগিনীর বহু কাহিনি ইতিহাসের বিস্মৃত পত্র উজ্জ্বল করিয়া আছে। সাগরপথে বঙ্গদেশ প্রবেশের সিংহদ্বারে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ বর্তমান। এই হিজলির বক্ষে কত স্বার্থময় শোণিতপাতের রোমাঞ্চকর কাহিনি, উত্থান পতনের কত বিচিত্র ইতিহাস সুপ্ত রহিয়াছে — তাহার ইয়ত্তা নাই। বহুদিন পরিত্যক্ত ধ্বংস ও বিস্মৃতির স্তূপ হইতে হিজলির অতীত ইতিহাসের কঙ্কাল টানিয়া বাহির করিতে চেষ্টা করিয়াছি…’