২৫. বিচিত্র তাঁর মন, উদ্যোগপতি হেমেন্দ্রমোহন
কুন্তলীন এক সুগন্ধী তেল, দেলখোশ সেন্ট, তাম্বুলীন হল পানপশলা। এই তিনটি পণ্য নিয়ে একটি ছড়া ছিল। দেড়শো বছর আগের ছড়া। অনেকে বলেন ছড়াটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ :
কেশে মাখ কুন্তলীন
রুমালেতে দেলখোশ;
পানে খাও তাম্বুলীন
ধন্য হোক এইচ বোস।
এগুলি এইচ বোসের তৈরি। তাই মানুষ এগুলি ব্যবহার করলে এইচ বোস ধন্য হবেন। কিন্তু কে এই এইচ বোস?
ইনি হলেন হেমেন্দ্রমোহন বসু (১৮৬৪-১৯১৬)। ময়মনসিংহের জয়সিদ্ধি গ্রামে তাঁর জন্ম। হরমোহন বসু তাঁর বাবা, তিনি ছিলেন সরকারি আদালতের মুনশেফ। কাকা আনন্দমোহন বসু প্রথম রাঙ্গলার ও ব্রাহ্ম সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র বসুদের সঙ্গে তাঁদের আত্মীয়তার সূত্র আছে। গ্রামের স্কুলে পড়ার পরে হেমেন্দ্র এলেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন কলেজে। বি.এ পরীক্ষা দেবেন। হঠাৎ বদল হল খেয়াল। ডাক্তারি পড়তে হবে। ভর্তি হলেন মেডিকেল কলেজে। সেখানেও বাধা। গবেষণাগারে কাজ করার সময়ে চোখে ঢুকে গেল অ্যাসিড। অন্ধ হয়ে যাবেন না কি ! অনেক চিকিৎসার পরে ফিরে পেলেন দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু তখন আর প্রথাগত শিক্ষার ইচ্ছে নেই।
তাই বলে কি বন্ধ হল লেখাপড়ার চর্চা?
না, বন্ধ হল না। রসায়ন ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। শুরু করে দিলেন গন্ধদ্রব্য নিয়ে গবেষণা। তখন তিনি আছেন ৫২, আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে। ১৮৯০ সাল। তৈরি করে ফেললেন কেশতৈল কুন্তলীন। বিলিতি macasser oil-এর চেয়ে অনেক ভালো সে তেল। ব্যবসার সঙ্গে বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক হেমেন্দ্র বুঝতেন। কুন্তলীন তেলের বিজ্ঞাপন ছাপা হত সেকালের বড় পত্রিকায়। সঙ্গে থাকত সুরেন্দ্রনাথ, লালা লাজপত, রবীন্দ্রনাথের ছবি ও মন্তব্য। কুন্তলীনকে জনপ্রিয় করার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন কুন্তলীন প্রেস ও কুন্তলীন পুরস্কার। ১৮৯৬ সালে প্রবর্তন করা হয় কুন্তলীন পুরস্কার আর প্রথম বছর যিনি পুরস্কার পেলেন তিনি সাহিত্যিক নন, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। কুন্তলীন জড়িয়ে গেল বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে। শুধু কুন্তলীন নয়, তৈরি হল দেলখোশ ও তাম্বুলীন।
শুধু গন্ধদ্রব্য তৈরি করে এই প্রাণচঞ্চল উদ্যোগপতি ক্ষান্ত হন নি। একে একে অনেক কিছু।
নেশা ছিল ক্যামেরায় ছবি তোলার। বিদেশ থেকে আনালেন ক্যামেরা। ঘরে তৈরি করলেন ডার্করুম। ছবিতে আনলেন থ্রি ডায়মেনশন। তাঁর হাত ধরে রঙিন ছবিও চালু হল। স্বদেশি আন্দোলনের ছবি তুললেন। যেমন ১৯০৫ সালের ১৫ অক্টোবরের বঙ্গভঙ্গবিরোধী জনসভা, গঙ্গায় রাখিস্নানের ছবি, ছোট টেবিলে চড়ে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর বক্তৃতা, মেরি কার্পেন্টারের হলের সামনে ও গঙ্গার ঘাটের ছবি, ভাষণরত রবীন্দ্রনাথের ছবি, মৃণালিনী দেবীর ছবি। তাঁর আইকা পলিস্কোপ স্টিরিও ক্যামেরাটি এখনও আছে পৌত্র ড. সুগত বসুর কাছে।
৪১, ধর্মতলা স্ট্রিটের মার্বেল হাউজে শুরু করলেন সিলিণ্ডার রেকর্ড ও ফোনোগ্রাফের ব্যবসা। এই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘টকিং মেশিন হল’। ১৯০৬ সালে হেমেন্দ্রের হাতে তৈরি হল নিজস্ব রেকর্ড প্রতিষ্ঠান ‘এইচ বোসেস রেকর্ড’। সাহাদাত পারভেজ বলেছেন যে ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে গোটা দেশ যখন উত্তাল সেই সময়ে তিনি স্বদেশি রেকর্ড ব্যবহারের ডাক দিয়ে দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গাওয়া দেশাত্মবোধক গান ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল হেমেন্দ্রমোহনের মোমের তৈরি সিলিণ্ডার রেকর্ড। সিলিণ্ডার রেকর্ডেই রবীন্দ্রনাথ রেকর্ড করেছিলেন যদুভট্টের সুরে ‘বন্দেমাতরম’। ১৯০৮ সালের ৯ নভেম্বর হেমেন্দ্রর অফিস ও কারখানায় হামলা চালায় ইংরেজের পুলিশ।
প্রেসের ব্যবসাও করেছিলেন তিনি। ৬২, বউবাজার স্ট্রিটে প্রতিষ্ঠা করেন কুন্তলীন প্রেস। প্রেসের রোটারি মেশিনে তিনি এদেশে প্রথম মনোটাইপ ও লাইনোটাইপ প্রবর্তন করেন। ব্লক তৈরির কাজ হত উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ‘ইউ রায় অ্যাণ্ড সন্স’ থেকে। হেমেন্দ্রমোহন বিয়ে করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের ছোট বোন মৃণালিনীকে। স্ত্রী ছিলেন স্বামীর যোগ্য সহধর্মিনী।
চলচ্চিত্রের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। বিদেশ থেকে তিনি বেশ কয়েক ধরনের মুভি ক্যামেরা আনিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে চিত্রপরিচালক ও ক্যামেরাম্যান নীতিন বসু বাবার ক্যামেরাতে হাত পাকিয়েছিলেন।
১৯০০ সালে তিনি দু-সিটের মোটরগাড়ি কেনেন। তার পর প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রেট ইস্টার্ন মোটর কোং’। পার্ক স্ট্রিটে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রেট ইস্টার্ন মোটর ওয়ার্কস’। ১৯০৩ সালে তিনি স্থাপন করেন ভারতীয় সাইকেল কোম্পানি, যার নাম ‘এইচ বোস অ্যাণ্ড কোং সাইকেলস’।
অসাধারণ তথ্য ভান্ডার!