কালেক্টরের কাজকর্মের পরিধি বিষয়ে হলওয়েলের বর্ণনা থেকে মনে হয় যে, ১৭৫৮-য় ফৌজদারি আর দেওয়ানি আদালত একই কাছারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। (“জমিদার দুটো আলাদা আর স্বাধীন ক্ষমতায় কাজ করেন (খুব কম ব্যতিক্রম বাদ দিলে), একটি হলো রাজস্বের তত্ত্বাবধায়ক আর সংগ্রাহক হিসেবে, এবং অন্যটা হল, কাছারি আদালতের বিচারক হিসেবে। এই আদালত এমন একটি বিচারালয় যা সমস্ত দেওয়ানি আর ফৌজদারি মামলা শোনার, বিচার করার এবং নিষ্পত্তি করার জন্য তৈরি হয়েছিল, যে আদালতের বাদী-বিবাদী হত কেবলমাত্র মুঘল সাম্রাজ্যের স্থানীয় প্রজাই। জমিদার খুবই সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার করতেন — তাঁর বেত্রাঘাত, জরিমানা এবং কারাদণ্ডের ক্ষমতা ছিল : তিনি মালিকানা সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ের নিষ্পত্তি করতেন; এবং সমস্ত ফৌজদারি মামলায় শুনানির পরই রায় এবং শাস্তি দিতেন – তবে যদি অপরাধ (বা হত্যা) এমন গুরুতর হয় যে মৃত্যু পর্যন্ত বেত্রাঘাত প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে তিনি রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখতেন, যতক্ষণ না ঘটনা আর প্রমাণ প্রেসিডেন্টের সামনে পেশ করা হয় এবং তিনি রায়টি নিশ্চিত করেন। চোর এবং অন্য অপরাধীর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা আজীবন রাস্তায় শিকল পরিয়ে কাজ করার দণ্ড দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। সম্পত্তি সংক্রান্ত সমস্ত মামলায়, তাঁর রায়ের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিলের কাছে আপিল করার সুযোগ ছিল।” মি. হলওয়েল এবং বন্ধুদের লেখা ‘ইন্ডিয়া ট্র্যাক্টস’, ২য় সংস্করণ, লন্ডন, ১৭৬৪, পৃষ্ঠা ১২০।)
প্রশাসনিক কাজের সুবিধের জন্য, তিনটে শহর চার বিভাগে ভাগ করা হল:-
১. বড় বাজার।
২. টাউন কলকাতা।
৩. সুতানুটি (“সুতা লুটা।”)
৪. গোবিন্দপুর।
কালেক্টর বা জমিদারের অধীনে একজন দেশীয় কর্মকর্তা মনোনীত হলেন, যিনি “কালো কালেক্টর” নামে পরিচিত ছিলেন। এই ব্যক্তি বহু পুরোনো প্রথা অনুযায়ী তার অপর্যাপ্ত বেতন পরিপূরন করার জন্য বহু কিছু [অন্যায্য] সুবিধা গ্রহণ করতেন, যা তিনি দেশীয় ঐতিহ্য অনুসারে তার পদের প্রাপ্য হিসেবে গণ্য হত ঠিকই — কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হলে তার নিয়োগকর্তাদের স্পষ্ট হবে সে সব প্রাপ্য আদতে একপ্রকার আত্মসাৎই। হলওয়েল সে সময়ের “কালো কালেক্টর” গোবিন্দরাম মিত্রকে কোম্পানি প্রশাসনের কাছে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টার মাধ্যমে তার কাজ শুরু করেন।
পরের একটা অধ্যায়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দেওয়া সনদের অধীনে বিচার প্রশাসনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন হবে। আমরা বর্তমানে যে বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছি, সেটা মাত্র তিনটে শহরের জমিদার হিসেবে কোম্পানির অবস্থানের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। গ্রেট ব্রিটেনের সম্রাটের সনদ বাস্তবায়িত করার জন্য পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত আদালতগুলোর এখতিয়ার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজাদের, তাদের নির্ভরশীল মানুষদের এবং যারা স্বেচ্ছায় বশ্যতা স্বীকার করতে রাজি ছিল সে সব মানুষদের সেই এখতিয়ারের অধীন হয়েছিল, তাদের উপর এই কর্তৃত্ব বিস্তৃত ছিল। অন্যদিকে, কাছারি আদালত ছিল এমন এক বিচারব্যবস্থা, যে বিচার কাঠামো অন্তত ইংরেজদের ধারণায়, মুঘল সাম্রাজ্য থেকে তার কর্তৃত্ব অর্জন করেছিল এবং এটি ছিল এমন একটি এখতিয়ার যার অধীনে ছিল মুঘল সাম্রাজ্যে স্বাভাবিক প্রজারা। সম্ভবত ১৭০৪-য় কাছারি আদালত তৈরি হয়, কারণ সেই বছরের ১৮ই আগস্টের কাউন্সিলের কার্যবিবরণীতে দেখা যায়:
“আদেশ জারি করা হচ্ছে যে, জনাব রবার্ট নাইটিঙ্গেল, জনাব জর্জ রেডশ এবং জনাব বেঞ্জামিন বাউচার (বাউচার ১লা ফেব্রুয়ারি, ১৭০৪ থেকে ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৭০৫ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত কালেক্টর ছিলেন।) প্রতি শনিবার সকাল নয়টা থেকে বারোটার মধ্যে কোনো সুবিধাজনক স্থানে মিলিত হবেন এবং ছোটখাটো বিবাদ নিষ্পত্তি করবেন, কিন্তু যদি কোনো কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, তবে সে মামলা পূর্ণ সদস্য বিশিষ্ট কাউন্সিল শুনবে।”
দু’বছর পর, ২৯শে আগস্ট, ১৭০৬ তারিখে লেখা হয়েছে:
“কয়েকদিন আগে বেশ কিছু ডাকাত আর চোর ধরা পড়েছে; উল্লিখিতরা বেশ কয়েকজন মানুষকে হত্যা করেছে, এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, আমাদের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের এবং যাদের ধরা হতে পারে, তাদের গালে, আদালতের ভদ্রলোকেরা দাগিয়ে দেবে এবং তাদের নদীর অন্য পাড়ে পাঠিয়ে দেবে”।
জনসাধারণের ব্যয় নির্বাহের জন্য কর আরোপের ক্ষেত্রে জমিদারদের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে কাউন্সিল অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ত ছিল বলে মনে হয়। ১৭২৭-এর বছরে মেয়র আদালতের জন্য একটা বাড়ি এবং একটা নতুন কারাগার কেনার তহবিল জোগাড় করতে কাউন্সিলকে অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল।
জানুয়ারিতে তারা সিদ্ধান্ত নেয় শহরের বাসিন্দাদের ওপর কর আরোপ করা হবে, কিন্তু তারা এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে গিয়েও পিছিয়ে আসে, যেহেতু বাসিন্দারা এই করাধানকে “সম্পূর্ণ বোঝা বহন করা এবং কোম্পানি কোনো অংশ বহন না করাকে ক্লেশকর বিষয়” বলে মনে করেছিল, তাই ১৭৩১-এ তারা দেশে লিখে জানায় যে কর নির্ধারণ করা হয়নি। ১৭৩৩-এর জানুয়ারিতে তারা বলে যে “কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দাদের উপর কর চাপানোর সিদ্ধান্ত প্রজাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে।” এই কর চাপানোর কাজ কখনও যদি করা হয়ে থাকে, তবে এই কাজের দায়িত্ব সম্ভবত মেয়রের আদালতের বিচারপতিদের কাঁধেই চাপানো হয়েছিল। (১৭৪৮-এ সুতানুটি বাজারের দিকে যাওয়া রাস্তার ঘাট নির্মাণের উদ্দেশ্যে কর আরোপের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। দেখুন লং: সিলেকশনস, নং ২৭ ও ৩১। ১৭৫৫-এ ইউরোপীয় বাসিন্দারা বাড়ি বিক্রির উপর ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কালেক্টরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে। ইবিড., নং ১৬৩। ২রা ফেব্রুয়ারি, ১৭৬৯-তে এক সাধারণ চিঠিতে প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিল লিখলেন: “রাস্তা নির্মাণ ও মেরামতের পদ্ধতি এবং এই কাজের ব্যবস্থাপনার জন্য একজন সার্ভেয়ার নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, আমরা তিনটি বিষয়ে এই স্থানের সবচেয়ে যোগ্য আইনজীবীদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন মনে করেছি: প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল হিসাবে বা বিচারকদের একটি বেঞ্চ হিসাবে, শহর এলাকার মধ্যে রাস্তা ও নর্দমা নির্মাণ ও মেরামতের খরচ এবং এই স্থানের পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্ভূত অন্য কোনো খরচ মেটানোর উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় বাসিন্দাদের থেকে কোনো কর বা আবর্জনা অপসারণের জন্য কোনো শুল্ক আদায়ের অধিকার আমাদের আছে কিনা এবং থাকলে তা কতটুকু। সেই অনুযায়ী রেজিস্ট্রার মি. হোমসের সঙ্গে উপযুক্ত পরামর্শ করা হয়েছিল, এবং তিনি বলেন, শান্তিরক্ষক বিচারক হিসাবে আমাদের প্রতি পাউন্ডে অনধিক ছয় পেন্স কর আরোপ করার অধিকার রয়েছে”)
১৭১৪-এরর জানুয়ারি মাসে কলকাতার ইংরেজ সরকারের অক্ষহৃদয় রাজকীয় আদেশ (হসব-উল-হুকুম) হাতে নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। নবাবকে উদ্দেশ্য করে জারি করা সেই আদেশে বলা হয়েছিল, “ইংরেজদের আওরঙ্গজেবের সময়ের মতো বাণিজ্য করার অনুমতি দিতে হবে এবং তাদের কোনোভাবে হয়রানি করা যাবে না।” রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণেই আনন্দের একটি প্রকাশ্য প্রদর্শনীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। (“গত রাতে উজিরে আজমের মোহরাঙ্কিত একটি হুকুমনামা এসে পৌঁছেছে, যাতে দেওয়ান জাফর খানকে (মুর্শিদ কুলি খান) আমাদের কোনো প্রকার হয়রানি না করতে এবং আমাদের পূর্বসূরিদের আমলে আমরা যে স্বাধীনতা ও সুবিধা ভোগ করতাম, সেই একই স্বাধীনতা ও সুবিধায় আমাদের বাণিজ্য চলতে দিতে আদেশ করা হয়েছে। রাজার কাছ থেকে এই অনুগ্রহ লাভের জন্য প্রকাশ্যে আনন্দ প্রকাশ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল, যা নিম্নলিখিতভাবে করা হয়েছিল। আমাদের সকল সৈন্যের বন্দুক থেকে তিনবার গুলি বর্ষণের পর আমরা আমাদের রানী এবং রাজা ফারুখসিয়ারের সুস্বাস্থ্য কামনা করে মদ্য পান করা শুরু করি এবং প্রতি বার সুস্বাস্থ্য কামনা করে ৫১বার করে বড় কামান দাগা হয়। এরপর আমরা ৩১টি কামান দেগে মাননীয় কোম্পানির সমৃদ্ধি এবং আরও ২১টি কামান দেগে তাদের বাণিজ্যের সাফল্য কামনা করি এবং বন্দরে নোঙর করা সমস্ত জাহাজ প্রতিটি সুস্বাস্থ্যের কামনায় কামান দাগে। এরপর রাতে আমরা একটি বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বালানোর নির্দেশ দিই এবং আমাদের সৈন্যদের মন প্রফুল্ল করার জন্য এক টাব পাঞ্চ পান করতে দিই। আমরা আমাদের বণিকদেরও নির্দেশ দিই যে তারা যেন সর্বত্র তাদের প্রতিনিধিদের কাছে এই হুকুমনামা সম্পর্কে এবং রাজার এই অনুগ্রহকে আমরা কতটা সম্মান ও শ্রদ্ধা করি এবং এ উপলক্ষে আমরা কী ধরনের আনন্দোৎসব করেছি, সে সম্পর্কে লিখে জানায়।” Diary and Consultation Book, ৪ জানুয়ারি, ১৭১৩/১৪। উইলসন, পূর্বোক্ত, খণ্ড ২, অংশ ১, পৃষ্ঠা ১৫৩।) এই সুযোগ যত দ্রুত সম্ভব কাজে লাগানোর জন্য কাউন্সিল, দিল্লিতে একটি দৌত্যদল পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়—এই পরিকল্পনা মাদ্রাজর গভর্নর টমাস পিট প্রায় ছয় বছর আগে করেছিলেন, কিন্তু এই ভাবনা সে সময় জারিত হলেও দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পরে পরিত্যক্ত হয়েছিল। অনেক আলোচনা এবং নিয়োগের বেশ কয়েকটি সংশোধনের পর দৌত্যদলের কর্মীদল চূড়ান্ত করা হয়। দৌত্য দলের প্রধান ছিলেন জন সারম্যান, একজন অসাধারণ প্রতিভাবান যুবক (আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী), এক ধূর্ত আর্মেনীয়, খাজা সারহাদ দ্বিতীয়, এডওয়ার্ড স্টিফেনসন (জন্ম ১৬৯১, ৮ অক্টোবর, এবং তাই এই সময়ে বয়স ২৩) তৃতীয় এবং রবার্ট বার্কার (আনুমানিক ২১ বছর বয়সী) সচিব হিসেবে। সার্জন উইলিয়াম হ্যামিল্টন চিকিৎসক হিসেবে দৌত্যদলের সাথে গিয়েছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে, কূটনীতিকরা যে সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তার অনেকটাই ছিল সম্রাটের রোগের চিকিৎসায় হ্যামিল্টনের চিকিৎসা দক্ষতার ফল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ