চতুর্থ অধ্যায়
কোম্পানি হল জমিদার
আগের অধ্যায়ে দেখেছি, ১৬৮৬-তে কোম্পানি তাদের বে-অঞ্চলের এজেন্ট জব চার্নককে চট্টগ্রাম দখল করিয়ে সামরিক বিজয় হিসেবে সেই অঞ্চলে দখল নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। আগামি দিনে যদি এই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হতো, তবে বাংলায় ইংরেজ শাসনের ইতিহাস সম্ভবত এখনকার চেয়ে অনেক সহজ হতো। ১৬৯০-তে কলকাতা শহর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামরিক সক্রিয়তার যুগের সূচনা করল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ঠিক এই জন্যই এই সময়ে পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা নির্মাণের পরিকল্পনা করাও হল এবং শেষও হল (দেখুন সি. আর. উইলসন: ওল্ড ফোর্ট উইলিয়াম ইন বেঙ্গল (ইন্ডিয়ান রেকর্ডস সিরিজ)। ১৬৯৬-তে বর্ধমানের নিকটবর্তী জমিদার সুভা [মতান্তরে শোভা — অনুবাদক] সিং বিদ্রোহ করেন এবং উড়িষ্যার আফগান সর্দার রহিম খানের কাছে সাহায্যের জন্য আহ্বান জানান। রাজমহল থেকে মেদিনীপুর — সমগ্র পশ্চিম বাংলা সাময়িকভাবে আফগানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই গোলযোগের সময়, বৃদ্ধ নবাব ইব্রাহিম খান ইংরেজ, ওলন্দাজ এবং ফরাসিদের তাদের কুঠি সুরক্ষিত করার জন্য সাধারণভাবে অনুমতি দেন। এই অনুমতির ফলস্বরূপ ফোর্ট উইলিয়ামের নির্মাণ কাজ শুরু হয়), কিন্তু ১৭৫৭-র আগে এই কেল্লা তত বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে উঠতে নি, যত দিন না কর্নেল ক্লাইভ, অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে টপকে ব্রিটিশ সৈন্য নিয়ে দুর্গের ধ্বংসাবশেষে প্রবেশ করবেন; সেই সময় থেকে প্রথমবার এই সুরক্ষিত দুর্গ বিজিত অঞ্চলের প্রতীক হিসেবে গণ্য হল। তবে, পরবর্তীকালে ইংরেজরা নবাবকে সনদ জারি করিয়ে তাদের রাজধানী কলকাতা শাসনের অনুমতি লাভ করে; প্রকৃত অর্থে বলা যায়, ১৬৯০-১৭৫৭ সময়কালে কোম্পানির অর্জিত সবচেয়ে স্থায়ী কাঠামো হিসেবে দুর্গ নির্মা চিহ্নিত করতে পারি না, বরং বলতে পারি ১৬৯৮ থেকে মুঘল রাজস্ব আইনের শর্তে কলকাতা, সুতানুটি এবং গোবিন্দপুর—এই তিন গ্রামের জমিদারি স্বত্ব অর্জনই ছিল স্থায়ী অর্জন। এই অধিগ্রহণের মাধ্যমে কোম্পানি প্রথমবারের মতো মুঘল সাম্রাজ্যের আইনি কাঠামোয় প্রবেশ লাভ করল এবং এর ফলে যে কার্যকর তত্ত্বের জন্ম হল, সেই তত্ত্ব বিকাশের চূড়ান্ত যৌক্তিক পরিণতি হলো ১৭৬৫-এ দেওয়ানি অধিকার লাভ।
বাংলায় কোম্পানির সদর দপ্তর হুগলিতে তৈরি হল। স্থান পেল ডাচদের বিপুল জাঁকজমকে ভরা দপ্তরের খুব কাছে এবং সম্ভবত তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ফৌজদারদের নজরদারিতে। সে সময় ইংরেজরা কুঠির সীমানার মধ্যেই জীবন যাপন করত এবং দেওয়ানি বিচার ও স্থানীয় প্রশাসনের সমস্যা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাত না। দেশি সরকার তাদের গণ্য করত সহনশীল বিধর্মী বণিক হিসেবে। সম্রাটের কাছে ইংরেজদের আইনি অবস্থান ছিল কোম্পানির সনদে সংজ্ঞায়িত বক্তব্য; এবং বলা দরকার এই সংজ্ঞা এমন এক নবাবের ব্যাখ্যার অধীন ছিল যিনি আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তবে, চার্নক নিজের বাসস্থান এবং তার অধীনস্থ কর্মচারীদের দপ্তর কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করার পরে পরেই দেখা গেল, ধনী আর্মেনীয় এবং স্থানীয় এবং ইউরেশীয় খ্রিস্টানরা কলকাতায় বেশ বড় উপনিবেশসহ তৈরি করেছে; তাছাড়া কয়েকটি শহরের ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ হাসিল করা এবং একটা অত্যন্ত ব্যস্ত বন্দরের নিয়মিত ব্যবস্থাপনার প্রভাবে ইংরেজরা ক্রমশ একটার পর একটা নতুন দায়িত্ব আর বাধ্যবাধকতার জালে জড়িয়ে পড়তে থাকে। সুতানুটিতে চার্নকের চূড়ান্ত অবস্থানের বারো বছর পর, তিনটে শহরের জনসংখ্যার অনুমান ছিল ১৫,০০০; আট বছর পরে জনসংখ্যা বেড়ে হল ৩১,০০০। যে কোনো ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা, রাস্তাঘাট, বাজার, নদীর ঘাট ইত্যাদি নির্মাণের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানোর উপায় খুঁজে বের করা এবং আরও অনেক জরুরি কাজকর্ম চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে ইংরেজরা অন্ততপক্ষে প্রতিবেশী জমিদারদের মতো স্বীকৃত কর্তৃত্ব অর্জন করার রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে। যতদিন তারা শহরের বাসিন্দাদের বিচার দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে নি, ততদিন তারা বাজারে কর আদায়কারী উদ্ধত প্রতারক স্বেচ্ছাচারী কর্মচারীদের হাতে প্রতিদিন হয়রানির শিকার হতো, এবং তাদের ব্যক্তিগত অভিযোগের প্রতিকারের জন্য কোম্পানির কর্মচারীরা নিষ্ক্রিয় হিন্দু কাছারি থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার চেয়ে নিজেদের তৈরি করা ভয়ের পরিবেশের ওপরেই বেশি নির্ভর করত। পরিস্থিতি এমন ছিল যে ইংরেজদের কেবল অবৈধ দখলদারের মর্যাদা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা সম্ভব ছিল না। ১৬৯৭-এর ১৪ই ডিসেম্বর, কলকাতার কাউন্সিল নিজের দেশে চিঠি লিখল :
এজেন্ট চার্নকের মৃত্যুতে (জব চার্নক ১৬৯৩-এর ১০ই জানুয়ারি মারা যান। সমাধিসৌধের ফলকে ১৬৯২ লেখা হয়েছে অবশ্যই পুরোনো পঞ্জিকার রীতি অনুসারে। চার্নকের মৃত্যুর পরে অল্প সময়ের জন্য বেঙ্গল এজেন্সির নিয়ন্ত্রণ ফোর্ট সেন্ট জর্জের হাতে দেওয়া হয়েছিল। ব্রুস: অ্যানালস অফ দ্য অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৮১০, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৪।) সম্মানীয় মহোদয়গণ, আপনারা বাংলায় একটি বিচারালয় স্থাপনের প্রত্যাশা করে হতাশ হয়েছেন, এবং সেই কারণে আমরা অনুমান করি যে ফোর্ট সেন্ট জর্জের মাননীয় প্রেসিডেন্ট ও কাউন্সিল আপনাদের সম্মানীয় মহোদয়ের প্যাকেট থেকে কমিশনটি আমাদের কাছে আসার আগেই সরিয়ে নিয়েছেন। এখানে স্থায়ী বসতি স্থাপনে নবাব এবং দেওয়ানের সম্মতি আদায়ের আমাদের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ, এবং এই দেওয়ান যতদিন বহাল থাকবেন, ততদিন আমরা কোনো সদর্থক অনুমোদন পাওয়ার আশা করি না। আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী দু’তিনটে শহর (সুতানুটি সহ) অধিগ্রহণের চেষ্টা করছি, যেগুলোর খাজনা বাবদ বছরে প্রায় ২,০০০ বা ২,৫০০ টাকা আয় হবে, যা আপনাদের সম্মানীয় মহোদয়ের সুুতানুটি শহরে রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম উপায়। কারণ, যদিও আমরা শস্য ইত্যাদির জরিমানা বাবদ বাজারগুলো থেকে সামান্য কিছু আয় করি, তবুও যতক্ষণ না আমরা এই স্থানের ওপর অধিকার দাবি করতে পারি, সে শুল্ক বা অন্য কিছুই হোক না কেন, বা যতই যুক্তিসঙ্গত হোক না কেন, আমরা জনগণের উপর কোনো কর আরোপ করার অধিকার অর্জন করতে পারি না। পাশের শহরগুলোতে ইজারার অধিকার আমাদের শীঘ্রই সেই অধিকার এনে দেবে এবং আমাদের নিজস্ব শাসন পদ্ধতি এবং নিয়ম অনুযায়ী বাসিন্দাদের থেকে শুল্ক আদায়ের স্বাধীনতা তৈরি করবে। আমাদের স্থায়ী বসতি তৈরির জন্য অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এই রাজস্ব আদায়ই একমাত্র উপায় আমরা ভাবতে পারি।(উইলসন: ওল্ড ফোর্ট উইলিয়াম ইন বেঙ্গল, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪-১৫; বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৪৭ এবং পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলো।)
৭ই মার্চ, ১৬৯৮-এর কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, এই সুবিধাগুলো চাওয়ার ক্ষেত্রে ইংরেজরা ‘দেশের জমিদারের’ থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছিল :
“আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের জমিদার যাতে আমাদের ডিহি কলকাতা শহর প্রচলিত ভাড়া বা খাজনায় দেন সে প্রতিশ্রুতি আদায় করার সমস্ত উপায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে, তার এই শহর থেকে বর্তমানে যা আয় হয় তার চেয়েও একচতুর্থাংশ বেশি পরিমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পরেও আমাদের আবেদন নিবেদন ব্যর্থ হয়েছে। তিনি তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন আপত্তি তুলেছেন যে তিনি মহামান্য কোম্পানির নামে সেই দেশের কোনো অংশ আমাদের দেবেন না, তবে আমরা কোনো স্থানীয় ব্যক্তির নামে আমাদের ব্যবহারের জন্য নিতে পারি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে, স্থানটি তার হাতছাড়া হবে, আমরা একটি শক্তিশালী জাতি, এবং যখন প্রয়োজন হবে তখন তিনি তার দেশ আবার নিজের দখলে নিতে পারবেন না, অথচ তিনি তার দেশের কোনো অংশ ভাড়া নেওয়া যেকোনো স্থানীয় ব্যক্তির কাছ থেকে তা কেড়ে নিতে পারেন।” তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, এবং এই নিম্নস্তরের জমিদারদের সাথে লেনদেন করতে আমরা যে অসুবিধা অনুভব করছি, যেখানে কোনো নিরাপত্তা বা বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তার পরিপ্রেক্ষিতে, যদি আমরা বড় জমিদারদের কাছ থেকে এলাকাটি ইজারা নিই, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে।
“এই মর্মে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমরা শাহজাদা (প্রিন্স) কাছে তিনটি শহরের জন্য, যথা: সুতানুটি, ডি(হি)ক্যালকাটা এবং গোবিন্দপুর, যে শহরের জমির পরিমান আমাদের মাননীয় মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী হবে – আবেদন করব এবং তাঁর কর্মকর্তাদের মধ্যে আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করব।
“এবং ভাড়ার পরিমাণও প্রায় তত টাকাই হবে যা তাঁরা আমাদের জন্য বরাদ্দ করেবেন; এবং যেহেতু আমরা অন্য বিষয়ে সম্রাটের নাতি শাহজাদাকে উপহারও দিচ্ছি, তাই আমরা আশা করতে পারি যে উল্লিখিত শহরগুলোর জন্য অনুদান পেতে অসুবিধা কম হবে; কিন্তু যদি কোনো অসুবিধা দেখা দেয়, তবে মাননীয় কোম্পানির জন্য এই শহরগুলো যে বিশাল সুবিধা বয়ে আনবে, তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে বরং—
“এই সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আমরা জমিদারকে বর্তমানে প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে এক-চতুর্থাংশ বেশি অর্থ অগ্রিম দেব, এই উদ্দেশ্যে যে আমরা এটিকে এমনভাবে উন্নত করব যা এখন পর্যন্ত কেউ চেষ্টা করে নি অথবা যে কাজ জমিদারদের পক্ষে সমাধা করা সম্ভব নয়।”(উইলসন: পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ