ভারতের ইতিহাস থেকে আমরা জেনেছি যে ১১২৯ থেকে ১৭২৯ এই পাঁচশো বছরে এ দেশের অন্তত শতাধিক মন্দির ধ্বংস হয়েছে। কাদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতের ঐতিহ্যমণ্ডিত সেইসব মন্দির? সীতারাম গোয়েল, ইলিয়ট, ডডসন প্রমুখের তথ্য অনুসারে মুসলমান শাসক অথবা লুঠেরা। উল্লেখ করা যায় গুজরাটের সোমনাথ, আসামের কামাক্ষ্যা, উড়িষ্যার লিঙ্গরাজ প্রভৃতি। প্রশ্ন মুসলমানেরা এ দেশে আসার আগে কী কোনো মন্দির ধ্বংস হয়নি? কলহন তার বিখ্যাত ‘রাজতরঙ্গিনী’তে লিখছেন কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হর্ষ (১০৮৯-১২১১) নিজের রাজকোষ সামাল দিতে বহু হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ পুণ্যস্থান ধুলিসাৎ করেছিলেন। উল্লেখ্য, কলহন ছিলেন হর্ষের মন্ত্রী চম্পকের ছেলে। কলহন ‘রাজতরঙ্গিনী’তে লিখেছেন, তাঁর রাজ্যের গ্রাম নগর বা শহরে এমন একটি মন্দির ছিলনা যার বিগ্রহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সব সময়ে হর্ষ যে মন্দির ধ্বংস করেছেন তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে তিনি লোক দিয়ে মন্দিরের বিগ্রহ তুলে নিয়ে যেতেন। সেই বিশেষ রাজকর্মচারীদের নাম ছিল দেবোৎপাটনায়ক। এই রাজকর্মচারীরা কী সবাই ধর্মে মুসলমান ছিল? পতঞ্জলি ১৫০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে যে ‘মহাভাষ্য’ লখেছিলেন এবং ৪০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের পাণিনির ব্যাকরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্যরা তাঁদের অর্থভাণ্ডার তলানিতে ঠেকলে মূল্যবান দেবদেবীর মূর্তি গলিয়ে ফেলতেন। জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের শুঙ্গ রাজা পুশ্যমিত্র শুঙ্গ বহু বৌদ্ধ মঠ ও স্তূপ ধ্বংস করেছিলেন। ওই সময়ে লেখা ‘দিব্যদান’ থেকে জানা যায়, পুষ্যমিত্র শুঙ্গ সম্রাট অশোকের নির্মিত ৮৪০০০ বৌদ্ধস্তুপ ধ্বংস করেছিলেন। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন মগধের বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলি। বৌদ্ধ মঠ মন্দির ধ্বংস করে পুড়িয়ে হত্যা করেছিলেন বহু সন্যাসীকে। রাষ্ট্রকূট রাজা ইন্দ্র তৃতীয় কালপ্রিয় মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। অর্থের কারণেই যে সব সময়ে মন্দির ভেঙে ফেলা বা ধ্বংস করা হত তা নয়, বহু সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজার পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি মন্দির ভেঙে দেওয়া হত, তাছাড়া মন্দিরগুলিকে যেহেতু রাজনৈতিক প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসেবে দেখা হত, তাই সেগুলি দমন করার জন্য ভেঙে দেওয়া হত। অনেক সময় ধর্মীয় মতবিরোধ যেমন ব্রাহ্মণবাদী হিন্দুরা বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মকে প্রান্তিক ধর্ম মনে করত বলে ভেঙে ফেলত বা ধ্বংস করে দিত। আবার সম্পদের লোভে; মন্দিরগুলিতে সঞ্চিত রাখা ধনসম্পদ লুঠ করার জন্য হামলা হত।
এই ভাবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মুসলমান শাসকদের থেকে হিন্দু রাজারাই তুলনায় অনেক বেশি মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। অনেক হিন্দু রাজা জৈন ও বৌদ্ধ মন্দির ধুলিস্যাৎ করে তাদের উপর নির্যাতন করেছেন। এই ঘটনা প্রথম ঘটে ভীম কেশবের মন্দির বিধ্বস্ত করা দিয়ে। দ্বাদশ শতকে পারমার রাজারা গুজরাটে সম্পদের লোভে দাভয় ও ক্যাম্বে অঞ্চলের বহু জৈন মন্দির লুণ্ঠন করেন। শৈবদের হাতেও বহু বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরের ক্ষতি হয়। সেগুলি পরে শিব মন্দিরে রূপান্তরিত হয়েছে। দশম ও একাদশ শতকের চোল বংশের শৈব সম্রাট প্রথম রাজারাজ চোল এবং তাঁর পৌত্র রাজাধিরাজ চোলও চালুক্য রাজ্যের জৈন মন্দির লুণ্ঠন ও ধ্বংস করেন। দশম শতকের কাশ্মীরের রাজা ক্ষেমগুপ্ত শ্রীনগরে বৌদ্ধমন্দির জয়েন্দ্রবিহার ধ্বংস করে ক্ষেমগৌরীশ্বর নামে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুর জেলার সাতচল্লিশটি জনশূন্য দুর্গানগরী আসলে বৌদ্ধশহরের ভগ্নাবশেষ। বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে চরম জয় পাওয়ার পর ব্রাহ্মণরা এইসব শহর জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তিব্বতীয় এক গাথা অনুযায়ী একাদশ শতকের কালচুরি রাজা কর্ণ মগধের বহু বৌদ্ধবিহার ও মন্দির ধ্বংস করেন। ত্রয়োদশ শতকে আলভার (বৈষ্ণব ধর্মের) শাস্ত্রের উল্লেখ অনুযায়ী, বৈষ্ণব কবি ও সন্ত তিরুমানকাই নাগাপত্তনমের স্তুপ থেকে বিরাট এক সোনার বুদ্ধমূর্তি চুরি করে সেটাকে গলিয়ে মন্দির নির্মাণের কাজে লাগিয়েছিলেন।সম্ভবত হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক কান্যকুব্জ বা কনৌজের রাজা কুমার শিলাদিত্য বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্টপোষক হওয়ার অপরাধে ব্রাহ্মণরা তাঁকে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। দাক্ষিণাত্যের পাণ্ডে বংশের রাজা সুন্দর হাজার হাজার জৈনকে নাক কান কেটে হত্যা করেন। তাদের অপরাধ তারা হিন্দুধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। দাক্ষিণাত্যের অনেক মন্দিরের গায়ে সেই শূলবিদ্ধকরণ উৎকীর্ণ দেখতে পাওয়া যায়। হিউয়েঙ সাঙ অযোধ্যা পরিদর্শন করে লিখেছিলেন, অযোধ্যার শতাধিক বৌদ্ধমঠ ছিল যেখানে প্রায় ৩০০০ বৌদ্ধ শ্রমণ ছিলেন। হিন্দু মন্দির ছিল মাত্র ১০টি। এই বৌদ্ধ বিহারগুলি সেদিন হিন্দুরাই ধ্বংস করেছিল।
বাংলার কর্ণসুবর্ণের হিন্দু রাজা নরেন্দ্র গুপ্ত বা শশাঙ্ক (খ্রীঃ ৬১৯–৬৩২) নির্দেশ দিয়েছিলেন সেতুবন্ধ হতে হিমগিরি পর্যন্ত যত বৌদ্ধদের হত্যা করতে হবে। বুদ্ধগয়ার যেখানে গৌতমবুদ্ধ জ্ঞানলাভ করেছিলেন সেই বোধিবৃক্ষ কেটে জ্বালিয়ে বুদ্ধ মূর্তিকে মন্দির থেকে সরিয়ে সেখানে শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পাটলিপুত্রতে বুদ্ধের পদচিহ্নের পাথর খণ্ডটি ভেঙে ফেলেন, বহু বৌদ্ধভিক্ষুকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেন। অষ্টম শতকে হিন্দুধর্মের পূনরুত্থানের সময় দক্ষিণভারতীয় ভাষাবিদ্ কুমারিল ভট্ট বৌদ্ধ নির্যাতন চালাতে রীতিমতো শাস্ত্রীয় নির্দেশ জারি করেছিলেন। তিনি প্রচার করতেন ‘বৌদ্ধ মাত্রই বধ্য’। রাজা সুধন্বা অসংখ্য জৈন ও বৌদ্ধ পণ্ডিতের মাথা কেটে ফেলে দিয়েছিলেন। অষ্টম শতকে গাড়োয়ালের হিন্দুরাজা তিব্বতের রাজা লামা ইয়োসীহোতকে বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করাতে ব্যর্থ হলে তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন। সপ্তম শতকে কুমায়ুনে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠালাভ করলেও শঙ্করাচার্যের আন্দোলনে সেখানে একটি বৌদ্ধ মন্দির অবশিষ্ট থাকেনা। পল্লব রাজবংশের হিন্দু রাজা প্রথম নরসিংহবর্মণ (৬৩০ – ৬৬৮) চালুক্যদের মন্দিরের মূল বিগ্রহ গণেশ মূর্তি লুণ্ঠন করেন। চালুক্য রাজা ৬৯৩ খ্রীষ্টাব্দের উত্তর ভারতে অভিযান চালিয়ে পরাজিত রাজাদের মন্দির থেকে গঙ্গা ও যমুনার দেবীমূর্তি লুণ্ঠন করেন। অষ্টম শতকে কাশ্মীর রাজ ললিতাদিত্যের (৬৯৯ – ৭৩৬) রাজ্যে হানা দিয়ে পাল রাজারা কাশ্মীরে রাজাদের রামস্বামী নামক বিষ্ণু মূর্তিকে ভেঙে দেন। অষ্টম শতকে পাণ্ডা রাজা শ্রীবল্লভ সিংহল আক্রমণ করে তাঁর রাজধানীতে একটি সোনার বুদ্ধমূর্তি লুণ্ঠন করে নিয়ে যান। দশম শতকের মাঝামাঝি ওই বিষ্ণুমূর্তি আবার ছিনিয়ে নেন চান্দেলা রাজ যশোবর্মন এবং সেটাকে খাজুরাহের লক্ষ্ণণ মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। একাদশ শতকের প্রথম দিকে চোল রাজা রাজেন্দ্র (১০১৪–১০৪২) বিভিন্ন রাজমন্দির থেকে বিভিন্ন দেবমূর্তি লুট করেন। একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চোল রাজাধিরাজ (১০১৮–১০৫৪) চালুক্য রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করে চালুক্য রাজবংশের রাষ্ট্রদেবতা দ্বারপালিকা বিগ্রহ বিধ্বস্ত ও মন্দির পুড়িয়ে দেন। ওড়িশার সূর্যবংশী গজপতি বংশের রাজা কপিনেন্দ্র ১৪৬০ খ্রীষ্টাব্দে তামিল রাজাদের রাজত্বে যুদ্ধাভিযান চালিয়ে বহু শৈব ও বৈষ্ণব মন্দির বিধ্বস্ত করেন। দশম শতকের গোড়ার দিকে রাষ্ট্রকুট রাজা তৃতীয় ইন্দ্র তাঁর শত্রুপক্ষীয় প্রতিহার রাজার রাষ্ট্রদেবতার কলাপ্রিয় মন্দির ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে নিজেই বিস্তারিতভাবে তার বিবরণ দেন। শংকরবর্মণ (৮৮৩–৯০২) ৬৪টি মন্দির লুট করেছিলেন। রাজা কলশ (১০৬৩–১০৮৯) সূর্যমূর্তি ধ্বংস করেন এবং বৌদ্ধমঠ থেকে বহু মূর্তি নিয়ে চলে যান।
(আগামীকাল শেষ)
এখনকার পরিস্থিতি ইতিহাসের বাস্তব তুলে ধরে। আসলে আমাদের দেশের ইতিহাস বিদেশী ভাষ্যে রচিত তাই কতটা বিশ্বাসযোগ্য সন্দেহজনক। বাংলাদেশ পাকিস্তান আফগানিস্তানের ইসলামী শাসন দেখলে ভারতের মধ্য যুগের ইসলামী শাসন কেমন ছিল বোঝা যায়। হিন্দুরা হিন্দু মন্দির ধ্বংস করলে দক্ষিণ ভারতের মন্দির গুলো রক্ষা পেল কি করে? মন্দির ও মূর্তি ধ্বংস ইসলামে পবিত্র কিন্তু ভারতের কোন ধর্ম এ কাজ অনুমোদন করে না। এটার ব্যাখ্যা কি হবে?