সানি গ্ৰে। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, কেরালার বাসিন্দা।
দিনপাঁচেক হল কলকাতায় এসেছেন। উঠেছেন এয়ারপোর্টের কাছাকাছি নতুন গজিয়ে ওঠা ঝাঁ চকচকে স্মার্ট সিটি নিউটাউনের একটি বিলাসবহুল হোটেলে। ইচ্ছে বড়দিনের কলকাতাকে উপভোগ করার।
হোটেলে আসার পরদিন শহরটাকে দেখতে বেরিয়েই কলকাতাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। এখানকার আপ্যায়নে তিনি মুগ্ধ। সবার ব্যবহার এত আন্তরিক যে মনে হয় যেন সানি ওদের বহুদিনের পরিচিত। কয়েকটা দিন ধরে সানি গোটা কলকাতাকে চষে ফেলেছেন।
আজ চব্বিশে ডিসেম্বর। থ্যাঙ্কস্ গিভিং ডে। সানি আজ সকালে স্নান সেরে গিয়েছিলেন সেন্ট পলস্ ক্যাথিড্রাল চার্চে। সেখানকার প্রার্থনা ও ক্যারল শেষ হলে সানি শপিংমলে গিয়ে হোটেলের যে সব কর্মীরা এতদিন ধরে তাকে পরিষেবা দিয়ে চলেছে তাদের প্রত্যেকের জন্য গিফ্ট কেনেন।
ক্রিসমাস ইভের সন্ধ্যেবেলা। হোটেলের লবি সুন্দর করে সাজানো। আজ ফ্লোরে লাইভ কনসার্ট হচ্ছে। উৎসব মুখরিত পরিবেশে সবাই আনন্দিত। একে অপরকে উইশ করছে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। সবার হাতে হাতে স্পার্কলিং ওয়াইনের টিউলিপ থেকে যেন আনন্দ উপছে পড়ছে।
হোটেলের কর্মচারীরা সবাই খুব ব্যস্ত। তবুও তারই মধ্যে সানি তাদের এক এক করে ডেকে বড়দিনের উপহার দিলেন। সবাই খুব খুশি।
এরই মধ্যে শিলংয়ের মেয়ে আর্যা গোমেজ উপহার হাতে নিয়ে জলভরা চোখে সানির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম সে কর্মসূত্রে বড়দিনে বাড়ি থেকে দূরে। আজকের দিনে বাড়ির সকলকে বিশেষ করে মায়ের হাতে বানানো ফ্রুট কেক আজ ও খুব মিস করছে। সানির মায়া হয়। ওর মাথায় হাত রাখে।
আর্যা বলে যে ওর মা বড়দিনে নারকেল, সুজি, দুধ, চিনি আর এলাচগুঁড়ো দিয়ে অপূর্ব এক মিষ্টি বানায়, যেটা বছরের অন্য কোনওদিন বানায় না। সেই মিষ্টি থ্যাঙ্কস্ গিভিং ডে তে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়, পড়শি সবার বাড়িতে পাঠানো হয়। আজ আর্যার বড়োই মনে পড়ছে সেসব কথা।
সানি বলে, দ্যাখো, দয়াময় যীশু মানুষকে পরীক্ষা করেন; সত্যিকারের কষ্টে প্রভু সবসময় মানুষের পাশে থাকেন। তোমার কষ্টও নিশ্চয়ই তিনি লাঘব করবেন।
আর্যা সানিকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের কাজে চলে যায়।
ধীরে ধীরে রাত বাড়ে। মধ্যযামিনীতে আনন্দ ধ্বনিতে যীশুর জন্মের ঘন্টা বেজে ওঠে হোটেল জুড়ে। তারপর সানি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ান।
যেতে যেতে কফিশপের ম্যানেজার তরভীন আর আর্যার কিছু কথোপকথন কানে আসাতে দাঁড়িয়ে পড়েন সানি।
আর্যা চাপা গলায় তরভীনকে বলছে, “দিস্ ইজ নট্ ফেয়ার। ইউ কান্ট ডু দিস্।”
“ওকে, দেন উই উইল সি দ্যাট্ অন দ্য এ্যাপ্রাইজাল ডে” হিসহিসিয়ে ওঠে তরভীন, “গো এ্যাহেড।”
আর্যা বুঝতে পারে যে তরভীনের কথা না মানলে প্রমোশনের আশা নেই। কিন্তু ওর প্রস্তাব মেনে নেওয়া আর্যার পক্ষে অসম্ভব।
মিস্টার গ্ৰে মারা যাওয়ার পর কয়েকবছর ধরে সানি একাই নিজের মতো করে ক্রিসমাস পালন করেন। এসময়টা তিনি বাড়িতে থাকতে পারেন না। দীর্ঘ দাম্পত্যের স্মৃতি তাঁকে বিচলিত করে। তাই একাই বেরিয়ে পড়েন। বুঝতে চেষ্টা করেন এইসব আধুনিক বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে জীবনের স্রোতে উদয়াস্ত হাসিমুখে পরিষেবা দিতে ব্যস্ত কর্মচারীদের রোবোটিক হাসির আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে। তাই আজ সামান্য কয়েকটা কথা কানে আসতেই বুঝতে পারলেন সামথিং ইজ গোয়িং রং।
তিনি ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগিয়ে আসেন। স্মিত হেসে তরভীনকে লক্ষ্য করে বলেন, “এই মেয়েটির সাথে কি আমি কথা বলতে পারি?”
তরভীন একগাল বিগলিত হাসি মুখে নিয়ে বলে, শিওর ম্যাম।”
সানি আর্যাকে জিজ্ঞাসা করে, “তোমার ডিউটি অফ্ কখন হবে?”
আর্যা উত্তর দেয়, “সকাল ছটায়, ম্যাম্”।
“ওকে, আমি ওইসময় তোমার জন্য পুলসাইডে অপেক্ষা করব।” সানি বলেন, “তোমার জন্য কিছু গিফ্ট রাখা আছে। প্লিজ তুমি কালেক্ট করে নিও।”
“ওকে ম্যাম্।” বলে আর্যা সেখান থেকে চলে যায়।
সানি লক্ষ্য করেন আর্যার চোখের কোণ চিকচিক করছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে তরভীন ওদের কথা শুনছিল। ওর দুচোখে আগুন ঠিকরোয়।
সানি তরভীনকে শুভরাত্রি জানিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ান।
আজ বড়দিন। সানি গতকাল সারারাত ঘুমোতে পারেন নি। ছটফট করেছেন। প্রভু যীশুর কাছে প্রার্থনা করেছেন আর্যার জন্য। ভোর সাড়ে পাঁচটায় নেমে এসেছেন পুলসাইডে। লক্ষ্য করেছেন উৎসব শেষের কফিশপে আর্যা নিজের কাজ গোছাতে ব্যস্ত। সানি ধীর পায়ে পুলসাইডের চেয়ারে গিয়ে বসেন।
সকাল সাড়ে ছটায় আর্যা আসে একমুখ হাসি নিয়ে। এসেই সানির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে, “ম্যাম্ আজ আপনিই আমার যীশু।”
সানি হাসেন। বলেন, “বেটা, কাল তোমাদের কথায় আমি আন্দাজ করেছিলাম হয়তো খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে, তাই তোমাকে ডিউটির পরে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলাম।”
“হ্যাঁ ম্যাম্, আমি সেটা তখনই বুঝতে পেরেছি।” আর্যা হাসে, “আজ আপনি আমাকে রক্ষা করেছেন ম্যানেজারের হাত থেকে।”
এইসময়ে আর্যার মোবাইল বেজে ওঠে। ওর চোখে খুশির ঝলক। বলে, মা ফোন করেছে।
ফোনটা ধরেই খুশিতে ফেটে পড়ে ও। স্থান, কাল, পাত্র ভুলে সানিকে জড়িয়ে ধরে। বলে, “ম্যাম্, আমার মা এসেছে কলকাতায়। হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করছে আমার জন্য ফ্রুট কেক আর মায়ের হাতে তৈরী স্পেশাল মিষ্টি নিয়ে।”
সানি বলে, “দয়াময় প্রভুর ইচ্ছায় বড়দিনে তোমার ইচ্ছাপূরণ হয়েছে। যাও তুমি, মায়ের সাথে দেখা করো। আর একটা কথা, কখোনোই কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিও না। মনে রেখো ঈশ্বরও অন্যায় সহ্য করেন না। মাথা উঁচু করে নিজের যোগ্যতায় সামনের পথে এগিয়ে চলো। প্রভু যীশু তোমার সহায় হোন।
আজ আর্যার মনে শুধুই খুশি। আজই এই বড়দিনে প্রভু যীশু ওকে শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়েছেন।
খুব সুন্দর লিখেছো!নতুন ধরণের গল্পে মেয়েদের চিরন্তন সমস্যার কথা তুলে ধরেছো।ভাল লাগল।
!নতুন ধরণের গল্পে মেয়েদের চিরন্তন সমস্যার কথা তুলে ধরেছো।ভাল লাগল।