কিছুদিন আগে মহারাষ্ট্রের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী মকরন্দ যাদব (পাতিল) জানান, চলতি বছর ন’মাসে তাদের রাজ্যা ৭৮১ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এই তথ্য মহারাষ্ট্রের বিধানসভায় সরকারের থেকেই দাখিল করা হয়েছে। কৃষকদের আত্মহত্যার কারণ ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে, কৃষিকাজে লোকসান বেড়ে যাওয়া, কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফসল নষ্ট হওয়া ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধি। আর সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে বহু কৃষক মৃত্যুকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে, অকাল বর্ষণ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে যাঁদের ফসল নষ্ট হয়েছে, সরকার তাঁদের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। তা ছাড়া দরিদ্র কৃষকদের প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মান যোজনা থেকে বছরে ছয় হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে, রাজ্য সরকারও দিচ্ছে বাড়তি ছ’হাজার টাকা। সরকারি এতসব সহায়তা সত্ত্বেও কৃষকদের আত্মহত্যা প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না কেন? কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কৃষকদের অভিযোগ, সরকার কৃষকদের বঞ্চিত করছে, ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধির বদলে কৃষকদের ভাতে মেরে করপোরেট দুনিয়ার মুনাফা বাড়াতে কৃষি আইন এনেছিল। কৃষকদের বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের মুখে সেই আইন খারিজ করতে বাধ্য হলেও এখনো কৃষকদের কোনো রকম সুরাহা দিতে পারেনি। তাই কৃষক আত্মহত্যা করছে।
কৃষিপ্রধান এই দেশে যেখানে প্রায় ৭০% মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল সেই দেশে কয়েক বছর ধরে কৃষক আত্মহত্যার হার যে হারে বেড়েছে তা খুবই উদ্বেগজনক। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র তথ্য জানাচ্ছে, ২০২২ সালে কৃষি খাতে ১১,২৯০ জন কৃষক ও কৃষি শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন, ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়ছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক রিপোর্ট। মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কর্ণাটক, এবং অন্ধ্রপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি। পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা কী? এ রাজ্যের তরফে বার বার দাবি করা হয়েছে, গত কয়েক বছরে বাংলায় কোনো কৃষক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সেটাই কি বাস্তব চিত্র? আরটিআই-এর হিসেব জানাচ্ছে, ২০২১ সালেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাতে ১২২ জন কৃষিকাজে যুক্ত মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। উল্লেখ্য, রাজ্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবি পরিসংখ্যান তৈরি করে। গত অগস্ট মাসে এনসিআরবি যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে গোটা দেশের বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে সেখানে অন্য কয়েকটি রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গের নামের পাশে কৃষি ও কৃষি সম্পর্কিত ক্ষেত্রে আত্মহত্যা দেখানো হয়েছে শূন্য। বোঝা যায়না কেন আরটিআই-এর তথ্য অন্য কথা বলছে? আরটিআই-এর তথ্যে বলছে, শুধুমাত্র পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাতেই ২০২১ সালে ১২২ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। ২০২২ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩৪ জন। এই রাজ্যেও কৃষক আত্মহত্যা একটি জ্বলন্ত সমস্যা, একটি জেলার পরিসংখ্যান দেখলেই তা বোঝা যায়। আরটিআই-এর তথ্যে জেলার প্রতিটি থানা এলাকা ধরে ধরে যে পরিসংখ্যান তুলে ধরে তাতে বেশ কয়েকটি জেলার কৃষক আত্মহত্যার খবর রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া তথ্য জানাচ্ছে, বিগত ১১ বছরে ভারতে কৃষিজ রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯০ মিলিয়ন টন। সাকসব্জি এবং ফলমূল উৎপাদনও ৬৪ মিলিয়ন টন বেড়েছে। ভারত এখন দুধ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম এবং মাছ উৎপাদন দ্বিতীয়। দেশে মধুর উৎপাদন ২০১৪-র তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ডিমের উৎপাদনও দ্বিগুণ হয়েছে। বিগত ১১ বছরে দেশে ছটি বড় সার কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ২৫ কোটিরও বেশি মৃত্তিকা স্বাস্থ্যপত্র দেওয়া হয়েছে কৃষকদের, ১ কোটি হেক্টর কৃষি জমিতে পৌঁছে গেছে অনুসেচের ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার আওতায় কৃষকদের দেওয়া হয়েছে ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। গ্রামে সমবায়ের প্রসার এবং কৃষকদের বিপণনের সুবিধা বাড়াতে বিগত ১১ বছরে ১০ হাজারেরও বেশি কৃষক উৎপাদক সংগঠন বা এফপিও গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ এনসিআরবি-র তথ্য জানাচ্ছে ২০১৪ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সময়ে ১,১১,২৬০ জন কৃষক ও কৃষি-শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩৪ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। ২০২৩ সালে কৃষিক্ষেত্রে ১০,৭৮৬ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন এনডিএ-শাসিত রাজ্যগুলি: মহারাষ্ট্র (৩৮.৫%), অন্ধ্রপ্রদেশ (৮.৬%), মধ্যপ্রদেশ (৭.২%)।
কৃষক আত্মহত্যার প্রধান কারণ ঋণের চাপ। এনসিআরবি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ৩০০০ কৃষক আত্মহত্যার মধ্যে ২৪৭৪ জনের ব্যাংক থেকে ঋণ ছিল। যে ঋণ শোধের চাপ কৃষকদের মানসিক চাপ বাড়ায়। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও ফসলের ক্ষতি, বীজ, সার, কীটনাশক, এবং জ্বালানির দাম ক্রমাগত বাড়ায় কৃষকদের লাভের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। এরপর সরকারি নীতিগুলি প্রায়শই শহুরে ভোক্তাদের পক্ষে থাকে, যা কৃষকদের জন্য ক্ষতিকর। ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য (এমইপি) এবং অত্যাবশ্যক পণ্য আইনের মতো নীতিগুলি ফসলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে, যা কৃষকদের আয় কমিয়ে দেয়। এছাড়া, মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতি কৃষকদের লাভের অংশ কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় সরকার স্রেফ গালভরা প্রতিশ্রুতি দেন, তাই দেশের অন্নদাতাদের দুর্দশা ঘোচে না। খোদ সরকারি রিপোর্ট বলে দিচ্ছে, দড়ির ফাঁসেই মুক্তি খুঁজছেন দেশের কৃষকরা। তাই মহারাষ্ট্রে মাত্র তিন মাসে আত্মঘাতী হয়েছেন ৭৬৭ জন কৃষক। ফড়ণবিস সরকার বিধানসভা অধিবেশনে এই তথ্যই প্রকাশ্যে জানিয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী বলছেন, জিএসটি সংস্কার হওয়ায় অনেক কৃষি সরঞ্জামের দাম কমেছে। বর্তমান জিএসটি হার অনুযায়ী ট্রাক্টরের দাম ৪০,০০০ টাকা কমেছে, অনুসেচের সরঞ্জাম সহ আরও অনেক কৃষি সরঞ্জামের দামও কমেছে বলে প্রধানমন্ত্রী দাবী করেন। প্রশ্ন, তাহলে কৃষক কী শখে আত্মহত্যা করেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের ভূমিকা শুধুমাত্র ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, আত্মনির্ভর ভারত গঠনের উদ্যোগেও তাঁরা অন্যতম চালিকাশক্তি।