ভাষায় নতুন শব্দ
শব্দ হল ভাষার প্রাণ। নতুন নতুন শব্দ ভাষাকে প্রাণবন্ত করে। আমাদের বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি-পর্তুগিজ-ইংরেজি শব্দ প্রবেশ করেছে। সেগুলি কালক্রমে বাংলা ভাষার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে। আধুনিককালে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা বাংলা ভাষায় পুরাতন শব্দকে নতুন অর্থে প্রয়োগ করছেন, নতুন নতুন শব্দ আমদানি করে চলেছেন। যেমন ধরুন, ‘চামচে’ শব্দটা। রান্নাঘরে ব্যবহৃত বস্তুটি চামচ। তার থেকে চামচে। বশংবদ অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন, নেতার চেয়ে চামচের প্রতাপ বেশি। গত শতকের সত্তর দশকে সিপিএম ‘কংশাল’ শব্দটা খুব ব্যবহার করতেন। কংগ্রেস আর নকশালদের মিলন থেকে শব্দটার উৎপত্তি। বর্তমান শতকের প্রথম দিক থেকে ‘হার্মাদ’ শব্দের ব্যবহার। সিপিএমের বাহুবলীদের বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করতেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। অনুরূপভাবে তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে যে সেটিং আছে, সেটা বোঝাতে সিপিএম ব্যবহার করেন ‘বিজেমূল’ শব্দটি। সাম্প্রতিকালে আর একটি নতুন শব্দ এসেছে বাংলা ভাষায়। সেটি হল ‘রোহিঙ্গা’।
রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা
ভোটার তালিকা সংশোধন। SIR দিল্লির বিজেপি নেতারা বলতে লাগলেন দেশে বহু অনুপ্রবেশকারী আছে, বাদ দিতে হবে তাদের। এরাই রোহিঙ্গা। বিহারের নির্বাচন হয়ে গেছে। অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে বিজেপি ও তার দল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ফল লাভ করেছে। এবার ধরতে হবে বাংলাকে। দিল্লির নেতাদের পোঁ ধরে এখানকার বিজেপি নেতারা বলতে লাগলেন রোহিঙ্গার কথা। সবাইকে টেক্কা দিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি ডাঁয়ে-বাঁয়ে, স্বপনে-জাগরণে দেখতে লাগলেন রোহিঙ্গাকে। একদিন তিনি কোন এক মফস্বল শহরে সভা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে কোন মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান দিল। তিনি বীর বিক্রমে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে ‘রোহিঙ্গা’ ‘রোহিঙ্গা’ বলে লোকটির দিকে তাড়া করে গেলেন। তাঁর মনে হয়েছিল এই রোহিঙ্গারা তাঁর স্বপ্নকে সার্থক করবে। স্বপ্নটা ‘নবান্নে’র চোদ্দতলা দখল করা। স্বপ্নেই তিনি দেখতে লাগলেন এই বঙ্গে ১ কোটি ২০ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে। ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম কেটে দিলেই ধাঁই ধাঁই করে বিজেপি জিতে যাবে আর শুভেন্দু হয়ে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী। এই ‘রোহিঙ্গা’ বলতে ঠিক কি বোঝাচ্ছে বিজেপি? বোঝাচ্ছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, সন্ত্রাসবাদী মুসলমানদের। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের অর্থ পরিবর্তন হয়ে গেল এইভাবে।
ইতিহাসের দর্পণে
রোহিঙ্গারা মিয়ানমার বা বর্মার আরাকান রাজ্যে বসবাসকারী এক মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। তাদের পূর্বপুরুষরা কয়েক শতাব্দী সে অঞ্চলে বাস করলেও বার্মিজ সরকার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।
আরাকানে প্রথম বসতি স্থাপনকারী মুসলিমরা ১৫ শতকের মধ্যে এই অঞ্চলে আসে। তখন সেখানকার বৌদ্ধ রাজা নারামেইখেলা (বা মিন স সুন) তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিলেন। পরবর্তী আরাকান রাজারা নিজেদেরকে মুঘল সম্রাটদের অনুকরণে গড়ে তুলেছিলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁরা মুসলমান উপাধি ব্যবহার করতেন। ১৭৮৫ সালে দেশের দক্ষিণ থেকে বৌদ্ধ বার্মিজরা আরাকান জয় করে নিলেন। তাঁরা মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার শুরু করলেন। তখন আরাকানের প্রায় ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা ব্রিটিশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে।
১৮২৬ সালে ব্রিটিশরা আরাকানের নিয়ন্ত্রন নিলেন। তারা বাংলার কৃষকদের এখানে আসতে উৎসাহিত করে; এদের মধ্যে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাঙালি ছিল। এর ফলে আরাকানে বসবাসকারী বৌদ্ধ রাখাইন জনগণ ক্ষুব্ধ হয় এবং জাতিগত উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশ রা আরাকান ত্যাগ করে, আসে জাপানিরা। জাপানিরা রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে। ১৯৪৫ সালে জাপানিরা চলে যায় এবং ১৯৪৮ সালে বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। বার্মা সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। তখন মুসলিম রোহিঙ্গারা নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগদানের জন্য আন্দোলন শুরু করে। জেনারেল নে উইনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বার্মা সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময়ে কিছু বাঙালি আরাকানে আশ্রয় নিলে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী বিক্ষোভে সামিল হয়। বার্মা সরকার ২ লক্ষ মুসলিমকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
সেই সময় থেকে মিয়ানামারের রোহিঙ্গারা অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন যাপন করছে, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশগুলি রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। মিয়ানামারে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন আজও অব্যাহত। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, শিশুহত্যার বিরাম নেই।
কোন দেশে কত রোহিঙ্গা
জীবন রক্ষার জন্য আরাকান ছেড়ে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। ‘বাংলা দেশ জার্নাল’ তার একটি তালিকা প্রকাশ প্রকাশ করেছে।
ক] বাংলাদেশ : মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। এই সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ। আগে থেকে বাংলাদেশে ছিল ৪ লক্ষ রোহিঙ্গা।
খ] পাকিস্তান : ২ লক্ষের মতো রোহিঙ্গা বাস করে পাকিস্তানে। ১৯৪২ সালে সামরিক অভিযানের পর তারা পাকিস্তানে যেতে শুরু করে।
গ] থাইল্যাণ্ড : মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়া যওয়ার পথ হিসেবে রোহিঙ্গারা থাইল্যাণ্ডকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করত। থাইল্যাণ্ডে এখন ১ লক্ষ রোহিঙ্গা বাস করে।
ঘ] মালয়েশিয়া : ইউ.এন.এইচ.সি.আর-এর হিসেব অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় আছে ৫৯ হাজার রোহিঙ্গা। দেশটি জাতিসংঘের শরনার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী না হওয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বীকৃতি দেয় নি।
ঙ] যুক্তরাষ্ট্র : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাস করে। এদের বেশির ভাগ আছে শিকাগোতে।
চ] ইন্দোনেশিয়া : ইন্দোনেশিয়ায় ১১ হাজার ৯৪১ জন নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। এদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
ছ] নেপাল : নেপালে ২০০ জন রোহিঙ্গা বাস করে।
জ] পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা বলছিলেন যে এখানে ১ কোটি ২০ লক্ষ রোহিঙ্গা আছে। মিয়ানমারসহ সারা পৃথিবীতেও এত রোহিঙ্গা নেই। সরকারি হিসেব মতে ভারতে আছে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছেন যে দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ. পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, কেরল, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা, পঞ্জাব) আছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
কোথায় গেল রোহিঙ্গারা
গতকাল খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হল। বাদের তালিকায় আছে : মৃত-২৪,১৬,৮৫২; অনুপস্থিত-১২, ২০,০৩৮; ঠিকানা বদল-১৯,৮৮,০৭৬; ডুপ্লিকেট–১,৩৮,৩২৮; অন্যান্য-৫৭,৬০৪; সর্বমোট=৫৮,২০,৮৯৮। এর মধ্যে রোহিঙ্গা কোথায়? কোথায় রোহিঙ্গা? বিজেপি নেতাদের এত আস্ফালন, গোদি মিডিয়ায় এত ঢক্কানিনাদ, সব কি তবে জলে গেল?
বড় হতাশ হয়েছেন আমাদের বিরোধী দলনেতা। রোহিঙ্গা নিয়ে তাঁর নাচন-কোদন দেখতে দেখতে গত তিন চার মাস আমরা ভাবছিলাম রোহিঙ্গারা বড় মায়াবী মানুষ। বিএসএফের দৃষ্টি এড়িয়ে তারা টুকটাক করে ঢুকে পড়েছে আমাদের বঙ্গে, মিশে গেছে বঙ্গবাসীর সঙ্গে। এখন খসড়া ভোটার তালিকা বলছে ভিন্ন কথা। এ কি সেম সাইড গোল?
আসুন আমরা বিরোধী দলনেতার মনের কথা শুনি আর সমবেদনা জানাই : —
কোথায় গেল রোহিঙ্গারা
খুঁজতে গিয়ে পাগলপারা
তবে কি তারা মায়াবিনী
কেমন করে তাদের চিনি
আয় না ভাই হাজার কয়
ছাব্বিশেতে করব জয়
লোডশেডিংএর মায়ার মতো
ভোট বাড়বে কয়েক শত
দলবদলুর বাড়বে মান
রোহিঙ্গার অস্ত্রে শান