কালের নিয়মে সময় যখন প্রকৃতিতে থাবা বসায় সে আঁচড় হয় সাময়িক, নিজের খেয়ালেই ক্ষত সারিয়ে প্রকৃতি আবার সেজে ওঠে; ঝরে যাওয়া পাতার কথা বুঝি তার মনেও থাকে না। কিন্তু মানুষ তো কালের ঘরে ক্রীতদাস। অতীতকে হৃদয়ে বেঁধে রেখেই আবেগী মন এগিয়ে যায় সামনের পথে।
আমি শুভ। রিটায়ার্ড, সামান্য সরকারী কর্মচারী। মাথার ওপরে ছাদ আর পেটের ভাতের নিরাপত্তায় ঘেরা জীবনকে ভালোবেসেই এগিয়ে চলেছি। জীবনের নৌকা চলছে কাল-সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে। ঢেউয়ের মাথায় থাকলে মনে হয় এই বুঝি গেল গেল; আবার জলে ভাসার সময় ছুটে আসা দুরন্ত ঢেউ দেখে ভাবি এই বুঝি গিলে নিল।
আমার জীবনের পরত মোটা হয়েছে ভালোবাসার সরে। শিকড় ছড়িয়েছে বহুদূর। সময়ের আঁচড়ে দাগ পড়েছে শরীরে, দাগ পড়েছে বসতভিটেয়। ক্রমশঃ শরীরের মতো যতই জরাজীর্ণ হয়েছে আমার বাড়ি ততই ভালোবাসার রশিতে বাঁধনের টান বেড়েছে নাড়ীতে আর বাড়িতে। বিশেষতঃ এই বাড়ির দক্ষিণের বারন্দা খোলা হাওয়ায় লুটোপুটি খেতে খেতে প্রাণের অহঙ্কারে আমার সকল স্মৃতির ঝাঁপি নিয়ে সগর্বে আমাকে ঘিরে থাকে।
আজকের পারিপাট্যের ছিমছাম ব্যালকনির ফ্যাশন আর মান্ধাতা আমলের বিস্তৃত বারন্দার আভিজাত্যে আমার কাছে যোজন দূরত্ব। তবুও সময়ের সাথে সঙ্গতি রেখে স্ত্রী রূপা আর পুত্র তমালের ইচ্ছেয় জীর্ণ বাড়ির মায়া ত্যাগ করে বাড়ির ভেতর দিকের ফাঁকা জমিতে যুগোপযোগী সুরম্য বাড়ি বানিয়েছি।
পুরোনো বসতভিটে মাটিতে মিশে গেছে, শুধু রয়ে গেছে বড়ো বড়ো জানলাওয়ালা দক্ষিণের পুরোনো বারন্দাটি। হয়তো এটিও অচিরেই হারিয়ে যাবে; নচেৎ নতুন বাড়ির সামনে জেগে থাকা শীর্ণ হাড়হাভাতে বারন্দা যে নতুন ব্যালকনির অহঙ্কারে আঘাত করে।
রাত দশটা বাজে। আজ আমার নতুন বাড়িতে গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠান ছিল। অতিথি অভ্যাগতরা সবাই বিদায় নিয়েছেন। সকলেই নতুন বাড়ির প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত ছিলেন। সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে এসে দাঁড়ালাম ব্যালকনিতে। এখান থেকে আমার আশৈশবের চেনা পাড়াটাকে যেন অন্যরকম লাগছে। খুব সুন্দর, কিন্তু কোথাও যেন ফাঁক থেকে যাচ্ছে। ভালো লাগছে না। কোথায় যেন গভীরতার অভাব টের পাচ্ছি। নিজেকে বড় ঠুনকো মনে হচ্ছে। নেমে এলাম।
এখন আমি এসে দাঁড়িয়েছি আমার সারাজীবনের স্মৃতি বিজড়িত দক্ষিণের বারন্দায়। ঠাণ্ডা হাওয়ার পরশ আমার মনের ঘরের সকল দুয়ার খুলে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।
আমি অনুভব করছি মা জানলা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আমার অফিস থেকে ফেরার পথ চেয়ে।
আমি দেখতে পাচ্ছি ওই ধারের জানলার পাশে ছোট্ট টেবিল-চেয়ার। দিদির প্রিয় জায়গা। ওখানে বসে দিদি পড়াশোনা করত। আমি অবশ্য বলতাম ওটা পড়ার নামে ফাঁকিবাজি, খালি রাস্তা দেখা।
আজ গৃহপ্রবেশ উপলক্ষ্যে দিদিও এসেছে অনেকদিন পরে। ভালোলাগায় আমার মন ভরে আছে।
নতুন বাড়িতে প্রথম আসা উপলক্ষ্যে অন্যান্য আত্মীয় বন্ধুজন সবাই ঘর সাজানোর নানারকম উপহারসামগ্ৰী নিয়ে এলেও দিদি আমার নতুন বাড়ির জন্যে হাতে করে কিছুই নিয়ে আসেনি। এ নিয়ে রূপা আমাকে ঠারেঠোরে দুকথা শুনিয়েও দিয়েছে। ওর এ ধরণের কথার বাণে আমি অভ্যস্ত। ওসব আমার গা সওয়া। এখন আমি প্রাণভরে মেতে আছি বারন্দার সাথে।
নতুন বাড়িতে আমাকে খুঁজে না পেয়ে তমাল এখানে এসে হাজির। “ডিসগাস্টিং। বাবা, এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তুমি কি পাও বলোতো?” তমাল বলে।
ওর কথায় আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। ম্লান হেসে বলি, “তোর, আমার, আমাদের সকলের শিকড় যে এখানেই বাবা। তোর বড়ো হয়ে ওঠা যে এখানেই”।
“এসব ফালতু সেন্টিমেন্টের আজ কোনও দাম নেই। মিস্ত্রী আসবে কাল। এই বারন্দা কালই ভাঙা হবে। বাড়ির সামনে এই হতকুচ্ছিৎ বারন্দাটা যাস্ট অসহ্য বাবা। এখানে টানা সুদৃশ্য লোহার গেট বসানো হবে। তখন দেখবে আমাদের নতুন বাড়ির রূপই বদলে যাবে।” যুবক তমাল নতুনের স্বপ্নে বিভোর।
আমি আপত্তি করতে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে কাঁধের ওপর চেনা স্পর্শে ঘুরে দেখি দিদি এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, “যা গেছে তাকে আঁকড়ে থাকবি কতকাল? তার থেকে তমালের পছন্দেই মত দে।”
আলো আঁধারিতে দিদিকে কেমন যেন অপার্থিব মনে হচ্ছিল। নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে একবুক দমবন্ধ করা অস্বস্তি নিয়ে সরে গেলাম।
পরদিন সকাল। বাড়িতে হুলুস্থূল পড়ে গেছে। সকাল থেকেই দিদি বাড়িতে নেই। রূপা পাড়া প্রতিবেশীদের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছে। কোথাও নেই। এখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শুরু করেছে দিদির মুণ্ডুপাত। “বেআক্কেলে মানুষ, সভ্যতা ভদ্রতার ধার ধারে না, অনুষ্ঠানবাড়িতে একটুকরো উপহার নিয়ে আসার সৌজন্যবোধটুকুও নেই। সবই না হয় মানা গেল কিন্তু চলে যদি যেতেই হয় বলে গেলেই হতো” ইত্যাদি ইত্যাদি।
নতুন ব্যালকনি থেকে ভেসে আসা মধুর শব্দগুলো এড়িয়ে চলে আসি আমার চিরপরিচিত বারন্দায়। এখন মনে হচ্ছে আভিজাত্যের গরিমায় আমার শ্রীহীন বারন্দা ওই বাহারি মানিপ্ল্যান্ট ঝোলানো ব্যালকনির থেকে অনেক সুন্দর। এ বারন্দার স্মৃতিতে এমন শ্রুতিকটু কথার সম্ভার নেই। এর আনাচেকানাচে ছড়িয়ে আছে ভালোবাসা ভরা খুনসুটি আর আত্মজনের প্রতি টান।
হইহই করে তমাল জুটিয়ে এনেছে মিস্তিরির দল। আজই ভেঙে ফেলা হবে বারন্দা। আমার অন্তরাত্মা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। ওরা গাঁইতি, শাবল, হাতুড়ি বার করে তৈরি হচ্ছে আমার অতীত অধ্যায় মুছে ফেলার জন্য। আমার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। খুব জলতেষ্টা পাচ্ছে। এ দৃশ্য আমি সইবো কেমন করে! আমি এ জায়গা থেকে চলে যাওয়ার জন্য পেছন ঘুরি।
বারন্দায় গাঁইতি, হাতুড়ির ঘা পড়ছে দমাদম। ছিটকে যাচ্ছি আমি, দিদি, মা, বাবা। সরে যাচ্ছে সবার জড়ো করা টুকরো টুকরো একমুঠো সময়। আমি পালাতে চাই এখান থেকে।
হঠাৎই পেছন থেকে দিদির গলা, “দাঁড়া শুভ। এদিকে আয়, সময়কে অস্বীকার করে মুখ ঘুরিয়ে বাঁচা যায় না রে। সবকিছুর মধ্যেই নিজের ছাপটুকু রেখে নিজেকে মানিয়ে চলতে হয়। অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনকে রোধ করার সাধ্য স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই রে, আয় দেখবি আয়, আজ আমি কি উপহার এনেছি তোর জন্যে।”
দিদির ডাকে আবার ফিরে চলি। দিদি একটা ব্যাগ নিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। ব্যাগের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে চারাগাছ।
আমাকে অবাক করে দিয়ে দিদি হাতে তুলে নেয় শাবল। তারপর ভেঙে ফেলা দক্ষিণের বারন্দার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে খুব যত্ন নিয়ে বসায় ছোট্ট একটা কৃষ্ণচূড়ার চারা। আর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বসায় একটা মেহগণির চারা।
আমি দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি সূর্যের আলোয় গাছ লাগানোর পরিশ্রমে ঘামে ভেজা দিদির মমতাময়ী মুখে জড়িয়ে এক ভালোবাসার তৃপ্তি। বুঝি, আমার নিঃসঙ্গ বারন্দা আজ অন্য এক ভালোবাসার বাঁধনে ধরা পড়ল।আমি মানসচক্ষে দেখতে পাই দুটো মহীরূহ অসংখ্য পাখ-পাখালির আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। কাকলিতে ভরে উঠেছে আকাশ।।
অপূর্ব!!