আজ মিত্র সপ্তমী। অগ্রহায়ণ মাসের শুক্ল পক্ষের সপ্তমী তিথিতে মিত্র সপ্তমী পালিত হয়। অগ্রহায়ণ মাসের সূর্যকে মিত্র বলা হয়। মানবজাতি কল্যাণের জন্য অগ্রহায়ণ মাসে সূর্য মিত্ররূপে বিরাজ করেন। মানুষের প্রধান চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। বস্ত্র, বাসস্থান ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে কিন্তু অন্ন ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেই খাদ্যের নিশ্চয়তা যে সূর্য প্রদান করেন, তিনি তো জীবকুলের মিত্র।
সূর্যদেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমাদের দেশে মিত্র সপ্তমীতে অর্থাৎ অঘ্রাণ মাসের শুক্লা সপ্তমীতে উপবাস পালন ও পূজার মাধ্যমে বিশেষ ব্রত পালন করা হয়। ব্রতকথায় বলা হয়েছে, সূর্য আরাধনা মানবকে অর্থকষ্ট থেকে অব্যাহতি দান করে। মহাভারতে জ্যৈষ্ঠ পান্ডব যুধিষ্ঠির বনবাস এর সময় সূর্য আরাধনা করে এক তাম্রস্থালি লাভ করেছিলেন যে স্থালি, পাঞ্চালি অন্ন গ্রহন না করা পর্যন্ত সর্বদা পরিপূর্ণ থাকত। বনের মধ্যে বাস করেও তাই পঞ্চপান্ডবের অতিথি সৎকারে কোন অসুবিধা সৃষ্টি হয়নি।
পুরাণের কাহিনী অনুসারে কৃষ্ণপুত্র শাম্ব অভিশপ্ত হয়ে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত হন। শাম্ব ভয়ঙ্কর ক্ষতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভের জন্য সূর্য আরাধনা করেন ও কুষ্ঠ রোগ থেকে নিরাময়ে লাভ করেন। এর ফলে সৃষ্টি হয় কোনারকের বিখ্যাত মন্দির।
মহাভারতের উল্লেখযোগ্য চরিত্র রাণী কুন্তীর পুত্র কর্ণের পিতা ছিলেন সূর্য। কর্ণ তাই কবজ কুন্ডল নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সূর্য দেবতা আমাদের প্রত্যক্ষ দেবতা, তাই সূর্য উপাসকের এক পৃথক গোষ্ঠী ভারতে গড়ে উঠেছে। ব্রতকথা ও সূর্যমূর্তি তারই নিদর্শন বহন করে।
বঙ্গদেশে যেসব প্রাচীন মূর্তি এপর্যন্ত পাওয়া গেছে তার মধ্যে ভগবান বিষ্ণু, বুদ্ধ ও সূর্যের মূর্তি অধিক। এখান থেকে বোঝা যায় বৌদ্ধ বৈষ্ণব এবং সূর্যের আরাধনার যুগে ভারতের শিল্পকলার নৈপুণ্য বিস্তার লাভ করেছিল। বাংলার গৃহপ্রাঙ্গনে যে ব্রতগুলি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, তার মধ্যে সূর্যব্রত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রত। কারণ আমাদের তিথি নক্ষত্রের উৎপত্তি ও বিস্তার এই প্রত্যক্ষ দেবতা সূর্যকে ঘিরেই।
সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর পরিভ্রমন ছয়টি ঋতু ও দ্বাদশ মাস ধরে। পুরানে ভগবান ভাস্করের দ্বাদশমূর্তির উল্লেখ করা হয়েছে। এটাই দ্বাদশাদিত্য নামে খ্যাত। দ্বাদশাদিত্য অনুসারে এই দ্বাদশ মাসের প্রত্যেকটিতে সূর্যের রূপ পৃথক পৃথকভাবে কল্পনা করা হয়েছে। গীতার একাদশ অধ্যায় ভগবান কৃষ্ণ সূর্যকে নিজের আরেকটি রূপ বলে বর্ণনা দিয়েছেন। মৎস্য, ভবিষ্য, মার্কণ্ডেয় ইত্যাদি পুরাণে সূর্যের উদ্ভবের বিভিন্ন কাহিনী বর্ণনা করা রয়েছে। কূর্মপুরাণে একটি বহু প্রচলিত কাহিনী আছে।
ত্বষ্টা বা বিশ্বকর্মার কন্যা সংজ্ঞা ছিলেন সূর্যের পত্নী। সংজ্ঞা সূর্যের সহ্য করতে না পারায় তার অনুরোধে পিতা ত্বষ্টা আদিত্যকে দ্বাদশটি খন্ডে বিভাজিত করে ফেলেন। এই খন্ডিত সূর্যের এক একটি দ্বাদশ মাস ধরে উদিত হন।
সূর্যদেব মাঘ মাসে বরুন, ফাল্গুন মাসে পুষা, চৈত্র মাসে ঈশ, বৈশাখ মাসে ধাতা, জ্যৈষ্ঠে ইন্দ্র, আষাঢ়ে সবিতা, শ্রাবণে বিবস্বান, ভাদ্রে ভগ, আশ্বিনে ত্বষ্টা, কার্তিকে ভাস্কর, অগ্রহায়ণে মিত্র, পৌষে বিষ্ণু।(পুরান অনুযায়ী নাম পরিবর্তিত হয়।)
পুরানে আরেকটি গল্পে বলা হয়েছে সংজ্ঞার গর্ভে সূর্যের প্রথম পুত্র বৈবস্বত মনু, তারপরে যম, শেষে একটি কন্যা যমুনা জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সূর্যের তেজ সংজ্ঞা সহ্য করতে পারতেন না, তাই সর্বদা দূরত্ব বজায় রাখতেন। কিন্তু কিভাবে দিন কাটাবেন, সংসার করবেন, কিভাবে বা সূর্য দেবতাকে তার সমস্যার কথা বলবেন! তিনি একদিন ভাবতে ভাবতে স্থির করলেন, অবিকল নিজের মত দেখতে এক নারী সৃষ্টি করে রেখে যাবেন সূর্যের কাছে। নাম দিলেন ছায়া। ছায়াকে বললেন — ‘তুমি সূর্যের স্ত্রী হয়ে থাকবে। তোমার পরিচয় কখনও কাউকে বলবে না’। সূর্য তাকে দেখে আর সন্দেহ করবেন না।
এরপর সংজ্ঞা বাপের বাড়িতে বাবা বিশ্বকর্মার কাছে চলে যান এবং সমস্ত সমস্যার কথা বললেন। কন্যার কথা শুনে বিশ্বকর্মা প্রথমে রেগে গেলেন এবং ভৎসনা করলেন। বিশ্বকর্মা তাকে বরের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য বললেন।
সংজ্ঞা চিন্তা করলেন, নারী জন্মই বৃথা! প্রথম জীবনে পিতার আশ্রিত, দ্বিতীয় জীবনে স্বামীর আশ্রিত, আর তৃতীয় জীবনে পুত্রের আশ্রিত হতে হয়। স্বামীর কাছে ফেরত গেলে তিনি ধরা পড়ে যাবেন আর পিতার কাছে রোজ ভৎসনা শুনতে হবে। অতএব সংজ্ঞা ঠিক করলেন, সর্বলোকের অজ্ঞানতা দূর করতে তিনি উত্তর মেরুতে গিয়ে লতাপাতা খেয়ে কঠোর তপস্যা করবেন।
এদিকে সূর্যেদেব ছায়াকেই পত্নী মনে করে সংসার করতে লাগলেন। ছায়ার গর্ভে পুত্র শনি ও তপতী নামে কন্যার সৃষ্টি হয়।
এখন ছায়া সংজ্ঞার তিন ছেলে মেয়ে ও নিজের তিন ছেলে মেয়ে মোট ছয় জনকেই দেখাশোনা করছেন। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই নিজের সন্তানদের বেশি স্নেহ করেন। বৈবস্বত মায়ের আচরণ সহ্য করে নিতেন।
কিন্তু যম, খাদ্য সামগ্রী, অলংকারাদি আর লালন পালনাদি ব্যাপারে উত্তম শনি ও তপতীর প্রতি মায়ের বেশ অনুরাগ দেখে সহ্য করতে না পেরে বাল্যাবস্থায় ক্রোধবশে পা তুলে মায়ের প্রতি তর্জন করতে থাকেন।
তখন ছায়া যমকে শাপ দেয়, ওহে তুমি আমাকে আঘাত করবার জন্য যে পা তুলেছিলে, সেই পা তোমার খসে পড়বে।
শাপ শুনে যমের ভয় হল। ছুটে গেলেন বাবার কাছে, বললেন — বাবা মা আমাকে শাপ দিয়েছেন, মা তো সব ছেলেমেয়েকে সমান চোখে দেখবেন। কিন্তু তিনি তা না করে উত্তম শনি ও তপতীর প্রতি বেশি স্নেহ দেখান। তাই আমি রেগে গিয়ে পা তুলেছিলাম, পদাঘাত করিনি। তাতেই মা শাপ দিলেন। বাবা মায়ের শাপে আমার পা যাতে খসে না পড়ে ব্যবস্থা করুন।
সূর্য বললেন, ছেলে অপরাধ করলেও মা কখনো পুত্রকে শাপ দেন না। আমার মনে হয় তিনি যে তোমাকে শাপ দিয়েছেন, নিশ্চয় তার কোন কারণ থাকবে। কৃমিতে দংশন করবে তোমার ওই পায়ে। সে জন্য পুঁজ হবে।
এরপর সূর্যের সন্দেহ হয় এবং ধ্যানযোগে সমস্ত কিছু জানতে পারেন। ছায়াকে জিজ্ঞাসা করলে ছায়ার সমস্ত সত্যি কথা বলে ফলে সূর্য তাকে আর অভিশাপ দিলেন না। এরপর সংজ্ঞার সঙ্গে দেখা করতে সূর্য বিশ্বকর্মার কাছে যান এবং জানতে পারেন উত্তর মেরুতে সংজ্ঞা অশ্বিনী রূপে তপস্যা করছেন। বিশ্বকর্মা বলেন সংজ্ঞা সূর্যের তেজ সহ্য করতে পারছেন না তাই এই পদক্ষেপ পরে সূর্যের অনুমতি নিয়ে বিশ্বকর্মা সূর্যকে বুকে চেপে ধরেন এবং তার তেজ কমে যায়।
সূর্য উত্তর কুমেরুতে গিয়ে তপস্যারত এক ঘোটকীকে দেখতে পেলেন। সংজ্ঞাই ঘোটকী তা চিনতে পারলেন সূর্য, তখন তিনি এক সুন্দর ঘোটকের রূপ ধরে তার সঙ্গে সুখে সঙ্গম করলেন। অশ্বিনীরূপিণী সংজ্ঞা পরপুরুষের সঙ্গে মিলন জনিত পাপের আশঙ্কায় যেই সূর্যবীর্য নাসার দ্বারা বমন করলেন। তাতে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের জন্ম হল। পরে এই অশ্বিনীকুমার দুজন স্বর্গবৈদ্য রূপে খ্যাতি লাভ করেন।
সংজ্ঞাকে তার নিজস্ব রূপে দেখতে পেয়ে সূর্য তখন আপন রূপে প্রকাশিত হলেন। সংজ্ঞা তখন সূর্যের কমনীয় রূপ দেখে আনন্দিত হলেন।
সূর্যব্রত পালন করতে, শুক্লা সপ্তমীর সকালে সূর্যোদয়ের আগে কোন নদী বা জলাশয় স্নান করে সূর্যদেবকে অর্ঘ্য প্রদান করুন। নিবেদন করা হয় নানারকম ফল-মিষ্টি এবং অন্যান্য দ্রব্য। ব্রতিরা এদিন উপবাস করেন এবং সারাদিন ফলমূল খেয়েও কাটান। এই দিনের লবণ একদম খাওয়া চলে না। উপবাসের দিন চন্দনের মালা অথবা রুদ্রাক্ষ নিয়ে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা খুব শুভ। অষ্টমীর দিন সকালে সূর্য অর্ঘ্য দিয়ে উপবাস ভাঙতে হয়। এই ব্রতের অন্যতম অঙ্গ সূর্যস্নান। বলা হয়, এই দিনে দীর্ঘক্ষণ সূর্যরশ্মি ও তাপ গায়ে লাগানো অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। এতে শরীর ও মন হয় পরিশুদ্ধ। শাস্ত্রমতে, মিত্রসপ্তমী ব্রত করলে সম্পদ ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়। পুরাণে ষোড়শপচারে সূর্য পূজা করার নিয়ম রয়েছে।
বিজ্ঞান বলে যে সূর্যের অতিবেগুনী বি (UVB) রশ্মি ত্বকের সংস্পর্শে এলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। ত্বকের নিচে থাকা 7-DHC নামক একটি যৌগ এই অতিবেগুনী রশ্মির সাহায্যে ভিটামিন ডি-৩ তে রূপান্তরিত হয়, যা আমাদের শরীরের জন্য অপরিহার্য। এখনতো ভিটামিন ডি-এর অভাব পূরণ করবার জন্য আমরা ক্যাপসুল খেয়ে থাকি অথচ প্রাকৃতিক উপায়ে সূর্য দেবতাই আমাদের ভিটামিন ডি প্রদান করেন।
মানবদেহে ভিটামিন ডি-এর প্রধান কাজ হলো ক্যালসিয়াম এবং ফসফেট শোষণে সাহায্য করা, যা হাড়, দাঁত ও পেশী সুস্থ রাখে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষায় এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিটামিন ডি-এর অভাবে শিশুদের রিকেটস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের অস্টিওম্যালাসিয়া (হাড়ের ব্যথা) ও অস্টিওপরোসিসের (হাড় ভঙ্গুর হওয়া) মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সূর্যের আলোর সংস্পর্শে ত্বক প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি করে। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত সূর্যের তাপ নেওয়ার আদর্শ সময়। ভিটামিন ডি শরীরে সবচেয়ে বেশি যায় কোমরের অংশ থেকে। তাই সূর্যের দিকে ঘুরে দাঁড়ালে কোমরে অনেক অংশেই রোদ পাবে। প্রত্যেকদিন নিয়ম করে অন্তত ১৫ মিনিট সূর্যের তাপে থাকলে ভিটামিন ডি সংশ্লেষ হবে দেহে।
হিন্দুশাস্ত্র কিন্তু বহুশত বছর আগেই এমন একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সূর্যস্নানের বিধান দিয়েছে মানব কল্যাণে। তাই নিজেদের কল্যাণের জন্য ব্রতগুলো পালন করলে ক্ষতি নয় বরং উপকারই পাওয়া যায়।
কলিযুগে নামসংকীর্তন বা ভগবানের নামের জপই ধর্ম পালনের সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়। ভগবান সূর্যনারায়ণের আরাধনা মন্ত্র হলো–
ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম।
ধান্তারীং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।।
অর্থ : জবাপুষ্পের ন্যায় লাল, কশ্যপের পুত্র, মহাদ্যুতিসম্পন্ন, অন্ধকার দূরকারী ও সকল পাপনাশক দিবাকরকে প্রণাম করি।
অর্ঘ্য নিবেদনের মন্ত্র (সূর্য গায়ত্রী)
ওঁ আদিত্যয় বিদ্মহে মার্তান্ডায় ধীমাহি তানঃ সূর্যঃ প্রচোদ্যাৎ।
অর্থ : আমি সহস্র রশ্মি সহ সূর্য দেবতার ধ্যান করি। সূর্যদেব আমার বুদ্ধিকে আলোকিত করুন।
Bah,sundor.onek kichu janlam
থ্যাংক ইউ
অসাধারণ পৌরাণিক পেক্ষাপটে লেখা একটি অসামান্য লেখনী।