শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:০৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ডাকাতে কালী — বেলাড়ি’র বড়মা : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ৫৭৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

বর্ধমান থেকে বোলপুর। মাঝে এক স্টেশন বনপাশ। পাশেই বেলাড়ি গ্রাম। থানা আউশগ্রাম। এ গ্রামের মুখার্জি পাড়ায় আছেন এক মা কালী। গ্রামের লোকের বড়মা। পূজায় খুব ধুমধাম। কিন্ত আশ্চর্য! দেবীর পূজার সময় আলাদা। রাত্রি পেরিয়ে তবেই পূজা শুরু। কেন এ নিয়ম! ডোম ডাকাতের পূজা কেন করেন মুখার্জিরা! কি করে তিনি হলেন গ্রামের বড়মা! সে এক আশ্চর্য কাহিনী।

বাংলা জুড়ে আছে অনেক ডাকাত কালী। শুধু ডাকাত নয় সব ঠক প্রতারকদের আরাধ্যা দেবী ছিলেন করালবদনা কালী। সেই ডাকাতরা আজ নেই। কিন্ত তাদের দেবীরা আছেন। স্মৃতি হয়ে আছেন বাংলার বিভীষিকাময় এক অধ্যায়ের। রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাত, চিতু ডাকাত, মনোহর ডাকাত, কত ডাকাতের নাম! গর্দানমারি মাঠ, জামাইমারি মোড়, ডাকাতে খাল, রাস্তা, গ্রাম আছে সেই অধ্যায়ের স্মৃতি হয়ে।

এক সময়ে এই বাংলার রাত্রি ছিল বিভীষিকার। মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখত অন্ধকার ভেদ করে ছুটে আসছে ওরা হো হো করে। হাতে হাতে মশাল লাঠি শানিত অস্ত্র। ভূতের মত মুখ। সম্পন্ন গৃহস্থের রাত কাটে চোরা কুঠুরির গোপন অন্ধকারে। জমিদার মহাজনরা পাইক বরকন্দাজ পুষতেন। তবুও ওরা আসত। নামী ডাকাত দল পত্র প্রেরণ করে সৌজন্য প্রদর্শন করত গৃহস্থকে। অভিজাত ডাকাত দলের সর্দার আসত পাল্কী চড়ে। কোন দল যেত ঘোড়া ছুটিয়ে, কোন দল বজরা সাজিয়ে যেত। রনপা চড়ে সহজেই দূর দুরান্তে যেত ডাকাতের দল। গ্রামের লোক সাধ্য মত বাধা দেওয়ার চেষ্টা করত। বেধে যেত লাঠালাঠি। এজন্য গ্রামে অস্ত্র শিক্ষার আসর ছিল। আমাদের বাড়িতে এক বার ডাকাত এসেছিল। আশপাশের গ্রামের লোক লাঠিশোটা নিয়ে ছুটে এসেছিল আমাদের বাঁচাতে। তার পর বোমা বন্দুক এল। শুরু হল দিনে ডাকাতি। এখন তো সাইবার ডাকাতির যুগ। শিক্ষিতরা ঘরে বসেই দেশ বিদেশের ব্যাঙ্ক আ্যকাউন্টের টাকা লুঠ করছে। ঝাড়খণ্ডের জামতাড়া গ্যাং-এর নাম কে না শুনেছে!

কবে কোন যুগে ডাকাতির শুরু কেউ জানে না। ‘জোর যার মুলুক তার’, এই নীতি আদিম যুগের। এক গোষ্ঠী আর এক গোষ্ঠীর সম্পদ লুট করত। অসুররা যেত স্বর্গে ডাকাতি করতে। বিদেশীরা প্রথম এসেছিল আমাদের দেশের ধনসম্পদ লুন্ঠন করতে। কিন্তু তাদের ডাকাত বলি না। ইতিহাসে তারা দিগবিজয়ী বীর। ধনীর ধন তো শোষনের, সেও একরকম ডাকাতি। তবুও তারা সমাজে গণ্যমান্য। আর চোর ডাকাতরা ঘৃণার পাত্র। কিন্ত কেন তারা ডাকাত হয়েছে কজন সে খবর রাখে! না খেয়ে কে মরতে চায়? চোখের সামনে কে দেখতে চায় ক্ষুধার্ত স্ত্রী পুত্রের মুখ? তাই সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল কিছু মানুষ। বেছে নিয়েছিল প্রতারণার পথ। এক সময় চোর ছ্যাচোর ঠ্যাঙারে ফাঁসুড়ে ভাগিনা’য় ভরা ছিল দেশ। ঠগীরা শিকারের জন্য মাইলের পর মাইল পথ হাঁটত। তাদের শিকার কাহিনী রোমহর্ষক। সেই সময় সন্ধ্যার আগেই মানুষ আশ্রয় নিত সরাইখানায় কিংবা গ্রামের গৃহস্থের বাড়ি। সেখানেও নিরাপত্তা ছিল না জীবন। সাহিত্যিক বিভূতিভূষনের এক গল্পে পড়েছিলাম এক গৃহস্থ ঠকের গল্প। বাংলা সাহিত্যে এমন গল্প অনেক আছে।

এ দেশে ধনীরাও চুরি ডাকাতিকে ঘৃণা করেননি। কেউ সরাসরি সামাল দিতেন চোরাই মাল। বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের ডাকাত দল ছিল। তারা একবার ধনরত্ন ভেবে বৃন্দাবন থেকে শ্রীজীব গোস্বামীর পাঠানো বৈষ্ণব পুঁথির গাড়ি লুঠ করছিল। শ্রীনিবাস আচার্য সেই পুঁথি উদ্ধার করে মল্লরাজ বীর হাম্বীরকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেন। মুর্শিদাবাদের দেবী সিংহ ছিলেন কুখ্যাত ডাকাত। এই বাংলায় ডাকাত প্রতারকদের স্বর্ণ যুগ ছিল মধ্য যুগের শেষ পর্বে।

মুঘল শাসন তখন অস্তাচলে। বাংলার মসনদে নবাব আলিবর্দি। ১৭৪২ সালে হানা দিল বর্গীর দল। তাদের অত্যাচারে ছারখার হল বাংলা। ব্যাবসা বাণিজ্য কৃষিকাজ বন্ধ। ভেঙে পড়ল বাংলার অর্থনীতি। অনেক ধনী লোক ফকির হল। তার পর পলাশীর যুদ্ধ। শুরু ইংরেজের লুন্ঠন। ঘনঘন যুদ্ধের বোঝা চাপল কৃষকের কাঁধে। ইংরেজের রাজস্ব আদায়ের ভার রেজা খাঁ, সিতাব রায়, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের মত কুখ্যাত নায়েব দেওয়ানের হাতে। তাদের সঙ্গ দিচ্ছেন কান্ত নন্দী, নবকৃষ্ণ মুন্সীর মত অসংখ্য জমিদার জোতদার। এই হাহাকারের মধ্যেই শুরু হল ছিয়াত্তরের মন্মন্তর। পর পর তিন বছর অনাবৃষ্টি। না খেয়ে বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গেল। তবুও ইংরেজ তার পাওনা উশুল করতে ছাড়ল না। নিরুপায় মানুষ চুরি ডাকাতি শুরু করল। অনেক ধনী, জমিদার গৃহস্থ নাম লেখাল চোর ডাকাতের দলে। শাসক ইংরেজের অরাজকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন একদল মানুষ। ইংরেজ তাদের ডাকাত বলে দেগে দিল। সেই বিখ্যাত ডাকাতদের অন্যতম হলেন ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, মজনু ফকির। তারা অত্যাচারীর ধন সম্পদ লুন্ঠন করে বিতরণ করতেন গরীব অসহায় মানুষদের। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীদেরও অর্থের জন্য ডাকাতি করতে হয়েছে। তখন মানুষ তাদের স্বদেশী ডাকাত বলে জানত।

এক সময়ে পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম এলাকাও ছিল চোর ডাকাতের স্বর্গ রাজ্য। চারদিকে ঘন বন জঙ্গল। তার চিহ্ন এখনও আছে ইতিউতি। এখানেই চান্না গ্রামে থাকতেন প্রখ্যাত কালী সাধক কমলাকান্ত। এক রাতে পড়লেন ডাকাতের হাতে। ডাকাতরা কালী পুজোর বলি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। সাক্ষাত মৃত্যু সম্মুখেই। মৃত্যু ভয়হীন সাধক ডাকাতদের কাছে একটু সময় চাইলেন শেষ বারের মতো তার আরাধ্যা মা’কে ডাকার জন্য। ডাকাতরা রাজি হল। মৃত্যু কালে সাধক কমলাকান্ত গাইলেন, —

“তিলেক দাঁড়াহ ওরে শমন

বদন ভরে মাকে ডাকিরে।

আমার বিপদ কালে ব্রহ্মময়ী আসেন

কি না আসেন দেখিরে

লয়ে যাবি সঙ্গে যাব

তার একটা ভাবনা কিরে,

তবে তারা নামের কবচ মালা

বৃথা আমি গলায় রাখিরে॥”

তার পর কি হয়েছিল সবাই জানেন নিশ্চয়ই। স্বয়ং মা কালীই নাকি তাকে রক্ষা করেন। ডাকাত সর্দার বলি দিতে গিয়ে দেখে হাড়ি কাঠে মাথা দিয়ে পড়ে আছেন মা কালী। ভীত সর্দ্দার পা জড়িয়ে ধরলেন সাধক কমলাকান্তের।

যাইহোক, বিপদের ভয় কার নেই? তাই ডাকাত প্রতারকরা কাজে বের হবার আগে কালী পুজো করত। বলি ছাড়া মা তুষ্ট হন না। আর নরবলিই শ্রেষ্ঠ। তাই ডাকাতরা সাধ্য মত চেষ্টা করত বাৎসরিক পূজায় মা’কে নররক্তের পূজা দিতে। এমন নরবলি দেওয়ার রীতি ছিল অনেক শক্তিপীঠে। ক্ষীরগ্রামে যোগাদ্যা পূজায় একদিন ‘ময়ূর নাচ’ বা ‘মোরনাচ’ হয় এখনও। এই ময়ূর বা মোর কথাটা বিকৃত। আসল কথা ‘মেরায়া’। কন্দ ভাষায় বলি প্রদানের নরকে মেরায়া বলা হত। বলি সেই আদিম সংস্কৃতি। বলির আগে মেরায়া’কে নিয়ে নৃত্য করত কন্দরা। ক্ষীরগ্রামে যোগাদ্যা পূজায় নরবলির স্মৃতি হয়ে আছে ‘মেরায়া নৃত্য’।

এই আউশগ্রামের জঙ্গলে অনেক ডাকাত দল ছিল। বেলাড়ি গ্রামে ছিল ডোমেদের এক ডাকাত দল। তারাও কালী পুজো করত। তাদের বাৎসরিক পূজা শেষ হতে রাত পেরিয়ে যেতে। কিন্তু কেন! এ এক রহস্য। গ্রামের লোক বলেন পূজা উপাচার ডাকাতি করে আনতেই দেরী হত ওদের। আমার ধারণা ওরা মহাবলির নরের খোঁজে বের হত সন্ধ্যায়। কাজটা সহজ নয়। অত্যন্ত গোপনীয় ও ভয়ের। দূর দুরান্ত থেকে বলি সংগ্রহ করে ফিরতে কেটে যেত রাত। তার পর শুরু হত পূজা। এ ভাবেই চলছিল বেশ। তারপর হঠাৎই একদিন এই শক্তির সাধকরা হল ভক্তির অনুরাগী। ডাকাতি ছেড়ে দিল। সে এক আশ্চর্য কাহিনী।

বেলাড়ি গ্রামের পত্তন কবে কেউ জানে না। নামেও রহস্য। যাইহোক যখন গভীর জঙ্গল ছিল তখন এ সব গ্রাম ছিল আদিবাসীদের। পরে অন্য অনেক জাতিও বসবাস শুরু করে। তারা তন্ত্র মন্ত্রেই বিশ্বাসী ছিল। আশপাশের গ্রামে পূজা পার্বণে এখনও তার প্রভাব। তকীপুরের কালী পুজো বিখ্যাত, বিল্বগ্রামে দেখি বহু প্রাচীন শিব মন্দির। যাইহোক, তান্ত্রিকদের বিরোধিতায় মহাপ্রভূ চৈতন্যের অহিংস বৈষ্ণব মন্ত্র এখানে প্রবেশ করেনি বহুদিন। একদিন এলাকায় সেই মন্ত্র প্রচারে এলেন জনার্দন ঠাকুর। তিনিই হলেন গ্রামের মুখার্জি (হর্ষ) পরিবারের পূর্ব পুরুষ। তিনি তখন অকৃতদার, সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। তার নাম গানে মত্ত এলাকা। এক রাতে বেলাড়ি গ্রামে বসেছে হরিনাম কীর্তন বাসর। আসরে তখন ভাগবতের গভীর তত্ত্ব ব্যাখ্যায় বিভোর জনার্দন ঠাকুর। বিভোর শ্রোতারাও। মধ্য রাত। নিস্তব্ধ নিঝুম সব। হঠাৎই আঁধার ফুরে হাজির হল গ্রামের ডোম ডাকাতের দল। সামনে সর্দার। হাতে খর ধার খড়্গ। আঁতকে উঠল সবাই। কি চায় ওরা! এলাকায় জনার্দন ঠাকুরের শত্রু কম নয়। তারা শক্তির উপাসক। বৈষ্ণবের প্রেম ভক্তি তাদের অসহ্য। তারা জনার্দন ঠাকুরকে এলাকা ছাড়া করতে চায়। তবে তারাই কি পাঠিয়েছে ডাকাতদের! কি করবে ওরা! রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় সবাই। হঠাৎই ঠাকুরের পায়ে লুটিয়ে পড়ে ডাকাত সর্দার।

— আমার মেয়েটাকে রক্ষা করুন ঠাকুর।

সবাই অবাক! এ কি বলছে ডাকাত সর্দার! তার তো মেয়ে নেই!

জনার্দন বলেন, কোথায় তোমার মেয়ে, কি হয়েছে তার?

ডাকাত সর্দার উঠে দাঁড়াল। তারপর আঙুল তুলে ধরল যেখানে, সেখানে নামানো আছে একটা পাল্কী। তার ভিতর বসে সুন্দরী সালাঙ্কারা এক যুবতী কন্যা। সবাই উত্তেজিত কোথা থেকে ডাকাতি করে এনেছে হয়ত।

কিন্ত ডাকাত সর্দার শোনায় এক আশ্চর্য কাহিনী। কন্যাটিও সমর্থন করল সেই কথা।

কোন এক কুলীন ব্রাহ্মণের কন্যা সে। খুব দরিদ্র। ঘরে বিবাহ যোগ্যা কন্যা। কিন্ত পণের অর্থ নেই। এ দিকে সমাজে এক ঘরে করার হুমকি। বাধ্য হয়েই এক গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধকে হাতে পায়ে ধরে কন্যা উদ্ধারে রাজী করিয়েছিল বাবা। তার বিবাহ করতে আসার শক্তি সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়েই বাবা আজ বিবাহের জন্য পাত্র গৃহে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাকে। পথেই রাত্রি নামে। তার পরেই ডাকাত দেখে পাল্কী ফেলে সবাই পালিয়ে গেল। এখন আমি কলঙ্কিনী। কেউ আমাকে ঘরে তুলবে না। কোথা যাব আমি? তাই সর্দারের কন্যা হয়ে থাকতে চাই।

ডাকাত সর্দার বলে, ঠাকুর, আমরা গরীব। পেটের দায়ে ডাকাতি করি। কিন্ত কোন দিন স্ত্রী লোকের গায়ে হাত দিই না। আমরা যে মায়ের পূজারী। এখন বলুন ঠাকুর আমি কি করব? যে আমাকে বাপ বলে ডেকেছে, তাকে কি পথে ফেলে আসতে পারি? তাছাড়া আজ আমাদের জন্যই ওর সর্বনাশ হল। ও কি লগ্নভ্রষ্টা হবে? এই পাপ থেকে আপনি আমাদের উদ্ধার করুন।

হতবাক জনার্দন বলেন, কিন্ত আমি কি করব?

সর্দার বলল, ব্রাহ্মণের মেয়েকে আমি কি ঘরে তুলতে পারি?

— কিন্ত!

— আপনিও কুলীন ব্রাহ্মণ। আপনার পায়ে ওকে ঠাঁই দিন।

— আমি সন্ন্যাসী। আমার ঘর নেই। ওকে রাখব কোথা?

— আমরাই আপনার ঘর বেঁধে দেব। রাত শেষেই ও লগ্ন ভ্রষ্টা হবে। দয়া করুন ঠাকুর।

এবার সব ডাকাত জনার্দনের পায়ে ধরে কাঁদে। উপস্থিত জনতাও যোগ দিল তাদের সঙ্গে। এই গ্রামে ব্রাহ্মণ নেই। পূজা পার্বণ নেই। জনার্দনকে গ্রামে বেঁধে রাখতে চায় সবাই। জনতার চাপে এক সময় নত হলেন জনার্দন। এভাবেই নাকি মুখার্জি বংশের ভিত্তি পত্তন হয়েছিল বেলাড়ি গ্রামে।

(এই কাহিনী আমার শোনা। ঐ গ্রামে আমার মেয়ে মুগ্ধা পালের শশুর বাড়ি। বেলাড়ি স্টেশন বাজারে বেয়াই মশাই সুমিত পালের দোকানে মুখার্জি পরিবারের সদস্য আশীষ ও প্রকাশ বাবুর কাছে প্রথম শুনি ঐ মা কালীর কথা। তারপর প্রকাশ বাবুর দাদা জ্ঞান শঙ্কর মুখার্জির লেখা একটি বই’এ মুখার্জি বংশের পত্তন কথা পড়ে নিজের মত করে লিখেছি সেই কাহিনী। এ বিষয়ে ওনাদের কৃতজ্ঞতা জানাই)

যাইহোক এর পরেই ডাকাতি ছাড়ল ডোম ডাকাতের দল। কিন্ত কালী পুজো ছাড়েনি সর্দ্দার। প্রথামত পূজা চলেছে। আজ তার বংশের কেউ নেই। ডোম পাড়ার শেষ পুরুষ হটু ডোমের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সুমিত্রা দেবী হাল ধরেন পূজার। তার পর আর কেউ রইল না। হটু’র একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পূজা টলমল। এগিয়ে এলেন গ্রামের দিলীপ পাল। হাল ধরলেন মুখার্জি বংশের আশীসবাবু। যে ডোম বংশ তাদের এ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিল তাদের ভোলেন কি করে! ওনাদের পিছনে গ্রামবাসীরা। এই পূজা এখন সর্বজনীন। তবে পূজার রীতিনীতি বদল হয়নি। এখনও রাত্রি শেষে শুরু হয় পূজা। নররক্ত,ভয় অতীত। তিনি এখন ভক্তের মা। ভক্তির মা। তাই রাত্রি তার পিছনে। তিনি আজ গ্রামের বুড়িমা বা বড়মা। আর তার বরাভয় মাথায় নিয়ে পথ চলে বেলাড়ি গ্রাম।

চিত্র গ্রাহক : সৌভিক পাল


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “ডাকাতে কালী — বেলাড়ি’র বড়মা : সুব্রত দত্ত”

  1. Subrata Dutta says:

    ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই ‘পেজ ফোর’ ওয়েব ম্যাগাজিন’এর সম্পাদক ও সহযোগীদের আমার লেখাটি প্রকাশ করার জন্য।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন