আমাদের তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর মধ্যে একমাত্র কার্তিক ঠাকুরের নামে আখ্যাত হয়েছে হেমন্তের প্রথম মাসটি। আর কোনো দেবতার মুকুটে এমন খ্যাতির পালক জোটেনি। কৃত্তিকা নক্ষত্রে জন্মে বালা সুব্রহ্মণীয়মের (শিশু কার্তিক) ধাত্রী মায়েরা ছিলেন ছ’জন কৃত্তিকা নামের স্বর্গ নারী। শীতের আকাশের দক্ষিণপূর্ব কোণে এই কৃত্তিকা নক্ষত্রপুঞ্জের উজ্জ্বল উপস্থিতি।
মাত্র দু’দিন হল বার্থ ডে বয়ের জন্মদিন পালন করা হয়েছে। কালকে বিসর্জনের শোভাযাত্রায় তাঁর বড্ড খাটাখাটনি গেল। প্রায় সারারাত জগঝম্প বাজনা আর ঝিকিমিকি আলোর ঝলকানিতে দু-চোখের পাতা একটুও এক করতে পারেন নি। আমি লড়াই কার্তিক, বাবু কার্তিক, জামাই কার্তিক, রাজা কার্তিকের শহর চুঁচুড়ার মেয়ে। মেয়েবেলার সারল্যে নিশ্চয়ই কখনো না কখনো এই সুপুরুষটিকে নিশ্চয়ই মনে মনে পছন্দ করেছি! এইসব গোলমালের মধ্যে দুদিন বাদে যে তাকে মনে করলাম, সেজন্যে তিনি হয়তো আমাকে পাপ দেবেন না!

কার্তিক কুমারকে অনেকদিন অবধি জেনেছি, যে তিনিই হলেন স্বর্গের সবথেকে সুন্দর বিবাহযোগ্য, অবিবাহিত পুরুষ। ভুল ভাঙল ভেলোরের উঁচু পাহাড়ের অবস্থিত তীর্থগিরি মুরুগান মন্দিরে গিয়ে। সেই রঙচঙে বিশাল মন্দিরে সুব্রহ্মণ্যস্বামী বল্লী আর দেবসেনার পতি রূপে বিরাজমান। এ কেমন হল? পুরোহিত তিনবার জিভ কেটে, মাথা নেড়ে ভুল ভাঙালেন। দক্ষিণ ভারতে গণপতি বিবাহসূত্রে কোনো নারীর পতিত্ব গ্রহণ করেন নি। কিন্তু তাঁদের পরম আদরের মুরুগান, সুব্রহ্মণ্য, ষণ্মুখের দু-জন সুন্দরী পত্নী বিরাজমান!মনে পড়ল আমাদের কামারপাড়ার ষড়ানন তো একলা নন। দুই স্ত্রীকে কোলে নিয়ে বরাবর চুঁচুড়ায় বেড়াতে আসেন!

oppo_34
পন্ডিতেরা বলেন গজানন, মহাদেবের মত আদিতে তিনিও ছিলেন লৌকিক দেবতা। কালক্রমে সংস্কৃতায়নের পথ ধরে তিনি চলে আসেন উচ্চকোটি দেবতাদের খাসমহলে। কালিদাস তাঁর কুমারসম্ভব কাব্যে শিব পার্বতীর মিলন ঘটালেন এবং কার্তিকেয়র জন্মের আভাস দিলেন। আমরা তাঁকে মা দুর্গার সঙ্গে গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর ভাই বলে মামারবাড়ির আদর দিলাম। তাঁকে নিয়ে ছড়া কাটলাম। গণেশের সঙ্গে মাতৃভক্তির প্রতিযোগিতা নিয়ে মজার গল্প তৈরি হল। এসবই ‘দেবতারে প্রিয় করি’র জলজ্যান্ত মানুষী ভাবনা!

কার্তিক গণিকাদের পূজ্য, তিনি সেজেগুজে ময়ূরবাহন হয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়ান এমনটা মনে করা কিন্তু খুব অন্যায়। সর্বপ্রথম তিনি কিন্তু যুদ্ধ নায়ক। তাঁর জন্মই হয়েছিল তারকা সুরের অত্যাচার থেকে দেবস্থানকে রক্ষা করার জন্যে। তারকাসুরকে বধ করে তিনি তারকারি। প্রাচীন মন্দিরের মূর্তিতে তাঁর হাতে ধনু, শর, গদা, শঙ্খ, ত্রিশূল, পিনাক, অঙ্কুশ ইত্যাদি কত অস্ত্রশস্ত্র!

দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে দেখা যায় এই পার্বতী পুত্র কখনো ব্রহ্মার শিক্ষক রূপে, বিয়ের আসরে বর সেজে, নর্তক বেশে, বিদ্যার দেবতা জ্ঞানে প্রতিভাত। শিল্পীর কল্পনায়, রাজার আদেশে বা পুরোহিতের নির্দেশে তাঁর হাত এবং মস্তকের সংখ্যা কম বেশি হয়েছে। তিনি স্কন্দমাতা মতান্তরে দেবী ষষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই তিনি স্কন্দকুমার। তাঁর নামে একটি গোটা একটি পুরাণ, ‘স্কন্দপুরাণ’ রচিত হয়েছে। যার বিষয় কার্তিক লীলা। দক্ষিণভারতে কোথাও কোথাও সন্তানের কল্যাণে স্কন্দষষ্ঠী পালন করা হয়। তাই বোধহয় সেখানে সন্তান রূপে কার্তিককে কামনা করা হয়, বালা সুব্রহ্মমণীয়ম এত আদরের নাম।

রাজা মহারাজারাও যে কার্তিকের শৌর্য বীর্যের অনুরাগী ছিলেন, সে নিদর্শন দেখা যায় কুষাণ নরপতির মুদ্রায় (১০৬-৪২ খ্রীষ্টাব্দ)। গুপ্তসম্রাটদের স্কন্দ গুপ্ত, কুমার গুপ্ত নামকরণ হয়েছিল দেবসেনাপতির বীরত্বকে ভালোবেসে। গুপ্ত যুগের মুদ্রাতেও কার্তিকের অবস্থান ময়ূরবাহনরূপে।
বিশাখাপত্তনম্ শহরটিকে সমুদ্রের ঘূর্ণিঝড় থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিও বিশাখদেব বা কার্তিক। আজ পুরুষ দিবসে এমন রূপবান, গুণবান ঠাকুরটির আলোচনা করতে বেশ লাগল। তিনি ধাত্রী মায়েদের নামেই পরিচিত হয়েছেন। মাকে ভালো বেসেছেন। দুই স্ত্রীকে সমমর্যাদায় যুদ্ধে সহযাত্রী করেছেন। কখনো মেয়েদের অবমাননা করেছেন বলে শোনা যায়নি, তিনি সর্বদা আমাদের পাশে থাকুন।
নতুন আঙ্গিকে স্কন্দ বন্দনা ভালো লাগল।
তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।
অনেক নতুন তথ্য জানতে পারলাম। সাহাগঞ্জেও কার্তিক পুজো বিখ্যাত। তবে দুঃখের বিষয় আমার দেখা হয় নি।
খুব ভাল লাগল পড়ে। কার্তিক ঠাকুর নিয়ে বেশ লেখা।
সত্যিই বড় মনোজ্ঞ প্রতিবেদন! তথ্যে ঠাসা,পড়তেও মনোরম! খুব ভালো লাগলো।