শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:০৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাটোয়ার কার্তিক — উৎস সন্ধানে : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ৭৫৮ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫

লড়াই লড়াই আজ। লড়াই দেখতে দলে দলে লোক ছুটছে। পথে আলপথে লোকের লাইন। অনেক বছর আগের কথা। গ্রামে তখন মধ্য যুগ। কুঁড়ে ঘর, রাস্তায় এক হাঁটু কাদা। ঘুঁটঘুটে অন্ধকার রাত। বৈচিত্র্যহীন বিনোদনে দমবন্ধ জীবন। হাঁফ ছাড়তে মানুষ মাঝে মধ্যে কাটোয়া ছোটে। কখনও গঙ্গা স্নানের নামে, কখনও বাজার হাট করতে। বাস ট্রেন সিনেমা দেখে গ্রামে এসে গর্ব করে, গল্প করে। হাঁ করে শোনে সবাই শহরের গল্প। আমাদের দুর্গাগ্রাম থেকে কাটোয়া মোটে পাঁচ ক্রোশ পথ। তাও যাওয়া হয় না। কার্তিক লড়াই এলেই বাঁধ ভেঙে যায়। সেদিন দলে দলে ছুটত মানুষ। বছরের জমানো সম্বল খুঁটে বেঁধে, এক পোঁটলা মুড়ি নিয়ে ছুটত। কারো সঙ্গে বেটা বউ। দুপুর থেকেই কাটোয়া লোকারণ্য। নদীয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ থেকেও এসেছে মানুষ। সকাল থেকেই শুরু বিসর্জনের শোভাযাত্রা, বাহারী বাজনা। রাতে আলোর রোশনাই। কাটোয়ার কার্তিকের থাকা বিখ্যাত। নানান পৌরাণিক কাহিনী মাটির মূর্তি রূপে ধাপে ধাপে সজ্জিত। কোথাও রাম রাবনের যুদ্ধ, কোথাও কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণ। থাকার মধ্যমনি কার্তিক। কাটোয়ায় কত কেতার কার্তিক! ল্যাংটা কার্তিক, খোকা কার্তিক, সাহেব কার্তিক, ধুমো কার্তিক, সাত ভাই কার্তিক ইত্যাদি। পাড়ায় পাড়ায়, ক্লাবে ক্লাবে প্রতিযোগিতা বা লড়াই। আলো, বাজনা, প্যান্ডেল, জাকজমকের লড়াই। আপনজন, ঝঙ্কার, জনকল্যাণ সঙ্ঘ, জয়শ্রী সঙ্ঘ, ইত্যাদি কত ক্লাব, পাড়ারপূজা। এখন কাটোয়া ছাড়িয়ে গেছে লড়াই। থাকার বদলে এসেছে থিম। আগে এই প্রতিযোগিতা ছিল বাবুদের। অর্থ প্রতিপত্তির লড়াই। গ্রামের প্রবীন মানুষের মুখে শুনেছি, কাটোয়ার নিচু বাজারের সঙ্কীর্ন পথে একাধিক শোভাযাত্রা মুখোমুখি হলেই সংঘর্ষ বাঁধতো। কে আগে যাবে, কে পিছে, কার ঠাকুর আগে বিসর্জন হবে, কারণে অকারণে এক দলের সঙ্গে অন্য দলের লড়াই বেঁধে যেত। এজন্য লাঠিয়াল থাকত দলে, জোর প্রস্তুতিও থাকত। সেই লড়াই দেখতেই ভীড়। দর্শনার্থীদেরও লড়াই কম ছিল না। সঙ্কীর্ন পথে মদমত্ত মানুষের ঠেলাঠেলি মারামারি। চরম অব্যবস্থা বিশৃঙ্খলা। ছিনতাই, মহিলাদের শ্লীলতাহানি, খুনোখুনিও ঘটেছে অনেক। গ্রামের মানুষ দিশে হারা হয়ে ছুটত তখন। সঙ্গের লোক হারিয়ে যেত। কেউ আহত হত। সঙ্গী বা সঙ্গিনী হারিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরত অনেকেই। এ নিয়ে বেশ কিছু দিন মশগুল থাকত গ্রামের মানুষ।

বিগত শতকের সাতের দশক পর্যন্ত কার্তিক লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র ছিল কাটোয়ার নিচু বাজার বা বড় বাজার। কাটোয়া শহরের পত্তন ওখানেই। তার আগে কাটোয়া ছিল এক গঞ্জ ও বৈষ্ণব তীর্থ ক্ষেত্র। এখানেই নবদ্বীপের নিমাই কেশব ভারতীর কাছে দীক্ষিত হয়ে শ্রী চৈতন্য হন। নবাব মুর্শিদকুলি খান এখানে একটি ফৌজদারী চৌকি স্থাপন করেন ও এই গঞ্জের নাম দেন মুর্শিদপুর বা মুর্শিদগঞ্জ। তখনও বাণিজ্য কেন্দ্র হয়নি কাটোয়া। তখন দাঁইহাট বা ইন্দ্রানী নগর ছিল এই এলাকার প্রধান বানিজ্য কেন্দ্র। তার অনেক প্রমাণ আছে। ‘বারো হাট তের ঘাট, — এই নিয়ে দাঁইহাট’ প্রবাদ প্রমাণ করে দাঁইহাটের গুরুত্ব। বর্গী সেনাপতি ভাষ্কর পণ্ডিত দুর্গা পূজা করেছিলেন এখানেই। বর্ধমানের রাজাদের গঙ্গানিবাশ থেকে অন্তিম সংস্কারের স্থান ছিল এখানেই। অনেক প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান মিলেছে এখানে। কাটোয়ার সে গর্ব নেই। যখন বর্গী হামলা, অত্যাচার লুঠপাটে দাঁইহাট ছারখার হয়ে গেল। যখন দাঁইহাটের গা থেকে গঙ্গা সরে গেল অনেক দূরে, তখনই দাঁইহাটের স্থান নিল কাটোয়া। অজয়ের ওপারে শাঁখাই-এ নবাবের একটি দুর্গ থাকায় কাটোয়া বা মুর্শিদগঞ্জ ছিল অনেক নিরাপদ। বনিকরা এখানেই ঘাঁটি গাড়লো।

কাটোয়া থেকে লবণ বস্ত্র কৃষি ও নানান পণ্যের আদান প্রদান শুরু হল। ইংরেজ আমলে রেল লাইন এলো কাটোয়ায়। পাকা রাস্তা হল। মহকুমা শহর হল কাটোয়া। দ্রুত বৃদ্ধি হল জনপদ। পণ্যের কারবারীরা পাকা কোঠা গড়লেন গঙ্গার ধারে। এখনও সেই সব কোঠার কিছু চিহ্ন আছে। বনিক, বাবুদের স্ফূর্তির জন্য গড়ে উঠল গনিকালয়। নাচে গানে জমে উঠত রাতের আসর। দেশান্তরের বণিকরাও বিশ্রামের অবকাশে টাকা উড়িয়ে যেত এখানে।

নারীর চির কালের স্বপ্ন স্বামী সংসার সন্তান। গনিকারাও নারী। তাদের ব্যর্থ জীবনের স্বপ্ন জমা থাকত পরকালের জন্য। হিন্দু মেয়েদের চিরকালের কামনা শিবের মত বর আর কার্তিকের মত রূপবান বীর পুত্রের। শিশু কার্তিক ধরা দেবেন কোলে এই কামনা নিয়ে হয়ত গনিকারা কার্তিক পূজা শুরু করেছিল। তাই ছোট্ট শিশু বা খোকা বা ল্যাংটা কার্তিক ছিল তাদের আরাধ্য। গনিকাদের মন ভরাতে পূজার খরচ জোগাতেন বাবুরাই। সেখানেই আড়ম্বরের লড়াই ছিল। কাটোয়ার কার্তিক লড়াইয়ের শিঁকড নাকি এখানেই! পরবর্তী কালে যা ছড়িয়ে পড়েছিল কাটোয়ার পাড়া ও ক্লাবের পূজায়। এটাই জনপ্রিয় ধারণা।

কিন্তু কার্তিক পূজা কাটোয়া তথা বাংলায় শুরু হল কবে? এই নিয়ে পণ্ডিতদের তর্ক বিতর্কের শেষ নেই। বাংলার আদিম সমাজ ছিল প্রকৃতির উপাসক। গাছ পাথর নদী এমনকি পশু পক্ষীদেরও পূজা করত। বাংলার পৌরাণিক দেব দেবতা অধিকাংশই বহিরাগত। কিন্তু এখানে এলেন কি করে? অতীতে কখনও শাসক, কখনও বণিকদের হাত ধরে এক দেশের দেবতা ছড়িয়ে পড়েছিলেন অন্য দেশে। তার পর নানান ঘাত প্রতিঘাতে নিজের আসন পাকা করেছেন সেখানে। কাটোয়ার কার্তিকও হয়ত এসেছেন সেভাবেই। অন্তত আমার ধারনা তাই। কিন্তু কোন গুণে বাংলার বৃহত্তর সমাজ গ্রহণ করল তাকে? সে এক জটিল প্রশ্ন। নানা জনের নানান মতের মধ্যে উত্তর খুঁজেছি তার। গুণীজনের মন্তব্যে সমৃদ্ধ হোক এই আলোচনা।

গবেষকদের মতে শিব পুত্র গণেশের মতই স্কন্দ বা কার্তিকেয়’র উত্থান আর্যেত্তর কোন এক সমাজে। অর্থাত প্রথমে ছিলেন অবৈদিক দেবতা। তিনি ছিলেন কৃষি ও প্রজননের লোকায়ত দেবতা। কালক্রমে আর্যায়নের পথ ধরে তার ঠাঁই হল উচ্চ কোটির দেব মহলে। মহাভারত ও পুরাণে বর্ণিত কার্তিকের জন্ম বৃত্তান্তে তার প্রাথমিক চরিত্র যে লোকায়ত তা বোঝা যায়। হয়ত বা যুদ্ধের দেবতা ছিলেন তাই হলেন দেব সেনাপতি। যোদ্ধাদের প্রিয়পাত্র। আদিম সমাজের নারীরা তাই কি তার মত বীর পুত্রের কামনা করত? এখন মূলত বন্ধ্যা নারীরাই তার আরাধনা করেন আর গনিকারা। দক্ষিণে কুমারী নারীদের কাছে তিনি ব্রাত্য! কারণ তাকে প্রণাম করলে বিয়ে হয় না। মহারাষ্ট্রে কার্তিক পূজায় মেয়েদের অংশ গ্রহণ নৈব নৈব চ। মহীশূরের সন্দুরে কার্তিকের প্রাচীন মন্দিরে মেয়েদের প্রবেশ পর্যন্ত নিষিদ্ধ। তার উপর দৃষ্টিপাত করলে মেয়েদের সাত জনমের বৈধব্য নিশ্চিত। চির কুমারের এমনই কু দৃষ্টি! সম্ভবত দক্ষিণ ভারতেই প্রথম উদ্ভব তার। সেখানেই এখনও জনপ্রিয়তম দেবতা তিনি। অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটকে তিনি সুব্রহ্মণ্য, মুরুগান নামে পরিচিত। প্রাচীন কালে দক্ষিণের ইক্ষ্বাকু ও কদম্ব ও পরে গুপ্ত বংশীয় সম্রাটরা এই যুদ্ধ নিপুণ দেবতার পূজা করতেন। গুপ্ত শাসনের শেষ দিকে এই দেবতার আর্যীকরণ ঘটে। এই সময়েই সম্ভবত বঙ্গে আগমন তার। কিন্ত আনলো কারা?

বাংলার নদী তীরবর্তী শহর বা বানিজ্য কেন্দ্রের পূজা পার্বণে বিশেষ সমারোহ লক্ষ্য করা যায়। কার্তিক পূজায় বিশেষ সমারোহ হয় কাটোয়া, বেলডাঙা, অগ্রদ্বীপ, চুঁচুড়া, বাঁশবেড়িয়া, ব্যণ্ডেল, গুপ্তিপাড়া, হুগলি, ডায়মন্ডহারবার ইত্যাদি শহরে। এই সব পূজার বেশ কিছু যে বহিরাগত বনিকদের অবদান সন্দেহ নেই। অতীতে জলপথ স্থলপথে বণিকরা দূর দুরান্তে বাণিজ্য করতে যেতেন। পণ্য কেনা বেচার কাজে সেখানেই থাকতে হত দিনের পর দিন। সেখানেই নিজের ধর্মাচারন করতেন। পথের বিপদ বা বানিজ্যে সৌভাগ্য কামনায় তখন দেবতাই ছিলেন ভরসা। স্থানীয়রাও যোগ দিত তাদের পূজায়, শুনত সেই সব দেবতার মহিমা। তার পর তারাও সেই দেবতাকে নিজের বলে গ্রহণ করত। প্রাচীন যুগের রাজারা মাঝে মাঝেই দিগবিজয়ে বের হতেন। রাজ্য জয় করে সেখানে শাসন করতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের প্রতিনিধিরাই সেই অঞ্চল শাসন করতন। তারা নিজের ধর্ম ও বিশ্বাস অনুযায়ী চলতেন। অনেক সময়ই প্রজাদের ঘাড়ের উপর চাপাতেন সেই বিশ্বাস। ভয়ে হোক ভক্তিতে হোক প্রজারা গ্রহণ করত নতুন মত পথ। এভাবে অনেক দেব দেবতা, ধর্ম দেশ বিদেশে ছড়িয়েছে। যেমন ইসলাম, খ্রীষ্টান ধর্ম এদেশে এসেছিল এভাবেই। আবার হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ধর্ম ছড়িয়েছিল বিদেশে। মুরুগান এক দিন কার্তিকেয় রূপে এসেছিল এই বাংলায়। কিন্ত কবে, কি ভাবে তা জানার উপায় নেই। অষ্টম শতকে রচিত কহ্লনের রাজতরঙ্গিনীতে প্রথম পৌণ্ড্রবর্ধনে অবস্থিত একটি কার্তিকেয় মন্দিরের উল্লেখ আছে। ড. নীহাররঞ্জন রায় বাংলাদেশে দ্বাদশ শতাব্দীর ভাস্কর্যে ময়ূর বাহনের উপর মহারাজলীলায় উপবিষ্ট কার্তিকের একটি স্বতন্ত্র প্রতিমার কথা বলেছেন। এমন দু-একটি স্বতন্ত্র ভাস্কর্য বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বাংলাদেশের এখানে সেখানে নজরে পড়লেও খ্রীষ্ট পূর্ব আমলে কার্তিক পূজার প্রচলন এখানে যে ছিল না তা নিশ্চিত। অর্থাত এই পূজা প্রসারে শাসকদের তেমন ভূমিকা ছিল না বলেই মনে হয়।

বিশেষ এক তামিল সম্প্রদায়ের ইষ্ট দেবতা মুরুগান। ভারতের বাইরে যেখানেই তামিলরা বসবাস করেন সেখানেই এই পূজার প্রচলন এখনও দেখা যায়। যেমন শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মরিশাস ইত্যাদি। বানিজ্য সুত্রেই তামিলরা গেছেন সেখানে। বাংলার বনিকদের মতই তারাও দেশ বিদেশে বাণিজ্য করতেন। এই বণিকদের সুত্রেই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশে দেশে ভারতীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও উপনিবেশের প্রসার ঘটে।

এই বাংলার কার্তিক পূজাও কি দক্ষিণের বনিকদের অবদান!

গঙ্গা তীরবর্তী বানিজ্য কেন্দ্রিক শহর গুলিতে কার্তিক পূজার ধুমধাম দেখে তাই মনে হয়। বাংলার বণিকরাও এই পূজার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সপ্তদশ শতকে সপ্তগ্রামের কংসবণিক, সুবর্ণ বনিকরা বৈষ্ণব ধর্মের পাশাপাশি কার্তিক পূজার বিশেষ উদ্যোক্তা ছিলেন। বণিকদের গণিকা গৃহে গমন স্বাভাবিক ঘটনা। তাদের উৎসাহেই হয়ত গনিকারাও শুরু করে কার্তিক পূজা। গনিকাদের কার্তিক পূজার কারণ নিয়ে নানা মুনির নানান মত। তবে শিশু বা ছেলে কার্তিক পূজার আধিক্য দেখে মনে হয় পর জন্মে সন্তান কামনাই ছিল মূখ্য। যাইহোক, পূজার জাকজমক দেখে পরে তা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার গ্রামে গঞ্জে! বণিকদের দেখে অনেক বহিরাগত দেবতা বাংলার মান্যতা পেয়েছিল অতীতে। শিবও প্রথমে ছিলেন বনিকদের পূজ্য দক্ষিণী দেবতা। বাংলা মঙ্গলকাব্যে দেখি বণিকরাই ছিলেন সমাজের শিরোমনি। তাদের অনুগৃহীত ছিল নিম্ন বর্ণের মানুষ। শিরোমনিদের স্বীকৃতির মূল্য অসীম। পূজার জন্য দেবী মনসাকে তাই ছুটে আসতে হয়েছিল চাঁদ সওদাগরের কাছে।

এই বণিকদের হাত ধরেই কি বাংলার মাতৃ সাধনা গ্রহণ করেছে তন্ত্র মন্ত্র প্রদেশ! মধ্যযুগের নতুন নতুন শাস্ত্র পুরাণ, মঙ্গলকাব্যে নতুন পরিচয় পেয়েছিলেন দেবদেবীরা। যাই হোক, ভারতে হিন্দু ধর্মের বৈচিত্র্যের বিকাশে বনিকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বনিকদের সেই ভূমিকা আজ অন্ধকারে কিন্ত অতীত তার চারনের চিহ্ন রেখে যায় সময়ের বুকে। কাটোয়া তথা বাংলার কার্তিক লড়াই সেই চারণচিহ্ন সন্দেহ নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন