আব্বুর দেহান্তের পর আমিনুল্লা তৎপরতার সাথে দাফনের ব্যবস্থা করেছে। গ্ৰামের মাথাদের সাথে কথা বলে গ্ৰামের বাইরের নির্দিষ্ট গোরস্থানে জানজা না নিয়ে গিয়ে গ্ৰামেরই পশ্চিমদিকে সরকারী খাস জমির একপাশে আব্বুকে কবরস্থ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও। ওর ইচ্ছেতে সবাই সম্মতি জানিয়েছে। কারণ ওর আব্বুকে সবাই সম্মান করে, ভালোবাসে। তিনি এই এলাকার পীরসাহেব। ঠিক হয়েছে কিছুদিন পর তাঁর সমাধিস্থল ঘিরেই তৈরী হবে দরগা।
জানজায় কাঁধ দেয় পীরসাহেবের একমাত্র সন্তান আমিনুল্লা। বাড়ি থেকে বেরোতেই আমিনুল্লার মনে হয় কে যেন ওর কাঁধের ভারটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ওকে হাল্কা করে দিল। অথচ ও একইভাবে জানজার কোণাটা ধরে আছে। কানের কাছে নারীকন্ঠে হিসহিসে স্বর, “জানজা যাবে ঈদগাহের মাঠে।”
চমকে আশেপাশে তাকায় আমিনুল্লা। ভাবে, এই মিছিলে তো মহিলারা থাকে না। তবে?
আবারও সেই স্বর, “জানজা যাবে ঈদগাহে। কথাটা মনে রাখিস।’
আমিনুল্লা যেন ঘোরের মধ্যেই বলে ওঠে, “জানজা যাবে ঈদগাহে।”
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কিন্তু এক্ষেত্রে পীরসাহেবের সন্তানের কথাই শেষ কথা। তাই কেউ কিছু বলে না।
নীরবে মিছিল চলে ঈদগাহের মাঠে।
পৌঁছে সবাই অবাক। মাঠের পাশে যে বিশাল জারুল গাছটা রয়েছে, ঠিক তার নীচেই সুন্দর করে কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছে।
শুরু হয় পীরসাহেবকে কবরস্থ করার কাজ। কিন্তু কবরে নিয়মমাফিক মাটি দেওয়ার সময় বাধে বিপত্তি। আমিনুল্লা যতবারই দুহাতে মাটি নেয় কবরে দেওয়ার জন্য ততবারই তার হাত কেঁপে ছড়িয়ে পড়ে মাটি। ও অনুভব করে কোনও এক ছায়াশক্তি যেন ওর হাতের মাটি ফেলে দিচ্ছে। কানের কাছে হিসহিসিয়ে ওঠে সেই নারী কন্ঠ, “পুণ্যাত্মার কবরে তোর মাটি দেওয়ার কোনও হক নেই। সন্তান হলেও না। প্রাণে বাঁচতে চাস তো পালা এখুনি।”
ভয়ে, উত্তেজনায় প্রাণপনে দৌড় লাগায় আমিনুল্লা।
সবাই হতবাক। পীরসাহেবকে কবরস্থ করার কাজ শেষ করে ফিরে যায় সবাই।
***
সম্ভ্রান্ত গ্ৰাম তিরকি। যুগের পর যুগ ধরে হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বাস করে এখানে। একে অপরের ধর্মকে সম্মান করে। ভালোবাসায় ভরা এ গ্ৰাম।
গ্ৰামের শেষপ্রান্তে ঈদগাহ। ঈদের সময় আর বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে নামাজ পড়া হয়। পাশেই বাওড়। বাওড়ের জলে এখন আর জোয়ার ভাঁটা না খেললেও এর জলকে পবিত্র বলেই মনে করে স্থানীয় মানুষজন। নামাজ পড়ার আগে সবাই বাওড়ের জলে হাত-পা ধুয়ে এসে নামাজ পড়ে।
কোলে মাসছয়েকের শিশু সন্তান নিয়ে জাহিরা এখানে কোথা থেকে এসেছিল কেউ জানে না। ওর অবস্থা দেখে দয়াপরবশ হয়ে পীরসাহেব ঈদগাহের শেষপ্রান্তে ঘর বেঁধে থাকার অনুমতি দেন। পরিবর্তে জাহিরাকে ঈদগাহ পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু শর্ত দেন যে, পুরুষমানুষদের জমায়েতের সময় সে যেন সামনে না আসে। যে সময় এই জায়গা ফাঁকা থাকবে সেই সময়তেই ওকে ওর কাজ সারতে হবে। বিনিময়ে গ্ৰামের মানুষের তরফে প্রতিমাসের রেশন পৌঁছে যাবে জাহিরার কাছে।
দিন যায়। সাধারণত দুপুরবেলাটা জনশূন্য থাকে ঈদগাহ। এই সময়েই নিজের কাজ সারে জাহিরা। ওর ছেলে আজীবের বয়স এখন চার। দুরন্ত ছেলেকে সামাল দিতে দিতেই ও মন দেয় কাজে।
আজকাল মাঝেমধ্যেই পীরসাহেবের ছেলে আমিনুল্লা তার কয়েকজন সাকরেদ নিয়ে জাহিরার কাজের সময় উপস্থিত হয়।
ওদের দেখে প্রথম প্রথম জাহিরা কাজ ফেলে রেখে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ঝুপড়ির দিকে ছুট লাগাত।
একদিন ঝুপড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আমিনুল্লা বলে, “আমি তোমার কাজের তদারকি করতে আসি। ঠিকঠাক কাজ না হলে আব্বুকে বলে এখান থেকে তোমার বাস ওঠাবো। তাই ঘরের ভেতর না থেকে যাও তোমার নিজের কাজ কর।”
পীরসাহেবের ছেলের কথা জাহিরা অমান্য করতে পারে না। এদের কথার ধরন আর চাউনির সামনে কুন্ঠিত হলেও ওদের সামনেই আজকাল ওকে কাজ করতে হয়। নানারকম বিশ্রী ইঙ্গিত আসে।
কিন্তু ঠাঁইটুকু হারানোর ভয়ে ও চোখ কান বুজে নিজের কাজটুকু সেরেই ছেলেকে নিয়ে ঘরে ফিরে যায়।
সেদিনও নিজের মনে কাজ করছিল জাহিরা। আজীবও যেন একটু বেশিই দুষ্টুমি করছিল সেদিন।
জাহিরা যতবারই ঝাঁট দিয়ে শুকনো পাতা, নোংরা একজায়গায় জড়ো করে ততবারই আজীব সেগুলোকে চারদিকে ছড়িয়ে ফেলে আর নিজের গায়েও খানিক নোংরা মেখে হি হি করে হাসতে থাকে। অতিষ্ঠ জাহিরা বলে ওঠে, “হে মা কালী, আর যে পারি না!”
জাহিরা খেয়াল করেনি কখন আমিনুল্লা ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। কথাগুলো সবই ওর কানে গেছে।
আমিনুল্লা দিগবিদিক ভুলে চিৎকার করে ওঠে, “কাফের!” এক ঝটকায় জাহিরার হাত ধরে টেনে তুলে দাঁড় করায়।
বলে, “সত্যি করে বল্ তুই কে?”
ওর রোষের মুখে জাহিরা কাঁপতে থাকে।
আমিনুল্লা বলে, ঐ জারুল গাছে তোকে বেঁধে পাথর ছুঁড়ে মারা হবে। হাতেনাতে পাবি পরিচয় ভাঁড়ানোর ফল। সাকরেদরা ওর কথায় সায় দিলেও এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা পীরসাহেবকে জানানোর কথা বলে। একজন গিয়ে পীরসাহেবকে ডেকে নিয়ে আসে। এসব খবর হাওয়ার আগে দৌড়ায়। গ্ৰামের লোকজন জড়ো হয় ঈদগাহে।
পীরসাহেব আসতেই জাহিরা তাঁর পা জড়িয়ে ধরে। বল, “বাবা আমি মিথ্যা বলিনি। আমি মুসলমানের বিবি। মিঞা নতুন নিকাহ্ করে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। সেই থেকে আমি এখানে, আপনার আশ্রয়ে।”
–“তোর মুখ থেকে যা বেরিয়েছে তা কোনও সাচ্চা মুসলমানীর জিভে সরে না। তাহলে তুই কথাগুলো বললি কি করে?” রাগে ফেটে পড়ে আমিনুল্লা।
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে জাহিরা। তারপর পীরসাহেবকে বলে, “বাবা আমার জন্ম হিঁদুর ঘরে হলেও আমি ভালোবেসে মুসলমানের সাথে শাদী করেছিলাম।”
পীরসাহেব ছেলেকে বলেন, “দেখ আমিনুল্লা, ভুল তো মানুষমাত্রেই করে। তাই বলে নিষ্ঠুরভাবে কারও জান নিলে খোদাতালা মাফ করেন না। গুণাহ্ হয়।”
আব্বুর কথা মানতে পারে না আমিনুল্লা। বলে, “তাই বলে এমন অন্যায় তো মেনে নেওয়া যায় না। আব্বু, শাস্তি ওকে পেতেই হবে। ঠিক আছে, ওই গাছের নীচে দাঁড়িয়ে পঞ্চাশ ঘা বেতের বাড়ি ওর জন্যে বরাদ্দ হল।”
আমিনুল্লাকে সমর্থন করে উপস্থিত জনতা হইহই করে ওঠে।
সমবেত মানুষজনকে শান্ত করতে না পেরে পীরসাহেব আর কথা না বাড়িয়ে ঈদগাহ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
পঞ্চাশ ঘা বেতের বাড়ি খেয়ে জাহিরা টলতে টলতে বাওড়ের জলে নেমে যায়। আর ওঠে না।
এরপর পীরসাহেবও আর কখনো এই ঈদগাহে পা রাখেননি।
এই ঘটনার পর যতবার এখানে সমাবেশ হয়েছে ততবারই সবার মনে হয়েছে কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিসিয়ে বলছে, “এখানে চাদ্দিকে পাপ! পাপ নিয়ে ঘরে ফেরো।”
ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায় এই স্থান। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পরিচ্ছন্ন থাকে, কোথাও এতটুকু ময়লা জমে না।
অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। পীরসাহেবের সমাধি ঘিরে গড়ে উঠেছে দরগা। দূরদূরান্তের মানুষ ছুটে আসে মনের বাসনা নিয়ে। মানত করে ঢিল বেঁধে যায়। মানত পূরণ হলে আবার আসে ঢিল খুলতে।
দিনমানে মানুষজনের যাতায়াত থাকলেও সূর্য ডুবলেই এটা যেন আলাদা একটা জগৎ। এখানে পা রাখলেই মনে হয় কেউ যেন পাশে রয়েছে। শোনা যায় ছায়াস্বর, “জানে বাঁচাতে চাও তো তফাৎ যাও।”
***
তারাদাস বাউলের বয়স হয়েছে। এখন মাধুকরী বৃত্তি আর ভালো লাগে না। কিছুদিন আগেও মনে হত কোথাও একটু থিতু হয়ে বাকি জীবনটা প্রাণের গৌর-নিতাইয়ের পায়ে সঁপে দিতে পারলেই জীবন সার্থক। কিন্তু ইদানীং যেন সবকিছু গোলমাল হয়ে যাচ্ছে তারাদাসের। বারবার মনে হয় যে কৃষ্ণ সেই তো কালী, প্রভেদ তো নেই। তাহলে অমন রাজরাজেশ্বরীর পদতলে পড়ে থাকতে বাধা কোথায়! পথের মধ্যে কালী মন্দির দেখলেই আজকাল সেখানে ঢুকে পড়ে। মনে মনে আওড়ায় দশমহাবিদ্যার নাম।
আজ ঘুরতে ঘুরতে বহুবছর পর এক চেনা জায়গায় এসেছে তারাদাস। অনেকদিন পর মনটা আজ ভারি খুশি। এখানেই তো পেয়েছিল তার কানাইকে। চাষের মাঠে আলের ওপর বসে পড়ে তারাদাস। অনেকদিন পর একতারা বাজিয়ে গান ধরে, “আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।”
গান করতে করতে গলা ধরে আসে। চোখের কোল ভিজে ওঠে। ভাবে, কে জানে কোথায় কেমনভাবে আছে আমার কানাই!”
মনে মনে বলে, “মা তারা, তুমি দেখে রেখ আমার কানাইকে।”
ঘুরতে ঘুরতে আসে তিরকি গ্ৰামের ঈদগাহে। চারদিকের নিস্তব্ধতা মনকে প্রসন্ন করে তোলে। গিয়ে বসে পীরসাহেবের দরগায়। পথের শ্রান্তি আর মাঠ জুড়ে ঘুরপাক খাওয়া বাউল বাতাসে দেহ যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে। দুচোখ ভারী হয়ে আসে তারাদাসের। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে এক ভীষণা কালী মূর্তির। কিন্তু সে রূপ যতই ভয়ঙ্করী হোক না কেন তার দুচোখ থেকে যেন স্নেহসুধা ঝরছে। মা যেন দুহাত বাড়িয়েছে। এক অমৃত কন্ঠস্বর বাজে তারাদাসের কানে,
“আমি তো এখানেই আছি। আমার সেবা করবি না?”
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে তারাদাস।
— এ কী দেখলাম!
— এ কী শুনলাম!
চারদিকে নিশুতি অন্ধকার।
আঁধার ভেদ করে একটা পুরুষ কন্ঠ আর একটা নারীকন্ঠের কথোপকথন ভেসে আসছে।
কান খাড়া করে তারাদাস।
— এলি বাপ?
— তোমার কি ভয়ডর নেই বুড়িমা?
— ধুস্।
— রোজ এত রাতে চান করো, তোমার ঠাণ্ডা লাগে না?
— আমার কিছু হবে না রে। তুই ভালো থাক বাপ।
— আমার জন্য তোমার এত চিন্তা কিসের?
— ওই যে তোকে বাপ বলিচি।
— হুঁ, সেইজন্য আমিও তো তোমাকে মা বলেই ডেকে ফেললাম।
বেশ হয়েছে আমাদের এই মা ছেলের সম্পর্ক। অন্ধকারে কেউ কাউকে ভালো করে দেখতে পর্যন্ত পাই না। আবার দিনের বেলা এলেও তোমার দেখা পাই না। কোথায় যে থাক!
— এই ভালো রে বাপ। নিরিবিলিতে মায়ে-পোয়ে গপ্পো করি।
তারাদাস আর কিছু শুনতে পায় না। থম্ মেরে বসে থাকে।
বুড়িমা বলে — জানিস বাপ, আজ এখানে আরও একজন এসেছে। ওই দেখ আসছে। যাই আমি চানে যাই।
বুড়িমা চলে যায় বাওড়ের দিকে।
***
অটোটা রোজ রাতে কানাই এখানেই রেখে যায়। বুড়িমার সাথে রোজ একই কথা হয়। তবুও বেশ ভালোই লাগে। এই অন্ধকারেও রাত জেগে কেউ তো অপেক্ষা করে ওর জন্যে। মনটা ভালো হয়ে যায়। যদিও বুড়িমাকে খুব ভালো করে এখনো দেখতে পায়নি ও। এত অন্ধকারে ঠিকমতো ঠাহর হয় না। মুখটা বোঝা যায় না। তবে মাথায় ঘোমটা দেওয়ার ধরনে মনে হয় মুসলিম পরিবারের বৌ।
অটোটা লক্ষ্য করে তারাদাস এগিয়ে এসে কানাডাকে দেখতে পায়। বলে, “বাবা, এই আঁধারে তো এক তুমি ছাড়া আর কাউকেই দেখছি না। আমি বড় বিপদে পড়েছি। কি যে করি, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
— কে তুমি?
তারাদাস বলে, “আমি বাউল মানুষ। এখানে নতুন এসেছি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙে গেল।
তারাদাস স্বপ্নের কথা বলে কানাইকে।
কানাই হো হো করে হেসে ফেলে।
বলে, “ঠাকুর, এটা ঈদগাহ ছিল। এখানে দরগা আছে। এখানে কালীমন্দির করার কথা পাগলেও ভাবে না ঠাকুর।
— হোক না মন্দির, ক্ষতি কি? তুই ওকে সাহায্য করিস বাপ। এবার আমি যাই।
নারীকন্ঠের আওয়াজে তারাদাস এদিক ওদিক তাকায় কিন্তু কাউকেই দেখতে পায় না।
ধীরে ধীরে গল্প জমে ওঠে ওদের দুজনের। কথায় কথায় তারাদাস জানতে পারে যে কানাইয়ের তিনকূলে কেউ নেই। ছোট থেকেই এদলে ওদলে ভিড়ে বড় হয়ে ওঠা।
কানাই বলে, “মা বাপের কথা মনেও পড়ে না। শুধু মনে পড়ে কাউকে কতগুলো লোক লাঠি দিয়ে খুব মারছিল। সেটা যে কে ছিল কে জানে!”
তারাদাস চুপ করে শোনে ওর কথা। মুখ দিয়ে বের হয়, “হে মা কালী!”
তারপর বলে, “একেই বোধহয় বলে নিয়তি! তা না হলে এখানে আসব কেন?”
কানাই বলে, “একথা বলছ কেন?”
“শোনো তাহলে” তারাদাস বলতে থাকে, “আজ থেকে প্রায় বিশ-বাইশ বছর আগের কথা। এখান থেকে প্রায় মাইল দুয়েক দূরে এক ধানক্ষেতে এক বছর পাঁচেকের বাচ্চাকে আমি কুড়িয়ে পাই।
কুড়িয়ে পাই বললাম কারণ বাচ্চাটা তখন মৃতপ্রায়। আলের ধারে পড়ে রয়েছে। ঠোঁটের দুকষ বেয়ে সাদা ফেনা গড়াচ্ছে। চোখেমুখে জল দিয়ে আমি তাকে সুস্থ করে তুলি। কিন্তু সে কোনও কথা বলার অবস্থায় ছিল না। এমনকি নিজের নামটাও সে বলতে পারেনি। ঝড়ের মুখে পাখির মতো কাঁপছিল। আমাকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। আমি সাথে করে নিয়ে যাই তাকে। নাম রাখি কানাই। ধীরে ধীরে কানাই সহজ হয়।
মাধুকরী বৃত্তি আমার। আমার সাথেই ও পথ চলতে শুরু করে। বছরদুয়েক এভাবেই চলছিল। একদিন এক গাঁয়ে যাত্রাপালা দেখতে বসেছিলাম। সেখান থেকেই হারিয়ে যায় আমার কানাই। বোধকরি যাত্রাদলের সাথে মিশে গিয়ে আমায় ছেড়েছিল। আমিও আর খুঁজিনি। বিশ্বাস ছিল জীবন দিয়ে যিনি ওকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তিনিই ওর জন্যে আহারও মেপে রেখেছেন।
কানাই জড়িয়ে ধরে তারাদাসকে। বলে, “তুমিই সেই গোঁসাইঠাকুর! লোকে তোমাকে গোসাঁইঠাকুর বলে ডাকত। তাই দেখে আমিও বলতাম।
জান ঠাকুর, আমি এখানে এসেছি মাত্র কয়েকমাস আগে। এতদিন ধরে বিভিন্ন দলে নানারকম কাজ করে যা রোজগার করেছি তা জমিয়ে একটা অটো কিনলাম। পেট তো চালাতে হবে?” কিন্তু আমি যেখানে থাকি সেখানে অটো রাখার জায়গা নেই। ঠিক করলাম এই খোলা মাঠেই রাখব রাতটুকুর জন্য। অনেকেই ভয় দেখিয়েছে; বলেছে এখানে নাকি ভূত আছে। কেউ কিছু রেখে গেলে সেটা নষ্ট করে দেয়। কিন্তু অন্য কোনো উপায় না পেয়ে আমি বাধ্য হয়েই এখানে আসি। বুড়িমার সাথে পরিচয় হয়। বলে, “আমি আছি। তোর কোনো ভয় নেই। তুই এখানেই রাখিস তোর অটো।” সেই থেকে রোজ রাতে এখানেই রেখে যাই আমার অটো।
— “তোমার বুড়িমা কোথায় থাকেন?”
— “তা জানি না। এখনও তো ওনাকে ভালো করে দেখতেই পেলাম না। দিনের বেলা যখন অটো নিতে আসি তখন ওনার সাথে দেখা হয় না। সে যাক তোমার স্বপ্নটা তো এবার পূরণ করতেই হবে গোঁসাইঠাকুর। আমার বুড়িমাও মত দিয়েছে।
— দেখা যাক্। তারাদাস মাথা নাড়ে।
পরদিন মাধুকরী করতে গ্ৰামে গিয়ে মাতব্বরদের স্বপ্নের কথা বলতেই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জানিয়ে দেয় যে ওই ভুতুড়ে মাঠে তারাদাস ইচ্ছে হলে মন্দির বানাতেই পারে; তবে গ্ৰামবাসীরা একাজে তাকে কোনোরকম সাহায্য করতে পারবে না। ওখানেই জানতে পারে যে ওখানকার দরগায় দিনের বেলা লোকজন গেলেও রাতে ওই এলাকায় কেউ পা রাখতে সাহস করে না। জাহিরার অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায় ওখানে।
গ্ৰামের লোকের মুখে তারাদাস শোনে জাহিরা কাহিনী।
মনে মনে বুঝতে পারে যে তার কানাই আসলে জাহিরার সন্তান আজীব।
***
আজ অটো রাখতে এসে বুড়িমাকে কোথাও দেখতে পায় না কানাই। একটু চিন্তা হয় বুড়িমার জন্য। শরীরটরীর খারাপ হল না তো!
সাথেসাথে অনুভব করে কেউ যেন ওর পাশেই রয়েছে। কানের কাছে ভাসে, “ভাবিস না বাপ। আমি তোর সাথেই আছি।”
চমকে যায় কানাই। দূরে দেখতে পায় তারাদাস বসে আছে দরগার সিঁড়িতে। কেউ যেন আদর করে হাত ধরে ওকে তারাদাসের কাছে নিয়ে যায়।
গ্ৰামের মানুষের সাথে যা যা কথা হয়েছে তার সবটাই কানাইকে বলে তারাদাস।
বলে, “তোমার বুড়িমার সাথে তুমি রোজই কথা বল অথচ আজ পর্যন্ত তাকে ঠিক করে দেখতেও পাওনি; দিনের বেলা এলে তার দেখা পাওয়া যায় না। আমি নিশ্চিত এ তোমার নিজের মা জাহিরা ছাড়া আর কেউ নয়।”
***
গ্ৰামের মানুষের সাহায্য ছাড়াই কানাই আর তারাদাসের চেষ্টায় পীরসাহেবের দরগার ঠিক পাশেই গড়ে উঠেছে কালীমন্দির। মূর্তির ঠিক তেমনই অবয়ব ঠিক যেমনটি তারাদাস স্বপ্নে দেখেছিল। গোঁসাইঠাকুর এখন তারাঠাকুর নামে পরিচিত।
প্রথম পূজোর দিন মায়ের সামনে একশো আট প্রদীপ সাজানো হয়েছিল। জ্বালানোর মুহূর্তে হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটা প্রদীপ বাদে সবকটা প্রদীপই উল্টে গিয়েছিল।
তারাঠাকুরের কানের কাছে অদৃশ্য এক নারীকন্ঠ বলেছিল, “কখনোই একটির বেশী প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা কোরো না। সূর্য ডোবার আগেই যেন মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়। আঁধার রাতে আলো জ্বাললে ভীষণ বিপদ।”
পরে কয়েকবার ইলেকট্রিকের আলো লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো না কোনো দুর্ঘটনায় তা ফলপ্রসূ হয়নি।
মায়ের সামনে জ্বলে একটিমাত্র প্রদীপ। আলো-আঁধারিতে এ যেন অন্য এক জগৎ। ভয়, ভক্তি জড়ানো ভক্তদের মনোস্কামনা পূরণ করেন মা।
মন্দির আর দরগা পাশাপাশি হওয়ায় পরিত্যক্ত ঈদগাহ এখন সর্বধর্মের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। মন্দিরের সিঁড়িতে পা রাখলেই দর্শনার্থীর মুখ দিয়ে অজান্তেই বের হয় ‘হে মা কালী’।
জাহিরার কথা মুখে মুখে ফেরে।
জাহিরা কালী বলেই প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে এই মন্দিরের মাতৃমূর্তি।
বুড়িমার সাথে আর দেখা হয় না কানাইয়ের। তবুও অটো রাখতে এসে রোজ কানাই শুনতে পায়, “এলি বাপ”।
অসাধারণ গল্প!!খুবই ভাল লাগল।
অপূর্ব লাগল। এক অনাস্বাদিত ,অন্য জীবনধারার গল্প।