কালীপ্রসন্ন সিংহর হুতোম প্যাঁচার নকশায় আছে, ‘ব্যোম কালী কলকাত্তাওয়ালী’ লব্জটি। বস্তুত প্রাচীন কলকাতার কালীক্ষেত্র নিয়ে আলোচনায় ‘ব্যোম কালী কলকাত্তাওয়ালী’ আসবেই। কলকাতার বেহালা থেকে দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত ছড়ানো ভূখণ্ড হল কালীক্ষেত্র। এখানে কালীপূজার বাহুল্য বরাবরই। তা, কালীর আগে ব্যোম তথা আকাশ কেন? জানতে হলে আমাদের যেতে হবে কালীপূজার একদিন আগের ভূতচতুর্দশীতে।
ভূতচতুর্দশীর সঙ্গে ভূতের কোনও সম্পর্ক নেই।
ক্ষিতি, অপ্, তেজঃ, মরুৎ, ব্যোম, এই হল পঞ্চভূত। অর্থাৎ ক্ষিতি বা পৃথিবী, অপ্ বা জল, তেজঃ বা আগুন, মরুৎ বা বায়ু, ব্যোম বা আকাশ, এই হল এক একটি ভূত। পাঁচে মিলে পঞ্চভূত। এই পঞ্চভূতের আরাধনা হয় যে চতুর্দশীতে, সেটাই হল ভূতচতুর্দশী। বামন শিবরাম আপ্তের সংস্কৃত অভিধানে ভূত অর্থে এই পাঁচটি নাম উল্লিখিত হয়েছে। পঞ্চভূতে বিলীন হওয়া মানে দেহান্ত হওয়া।
এইদিন চোদ্দশাক খাওয়া আর চোদ্দবাতি জ্বালার বিধান আছে।
জানা আছে, কালীপূজার আগের দিন ভূতচতুর্দশী।
দুপুরে খাওয়ার ওই ১৪ টি শাকের নাম হল — ওল, নটে, বেথুয়া, সর্ষে, কালকাসুন্দী, জয়ন্তী, নিম, হেলেঞ্চা, সজনে, পলতা, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা, শলপা, শুষণী।
ভূতচতুর্দশীতে চোদ্দশাক খাওয়া যেন সুজলাসুফলা শস্যশ্যামলা ধরিত্রী বা পৃথিবীর বন্দনা করা। পৃথিবী, জল, বাতাস, আগুন, আকাশ তো প্রাণের দ্যোতক। এখানেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরিপোষণ হয়।
তারপর সন্ধ্যায় চোদ্দ প্রদীপ জ্বালা হয়, চোদ্দ পুরুষের জন্যে। তাঁরা হলেন পিতা, মাতা, পিতামহ, পিতামহী, মাতামহ, মাতামহী, প্রপিতামহ, প্রপিতামহী, প্রমাতামহ, প্রমাতামহী, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহী, শ্বশুর, শাশুড়ি।
মতান্তরে, প্রদীপগুলি মূলত নিবেদিত হয় স্বর্গত পিতৃপুরুষ, ধর্ম, রুদ্র, বিষ্ণু, কান্তারপতি বা অরণ্যেঅধিষ্ঠিত দেবতাদের উদ্দেশ্যে।
অমাবস্যা শুরুর সাথে সাথে শুরু হবে মা কালীর পূজা ও দীপাবলি। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার জন্য প্রদীপের আআলোয় চারদিকে উদ্ভাসিত হবে। আর এই পুজোর আগের দিন পালিত হয় ভূতচতুর্দশী। এই রাতে রাতে নাকি বিদেহী আত্মারা নেমে আসে মর্ত্যে। তবে এই দিনটি নিয়ে নানা কাহিনী আছে। দেখে নেওয়া যাক কী কী সেই কাহিনী।

দানবরাজ বলির বড্ড অহংকার ছিল দানবীর হিসাবে।তিনি ছিলেন প্রহ্লাদের পৌত্র ও কশ্যপের বংশধর। তিনি স্বর্গ মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর হয়েছিলেন পৌরাণিক যুগে। এতে ধীরে ধীরে একসময় দারুণ সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন দেবতারা। তখন দেবগুরু বৃহস্পতির পরামর্শে ভগবান বিষ্ণু বামনরূপে এসে তাঁর পা রাখার জন্য তিন পা পরিমাণ জমি ভিক্ষা চাইলেন রাজা বলির কাছে।
স্বয়ং বিষ্ণু যে এসেছেন রাজার কাছে এ বিষয়টা পরিস্কার ছিল, কিন্তু কোনওভাবে এতটুকুও বিষ্ণুকে বুঝতে দেননি রাজা বলি। তবুও তিনি দান দিতে রাজি হলেন কথা রক্ষার্থে।
তখন বামনরূপী ভগবান বিষ্ণু একটা পা রাখলেন স্বর্গে, আর একটা পা দিলেন মর্ত্যে। এবার নাভি থেকে বের হল আর একটা পা। এই পা রাখলেন রাজা বলির মাথায়।
এর পর ধীরে ধীরে বলি ঢুকে গেলেন পাতালে। বলি জেনে বুঝেও দান করেছিলেন বলে ভগবান বিষ্ণু রাজা বলির নরকাসুর রূপের পুজোর প্রবর্তন করেন মর্ত্যলোকে।
নরকাসুররূপী বলি রাজা কালীপুজোর আগের দিন অর্থাৎ ভূতচতুর্দশী তিথিতে মর্ত্যে আসেন পুজো নিতে। সঙ্গে থাকে রাজার অসংখ্য অনুচর। প্রচলিত বিশ্বাস, তাদের দূরে রাখার জন্য জ্বালানো হয় প্রদীপগুলি।
প্রদীপ জ্বালানো সম্পর্কে অন্য যে সমস্ত মতের প্রচলন আছে তার মধ্যে একটিতে বলা হয়— এই দিনে রামচন্দ্র চোদ্দ বছরের বনবাস কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। এত বছরের দুঃখের দিনের অবসানের আনন্দে এবং রামচন্দ্রকে স্বাগত জানানোর জন্য সমগ্র অযোধ্যবাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে অযোধ্যা নগরীকে আলোকিত করে তুলেছিল। সেই থেকে এই প্রথা চলে আসছে।
আবার অনেকে মনে করেন অশুভ শক্তি দূর করতে এই দিন সারা রাত আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। পরদিন দীপান্বিতা অমাবস্যায় অনেকে অলক্ষ্মী বিদায় করতে লক্ষ্মী পুজো করে থাকেন। তবে ভূতচতুর্দশীর সঙ্গে ভূতের কোনও সম্পর্ক নেই। পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ, — এই পঞ্চভূতকে আরাধনার দিনই হল ভূতচতুর্দশী। এই ভূত শব্দ থেকেই ভৌতবিজ্ঞান এসেছে।