অসীম আকাশের নিচে, ধূ ধূ জমির ওপর একলা বসে থাকে একটা লোক। গ্রীষ্মে শুকনো খটখটে, ফুটিফাটা চামড়ার মত মাটিতে রাখা থাকে একটা নড়বড়ে কাঠের চেয়ার। চেয়ারের পিঠে দড়ি দিয়ে বাঁধা রঙজলা কালো ছাতা। এই রঙহীন ক্যানভাসে হাওয়ায় উড়ে এসে কখনো কখনো ছাতার ওপর রঙ ফুটিয়ে তোলে আগুনবরণ কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি।
অতুলকে কাজের সূত্রে ঐ রাস্তা দিয়ে প্রায়শই যেতে হয়। অতুল নবীন গল্পকার। পেশায় সাংবাদিক। ছাতার নিচে বসা বুড়ো লোকটাকে তার বড্ড রঙিন লাগে! বুড়োর মাথায় কালো হ্যাট, চোখে রোদ চশমা, পরনে প্যান্ট শার্ট আর পায়ে ক্যাম্বিশের জুতো। সে সমস্ত পথচারীদের হাত নাড়িয়ে টা টা করে। বাইকে চড়া, বয়ফ্রেন্ডের কণ্ঠলগ্ন স্মার্ট মেয়েরা তার দিকে উড়ন্ত চুমু ছুঁড়ে দেয়। লোকটাও তার বদলে চুমু ছুঁড়ে দেয়। অচিরেই তার অজান্তে লোকে নামকরণ করে ‘টা টা বুড়ো’।
সে দেখে মাঝে মাঝে এক আধটা বাচ্ছা টাটা বুড়োর কাছে দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গে তাদের বাবা-মা। বুড়োর সঙ্গে তারা সেল্ফি নিচ্ছে। বুড়ো মহাখুশি তাদের সঙ্গে। হাসছে, কথা বলছে। এদের দেখে অতুলের মনে ভাবনারা ডালপালা মেলতে থাকে।
বর্ষায় বুড়োকে ঘিরে বেজন্মা ঘাসেরা লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে। তাতেও বুড়োর হেলদোল নেই। সবুজ ঘাসের মধ্যে সাদা জামায় ফুল ফুটিয়ে যেন সে বসে থাকে। পায়ে তখন তার হাঁটু অবধি গামবুট।
টা টা বুড়ো যেখানে বসে থাকে, তার সামনে রাস্তা পেরিয়ে আবার খানিকটা ফাঁকা জমি। সেই জমির প্রান্তে ছোটো ছোটো টিলা যেন হাত ধরাধরি করে অনেকটা চলেছে। টিলার ধার ঘেঁষে রেললাইন। সারাদিন প্রায় সেখান দিয়ে ছোটো বড় রেলগাড়ি চলে। শরতের কাশফুলে ঢেকে যায় মাঠ। অতুলের মনে পথের পাঁচালির কাশফুল, রেলগাড়ির আবেগ তৈরি হয়।
অতুল ভাবে সমস্ত জগত ছুটে চলেছে তার আপন কাজে। কোথাও কোনো বিরতি নেই। শুধু শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার তোয়াক্কা না করে টাটা বুড়ো যেন অনন্তকাল ধরে বসে আছে ফাঁকা মাঠের মাঝে!
না, একদিন গিয়ে বুড়োর সঙ্গে আলাপ জমাতেই হবে! জেনে নিতে হবে ওর এই একলা বসে থাকার রহস্য।
সেদিন হাতে বেশ খানিকটা সময় ছিল অতুলের। বাইক থামিয়ে বুড়োর কাছে গেল। মনে মনে প্রশ্নগুলো সাজিয়ে নিচ্ছিল সাংবাদিক অতুল।
সামনে যেতেই একগাল হাসল টা টা বুড়ো। অতুল সঙ্গে করে এক প্যাকেট বিস্কুট আর সন্দেশ এনেছিল।
— নমস্কার দাদু। ভালো আছেন।
— হ্যাঁ বাবা। দিব্যি আছি। তুমি ভালো তো! জল খাবে? দুটো বাতাসা দিই!
মাটির ঘড়ার ঠান্ডা জল খেয়ে অতুলের প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। সে আবার পরের প্রশ্নে গেল।
— আপনার বাড়ি এখানেই, কাছে?
— হ্যাঁ বাবা এখানেই। ঐ যে বটগাছটা দেখছ পূবদিকে, ওর পেছনেই।
— তুমি কোথায় থাকো বাবা? কি করো?
____ খবরে কাগজে কাজ করি দাদু। এ রাস্তা দিয়ে প্রায়ই যেতে হয়। আপনাকে সবসময় দেখি । কতদিন ধরে এখানে এভাবে বসে থাকেন?
____ ঠিক মনে নেই । চারপাঁচ বছর বা আরো বেশি হবে !
এবারের অতুলের মোক্ষম প্রশ্ন, যার জন্যেই টাটা বুড়োর সঙ্গে এই খেজুরে আলাপ।
— কেন বসে থাকো দাদু এখানে এইভাবে? শুধুই সময় কাটানো?
বুড়ো রহস্যময় এক হাসি হাসল।
তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
— বেশ কয়েক বছর আগে পক্ষাঘাতে আমার ডান হাতটা অকেজো হয়ে গেল। খুব ভেঙে পড়েছিলাম। ডাক্তার বলল ঐ হাতে ব্যায়াম করতে হবে, আর ঐ যে তোমরা কি বল পয়সা নিয়ে ব্যায়াম করানো, সেই করতে হবে।
— হ্যাঁ হ্যাঁ ফিজিওথেরাপী।
— ছেলেপুলের সংসারে আমার অত খরচ করার সামর্থ্য ছিল না বাবা। তখন আমার জামাই এই প্রস্তাব দিল।
— এই টা টা করার প্রস্তাব!
আবার একগাল হেসে বুড়ো মাথা নাড়ল।
— সকাল সকাল চান টান সেরে আমি এখানে চলে আসি। আঁধার নামলে ঘরে ফিরে যাই। দুপুরের ভাতটা বাড়ির কেউ এখানেই দিয়ে যায়। জলের ঘরা তো সঙ্গে আছেই। বাহ্যে, প্রস্রাবের জন্যে খোলা মাঠ আর ঝোপঝাড়।
বুড়ো আবার হাসল। অতুল ভুরু কোঁচকালো।
— প্রথম প্রথম নিজের দায়ে এখানে এসেছি। তখন হাতটা ভালো করে তুলতেই পারতাম না।এখন টা টা করাটা নেশা হয়ে গেছে। মানুষ দেখার নেশাও। কতরকম লোক! কেউ আমাকে দেখে জোরে জোরে হাত নাড়ে। কেউ ভ্রক্ষেপই করে না। কেউ বা ঘাড় হেলিয়ে, মিষ্টি হেসে চলে যায়। তোমার মত দু-একজন আমার কাছে এসে দুদন্ড দাঁড়ায়। দুটো কথা বলে। আমি জলবাতাসা দিই। আমার মন জুড়িয়ে যায়। আমার অকেজো হাতটা এই করতে করতে দিব্যি সচল হয়ে গেছে বাবা।
বুড়ো আরো কি কি সব বলছিল, অতুল ভাবতে ভাবতে তার নিজের পথ ধরল। তারা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল ইঙ্গিতবাহী কিছু শব্দ, উপমা, অলংকার। এই বুড়ো মানুষটি তার ভাবনায় জুড়ে দিল এক উপলব্ধি বা দর্শন, যা আগে কখনো সে তলিয়ে দেখেনি। তার মনে হল, এই ছুটে চলা জগতের ব্যস্ততায়, অনন্ত আকাশের নিচে এই মানুষটি যেন সময়ের বাইরে থাকা এক চরিত্র। এক স্থির বিন্দুর প্রতীক এই চলমান মহাকালের মাঝে। চিরন্তন আকাশের নিচে জীবনের ক্ষণস্থায়ী, ধীর হয়ে আসা সময়ের প্রতিনিধি।
হয়তো বা সে যেন এক বিচ্ছেদের ছবি, যা ইঙ্গিত করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ কেবল বিদায়ই জানায়। একলা বসে থাকা মানুষটির মতো আমরাও সবাই একদিন শুধুই দর্শক হয়ে যাই!
তুমিই পারো এমন লিখতে বন্ধু, মন ছুঁয়ে যায়
ভালোবাসা জেনো। শুভ দীপাবলী
When we go to doctor for every little issues and most of the doctors takes advantage of the situation, this is the wonderful idea you have given to the society. I appreciate your idea. There are so many natural ways of treatment yourself. But for that one has to think deeply and find out a way of natural treatment. Your “Ta Ta” is an wonderful idea we all should follow.
Personally, I never go to doctor. Rather I consult with Naturopathy centre in Delhi where they advise the way to cure in a natural way.
I didn’t think that Ta Ta would make a great impact on you, However I’m happy that you have read my story minutely and appreciated .