শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:৩৭
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রজ্ঞাপারমিতা রায়-এর বড়োগল্প ‘এপথে আমি যে’

প্রজ্ঞাপারমিতা রায় / ১৮৪০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর, ২০২৫

ভালোই ছিল দীপাঞ্জন। দিন তো চলেই যায়। সময় কারও অধীন নয়। এক বছর আগে দীপাঞ্জন স্নান করতে গিয়ে হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে এনে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। সেই ঘটনার পর দীপাঞ্জনের হাঁটার একটু অসুবিধা হয়, একটু পা টেনে চলতে হয়, আর দৃষ্টি শক্তি একটু কমে গেছে।

দীপাঞ্জন ভাবলো কেন এমন হলো? তার নিজের দোষ তো কিছুই ছিল না। সেই সময়ে যদি তাকে স্নান করতে না যেতে হতো, তাহলে এমন হতো না। কিন্তু সুমনাই তাকে তাড়া দিয়েছিল স্নান করতে যাবার জন্য, সব সময়ে সব কিছু নিয়মে করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সব সময়ে অবুঝের মতো কাজ করে সুমনা।

যখন চাকরি করতো দীপাঞ্জন, তখন শুধু নিজের সুবিধা-অসুবিধা আর নিজের পাওনা-গণ্ডা বুঝে নিতেই সে ব্যস্ত ছিল। সুমনা নিজের জীবন কিভাবে কাটাচ্ছে, তার কি প্রয়োজন, সে কখন কিভাবে কি করছে, কোনোকিছুর প্রতিই দীপাঞ্জনের কোনো আগ্রহ ছিল না। সকালে উঠে অফিস, অফিস থেকে বাড়ী, বাড়ী এসে আবার অফিসের কাজ নিয়েই তার দিন-রাত কেটে গেছে। এবিষয়ে দীপাঞ্জনের মনোভাব হলো, সে যা করেছে, ঠিক কাজই করেছে। বাড়ীর কাজ বাড়ীর লোকেরই করা উচিত।

দুই ছেলেমেয়ের বড় হওয়া তাদের নিত্য প্রয়োজন, তাদের স্কুল-কলেজ কিভাবে যেন সব পেরিয়ে গেছে, বড় হয়ে তারা সব যে যার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অনিন্দ্য আর অদিতি তাদের যে যার কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দীপাঞ্জনের ধারনা, এই সমস্তই তার জন্য হয়েছে। সংসারে বেশী গা লাগানো মানে নিজের কাজের ক্ষতি করা, ওসব মেয়েদের কাজ।

একজন সরকারী কর্মচারীর জীবনে যেমনভাবে উন্নতি হয়, এক্ষেত্রেও তাই। অবসরের আগে তার বাড়ী — গাড়ী সবই হয়ে গেছে। সন্তানদের নিয়ে এবং তাদের জীবনযাপন সবকিছু ঠিকমতই চলছে। ব্যতিক্রম শুধু সুমনা। কলেজ জীবনে কোনো এক বিশেষ সময়ে ঠিক করেছিল দীপাঞ্জন যে, সুমনাকেই সে বিয়ে করবে, সেটা সে করেওছে। বিয়ের প্রথম একবছরের মধ্যেই সুমনা বুঝে গিয়েছিল — দীপাঞ্জনের জীবনে প্রয়োজনের সময় ছাড়া তার তেমন কোনো স্থান নেই।

মানুষ যখন প্রেমে পড়ে বা কারো সঙ্গে মানসিকভাবে একাত্ম হয়ে যায়, তখন সে নিজেই নিজের মধ্যে এত বেশী মগ্ন হয়ে যায়, অন্যজন কি ভাবছে না ভাবছে; সেই দিকে তার চোখ বেশী পড়ে না। প্রেমের স্বভাবই হল এমনি।

* * *

সুমনা খুবই সাধারণ পরিবারের মেয়ে। বাবা এবং মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষক। সুমনার দাদা আছে বিদেশে। ভাইবোনের কথাবার্তা বা যোগাযোগ কম হলেও — সম্পর্কের টান আগের মতই আছে। আজ বাবা মা কেউ নেই। ছেলেমেয়েকে প্রকৃত অর্থেই মানুষ করে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠিত দেখে গেছে তারা।

নিয়মিশৃঙ্খলার মধ্যে বেড়ে ওঠা সুমনা বিয়ের পর এবাড়ীতে এসে দেখলো এখানে কোনোকিছুরই কোনো নিয়ম নেই। দীপাঞ্জনরা চার ভাইবোন। নীলাঞ্জন ছোট ভাই, ব্যাঙ্কে চাকরি করে। দুই বোন বিবাহিত। এদের মা নেই, মাত্র বাহান্ন বছর বয়সেই তিনি হার্টফেল করে হঠাৎই একদিন মারা যান।

এবাড়ীতে কেউ কারো পরোয়া করে না, ভাবটা এমন ‘আমরা সবাই রাজা,’ বাকিরা কেউ নয়। এদের হাবভাব বুঝে নিতে সুমনার কিছুদিন সময় লেগেছিল, কিন্তু সবকিছু বুঝে যাওয়ার পর তো আর পিছন ফিরে তাকানো যায় না। বিয়ের পর সপ্তাহ-দশ দিন পার হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ শ্বশুর মশাই একদিন বললেন, ‘আমার শরীরটা ভালো লাগছে না, তুমি বাজারটা করে এনো’। তারপর থেকে কোনোদিনই এই কাজটা অন্য কেউ আর করে না — আজও সুমনাই করে চলেছে।

নীলাঞ্জন বিয়ের এক বছরের মধ্যেই আলাদা সংসার করে নিয়েছে। এবাড়ীতে সত্যিই তাদের অসুবিধা হচ্ছিল। একটা মেয়ের কিরকম অসুবিধা হয় একটা নতুন বাড়ীতে এলে, সেটা শ্বশুর বাড়ীর সবাই সবসময় বোঝে না, আর বোঝানো যায়ও না। সব মেয়ের ক্ষেত্রেই একথা সত্যি। মিত্রা খুব ভাল মেয়ে না খারাপ মেয়ে সেই বিচারে না গিয়েও বলা যায়, সংসারে মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়াটা শুধুমাত্র যে বউ হয়ে আসে তার দায়িত্ব নয়, যাদের বাড়ীতে আসে তাদেরও দায়িত্ব। কিন্তু সমাজ সংসার চিরকালই বউ এবং শ্বশুরবাড়ীর বনিবনা নিয়ে সমালোচনা করেই থাকে, এই নিয়ম এখনও চলছে।

* * *

দীপাঞ্জন তার নিজের অফিসে একসময় কোটি কোটি টাকার দায়িত্ব সামলেছে। বহু বড় সরকারি অফিসের সঙ্গে তার বিশেষ যোগাযোগ ছিল, তবে যখন সে বিয়ে করে, তখন এতবড় চাকরি সে করতো না। মনে উচ্চাশা ছিল — এক দিন বড় হবে। সুমনার বাবা মায়ের আপত্তি ছিল না এই বিয়েতে। সরকারি চাকরি করা পাত্রকে কোনো বাবা মা-ই অপছন্দ করতো না সেই সময়ে। তাই সুমনা ভালোবেসে দীপাঞ্জনকে বিয়ে করলে বাবা মা খুশিই হয়েছিল।

সুমনা ভালোবেসে দীপাঞ্জনের সঙ্গে ঘর বেঁধে ছিল বলেই সবরকম পরিস্থিতি এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেবার একটা দায় তার বরাবরই ছিল।

বিয়ের প্রথম বছর খুব ভালোভাবেই কেটে গেল। তিন বছর পর সন্তান এলো। দীপাঞ্জন সংসারের যাবতীয় খরচ সুমনার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতো, কারণ সে মনে করতো সুমনা একইসঙ্গে সরল এবং বোকা, আবার অত্যন্ত বিশ্বাসী একটি মেয়ে। তিন বছর পার হয়ে যাওয়ার আগেই দীপাঞ্জন চাকরিতে আরও উন্নতি করলো এবং তার মাইনেও একধাক্কায় বেড়ে গেল অনেকটা।

সুমনা খুবই সুন্দরী ছিল — কিন্তু সহজ স্বাভাবিক শিক্ষায় বড় হয়েছে বলে তার মধ্যে ছিল একটি সরলতা এবং সহিষ্ণুতা। বিএসসি পাশ করার পর আর পড়া হয়নি তার। উচ্চ শিক্ষিতা বলা হয় তো যায় না তাকে, কিন্তু সুশিক্ষিতা সে নিঃসন্দেহে। বিয়ে হয়ে আসার পর এবাড়ীতে সে সংসার, শ্বশুর, দেওর, সন্তান সব কিছু সামলাতে সামলাতে একজন হিমশিম খাওয়া মেয়ে মানুষে পরিণত হয়ে গেছে।

* * *

দীপাঞ্জন নিজে বাড়ীর বড় ছেলে। তাই তার সব ব্যাপারেই কথা বলার অধিকার ছিল, বলা ভালো সংসারে তার কথাই শেষ কথা ছিল। বাবা-ভাইবোনেরা সকলেই তাদের মতামত দিতো — আলোচনা করতো, কিন্তু দীপাঞ্জন শেষ কথা বলতো সবসময়ে। এইসব জায়গায় সুমনার অস্তিত্ব সে কখনই স্বীকার করতো না। বরং সকলের সামনে তার বউ যে কতটা বোকা এবং অকাজ ছাড়া কিছুই করতে পারে না, সেই কথা জোর গলায় বলতে ভালো বাসতো।

বউ সুন্দরী হবে, সংসারের বোঝ বইবে, কথা বেশি বলবে না অথচ পোষ মানবে — এইরকমই হয়তো মনের মধ্যে বউ সম্পর্কে তার ভাবনাচিন্তা ছিল। সেদিক থেকে খুব ঠকে যায়নি সে।

তবে, এসব কথা যখন দীপাঞ্জনকে বিয়ে করে এসেছিল তখন কোনোদিনই মনে আসেনি সুমনার। ধীরে ধীরে এগুলো তার মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। সকলের সামনে অপমানিত বোধ হলে সুমনার প্রথম প্রথম চোখ দিয়ে জল পড়তো, তার সেই মলিন মুখ এবং মাথা নীচু করা দেখে দীপাঞ্জনের হয়তো একটু আনন্দ হতো, একটু আত্মপ্রসাদও। কিছুদিন যাওয়ার পর এই ধরনের কথা শুনলে সুমনার আর তেমন কান্না পায় না। চোখের জল গেছে শুকিয়ে।

ছেলেমেয়েদের একটা ছোট বেলা থাকেই। সেই সময়ে অনিন্দ্য এবং অদিতির পড়াশুনা — ছবি আঁকা, গান বাজনা এইসব নিয়ে দীপাঞ্জন সুমনার কোনো কথাই কানে তুলতো না। সে এইসব ক্ষেত্রে সুমনাকে উপযুক্ত মানুষ বলে মনেই করতো না। ছেলেমেয়ের খারাপ কিছু হলেই সুমনাকে বলতো ‘কিছুই বোঝো না যখন কথা কেন বলো?’ অথচ সারা দিন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সুমনা যখন থাকে তখন কোথাও কোনো সমস্যা হয় না। বড় হওয়ার পর সন্তানরা বুঝে গেলো দীপাঞ্জন সুমনাকে অবহেলা করে, অপমান করে কথায় কথায়।

ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সুমনার সম্পর্কটা চিরকাল পর্দার আড়ালেই থেকে গেল। বাবার অনুপস্থিতিতে তারা তিনজনেই খুব স্বাভাবিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সময় কাটায়। সুমনা তাদের বুঝিয়েছে, তাদের বাবা রাগী হলেও মানুষ খারাপ নয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে টানাপড়েনের জন্য সন্তানদের যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সেদিকে তার সচেতনতা ছিল। তাদের কাছে দীপাঞ্জনের সম্পর্কে কখনো কোনো অশ্রদ্ধা বা অসম্মানের কথা সে বলতো না।

* * *

অনিন্দ্য এগারো ক্লাসে পড়ার সময়ে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়া শুরু করেছিল, তার পর ধীরে ধীরে সে ড্রাগ নেওয়া ধরে ছিল, সেই সময়ে দীপাঞ্জন প্রতিদিন বাড়ীতে এসে সুমনার সঙ্গে ঝগড়া করতো, ছেলেকে মারধোর করতো মাঝে মাঝে। তার পর একদিন সে অনিন্দ্যকে রিহ্যাবে দিয়ে দিলো। তার পরের ঘটনা অন্যরকম।

একটি বছর সেই সময়ে নষ্ট হলেও পরবর্তী সময়ে অনিন্দ্য পড়াশুনা শেষ করেছে এবং কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তার এই সফল জীবনের পিছনে মায়ের অবদান সে ভালো করেই জানে। তবে দীপাঞ্জন এইসব কথা হয়তো অর্ধেক জানে, বাকিটা জানতেও চায়না। সে মনে করে, ছেলের জন্য সে যা করেছে তা সবাই করতে পারে না। এবিষয়ে সুমনাকে কোনোরকম কথা বলার প্রয়োজন সে মনে করেনা। উল্টে আত্মীয়স্বজন, পাড়ার লোক, বন্ধুবান্ধবকে সে জানিয়েছে, মায়ের অতিরিক্ত আদরেই অনিন্দ্যর জীবন নষ্ট হয়ে যেতে বসেছিল। ভাগ্যিস সে নিজে ছেলেটাকে দেখেছিল, তাই রক্ষা। অনিন্দ্যকে রিহ্যাব থেকে নিয়ে আসার কিছুদিন আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে দীপাঞ্জন জানতে পেরেছিল যে অনিন্দ্য খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে। এই ছবি আঁকাকে কাজে লাগিয়ে অনিন্দ্যকে সুস্থ করে তুলতে তাদের খুবই সুবিধা হয়েছে। এগুলো এইধরনের রোগীর ক্ষেত্রে থেরাপির কাজ করে নানাভাবে।

একসময়ে সুমনা কিছুটা জোর করেই অনিন্দ্যকে আঁকার ক্লাসে ভর্তি করেছিল। তখন বছরখানেক বহু অশান্তি করেছে দীপাঞ্জন। সুমনাকে এমন কথাও শুনতে হয়েছে, যে ছেলেকে আসলে সে মেয়েলি শিক্ষা দিতে চায়। শেষ পর্যন্ত আঁকার ক্লাস থেকে ছাড়িয়ে এনে তবে মুক্তি।

ডাক্তারের কাছে থেরাপির কথা শুনে দীপাঞ্জন কিছুক্ষণের জন্য সেই সময়কার কথা মনে করে চুপ করে ছিল। বাড়ী ফিরে এই নিয়ে সুমনাকে সে কোনো কথা বলেনি। আসলে সুমনা যে কোনো ভালো কাজও করতে পারে, সেই বিশ্বাসই তার নেই। নিরেট এবং বুদ্ধিহীনা বলেই সে সুমনাকে মনে করে।

* * *

অদিতি পড়াশুনায় খারাপ নয়, তবে ছোট বয়স থেকেই গান গাওয়া এবং মাটি দিয়ে মূর্তি তৈরি করার খুব ঝোঁক ছিল তার। পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে একটু নান্দনিক চর্চা তাকে আনন্দ দিতো। কিন্তু, সবসময় যে সরাসরি সবকিছু করতে পেরেছে অদিতি তা নয়, একটু লুকিয়ে বাবার আড়ালে, কিছুটা মায়ের প্রশ্রয়ে সে তার ইচ্ছে পূরণ করেছে। অদিতি পড়াশুনা করছিল, তখনই একদিন হঠাৎ দীপাঞ্জন অদিতির বিয়ে ঠিক করে এবং দিয়েও দেয়। দীপাঞ্জনের কাছে তার নিজের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। অন্য কারোর মতামতের সে ধার ধারে না। তাই সুমনা যখন বলেছিল — ‘মাত্র তো বাইশ বছর বয়স, আরও কিছুদিন পরে তো দেওয়াই যায়।’ তখন দীপাঞ্জন বলেছিল, ‘তোমার মতামত তো কেউ চায়নি এই ব্যাপারে।’ কথা ওখানেই শেষ। বিয়ের পর অদিতি বেশিদিন বরের সঙ্গে থাকেনি। সন্তান জন্মাবার আগেই অদিতি বুঝেছিল, এইখানে সে থাকতে পারবে না। অভিজিৎ তাকে শারীরিক অত্যাচার করতো না, কিন্তু মানসিক যন্ত্রণা এমনভাবে দিতো যে কিছুতেই তা মেনে নেওয়া যেতো না।

একদিন অদিতি কোনো গানের অনুষ্ঠানে যাবে বলে নিজের শাড়ী গয়না সব গুছিয়ে রেখেছিল বিছানায়। কিছুক্ষণ পরে সে এসে দেখে শাড়ীটা বিছানায় চারভাগে কাটা হয়ে পড়ে আছে।

খেতে বসেছে সবাই একদিন, অদিতি যখন খেতে বসবে এবারে, তখন অভিজিৎ কোথা থেকে কতগুলো প্লাস্টিকের আরশোলা এবং ব্যাং এনে ভাতের উপর ঢেলে দিলো। সকলেই হাসছে, মজা পাচ্ছে। অভিজিৎ-এর মা বলেছিল, আবার ভাত নিয়ে খেয়ে নিতে। কিন্তু অদিতির মনটাই কেমন হয়ে গেল, খাওয়া আর হলো না।

মাঝ রাতে মুখোশ পরে একদিন অভিজিৎ ভয় দেখালো অদিতিকে। যার কোনো মানেই হয় না।

একি বিড়ম্বনা! এরকম অনেক ঘটনা আগে পিছে ঘটলেও অদিতি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ভাবলো, পেটের মধ্যে সন্তানকে বহন করছে সে, কাজেই মাথা তাকে ঠাণ্ডা রাখতেই হবে। কিছুদিন পরে সে বাপের বাড়ী চলে আসে সন্তান হবে বলে। আগেই নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেছিল সে। জানতো এই যাওয়াই শ্বশুর বাড়ী থেকে তার শেষ যাওয়া। টুপাই জন্মাবার পর সে আর শ্বশুর বাড়ী ফিরে যায়নি। দীপাঞ্জন বহুভাবে মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করেও সফল হয়নি। টুপাইকে বড় করার সঙ্গে সঙ্গে এদিক ওদিক চেষ্টা করে অনেক কষ্টে একটা চাকরি পেয়ে গেল অদিতি। এর কিছুদিন পর ছেলেকে সঙ্গে করে সে বাপের বাড়ীও ছাড়লো। এখন সে নিজের মতোই আছে। মাঝে মাঝে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এবাড়ীতে আসে। মা বাবা ভাইয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে ভালই। অভিজিৎ-এর সঙ্গে ডিভোর্সও হয়ে গেছে। এখন সে একাই থাকে এবং চাকরির সঙ্গে সঙ্গে টুপাইকেও মানুষ করছে। সুমনা বোঝে আজকাল অদিতি ভালোই আছে, সবচেয়ে বড় কথা শান্তিতে আছে।

* * *

অবশ্য দীপাঞ্জন বলে ‘মায়ের মতোই মেয়ে হয়েছে, সংসারের কিছুই বোঝে না, ওদিকে মুরোদও নেই। সবসময় অহংকার।’ সুমনার তো চুপ করে থাকা ছাড়া কোনো কাজ নেই।

এইসব ঘটনা ঘটে গেছে বেশ কিছু দিন আগে। অবসরের পরে আজকাল তো বাড়ীতে শুধু দু’জনেই থাকে। কিন্তু দীপাঞ্জন বুঝতে পারে — বাড়ীতে তারা দু’জনেই থাকে, কিন্তু একা একা থাকে। কেউ কারোর সঙ্গে থাকে না। সুমনা কিছুদিন হলো আগের থেকে আরও কম কথা বলে। তবে কাজ করে একদম ঘড়ি ধরে। সকাল সাড়ে পাঁচটায় সুমনায় ওঠার অভ্যেস, ঠিক ছ’টা বাজলেই দীপাঞ্জনের বিছানার পাশের টেবিলে চা এসে যায়। আগে দিনের শুরুতে এই সময়টা দীপাঞ্জন কোনো না কোনো বিষয়ে সুমনাকে একটা বকুনি দিয়ে দিতো। আজকাল বকতে গিয়ে দেখে সুমনা নেই, চলে গেছে। কোনো সময়ই সে ঠিক মতো কথার উত্তর দেয় না, অথবা সে শোনেও না হয়তো। দীপাঞ্জন বুঝেই পায় না, এত স্পর্ধা কি করে হয় সুমনার!

দীপাঞ্জন তার ছোটবেলার বন্ধু মধুসূদনের কাছে এইসব কথা বলে কখনও কথনও। মধুসূদনবাবু উকিল — দীপাঞ্জনের বাড়ীর চার-পাঁচটা বাড়ীর পরেই তার বাড়ী। তার বউ স্কুলে চাকরি করে, ওদের একই ছেলে বহু দিন হলো দিল্লিতেই থাকে। ওখানেই তার চাকরি এবং বিয়ে। ভালোই আছে ওরা। চৈতালী খুব ভালো মেয়ে এবং সুমনার বন্ধুও। ছুটির দিনে প্রায়ই মধুসূদন এবাড়ীতে আসে — দুই বন্ধুতে গল্প, আড্ডা, জলখাবার খাওয়া সবই চলে। চৈতালী তেমন আসে না, সুমনারও যাওয়া হয় না, কিন্তু এতে করে বন্ধুত্ব আটকায়নি। উভয়ের পারিবারিক ব্যাপারে এদের ভালোই আসা যাওয়া আছে। সুমনাও তাদের সব ক্ষেত্রেই নিজের বাড়ীর লোকের মতোই আদর আপ্যায়ন করে থাকে।

যদিও সুমনার মনের কোনো খবরই দীপাঞ্জন রাখে না, তবে চৈতালীর সঙ্গে তার সম্পর্কটাকে সে পছন্দ করে।

সে মনে করে, সুমনা অপরিণত বুদ্ধির একটি বোকা মেয়ে। কিন্তু এই সুমনার সঙ্গেই তার এতগুলো বছর কাটাতে হলো, এটাই তার একটা বিরক্তির কারণ।

মধুসূদন যেহেতু দীপাঞ্জনের ছোটবেলার বন্ধু, তাই সে দীপাঞ্জনের চরিত্র ভালো করেই জানে। কাজে কোথাও একটু গোলমাল হলে সে সুমনাকে ছেড়ে কথা বলে না। কিন্তু সুমনার কোনো ভালো কাজের জন্য সে তার প্রশংসা কোনোদিনই করে না। দীপাঞ্জন মানুষ খারাপ নয়। লোকের উপকার করে থাকে সময়ে সময়ে, কেউ প্রয়োজনে ডাকলে যায়, টাকা পয়সার প্রতি আকাঙ্ক্ষা তার আছে তবে তা প্রয়োজনের জন্য, লোভের জন্য নয়।

বিয়ের আগে জীবনযাপনে তেমন নিয়মশৃঙ্খলার ব্যাপার ছিল না দীপাঞ্জনের। বিয়ের পর যেভাবেই হোক তার জীবনে একটি স্থিতি এসেছে। বিবাহিত লোকেদের জীবন ধীরে ধীরে পরিণতি পায়। এক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু সুমনাকে সে এসবের জন্য কোনোভাবেই দায়ী ভাবে না, বরং মনে করে, সুমনা একটা আস্ত জীবন পেয়েছে শুধু তার জন্য। কোনোভাবেই সুমনা এত ভালো সংসার পাওয়ার যোগ্য ছিল না। দীপাঞ্জন তাকে বিয়ে না করলে তার কপালে অনেক দুঃখ ছিল। এসব কথা সে যখন মধুসূদনকে বলে, তখন মধুসূদন শোনে, মাঝে মাঝে কিছু মন্তব্য করে। সুমনাকেও মধুসূদন বোঝে এবং জানে কিছুটা।

* * *

নিজের স্ত্রীকে মধুসূদন বিয়ের পরে পড়াশুনা করিয়েছে। চৈতালীর স্কুলের চাকরির পিছনে মধুসূদনের অবদান কম নয়। দীপাঞ্জন এই ব্যাপারটা মোটেই ভালো চোখে দেখেনি। অনেক বিদ্রুপও করেছে এক সময়ে, তার পর সব থেমে গেছে। তবে, মধুসূদনের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব অটুট আছে এখনও। দু’জনেই তাদের নিজেদের এবং পারাবারিক সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। সুমনার কখনো কখনো কিছু কথা মধুসূদনের সঙ্গেই হয়, আর চৈতালীর সঙ্গে দেখা হলে কথা হয় অথবা ফোনে। তাই মধুসূদন বাড়ীতে এলে সুমনার মন ভালো লাগে, মনে হয় দু’একটা কথা বলা যাবে।

আজ রবিবার। সাড়ে আটটার সময়ে মধুসূদন এবাড়ীতে এলো। গত সপ্তাহে সে আসেনি। সুমনা তাকে বাড়ীতে ঢুকতে দেখে বললো — ‘কি ব্যাপার? পথ ভুলে নাকি?’

  • না, আসলে একটা কেসের জন্য একটু বাইরে ছিলাম।
  • আপনার বন্ধু তো আপনি না আসায় কথা বলতে পারছে না। মুখ গোমড়া করে বসে আছে।

মধুসূদন চলে গেলেন দীপাঞ্জনের ঘরে।

  • কিরে মধু তোর তো দেখাই নেই।
  • এই তো এলাম।

দুই বন্ধুর কথা আর গল্পের মাঝেই চলে এলো জলখাবারের থালা হাতে সুমনা। সুমনা চলে যাওয়ার পর দুই বন্ধু খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে সুমনা চা নিয়ে এলো।

  • আজকাল কি নুনের দাম বেশি হয়ে গেছে? না কি আমার নুন কেনার পয়সা নেই।

দীপাঞ্জনের এই প্রশ্নের উত্তরে সুমনা ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে চলে গেল। মধুসূদন বললো তখন…

  • নুন তো ঠিকই আছে তরকারিতে, এমন বললি কেন?
  • মেয়ে মানুষকে একটু ধমকে, বকে রাখতে হয়, নাহলে বড় বেড়ে যায় ওদের।

আগে বকুনি খাওয়ার সময়ে সুমনা একটু থমকে যেত, কিন্তু এখন যেন তার কোনোই পরিবর্তন হয় না। এইটা লক্ষ্য করে দীপাঞ্জন খুবই রেগে যায় এবং বিরক্তবোধ করে। একটু চিন্তাও করে সুমনা কি তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে?

* * *

গতকাল রাতে দীপাঞ্জনের একটু ঠান্ডা লেগেছিল, সকালে উঠে দু’চারবার কাশির দমক এলো, কিন্তু সুমনাকে কিছু বলার আগেই সে আদা, তুলসিপাতা আর মধু দিয়ে একটু গরম জল এনে দিলো। অন্য সময় হলে সুমনা দু’একটা কথা বলতো, কি হলো — আরাম লাগছে কি না ইত্যাদি। এখন সে আর কোনো প্রশ্নও করে না। গরম জল দিয়ে চলে গেল, পিছন ফিরে তাকালো না পর্যন্ত। সুমনার এই ব্যবহার দীপাঞ্জনের আগে কখনো চোখে পড়েনি। গরম জল হাতে নিয়ে দীপাঞ্জন কিছু একটা বলতে যাবে, তখন দেখে সুমনা ঘরে নেই।

মধুসূদন যাওয়ার সময়ে রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো সুমনা ব্যস্ত। বললো — খুব পেট ভরে গেছে, তুমি এত ভালো রান্না করো।

  • দাঁড়ান মধুদা, এই বাক্সটা নিয়ে যান, এটা চৈতালীর। আপনার জন্য নয়।
  • বেশ।
  • সুমনা তুমি দীপুর কথায় কিছু মনে করোনা, ও একটু তোমার পিছনে লাগতে ভালো বাসে, আর কিছু না।
  • আবার আসবেন।

মধুসূদন চলে যাবার পর সুমনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকলো, “মনে আর আমি করি না মধুদা, করতেও চাই না। আমার মন কি আর আমার আছে? কবেই যেন হারিয়ে গেছে, দীপাঞ্জনকে ভালোবেসে ছিলাম যেদিন, সেদিন থেকে মন আর আমার নেই, সে তো অন্যের। একবার ভালোবাসলে তার থেকে কি আর মুখ ফিরিয়ে থাকা যায়? আমার ইচ্ছে – অনিচ্ছে, ভালোলাগা – মন্দলাগা সব ওর মধ্যেই মিশে আছে। নিজেকে আর ওর থেকে কোনোদিন আলাদা করে ভাবতেই পারলাম না। এ বাড়ীতে আসার পর এতগুলো বছর ওর সঙ্গে ঘর করে চলেছি, কতভাবে কত অসম্মান ও করেছে, আমি তার হিসেব করি নি কখনো। এত অবহেলা সত্ত্বেও ওর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারি নি আমি।”

সুমনা নিজের মনেই বললো, “তুমি অফিসে যাবার পর সারাদিন বাড়ীতে যখন একা থেকেছি, তুমি ফিরে আসবে বলে, অপেক্ষার জানলায় চোখ রেখে সময় গুনেছি, শুধু তোমার জন্যে। তুমি আসার পর তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার সমস্ত দিনের ক্লান্তির অবসান হয়েছে, কিন্তু তুমি? একবারও আমার দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেছ। তোমার মনেই হয় নি একটা দুটো কথা বলা যেতে পারে আমার সঙ্গে। আমি যে সারাদিন এই আশায় বসেছিলাম।

বাড়ীর সবার জন্যে পুজোর বাজার করতে গিয়েছিলাম আমরা, সেটা বোধহয় আমাদের বিয়ের প্রথম বছর। রাস্তা পার হবার সময় তোমার হাতটা ধরতে চাইছিলাম, কিন্তু তুমি বার বার হাত ছেড়ে দিচ্ছিলে। পরে বলেছিলে, “এইসব ঢঙ যেন না করি।” আমি একটু অবাক হয়েছিলাম, কষ্ট হলেও তোমার মনোভাব বুঝে আর কখনো তোমার হাত ধরে রাস্তা পার হবার চেষ্টা করি নি। এখন তুমি মাঝে মাঝে আমার হাত ধরে নাও রাস্তায় বেরোলে। হয়তো ভাবো, দাঁড়িয়ে থাকবো আমি হতভম্বের মতো। কিন্তু এখন আর রাস্তা পেরোবার সময় আমার ভয় করে না।”

দীপাঞ্জন ভাবে, সুমনা এমন পাল্টে গেল কিভাবে? সংসারের সব কাজ করার পরেও সুমনার হাসি মুখ থাকতো। আজকাল তার কোনো কথাতেই সুমনার প্রতিক্রিয়া হয় না কেন?

যখন বয়েস কম ছিল, তখন সুমনাকে রীতিমত দাবড়াতো দীপাঞ্জন, একবার এক চায়ের দোকানের মাসীর সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করেছিল বলে, বাড়ী আসার পর যা বকেছিলো সুমনাকে, সে তো কেঁদেই সারা। সেই নরম মনের মেয়েটা এমন নির্বিকার, উদাসীন হয়ে গেল কোন সাহসে?

দেখতে সুন্দর, ঢলঢল চেহারার সুমনাকে প্রথম দিন দেখার পর দীপাঞ্জনের বুকের ভিতরটা কেমন যেন নরম হয়ে ভিজে গিয়েছিল। বিয়ে করে সুমনাকে বাড়ীতে নিয়ে আসার পরে একটু একটু করে সেই নরম সুকুমার মনোভাব সম্পূর্ণ মন থেকে মুছে গেছে। আর সুমনার সমস্ত মুখের মধ্যে সেই যে একটা উদ্ভাসিত আলো আলো ভাবছিল, তাও কবে যেন নিবে গেছে।

পুরুষতন্ত্র এমন ভাবে কাজ করেছে ঘরে বাইরে, যে, সুমনার অস্তিত্বই মুছে গেছে। মেয়েরা বহুক্ষেত্রেই এমনি করে বেঁচে থাকে, সংসার গড়ে তোলার পর তাকে ভেঙে ফেলার মনের জোর সবার থাকে না।

এমনি করেই দিন কাটে। দুপুর একটা বাজলেই সুমনা দীপাঞ্জনের সামনে এসে বলে, “খাবার সময় হয়েছে।” খাবার টেবিলে বসলে দীপাঞ্জন কোনদিকেই মন দেয় না, খেয়ে উঠে পড়ে। কে খেলো, না খেলো, কি খেলো ওইসব নিয়ে সে মাথা ঘামায় না।

নিয়ম করে তাকে কিছু ওষুধও খেতে হয়। ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করাটাও একটা কাজ, তাই সুমনাকে একটা ফোন কিনে দিয়েছে অনিন্দ্য। দীপাঞ্জন ভেবেছিল, এইসব ফোন নিয়ে সুমনা সমস্যায় পড়বে, এবং তার কাছে বারে বারে আসবে। কিন্তু কাজের বউয়ের থেকে একটু একটু করে এই ফোন রপ্ত করে ফেলেছে সুমনা। দীপাঞ্জন এই ফোন ব্যবহার করা নিয়ে ভালোরকম ঠাট্টা বিদ্রুপ করার সুযোগ আর পেল না।

মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, কাজের বউ, ইস্তিরি করার ছেলেটা সবাই সুমনার খুব কাছের। এদের কাউকে দীপাঞ্জন ভালো চোখে দেখে না। অথচ এদের সঙ্গে সুমনার কথা বার্তা, ব্যবহার দেখলে তার খুব রাগ হয়।

সুমনাকে দীপাঞ্জন বলেছে, তার কাজ সে নিজেই করে নেবে। ওষুধ সে নিজেই খাবে, এরপর মাসের শেষে দেখা যায়, অনেক ওষুধ বেঁচে আছে। এরকম কি করে হয়, তখন দীপাঞ্জন ভাবে, এটা কেন হচ্ছে? সে কি ভুল করছে? ঠিকমতো কি খাচ্ছে না তাহলে? বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না। ক্লান্ত লাগে। হাল ছেড়ে দিয়ে এই ব্যাপারটা একদিন সুমনার উপরে ছেড়ে দিল। বুঝিয়ে দিলো, একটু এদিক ওদিক হলেই কিন্তু সবকিছুর জন্যে সুমনা দায়ী থাকবে।

দীপাঞ্জনের ওষুধের হিসেব সুমনার কাছে আসার পর কোথাও কোনো অসুবিধা হয় নি এখন পর্যন্ত। তাই কোনোভাবেই একটুও কটুকথা বলার সুযোগ হচ্ছে না। একবার গোলমাল তো হবেই, এই অপেক্ষা করছে দীপাঞ্জন।

নিজের কোনো কাজে সুমনাকে ডাকতে খুব আত্মসম্মানে লাগে দীপাঞ্জনের, যদিও সব কিছুই বলার আগেই সে পেয়ে যায়।

* * *

একদিন রাতে বিছানায় একটু বেশী এপাশ ওপাশ করছিল সুমনা। গলার আওয়াজে দীপাঞ্জন একটু রাগ প্রকাশ করার পরেই সব থেমে গেল। সুমনার ঘুমের মধ্যে গলা শুকিয়ে আসছিল, একটু পরে সে উঠে জল খেয়ে একটু সুস্থ বোধ করলো। আর ঘুম হলো না তখন, কিন্তু পরদিন সে মাথা ঘুরে পড়েই গেল। সেই সময় কাজের বউ থাকায় ডাক্তার তাড়াতাড়ি এসে গেল। সব দেখে গোপাল ডাক্তার বললো, “দাদা, বৌদির রক্ত পরীক্ষা করতে হবে।” দু’দিন পর গোপাল ডাক্তার এসে দীপাঞ্জনকে বললো, – দাদা, বৌদির তো সুগার হয়েছে।

  • কি করে?
  • একদিনে তো হয় নি এটা। অনেকদিন ধরেই হয়েছে। হয়তো উনি বুঝেও গুরুত্ব দেন নি।
  • নির্বোধ তো। কিছু বোঝেই না ও। আমাকে তো বলা উচিত ছিল।
  • আপনার মিষ্টি মিষ্টি বকুনি বৌদিকে মিষ্টি রোগী বানিয়ে ফেলেছে।

অনেক কষ্টে দীপাঞ্জন একটু ম্লান হাসলেন, বললেন, “ওষুধপত্র সব লিখে দাও।”

* * *

পরদিন চৈতালী এল বিকেলে খবর নিতে। সুমনা আর দীপাঞ্জনের সঙ্গে আড্ডা গল্প চলতে চলতেই এসে গেল মধুসূদন। কাল ফোনে সবকিছু শোনার পরে আসা হয় নি, তাই আজ সবাই এসে পড়েছে।

সাত আট দিন কেটে যাবার পর সুমনা একটু হাল্কা আর সুস্থ বোধ করতে লাগলো। ভাবলো এই ক’দিনে তার কাজ জমে গেছে অনেক, সব সেরে ফেলতে হবে। পাশে তাকিয়ে দেখলো দীপাঞ্জন তার দিকে তাকিয়ে আছে রেগে।

  • উঠবে কখন?
  • উঠছি, একটু ক্লান্ত লাগছে তো, তাই।
  • খালি পেটে যে ওষুধটা খাই, সেটা তাড়াতাড়ি দাও। দিন দিন এমন বেআক্কেলে হয়ে যাচ্ছ কি করে কে জানে!

* * *

দিবানিদ্রার অভ্যেস নেই সুমনার, হয় বারান্দায় বসে নাহলে গল্পের বই পড়ে অথবা রান্নাঘরের কিছু কাজ নিয়েই তার সময় কাটে। আজ দুপুরে সে ফোন নিয়ে বসেছে, ও প্রান্তে চৈতালী।

  • এখন কেমন আছ? সব ওষুধ ঠিকমত খাচ্ছো তো?
  • হ্যাঁ গো। ঠিক আছি।
  • তুমি এবারে একটু নিজের দিকে তাকাও।
  • চেষ্টা তো করি। জীবনের মানে হলো শুধু দিয়ে যাওয়া, আমরা মেয়েরা সারাজীবন ধরে এই কাজটাই করে যাই। যে কাজের কখনো কোনো দাম সমাজ, সংসার কেউ দেয় না। তবু আমাদের করে যেতেই হয়। কেউ কিছু বলুক, না বলুক, আমাদের সেই ঘাড় গুঁজে, মুখ বুজে করে যাওয়াটা যেন ভাতের সঙ্গে নুনের সম্পর্কের মত। বিয়ে করার পরের দিন থেকেই শুরু হয় এটা কে করবে? ওটা কে রাখবে? অমুকে কি খাবে? আমি কি পড়বো? বাজারে কে যাবে? রান্না কে করবে? জামা কাপড় কে ধোবে? জুতো পালিশ করবে কে? আজ বাড়িতে লোকেরা খেতে আসবে, খাবার ব্যবস্থা কে করবে? বাচ্চার জন্ম দেবার পর আর এক প্রস্থ। বাড়িতে বউ এর কাজ কোনোদিনও ফুরায় না। অথচ জীবন একদিন ফুরিয়ে আসে, শেষও হয়। অসুখ বিসুখ মেয়েদের যে কেন হয়! হলেও কেউ পাত্তা দেয় না। মরলে মরুক, বাঁচলে আবার করবে সব, এইসব নিয়েই আমরা আছি। আজকাল শুনি মেয়েরা অনেক অন্যরকম হয়ে গেছে, খুব স্বাধীন, খুব ভালো, আমার তো তেমন নজরে পড়ে না। বয়েস বেশি হোক বা কম, মেয়েদের জীবন খুব একটা কি আলাদা হয়েছে আগের থেকে? ভালো লাগে না একদম। কোনো কিছুতেই মন বসে না, কাজ করতেই হবে তাই করে যাই। কি যে করি, কেন যে করি, তাও বুঝি না।
  • তুমি এত কিছু করেছ এতদিন। দীপুদা যাই বলুক, তোমার দিকটা তোমাকেই দেখতে হবে। আমি তো শুনেছি মধুর কাছে, দীপুদার তো আজকের মত অবস্থা ছিল না, তুমি এসেছ বলেই আজ এত পরিপাটি গোছানো সংসার, ছেলে মেয়েরা ঠিক আছে, সব থেকে বড় কথা দীপুদাকে কিছুই করতে হয় না, আত্মীয় স্বজন সকলেই জানে তুমি আছ বলেই দীপুদার সব আছে।
  • তোমার কথাগুলো শুনতে খুব ভালো লাগছে। তবে এই ভালোলাগা সাময়িক।

রাখি এবারে বুঝলে? বিকেল গড়িয়ে এল, আবার রান্না ঘরে যেতে হবে। তোমরা ভালো থেকো।

* * *

রিটায়ার এর আগে অফিসের কাজকর্ম যখন চলছিল, তখন সুরঞ্জন বার বার বলেছিলো, দুজনের চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যবস্থা সব ঠিক করে নিতে, কিন্তু নিজের শারীরিক ফিটনেস নিয়ে দীপাঞ্জন খুব গর্বিত ছিল। সুমনাও তাকে বলেছিলো, বয়েস বাড়লে খরচও বাড়বে। কিন্তু সুমনার কথা কানে তোলা তো এক অসম্ভব ব্যাপার। এদিকে আজকাল দুজনেরই ওষুধের খরচ গেছে বেড়ে।

প্রায় দিনই সুমনাকে কথা শুনতে হয়, “তোমার জন্যে এত টাকা খরচ হয়,” নিজে কোনোদিন তো চাকরি করে নি সুমনা, তাই সে মুখ বুজেই থাকে। ওষুধ তো খেতেই হবে। না খেলে শরীর খারাপ হবে।

সুমনার দাদাও বলেছে, সে আসবে এবারে। অনেকদিন ভাই বোনের দেখাও হয় নি। দীপাঞ্জন তো ভেবেই পায় না, সুমনা এমন কী মানুষ যে, সবাই এত খবর নিচ্ছে, আসছে, এদের সবেতেই বেশী বেশী দেখানো।

* * *

অঘ্রানের শেষ দিক। শীতের সকালে সময় খুব তাড়াতাড়ি বয়ে যায়। আজ দীপাঞ্জনের খুব বেলা হয়ে গেছে উঠতে, জানলা দিয়ে বিছানার উপরে আর সুমনার মুখের উপরে মিঠে রোদ এসে পড়েছে। এমন অবোধ মেয়েমানুষ জীবনে দেখে নি দীপাঞ্জন। না নিজে উঠেছে সময়মতো, না তাকে ডেকেছে, চা দেবে কখন কে জানে! এমনটা আগে কখনো দেখে নি সে। প্রথমে ডাকলো, কোনো সাড়া নেই, আস্তে ঠেলা দিল, তারপর সুমনাকে ধরে জোরে ঝাঁকালো, কোনো হেলদোল নেই দেখে এইবার একটু চাপা একটা আতঙ্ক হলো মনের মধ্যে। মুখটা সুমনার কেমন যেন হয়ে আছে, খুব নির্বিকার। ফোনটা হাতে নিয়ে প্রথমে অনিন্দ্যকে, তারপর অদিতিকে ফোন করলো, অনিন্দ্য গোপাল কাকুর কথা বলায় শেষে তাকেও জানালো। কিছুক্ষনের মধ্যেই গোপাল ডাক্তার এসে দেখেশুনে জানালো, “ঘণ্টা দুই আড়াই আগেই যা হবার হয়ে গেছে।” সে দুপুরে এসে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে যাবে।

* * *

দীপাঞ্জন ভাবছে চৈতালী, মধু সবাই এসে গেছে। আজ বৃহস্পতিবার, রবিবারেই ছেলে মেয়ে দুটোর আসার কথা ছিল, ওনার তর সইলো না। কথা বলার ধৈর্য নেই, আজই উনি ড্যাঙ ড্যাঙ করে উপরে রওনা হলেন, এত অহঙ্কার যে কিসের!

সবাই এসে দুঃখ প্রকাশ করছে, সমবেদনা জানাচ্ছে, কোনো মানে হয় না। এদিকে তার সকালের চা, খাবারের কোনো গল্পই নেই। কি স্বার্থপর রে বাবা! এইসব কাজ এখন কে করবে?

এতগুলো বছরে এমন অনাসৃষ্টি কাণ্ড ঘটেছে কখনো? অদিতি এসে বাবাকে চা দিল। মায়ের একটা খাতা আছে, তাতে লেখা আছে, বাবাকে কখন কোন ওষুধ দিতে হবে, সেই দেখেই সে ওষুধ দিল।

মধুসূদনের দিকে তাকিয়ে দীপাঞ্জন বলে উঠলো, “এত অবাধ্য মেয়েমানুষ আমি দেখিনি, জানিস সবসময় ওকে শিখিয়ে, বুঝিয়ে না দিলে কিছুই করতে পারতো না।” অনিন্দ্য আর অদিতি কেঁদেই চলেছে, কোনো কারণ নেই। কাজের মেয়েটা পর্যন্ত কাঁদছে। গোপাল ডাক্তার ওদের বলছে এবারে একটু নিজেদের যেন সামলে নেয় ওরা। ওরা যেহেতু গোপাল কে কাকু বলে, তাই সে এখন গার্জিয়ান গিরি দেখাচ্ছে।

দীপাঞ্জনের খুব অদ্ভুত লাগছে, এরা সবাই সুমনা কে ডেডবডি বলছে, কেউ কখনো এমন আজব কথা শুনেছে? নতুন শাড়ী পড়ানো, কপালে চন্দন, সিঁথিতে সিঁদুর সুমনাকে খুব সুন্দর লাগছে দেখতে। কিন্তু এই কথা তো কাউকেই বলা যাবে না, সুমনাকে তো নয়ই, যদি ওর স্পর্ধা আরো বেড়ে যায়! মেয়েদের বেশী বেড়ে যাওয়া দীপাঞ্জন সহ্য করতে পারে না একদম। ওরা সবাই গেল শ্মশানে, শুধু চৈতালী রয়ে গেল তার কাছে। ওরা ফিরলে সে বাড়ী যাবে।

* * *

ছ’মাস পরের ঘটনা। অদিতি নিজে বাবার দেখাশুনা করে আজকাল। সে পাকাপাকি ভাবে চলে এসেছে এখানে। মাস কয়েক হলো, দীপাঞ্জনের দৃষ্টিশক্তি একটু ভালো হয়েছে। টুপাই দাদুর সঙ্গে অনেকরকম কথা বলে, সময়গুলো কিভাবে যেন কেটে যায়, অদিতি সারাদিন কাজকর্মে থাকে, তাই একজন আয়া আছে, তবু টুপাই তার কাছে কাছেই থাকে। বিকেলে অদিতি ফিরলে আয়া চলে যায়।

একদিন দুপুরে ঘুম আসছে না দীপাঞ্জনের, বিছানার যেদিকে সুমনা শুতো, সে দিকের ড্রয়ার খুলে টুপাই সুমনার চিরুনি, টিপের পাতা, মোবাইল সব বের করে ফেললো। দীপাঞ্জন একটু অন্যমনস্ক ভাবে মোবাইলটা হাতে নিল। আগে সে মোবাইলে তেমন রপ্ত ছিল না, চোখে ভালো করে দেখতেও পেতো না। এখন একটু অভ্যস্ত হয়েছে। নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলো, মৃত্যুর ঠিক ক’দিন আগে অনিন্দ্য এবং অদিতির নম্বরে একই মেসেজ লেখা রয়েছে।

অনি আর অদি,

হেমন্তের বিষন্ন বিকেলের মতো আমার দিনও ফুরিয়ে এল। আজ কদিন হলো, শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনটাও শ্রান্ত।

সন্ধ্যার আকাশে তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলছে। মনে হয়, ওরা সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে, বলছে,

“দিন ফুরালো হে সংসারী,

ডাকো তাঁরে ডাকো যিনি শ্রান্তিহারী।

ভোলো সব ভবভাবনা,

হৃদয়ে লহো হে শন্তিবারি।”

খুব ইচ্ছে করছে তোমাদের দুজনের সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাই সেই ছোটবেলার মত। অনি, তোমার মনে আছে অদিকে সঙ্গে নিয়ে একবার গরমের ছুটিতে বাড়ীর পিছনের বাগানে একটা আমগাছ লাগিয়েছিলে, অনেক বছর ধরে সেই গাছের আম খেয়েছ তোমরা। এইবছর কী করে যেন, গাছটা মরে গেছে। খুব কষ্ট হয় দেখলে, টুপাইকে সঙ্গে নিয়ে ওইখানে আর একটা কোনো গাছ লাগিয়ে দিও।

অদি, আমার আলমারীতে ছোট লাল বাক্সটাতে একটা মটরমালা হার আছে, ওটা রেখে দিও, ভবিষ্যতে টুপাইয়ের বউকে দিও। বালাজোড়া অনির মেয়ের জন্যে রইল।

তোমরা শুনেছো তো গোপাল কাকু এসেছিলো আমাকে দেখতে, সেদিন একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, রক্ত পরীক্ষায় সুগার একটু বেশীই ধরা পড়েছে। একটু সাবধানে থাকতে বলেছে, চিন্তার কিচ্ছু নেই, ডাক্তাররা এমনি বলেই থাকে।

তোমাদের কিছু কথা বলে রাখা দরকার বলেই মনে হচ্ছে। অনি, তুমি সবসময় না পারলেও কিছুদিন বাদে বাদে বাবাকে দেখে যেও। অদি, যদি আমার হঠাৎ কিছু হয়ে যায়, তাহলে তুমি ভাড়া বাড়ী ছেড়ে এবাড়ীতে এসে থাকার চেষ্টা করো, পয়সাও বাঁচবে, আর বাবাকেও একা থাকতে হবে না। টুপাইকে মানুষ করতে তোমার একটু সুবিধা হবে মাথায় রেখ। দেখ, আমি তোমাকে বলেছি বলেই তোমাকে থাকতে হবে, এমনটা নয়, তুমি যেটা ভালো বুঝবে সেটাই করো।

তোমাদের বাবা একা থাকলে তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে পড়বে। এত বছর তো দেখছি, সকলের সঙ্গে থাকলে ভালো থাকে। আত্ম অভিমানে ভরপুর মানুষটা নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে, কে কী বললো, ভাবলো, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

আমাকে তোমাদের বাবা বিয়ে করে এবাড়ীতে নিয়ে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সারাজীবন তার মাশুল ও দিয়েছে। একসময় বুঝেছে, আমি হয়তো সম্পূর্ণ ওর উপযুক্ত নই।

বাইরে থেকে দেখে যা আমরা ভেবে নিই, তা সবসময় সত্যি হয় না। সংসার তো খুব সহজ জায়গা নয়, আমিও বুঝতাম না সবকিছু। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধিও বাড়ে। পরিকল্পনা করে দু’চারটে দিন কাটানো যায়, কিন্তু সমস্ত জীবন তো আর কাটানো যায় না। পথ চলতে চলতে আমরা দিন কাটাই। একসময় এমন হয়ে যায়, যখন কিছুই আর নিজের মনের মত হয় না।

আজকাল খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি, সব কাজ করতেও পারি না আর, মাঝে মাঝে ভয় হয়, কিছু কাজ তো এখনও করে উঠতে পারি নি। হয়তো আর পারবো না। রাত শেষ হবার আগেই হয়তো আমার দিন ফুরিয়ে যাবে।

ছোটবেলা থেকে তোমাদের বড় করে তোলা, আর তোমাদের বাবা এর বাইরে আমার আর কোনো জগৎ তো ছিল না। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতই ছিলাম আমি। প্রাত্যহিক জীবনের  জটিলতা তেমন বুঝতাম না। আর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সাদা সিধা ভাবে কিছুই দেখতে পারি না। চোখ আর মন দুটোই নষ্ট হয়ে গেছে।

তোমাদের মধুকাকুর দেশের বাড়ী আমাদের সবার যাওয়ার কথা হয়েছে এবারে। চৈতালী অনেকবছর ধরে বলছে, যাওয়া আর হচ্ছেই না। কি জানি! এবারে সত্যিই যাওয়া হবে কি না। বসন্তের পলাশফুলে পুরুলিয়া না কি তার রূপের পশরা সাজিয়ে বসে, মাঘ মাসের শেষে যাবার কথা।

তোমরা সকলে ভালো থেকো, আমার অনেক আদর আর স্নেহ রইলো তোমাদের জন্যে। অদি তুমি চোখের যত্ন নেবে নিয়মিত, নাহলে অসুবিধা হবে। অনি, তুমি ঠান্ডা লাগাবে না, সাবধানে থাকবে।

এবারে লেখা শেষ করি, অনেক কাজ পড়ে আছে।

ইতি-

তোমাদের মা।

* * *

দীপাঞ্জন মোবাইলটা আবার ড্রয়ারে রাখতে রাখতে ভাবলো, “সারাজীবন ধরে এইসব আজেবাজে ভাবনা ভেবে গেল, কোনো মানেই হয় না।”

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন