শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:৩৭
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সৌরভ হোসেন-এর ছোটগল্প ‘জাঁগ’

সৌরভ হোসেন / ৩১২৭ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই, ২০২৫

“খুঁচডা হক্ত কইরি পুঁতি দিস। শালোরা ত্যাখুন উপড়ি ফেলি দিবে।” পাড় থেকে হামলাল জলিল। নীচের জলে খটখট শব্দ তিড়বিড় করছে। বেটা হারুন ঠ্যাঙনাটা বলদের শক্তি দিয়ে কুঁত পেরে ঠুকছে। আর বিড়বিড় করছে, ‘কুনু শালার বাপের মুরেদ নাই যে তুইলি ফেলবে।’ ঝপাং করে একটা শব্দ তিড়িং করে উঠল! লুঙ্গি নেংটি মেরে ডুমনিটায় নেমে পড়েছে জলিল! এককুছা পচাজল ছ্যাৎ করে ছিটিয়ে ছ্যাড়ড়া হয়ে গেল! থির জল পিটপিট করে উঠল। জলিলও একগুন্ডা বাঁশের এগলে বগলে পুরে জলে পায়চারি করতে লাগল, “আজ মকা পেয়িচি, গুটা পচানডাই দখল কইরি লিব। গ্যালো বচ্ছর অ্যাক রাইত দেরি হবার লেগি অ্যাকটা জাঁগ দ্যাওয়ারও জাগা পাছুনু না। সব কাঁচাপাট, কাদামাটি ঘাসবুন আর লড়িখড়িতে ভত্তি ছিল। য্যানে পানি লয়, কাদাঘাসের আচ!”

হুড়মুড় করে বাঁশের এগলেগুলো হাত ফসকে জলে পড়ে গেল। একটা এগলে ফলা হয়ে জলিলের পায়ের পাতায় পড়ল। রক্ত না বেরোলেও আঘাতে টাটিয়ে উঠল রগ-মাংস। আলতো করে ‘ইস’ করে উঠল জলিল। “কী কইচ্চ! দ্যাশ-দুনিয়ার লোক ডেকি ফ্যাচাং বান্ধাবা নাকি? অ্যাক্ষুনি লোকজন চলি আসলে সব খাটুনি পণ্ড হবে। ত্যাখুন অতগুলেন জমির পাট কতি জাঁগ দিবা? তুমার মাথায়?” খচে উঠল হারুন। বাপটাকে তেড়েফুড়ে গেল। সে ঠারে ঠারে জানে পচান দখল করা কত ঠাপের কাজ। গত বছর এই পচান দখল করতে গিয়েই মাঠপাড়ার হাসান খুন হল! ছোড়া যেমন ছিল তাগড়া তেমন ছিল গোস্তবান। ডাহুক চোখে ছিল ষাঁড়ের রাগ। তবুও লাঠির বলে পেরে ওঠেনি। হেঁসোর এক কোপেই গদ্দনটা ঝুলে গেছিল। বেটার ধমকে জলিল দম মেরে গেল। ঘোলা চোখ ঘুলঘুল করে ঠাহর করল, ছেলে ঠিকই বলছে। এ বছর মেঘে বৃষ্টি কম। খরানির বছর। মাঠ-ঘাটে কোথাও ছৌচ করার জলও থিতিয়ে নেই। এত মাঠান পাট লোকে কোথায় জাঁগ দিবে! নদীটাও শুকিয়ে হাড়। যা চুড়ুক জল আছে তাতে আর কতগুলো জাঁগ দেওয়া যাবে! তাছাড়া নদীটা এখান থেকে অনেকখানি দূরে। গাড়ি ভাড়া করে পাট বয়ে নিয়ে গেলে অনেক খরচ। অ লাভের গুড় পিঁপড়েতে খাওয়ার মতন হবে। দেনাদুনি কিচ্ছু শোধ করা যাবে না খ। তার চেয়ে এই নিচু ডুমনিটার অর্ধেকটা দখল করে নিলেই নিশ্চিন্ত। জমি থেকে মাথায় করেই পাট বয়ে আনা যাবে। জবজবে করে ভেজা নেংটির কাপড়টা কেলঠে চামড়া হয়ে গেছে। বাবলার গুঁড়ির মতো কালো কুচকুচে শরীর জলিলের। দুবলাপাতলা গতরের ঝুন মাংস হাড্ডি কামড়ে আছে। চামটা পেটে হাঁ করে আছে অভাব। সংসারের এই অভাবকেই জলিল ঠাট্টা করে বলে, ‘এঁঠেলের আঠা’। গা থেকে ছাড়তে চায় না। ভক করে আঁশটে গন্ধর ছিটা লাগল নাকে। পচাজল আর ভুড়ভুড়ি কাদার সোঁদাগন্ধ খেটনে শরীরটায় লেপ্টে গেল। মাটির দেহ আরও মাটি হয়ে উঠল। চাষাভুষা গতরটা যেন এক ছটাক খেতি। গায়ে এই কাহনের গন্ধ লাগে বলেই তো দুনিয়ার মানুষ দুটো খেতে পায়। জমিন ফসল বিয়োই। আর আল্লাহর আসমান খিলখিল করে হেসে রাতের জ্যোৎস্না পাঠায়। মেঘ ভরে ওঠে। সে ভরা মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরান আল্লাহর ফেরেশতা মিকাইল। “কই দেখি, আরেকটা এগলি দ্যাও।” হাত বাড়াল হারুন। এক বুক জলে দাঁড়িয়ে আছে একজন কালবাউস জোয়ান। সে জোয়ান শরীরে দাঁত কামড়ে লেগে আছে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বুকের ঝোপ লোমগুলো থেকে টপটপ করে জল চোয়াচ্ছে। ঘুলঘুল করছে এক খামচা মুখের পরে টিপটিপে চোখ। ঘাড়ের পিছনে কালো চুলের হিপ্পি। খচখচে কালো গোঁফ। বাপকে মাথায় টপকে গেছে ক-বছর আগেই। নিজেও বাপ হয়েছে। সে বছর আবাদপানিও ভালো হয়েছিল। গোলা ভরে গেছিল ধানে। নাতির জন্মে সুখ এসেছিল ঘরে। সে বছর জলিল খুশিতে বড় মিলাদ দিয়েছিল। ফকির-মিশকিনকে পেট ভরে খাইয়েছিল। কাঠা ভরে ধান দান করেছিল।

এক বুক জলে দাঁড়িয়ে খুঁটি পুঁতা চাড্ডেখানি মদ্দানি নয়। জলে শরীর হালে। কাদাতে পা হড়কে যায়। তার ওপর আবার হ্যালাব্যালা করে পুঁতলে হবে না। গাব্দা করে পুঁততে হবে। আচাঁছা এগলেটার খেঁকলে গিঁটে ঠ্যাঙনাটার ঘা দিয়ে ঠুকতে লাগল হারুন। খটখট আওয়াজ অন্ধকার দাপাতে লাগল। যেন জমিনের আওয়াজ নয়, আশমানের মেঘ ফাটছে! “আস্তে ঠুক। লোকে টের পেয়ি যাবে!” চোখ পাকিয়ে উঠল জলিল। মনে মনে অন্ধকারকে গালি দিল, “শালার আন্ধারে মজাক করা খট শব্দও দুম করি ওঠে!” এ বছর শকুনের মতো সবার চোখ এই ডুমনিটার ওপর। এই সারিতলার মাঠে কম করে বিঘে ষাটেক পাট আছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই গাছাপাট আকাশে চোখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। আর কাছে-পিঠে পাট পচানোর জায়গা বলতে গেলে এই এঁধো ডুমনিটাই। কপালের চুল চুঁইয়ে টসটস করে পচাজল মুখে সেঁধিয়ে যাচ্ছে হারুনের। কষটে স্বাদে জিবটা ভেংচালো না হারুন। কাদা কাদা স্বাদ আজ নতুন তো নয়? মুনিশ শরীরটার নাড়ি-ভুঁড়ি, রগ-রক্ত, হাড়-মজ্জার এই স্বাদ যে আজন্ম সহা। জুবুথুবু চুলগুলো চুপসে মাথাটা নেড়া হয়ে গেছে হারুনের। যেন বেগুনের জমিতে পাখি তাড়ানোর জন্যে খুঁটিতে উপুড় করে বসানো চুনকালিমাখা মাটির হাঁড়ি। ঠক করে ঘা’টা পড়তেই থলবল করে নড়ে গেল খুঁচটা। “আব্বা, এগলেডাখে শক্ত কইরি ধর তো, লড়ি যাচ্চে।” বেটার ডাকে সাড়া দিয়েই হুড়মুড় করে এগিয়ে গেল জলিল। ভুড়ভুড়ে কাদায় তার খড়ি পা সেঁধিয়ে যাচ্ছে। নরম কাদাকে হুকের মতো আঙুল আঁকড়ে এগোল জলিল। এক হাতে এগলে আরেক হাতে টর্চ। “আব্বা তাড়াতাড়ি লাইডডা লিভাও।” “ক্যানে!” খরগোশের মতো কান খাড়া করল জলিল। “ওই দ্যাখো, আল দিয়ি কেডা আসচে!” বটতলার দিকে ইশারা করল হারুন। দপ করে টর্চটা নিভিয়ে দিল জলিল। এক থোকা অন্ধকার হুড়মুড় করে ছেকে ধরল ডুমনিটাকে। যেন আশমান নিভে গেল। বাপ বেটার কৌতূহুলি চোখ ভ্রূ টান করে আলোটাকে জরিপ করল, একটা আলো বটগাছের তলা দিয়ে এদিকে আসছে! জলিল ফিসফিস করে বলল, “কুন ব্যাটা এত্ত রাতে আসে!” হারুন গলা চেপে বলল, “শালোরা মুনে হয় পচান দখল কত্তিই আসচে!”

“যে লাটই আসুক, আমাধের দখলি খুঁচে হাত দিয়চে তো হাত মুচড়ি ভেঙি দিব।” তিড়িং বিড়িং করে উঠল জলিল। ডাড়স সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করল। কালহা পচাজলে কাদা শরীরটা রাগে লোহার শলাকার মতো তেতে উঠছে। “গ্যালো বচ্ছর এই পচান দখল কত্তে গিয়ি গায়ের গোস্ত পানি হয়ী গেলছিল। ই বচ্ছর কুনু বাহিঞ্চতকে অ্যাক ইঞ্চি জাগা ছাড়ব না। পাটগুলান ঠিক সুমায় না পচালে না খেয়ি মত্তে হবে। ধার দ্যানাতে গুটা গা ডুবি আচে।” বিড়বিড় করতে করতে কচুরিপানার ঝোপে ঝুপ মেরে গেল জলিল। মাথার উসকোখুসকো চুল আর কচুরিপানার এলেবেলে শেকড় মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। হারুনকে ফিসফিস করে বলল, “তুইও বাতরাজের ভেতর লুকি পড়।” “হু’ বলে ঘাড় লুকোল হারুন। দুজন মানুষ মূর্তির মতো থ হয়ে গেল। যেন দুটো জমাট আঁধার দাঁড়িয়ে আছে। শুধু চারটে চোখ পিটপিট করছে দূর আকাশের আধ নেভা আধ জ্বলা নক্ষত্রের মতো। সে আলোর রঙ অবশ্য এখনও নীল হয়নি। ঝোপের ভেতর পিটপিট করা জোনাকির মতো হলুদ সোনা। শব্দ বলতে গেলে জলের ভুড়ভুড়ি আর ঝিঁঝিঁ পোকার গান। আর ব্যাঙের কর্কশ ডাক। আচমকা একটা সাপকে তারার ক্ষীণ আলোয় ডাঙ্গা থেকে সড়সড় করে ডুমনিতে নামতে দেখে চিখড়িয়ে উঠল হারুন, “আব্বা সাপ!” “কই?” আঁতকে উঠে বুঁ করে ঘাড় ঘোরাল জলিল। ছানিপড়া ঘোলাটে চোখ ছো মেরে পরখ করল। তারপর গোঁফের ফাঁকে ফিক করে হেসে ফিসফিস করে বলল, “ঢুঁড় রে।” কচুরিপানার একটা ডগাকে সাপটার মুখের ছমুতে ফেলে ঠোঁট দিয়ে শিস কাটল -সি সি। শত্রুর আভাস পেয়ে রুট বদলাল হলহলে সাপটা। শুকনো পানার ভেতরে খড়মড় করে সেঁধিয়ে পড়ল। “হারু, তাড়াতাড়ি হাত লাগা।” ডাঙার দিকে ছুপ ছুপ করে যেতে যেতে বলল জলিল। ভুড়ভুড়ে কাদায় পুঁতে যাচ্ছে পা। গায়ে ঠেকছে বুদবুদের পচা ফ্যানা। কলমিলতার বুনো গাঁথনে গেঁথে আছে শ্যাওলার ঝোড়। কচুরিপানার বেগুনি-সাদা ফুল ডগায় লকলক করছে। জলিল সব ঠেলেঠুলে ডাঙায় উঠে পড়ল। ডাঙা জুড়ে ধনুকের মতো বেঁকে আছে ঢোলকলমির ডাল। মাথায় সাদা মাইকফুল। ফুলগুলি যেন কান খাড়া করে নীরবে শুনছে রাত্রির ফিসফিস। আর আশমানের খোদাকে শোনাচ্ছে দুনিয়াদারির কথা। জলিলের গা চুইয়ে ঝরছে পচাজল। জলে পরনের লুঙ্গিটা পোস্টারের মতো এমনভাবে সেটে গেছে দুই পাছাকে মনে হচ্ছে দুটো কালো কুচকুচে আব। “অইই হবে, উঠি আয়।” ব্যাটাকে ডাঙায় উঠতে বলল জলিল। ভেজা গামছাটা চিপে গা মুছল। সোঁদা গন্ধ ম ম করছে গায়ে। গামছাটা দিয়েও একটা বিটকেল গন্ধ বের হচ্ছে। সে গন্ধ হাওয়ায় আউরিবাউরি খেয়ে শিং ঢোকাচ্ছে চরাচরে। ডুমনির পাড়ে খুঁটল চোখ পিটপিট করে জলিল বলল, “কালকেই নামুডাঙ্গার ভুঁইডার পাটগুলান মাথায় করি বহি পচানে ফেলতে হবে। উ ভুঁইয়ে গরুর গাড়ি ঢুকবে না। অ্যাখুনও চাকার লিক পড়েনি। আসুকে বুলি রাখ। কালকে য্যানে কাহুর মুনিশ না যায়। এমনিতেই মুনিশের আকাল। ওদ খরানিতে পাটগুলান শুকি শুকি লালচে খড়ি হয়ী গেল বুলি। আর দু একদিন ফেলি রাখলে অ জ্বালান ছাড়া কিচ্ছু হবে না খ! পাটগুলান উঠি গ্যালেই ভুঁইডা কাদান কত্তে হবে। ধানের চারাগুলানও বড় হয়ী যাচ্চে। বেশি লেট কল্লে চারাতে গিঁট চলি আসবে। ত্যাখুন না হবে ধান না হবে পাতান। এমনিতেই বাতাল নামলা হয়ী গেল।”

দুই

‘উপড়ি ফেলব না তো পুজি করব? উ একা গুটা পচান দখল কইরি থুবে, পচানডা কি অর বাপের?’ জলিলদের বাপ-বেটার পুঁতা খুঁচগুলোর কয়েকটা পড়পড় করে তুলে ফেলে দিয়ে ডুমনির পাড়ে পাঁয়তারা করেছিল হেরেসতুল্লা। সে হাতাহাতি লাঠালাঠির জোগাড়। হেরেসতুল্লা মারার জন্যে লাঠিও তুলেছিল। তার চোখে-মুখে তখন ক্ষ্যাপা বলদের রাগ। এই শিং উঁচায় তো মাথা গোঁতায়। এই দাঁত খিঁচায় তো ঠ্যাং তুলে ল্যাং মারে। হারুনও সে শিং ঠ্যাং তুলে আছাড় মারার উদ্যোগি হয়। তার গায়েও তখন কালো বলদের বল। সেদিন আকাশও বিদ্যুৎ চমকিয়ে রাগ দেখিয়েছিল। সে রাগ অবশ্য বৃষ্টি হয়ে গলেনি। তড়পানোই সার হয়েছিল। শেষমেশ গায়ের কিছু মুরুব্বি মোড়লের মধ্যস্থতায় জলিল তার দখলে থাকা জায়গা থেকে দু-জাঁগ মতন জায়গা ছেড়ে দিলে ঝামেলাটার ফায়সালা হয়। অল্প জায়গাতেই গুতিয়ে গুতিয়ে চারটে জাঁগ দেয় জলিল। জাঁগের কাঁধে জাঁগ। একটা আধমরা ডুমনির আজ কত দেমাগ। পাট পচানের মরসুমটা চলে গেলে অবশ্য বুনজঙ্গলে ভরে যাবে। তখন মাঠে প্রাতঃ করা মানুষদের ছৌচ ছাড়া অন্য কোনও কাজে লাগবে না। সে জমা জলটুকু শুকিয়ে গেলে ছাগল গরু চরানোর চটান হবে। সে চটানে তখন কিছু বুনো ফুল ফুটবে। সে ফুলের ঘ্রাণে মাতাল হবে জমিন-আশমান। খিলখিল করবে হাওয়া।

ফ্যালফ্যাল করে দেখছে খুঁটল চোখগুলি। ভেড়ার লোমের মতো ফিনফিনে আঁশগুলো পচাজলে ল্যালপ্যাল ল্যালপ্যাল করছে। চাপান মাটির ঢ্যালাগুলো গলে ভুসভুসি কাদা। পাট জাঁগ দেওয়া আঠাশ দিন হয়ে গেল! গায়ের রক্ত জল করে জাঁগ দেওয়া পাটগুলো যে ছাড়াতে হবে তার কোনও হেলদোল নেই জলিলের। হারুন হদ্দিন কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করছে, ‘আব্বা, পাটগুলেন ছাড়ি লিতে হবে। সব ফেসি হয়ী গেল যে! মুনিশ দেখব?’ ‘আর কডাদিন থাক। দেখি, দরডা চাগচে কি না।’ দামের দোহায় দিয়ে পাট ছাড়ানোটাকে এভাবেই বার বার পেছনে ঠেলে দিয়েছে জলিল। কী আর করবে? বাজারে পাটের দাম একেবারে তলানিতে। মহাজনদের দাদনের টাকাগুলো শোধ করতে গিয়েই পাটচাষিদের ঝুলি ফতুর হয়ে যাচ্ছে। মাঠ মাঠ গাছাপাট অল্প দরের বিনিময়ে ঢুকে যাচ্ছে মহাজনদের আড়তে। রক্ত জল করা খাটুনির কোন কদর নেই। খাব কী! জলিলের মাথায় হাত, শেষে জমিজিরেত বিক্রি করেই না দেনা মেটাতে হয়! সে বিড়বিড় করছে, এই ল্যাওড়া আবাদ কত্তে গিয়িই ফেরাল হয়ী গেনু। গ্যালো বচ্ছর ধার দ্যানা শোদ কত্তি গিয়িই শিষতলার ভুঁইডা বন্ধক দিয়চি। সে ভুঁই এখুনও ছাড়াতে পারিনি। আর এ বচ্ছর পাটের দাম তো আরও পড়তির দিকে। ছেলিপুলি বৌ-বাচ্চা লিয়ি কী কইরি বাঁচব! ঘরে পাট ওঠার কথা। সে পাটের আঁশে শাসে নগদ টাকা ওঠার কথা। সে টাকায় বউয়ের পরনের কাপড়, বেটার বউয়ের কানের দুল আর নাতির হাতের আংটি হওয়ার কথা, উল্টে দোয়ারে এল অভাব। মাথায় চাপল দেনা। সে দেনার দায়ে না এবার ভিটেটাই বেচতে হয়!

কাঁচা খিস্তি দিল জলিল, “অ্যাখুন শালা পাটের দাম থাকবে না খ। আবার যেই চাষিধের সব পাট বিক্কিরি হয়ী আড়তে ঢুকি যাবে অমনি হুহু করি দাম চাগবে। ফুলিফেঁপি উঠবে আড়তদাররা। চাষি মলল কি বাঁচল, কেহু ভাববে না।” আর দেরি করল না জলিল। মুনিশ লিয়ি কী করব? রাইত দিন এক কইরি বাপ ব্যাটাতে ছাড়ি লিব। বলতে বলতে চাপানের কাদাগুলো হাত দিয়ে সরাতে লাগল জলিল। ভক করে একটা লতাপাতা পচা গন্ধ নাকেমুখে লাগল। ঝাঁপান বাঁধতে বাঁধতে হারুন বলল, “চাইপাড়ার মাধব মণ্ডলের সাথে পাকা কথা কহি লিইচি, সামনে বচ্ছর ভাগে ওল লাগাব।”

“ওল!” আকাশ থেকে পড়ল জলিল। ঘোলা চোখ থির করে বলল, “কিন্তুক সম্বচ্ছরের জ্বালানখড়ি? পাটখড়িগুলেন হয় বুলেই তো আখাটা জ্বলে? আমরা কি আর বড়লোকধের মুতন গ্যাস কিনি খাতে পারব? উ ছিলিন্ডারের গ্যাস কিনতে গিয়ি প্যাটের বুকের গ্যাস বেরহি যাবে।” হক কথাটা বলল জলিল। হাঁড়ির কথা কড়ির কথা। হারুন বলল, “পাটচাষ কল্লে ওই লড়ি খড়িই হবে, দড়ি আর হবে না। লুস্কানের ফসল ফলি কি ভাতে মরব?” জলিল পচানো পাটের একটা আঁটি বগলে পুরে ডাঙার দিকে টানতে টানতে আবারও বলল, “পাটখড়ি না থাইকলে আখাটা জ্বলবে কীসে রে! আখা জ্বলে বুলিই তো অ্যাখুনও দুনিয়ায় বেঁচেবর্তে আছি?”

গলা এঁটে আসছে জলিলের। শরীরটাকে পচানের পচা জলে পচিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে তার। চাষার শরীর আর খেতের ফসল আলাদা কিছু তো নয়? ধপাস করে ডুমনির পাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে পাটের আঁটির মতো জলে গড়ে গেল জলিল। ছেঁড়া লুঙ্গিটা জলের ভুড়ভুড়িতে লেপ্টে ত্যানা। পাগলের মতো জাগগুলোতে মাথা ঠুকতে লাগল সে। কোঁকড়ানো শরীরটা আরও কাদা হয়ে উঠছে। হারুন বেগতিক দেখে তড়াম করে লাফ মারল। দুই হাতের বল দিয়ে বাপটাকে চাগান দিল। জলিলের মুখটা তখন বেটার বুকে উঠলেও পাগুলো জলে ডুবে আছে। নেতানো শরীরটা আরও নেতিয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান নেই জলিলের। হারুন ডুকরে উঠল, “আব্বা…”। জলিল কোনও উত্তর করল না। তার জড়ানো ভেজা শরীর তখন পচানো পাটের মতো হিলহিলে হয়ে যাচ্ছে। সে গা থেকে বের হচ্ছে কাহনের পচা গন্ধ। হারুন গায়ের সব বল দিয়ে বাপটাকে ডাঙ্গায় তুলল। তার বাপের শরীর থেকে যে রক্ত তার শরীরে এসেছে এ বল সেই রক্তের। তার বাপের শরীর থেকে যে ওরস তার শরীরে এসেছে এ বল সে ওরসের। চোখে জলের ছিটা দিল হারুন। জাঁগের উপরে খাড়া কঞ্চিটায় বসা ফড়িঙের মতো ফিরফির করে নড়ে উঠল জলিলে বিড়ি খাওয়া পান খাওয়া লাল-কালো ঠোঁট। বলল, “আমিও পাটের মুতন পচি গ্যালে ভালো হয় রে হারু।”

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন