শনিবার | ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | বিকাল ৪:৩৭
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নির্বাচন পরবর্তী মিয়ানমার-রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সমস্যা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীচৈতন্যদেব গরুড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম বা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক : অসিত দাস বাসুদেব ঘোষের পদাবলীতে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মবৃত্তান্ত ও বায়ুপূরাণে অবতারত্ব বর্ণন : প্রবুদ্ধ পালিত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দোলউৎসব : রিঙ্কি সামন্ত পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (তৃতীয় পর্ব) : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ প্রসূতি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য বাঁকুড়ায় এলেন রবীন্দ্রনাথ : প্রবুদ্ধ পালিত এসআইআর-এর নামে ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ সরব দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ঘন ঘন কেঁপে উঠছে কেন : তপন মল্লিক চৌধুরী জহির রায়হান-এর ছোটগল্প অনমিতা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘কান্না হাসির দোলায়’ আ শর্ট ট্রিপ টু ‘জামশেদপুর’ : রিঙ্কি সামন্ত নয় টাকা কেজি দরে বারো লক্ষ টন আলু কিনবে রাজ্য সরকার : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় এআই ইমপ্যাক্ট সামিট নিয়ে প্রশ্ন অনেক উত্তর কম : তপন মল্লিক চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার বাবার রসবোধ : সৈয়দ মোশারফ আলী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ একটি বই যেভাবে বদলে দিয়েছিল তলস্তয়কে : সাইফুর রহমান কেন্দ্রের দ্বিচারিতায় দীর্ঘ আট বছরেও পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ হল না : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আলুর পর্যাপ্ত ফলন, প্রান্তিক চাষিদের জন্য হিমঘরে ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নরেন্দ্রনাথ মিত্র-র ছোটগল্প ‘সেতার’

নরেন্দ্রনাথ মিত্র / ২৭২৮ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৬ জুলাই, ২০২৫

শ্বশুর শাশুড়ী উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নীলিমা বসবার টুলটাকে স্বামীর বিছানার আরো কাছে এগিয়ে নিয়ে এল। তারপর তার শীর্ণ হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিয়ে বলল, ‘একটা কথা বলব শুনবে?’

সুবিমল স্নান একটু হাসল, ‘কেন শুনব না বলো।’

নীলিমা বলল, ‘আগে কথা দাও আপত্তি করবে না, রাগ করবে না।’ সুবিমলের দুপাশে সারে সারে আরো চোদ্দ-পনেরটি বেড। রোগী আর তাদের দর্শনার্থী আত্মীয় স্বজনের ভিড়ে হাসপাতালের এই ঘরটি ভরে উঠেছে, নীলিমার গলার স্বরে কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে তার দিকে তাকাল। কিন্তু নীলিমার কোন খেয়াল নেই, ভ্রূক্ষেপ নেই কারো দিকে। স্বামী-সম্ভাষণের এমন উপযুক্ত ক্ষেত্র এমন নিবিড় অবকাশ যেন আর কোন দিন সে পায়নি।

সুবিমলের হাতে আর একটু চাপ দিল নীলিমা, বলল, ‘রেখা বউদির কথা মনে আছে তোমার? আমার মামাত ভাই নীরদদার বউ। তিনি কাল এসেছিলেন আমাদের বাড়ী। বললেন, এক দিন হাসপাতালেও আসবেন তোমাকে দেখতে। রেখা বউদিরই পিসেমশাই হন সম্পৰ্কে রায় সাহেব পি, এন, বিশ্বাস। তাঁরই ছোট ছোট দুটি নাতনীকে বিকেলে গিয়ে গান শেখাতে হবে।

রেখা বউদি বলছিলেন আমি যা জানি তাতেই চলৰে৷ টাকা পঁচিশেক তো ওঁরা দেবেনই, বেশিও দিতে পারেন।

সুবিমল আস্তে আস্তে বলল, ‘কুটুথ-স্বজনের বাড়ীতে শেষ পৰ্য্যন্ত গানের মাষ্টারীও গিয়ে করতে হবে তোমাকে?’

নীলিমা বলল, ‘আহা-হা ভারি তো মাষ্টারী, মাষ্টারী করবার মত গান যেন আমি জানি। আর কুটুম্বও তো খুব। মামাতো ভাইয়ের পিসে-শ্বশুর। তাঁর কাছ থেকে টাকা নিলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না, বরং এক হিসেবে লাভ আছে। প্রথমেই একেবারে অজানা-অচেনার মধ্যে গিয়ে পড়বার ভয় নেই।’

সুবিমল বলল, ‘কিন্তু বাবা মা কি রাজী হবেন?’

নীলিমা জবাব দিল, ‘সে জন্য ভেব না। এক রকম নিমরাজী তাঁরা হয়েছেন।’

সে ভার আমার ওপর,

সুবিমল বিস্মিত হল না। যে শ্বশুর-শাশুড়ী বিয়ের পর মাত্র কয়েকটি মাসের জন্য পুত্রবধূকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিতে দেননি, ছেলের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলা-মেশায় আপত্তি করেছেন তাঁরাও যে আজ নীলিমাকে অর্থ উপার্জনের অনুমতি দিতে পারেন, একথা সুবিমলের কাছে আজ অবিশ্বাস্য মনে হোল না, এই বছর দুয়েকের মধ্যে তাদের সংসারে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। থাইসিসে আক্রান্ত হয়ে সে এসেছে যাদবপুরের এই হাসপাতালে, প্রথম বছর ফ্রী-বেড মেলেনি। চিকিৎসার খরচ বাবদ মোটা টাকা লেগেছে মাসে মাসে। বুড়ো বাপ দেশী একটা মার্চেন্ট অফিসে হিসেব লিখেন, অসুখ-বিসুখ দূরের কথা, সংসারের দৈনন্দিন অনেক খরচই তাঁর হিসেবের বাইরে গিয়ে পড়ে। ইদানীং সুবিমলের চাকরিই ছিল ভরসা। তাই অসুখের প্রথম ধাক্কাতেই তাঁকে হাত দিতে হয়েছে স্ত্রী আর পুত্রবধূর গয়নায়, হাত পাততে হয়েছে স্বজন-বন্ধুদের কাছে। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা অগণ্য নয়, ধার দেওয়ার ক্ষমতারও সীমা আছে। বাসন-কোসন গেছে, সামান্য আসবাবপত্র অদৃশ্য হয়েছে, তবু রোগ রেহাই দেয়নি।

সংসারের খরচা কম নয়, ভাই-বোনেই সুবিমলেরা ছটি। ভাগ্যের ফেরে মাঝখানেই পর পর ছুটি অনুঢ়া বয়স্থা মেয়ে, কন্যাদায়ের চিন্তা ছাড়া বাপ-মায়ের আর কিছু তারা বাড়াতে পারেনি, ছেলেরা এখনো স্কুলে নীচের ক্লাসে পড়ে৷

তবু অনেক চেষ্টা-চরিত্র ধরাধরির ফলে মাস কয়েক হোল হাসপাতালে সুবিমলের জন্য ফ্রী-বেডের ব্যবস্থা হয়েছে, বড় রকমের খরচ কিছু লাগে না। কিন্তু দু-একটা ওষুদের দাম আর টুকটাক হাতখরচ বাবদ ফী মাসেই পঁচিশ-ত্রিশ টাকা দরকার হয়। সুবিমল জানে, এই কটি টাকা পাঠাতেও বাপের সাধ্য আর এখন নেই, কিছু কাল ধরে নিজের ব্যবস্থা নিজেই তাই তাকে করতে হচ্ছে। কলকাতার বন্ধুদের কারো কাছে হাত পাততে আর বাকি নেই। ইদানীং তাদের কাছ থেকে টাকা আর সে চায় না, চাম্ন ঠিকানা। বন্ধুর বন্ধু তথ্য বন্ধুরা সারা ভারতবর্ষ ভরে কে কোথায় আছে, কে কোথায় ভালো চাকরি করছে।

অনেকেই চিনতে পারে না, অনেকের কাছ থেকেই জবাব পাওয়া যায় না। সকলে সমান নয়, কেউ কেউ আবার দেয়ও। ভরসা দেয় থাইসিস রোগটা আজকাল আর এমন কিছু মারাত্মক নয়, বিশেষ ও গোড়াতেই যখন ধরা পড়েছে। কেউ কেউ দু-এক মাস পাঁচ-দশ টাকা পাঠায়, কিন্তু তারপর হয় আর তাদের সাড়া মেলে না, না হয় অত্যন্ত হাত-টানাটানির খবর আসে।

এমনি দু-তিনখানা চিঠি স্বামীকে দেখতে এসে গতবার নীলিমার হাতে পড়েছিল।

সুবিমল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তাঁরা যদি রাজি থাকেন তবে আর কি, অন্যের কাছে থেকে ভিক্ষে নেওয়ার চেয়ে তোমার রোজগার আমি সহজ ভাবেই নিতে পারব।’

নীলিমার চোখ ছলছল করে উঠল, ‘অমন করে বলো না।’

স্ত্রীর সেই জলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সুবিমল কি যেন দেখল; তারপর কোমল কণ্ঠে বলল, ‘মান-অপমানের কথা নয়, আমি ভাবছি তোমার শরীরের কথা, সংসারের অত খাটুনির পরে আবার কি গান শেখানোর পরিশ্রম দেহে সইবে? দুদিনও তো শরীর টিকবে না তোমার।’

নীলিমার মনে পড়ল অফিসের কাজের পরে স্থবিমল যখন টিউশানিতে বেরুত নীলিমা ঠিক এই ধরণের কথাই বলত, স্বামীর স্বাস্থ্য ভেঙে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করত, সেই আশংকাই আজ নিষ্ঠুর সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন সুবিমলের মুখে সেই কথা, নীলিমার স্বাস্থ্যের জন্য ঠিক তেমনি ধরণের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্বামীর মনে। এমন কি হয় না, নীলিমার মত সুবিমলের আজকের এই উদ্বেগ আর আশংকাও এমনি সত্যি সত্যি ফলে যায়। আর সুবিমল সঙ্গে সঙ্গে ভালো হয়ে ওঠে। তাহলে বেশ মজা হয়, তাহলে নীলিমা উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে পারে স্বামীর ওপর৷

হুবিমল বলল, ‘হাসছ যে।’

নীলিমা বলল, ‘হাসছি তোমার কথা শুনে, আমার আবার শরীর! তার জন্য তোমার এত ভাবনা!’

সুবিমল বলল, ‘অত বিনয় ভালো নয়। তোমার শরীরের জন্য ভাবব না, তোমার মনের জন্য ভাবব না তবে ভাবব আর পৃথিবীতে কিসের জন্য?’ স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে সুবিমল অদ্ভুত একটু হাসল।

নীলিমার মুখে কেমন যেন একটু ছায়া পড়ল৷ কিন্তু পরমুহূর্তে সে-ও হাসিমুখে জবাব দিল, ‘কিছু ভেব না, তোমার কথা আমার মনে থাকবে।’

হুবিমল মুছ একটু হাসল, ‘তাই থাকলেই হোল৷

ভরসায় আমার দরকার নেই।’

এর চেয়ে বেশি কালীমোহন তবু আমতা আমতা করলেন, বললেন, ‘লোকে কি বলবে।’

মনোরমা বললেন, ‘আর সে সব কথা যদি আমার সুবুর কানে যায় তাহলে তারই বা কেমন লাগবে।’

অতি দুঃখে নীলিমার হাসি পেল। স্বামী শ্বশুর শাশুড়ী সকলের মনে সেই একই প্রশ্ন, সেই একই বিপদের আশংকা। অভাব অনটন সমস্ত সংসারকে গিলে ধরেছে কিন্তু স্থির আছে সেই অবিশ্বাস, সেই কুটিল সংশয়-প্রবণতা।

নীলিমা জবাব দিল, ‘অত ভাবছেন কেন মা, আজকাল কত মেয়েই তো এমন করছে। এতে নিন্দার কিছু নেই। আর নিন্দা-বন্দনার দিকে কান দেওয়ার এই কি আমাদের সময়?’

অন্য কোন সময় হলে পুত্রবধূর মুখে এই সব ছাপার অক্ষরের বড় বড় কথা মনোরমা সহ্য করতেন না, কিন্তু এখন চুপ করে রইলেন।

রেখাই প্রথম পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ভার নিল। নির্দিষ্ট দিনে এসে বলল, ‘চল ঠাকুরঝি।’

পায়ে পুরোনো একজোড়া স্যাণ্ডাল, পরণে অনেক কাল আগের রঙ ফিকে হয়ে যাওয়া একখানা শাড়ি। রেখা তার দিকে তাকিয়ে কি যেন বলি বলি করে চুপ করে গেল।

নীলিমা শ্বশুরের সামনে গিয়ে বলল, ‘তাহলে আসি বাবা।’

কালীমোহনের কণ্ঠ আর্দ্র হয়ে এল, বললেন, ‘এসো মা। নিতান্ত দুরদৃষ্ট নাহ’লে কুললক্ষী তুমি, তোমাকে আজ বেরোতে হয় টাকার চেষ্টায়!’

নীলিমা বলল, ‘কিন্তু এ সময় ঝি-গিরিতেও যে আমার অপমান নেই বাবা।’

কালীমোহন বললেন, ‘তবু আমি বেঁচে থাকতে—’

নীলিমা মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আপনি বিচলিত হবেন না বাবা।’

কালীমোহন বললেন, ‘না, আর বিচলিত হব কেন। আশীর্ব্বাদ করি তোমার কষ্ট যেন সার্থক হয়।’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘খুব দেখে-শুনে সাবধান মত চল মা।’

রেখা হেসে বলল, ‘বউকে বুঝি খুব দূর দেশে পাঠাচ্ছেন তায়ৈমশাই৷ ভবানীপুর থেকে কালীঘাট— ট্রামের মাত্র গোটাকয়েক ষ্টপেজ, তাতেই ভেবে এত সারা হচ্ছেন! ভয় নেই, ঘণ্টাখানেক বাদেই আপনাদের বউকে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’

রায় সাহেবের এ-বাড়িতে কি একটা বিয়ের নিমন্ত্রণে নীলিমা এর আগে আরো একবার এসেছিল। কিন্তু সে আসায় আর এ আসায় পার্থক্য অনেক। বাড়ির ভিতরে ঢুকতে গিয়ে নীলিমার পা যেন হঠা আর এগুতে চাইল না, মন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে উঠল।

রেখা বলল, ‘কি ব্যাপার, অত ভাবছ কি? দিন-রাত অমন ভাবনা কিন্তু ভালো নয়।’

সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের কথা মনে পড়ল নীলিমার, মনে পড়ল স্বামীর রুগ্ন শীর্ণ মুখ, নিজেদের নিঃসম্বল দীনতার কথা

নীলিমা একটু হাসতে চেষ্টা করল, বলল, ‘সে কথা ঠিক। চল।’ রেখার পিসীমা পিশে মশাই নীলিমাদের সাদরে বাড়ির ভিতরে ডেকে নিয়ে গেলেন।

রায় সাহেব বললেন, ‘কোন সংকোচ কোরো না।’

কাত্যায়নী বললেন, ‘বাঃ, সংকোচ আবার কিসের। এ কি পরের বাড়িতে এসেছে না কি।’

পরিবারের অন্য সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন কাত্যায়নী। সুদর্শন স্বাস্থ্যবান্ পুত্র, সুন্দরী পুত্রবধূ, সাত-আট বছরের চঞ্চল সপ্রতিভ দুটি মেয়ে, চমৎকার দেখতে।

কাত্যায়নী বললেন, ‘এরাই তোমার ছাত্রী নীলিমা— অগ্নু আর মঞ্জু, ভালো নাম কৃষ্ণা আর কাবেরী। পরিচয়ের সময় সঙ্গে সঙ্গে ভালো নাম দুটিও আমাকে ব’লে দিতে হয়, না হলে ফল ভালো হয় না।’ কাত্যায়নী হাসলেন।

দোতলার দক্ষিণ দিকের একটি ঘরে নীলিমাকে নিয়ে এলেন কাত্যায়নী। মেঝের ওপর দামী গালিচা পাতা। এক দিকে বাজনার নানা সরঞ্জাম ডুগি-তবলা, ছোট-বড় গুটি তিনেক সেতার নীল রঙের ঢাকনিতে ঢাকা।

কাত্যায়নী বললেন, ‘সপ্তাহে দুদিন ওস্তাদ আসেন অঞ্জু আর মঞ্জুকে সেতার শেখাবার জন্য। সেই সঙ্গে সঙ্গে ওদের বাপও শেখে। খুব ভালো সেতার বাজায় আমাদের থোকা, এক দিন শুনো।’

নীলিমা বলল, ‘গান-বাজনার দিকে সকলেরই বেশ ঝোঁক আছে এ-বাড়ীতে।’

রায় সাহেব পিছনে পিছনে এসেছিলেন। হেসে বললেন, ‘তা একটু আছে। পেশার আমরা চামার হ’লে হবে কি মা, নেশাটা সকলেরই একটু মোলায়েম।’

সহরতলীতে রায় সাহেবের ট্যানারী খ্যাতিলাভ করেছে।

সুমিতা বলল, ‘বাবাও বেশ চমংকার ডুগী তবলা বাজাতে পারেন।’

ভূমিকা হিসাবে হারমনিয়ম বাজিয়ে খান দুই গান গাইল নীলিমা। খুব ভালো জমল না। দু-এক জায়গায় তালও কাটল। রায় সাহেব কুঁচকালেন।

রেখা ননদের দোষ ক্ষালনের চেষ্টা করে বলল, ‘অনেক দিন ধরেই তো চর্চা নেই কি না।’

কাত্যায়নী বললেন, ‘থাকবার কথাও তো নয়৷ এখন রয়েছে।’ নীলিমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘সব মনের যে শাস্তিতে আমরা শুনেছি মা রেখার কাছে। কেমন আছে আজকাল সুবিমল? সত্যই ভারি কষ্ট হয় তোমার শ্বশুরেরর কথা ভেবে। এ বাজারে সংসারের খরচ চালিয়ে আবার হাসপাতালের খরচ জোগানো কি সহজ কথা! আর এ হল একেবারে রাজা-রাজড়াদের ব্যাধি। রীতিমত রাজসূয় যজ্ঞ।’

নীলিমার গুণের চেয়ে, তার প্রয়োজন, স্বামীর অসুস্থতার অর্থ সাহায্যের কথাই যে ওঁরা বেশি বিবেচনা করেছেন একথা নীলিমাও বুঝল, ওঁরাও বুঝিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলেও মনের মধ্যে কোথায় যেন একটু বিধতে লাগল নীলিমার।

ফেরার পথে রেখা বলল, ‘গান-বাজনাটা তোমাকে আরও একটু ভালো করে চর্চা করতে হবে ভাই।’

নীলিমা গম্ভীর ভাবে বলল, ‘তা তো হবেই।’

রেকর্ড রেডিয়ো

ওস্তাদ রেখে গান-বাজনা শেখার সুযোগ নীলিমা কোন দিন পায়নি, গরীব বাপের পক্ষে সে ব্যবস্থা করা সম্ভবও ছিল না। শোনা বিদ্যা। স্কুলে গানের ক্লাসও মাঝে মাঝে দু-এক বছর হত, মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যেত। মাইনে উঠত কম। স্কুলের তহবিলে কুলোত না, নিজের উদ্যম উৎসাহেই যা কিছু শিখেছিল নীলিমা। শ্বশুরবাড়ীতে এসে সব আবার চাপা পড়ে গিয়েছিল। শ্বশুর-শাশুড়ী জিনিসটা বিশেষ পছন্দ করতেন না, সুবিমলেরও যে এদিকে খুব সাধ-আগ্রহ ছিল তা নয়। তার পর এই ছ-বছর ধরে গানের কথা ভাববার নীলিমার ইচ্ছাও হয়নি, সময়ও হয়নি। আজ হল— সখ নয়, আনন্দ নয়, প্রয়োজন আর পেশা। একটু অভ্যাস করে না গেলে ছাত্রীদের কাছে মান থাকবে না, এমন কি চাকরি যেতেই বা কতক্ষণ। কিন্তু চাকরি গেলে চলবে না নীলিমার। যেমন করেই হোক স্বামীর হাসপাতালের খরচ তাকে সংগ্রহ করতেই হবে। পরিচিত অর্দ্ধ-পরিচিতদের কাছে আর তাঁকে সে ভিক্ষা করতে দেবে না। তার চেয়ে নিজে ভিক্ষা করবে সেও ভালো।

বাড়ির অন্য কেউ উঠবার আগে খুব ভোরে উঠে গলা সাধতে বসে নীলিমা। দিন ভরে চলে সংসারের কাজ। দুপুরে কোন কোন দিন অবসর পেলে গানের সঙ্গে হারমনিয়ম বাজিয়ে হাত আর গলাটাকে চোক্ত রাখে, বিদ্যাটাকে একটু ঝালিয়ে নিতে চেষ্টা করে নীলিমা। যেদিন সকাল সকাল খাওয়া দাওয়া শেষ হয়ে যায় সে দিন রাত্রেও আসর বসে নীলিমার ঘরে। দুই ননদ শাস্তি আর সুধা এসে জোটে, বলে, ‘বউদি, আমরাও শিখব, আমাদেরও শিখিয়ে দাও ভালো করে। তার পর তোমার মত বেরোব টিউশানিতে তিন গুণ টাকা আসবে ঘরে।’

মনোরমা মাঝে-মাঝে ধমক দেন, ‘কি যে তোরা আমোদ-আহলাদ গান-বাজনা করিস, তোরাই জানিস। এত স্ফূতি যে তোদের কি দেখে আসে তাই ভাবি। বাছা আমার হাসপাতালে ভুগছে আর বাড়ীতে তোরা দিব্যি গান-বাজনায় আনন্দ সোহাগে দিন কাটাচ্ছিস। যে শোনে সেইতো অবাক্ হয়ে যায়।

বেদনায় নীলিমাও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে। তার পর ঘরে এসে তাকায় দেয়ালে টাঙানো স্বামীর ফটোখানার দিকে। মনে অদ্ভুত বল পায় নীলিমা, মুখে হাসির আভাস দেখা দেয়৷ যে যাই বলুক কিছুতেই কিছু এসে যাবে না তার; সে তো জানে আমোদ-আহ্লাদ কিসের জন্য। তার বিদ্যা আজ কোন্ কাজে লাগছে, কি ভাবে সাৰ্থক হ’তে চলেছে সে তো জানে, বিমল তো জানে।

‘জানো তো? না তুমিও জানো না?’

ফটোখানাকে জিজ্ঞাসা করে নীলিমা। জবাব শোনবার জন্য দেয়াল থেকে লেখা না পেড়ে নিয়ে এসে অধীর আবেগে নিজের ঠোঁটের ওপর চেপে ধরে।

রায় সাহেবের ছেলে পুরন্দর একদিন সেতার বাজিয়ে শোনাল সবাইকে।

অঞ্জু বলল, ‘আমাদের নীল মাসিও বাজাতে জানেন বাবা। সেদিন তোমার সেতার নিয়ে।

পুরন্দর বলল, ‘তাই না কি। আপনার যে এমন চুরি করার অভ্যাস আছে তা তো আগে বলেননি।

নীলিমা লজ্জিত হয়ে বলল, ‘বলবার মত কিছু নয়।’

পুরন্দর বলল, ‘সে কথা ঠিক। চুরি কেউ বলে-কয়ে করে না। কিন্তু ধরাই যখন পড়ে গেছেন তখন তো একটু না শুনিয়ে পারবেন না।’ নীলিমা ভারি বিব্রত হয়ে পড়ল, ‘বিশ্বাস করুন, সত্যি কিছু জানিনে আমি।’

পুরন্দর নীলিমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল, বলল, ‘আপনার অতখানি অনভিজ্ঞতা বিশ্বাস করা সত্যি শক্ত।’

নীলিমা বলে, ‘সেটা আপনার বিশ্বাস করার শক্তির ওপর নির্ভর ছেলেবেলায় একবার শুরু করেছিলাম, তারপর আর হয়ে

করে। উঠল না।’

পুরন্দর বলল, ‘বেশ তো এবার হবে। তখন সুরু করেছিলেন, এখন শেষ করবেন। আমাদের ওস্তাদজী নারায়ণ ত্রিবেদীর সঙ্গে তো আপনারও পরিচয় হয়েছে, তাঁর কাছেই তো শেখার ব্যবস্থা ক’রে নিতে পারেন।’

নীলিমা বলল, ‘এক একবার অবশ্য এ কথা আমিও ভেবেছি। সেতারের ট্যুইশানে শুনেছি টাকাও বেশি পাওয়া যায়।’

পুরন্দর যেন একটু আহত হয়ে বলল, ‘টাকা! ও, ভারি দুঃখিত। সে কথা আমার মনে ছিল না।’

জবাবে নীলিমা মৃদু একটু হাসল।

বহু অনুরোধ উপরোধেও নীলিমা সে দিন সেতারে হাত দিল না। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে ট্রামে পুরন্দরের পরামর্শটা ভার কেবলি মনে পড়তে লাগল। সেতার শিখবার সত্যিই ভারি সাধ ছিল তখন। কিছু দিনের জন্য এক জন সৌধীন অল্পবয়সী দুটি স্বামী-স্ত্রী নীলিমার বাড়ির একতলায় দুখানা ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। তাঁদের ছিল একটি সেতার। নীলিমা সেই বউটির কাছে সবে শিখতে শুরু করেছিল। হঠাৎ এক দিন ওদের সঙ্গে কলের জল নিয়ে দারুণ ঝগড়া হয়ে গেল নীলিমাদের। তাঁরাও রাগ করে বাড়ি থেকে উঠে অন্য কোথায় চলে গেলেন। তারপর নীলিমা অনেক চেষ্টা করেছে সেতারের জন্য, কিন্তু কিছুতেই সুযোগ হয়ে ওঠেনি। ক্রমে মা অসুখে পড়লেন, বাবার পুরোনো ভালো চাকরিটা গেল, কম মাইনের নতুন এক অফিসে ঢুকতে হল তাঁকে। সেতারের কথা নীলিমা ভুলেই গেল।

ছাত্রীদের গান শেখাতে এসে আবার চোখে পড়ল সেই সেতার। বাজাতে দেখল অঞ্জু-মঞ্জুকে। কয়েক দিন রইল লোভ সম্বরণ করে, শেষে এক দিন হাত দিয়ে বসল যন্ত্রে। আঙুলের ছোঁয়ায় ঝঙ্কার দিয়ে উঠল তার, তার চেয়েও বেশি ঝঙ্কার লাগল নীলিমার হৃদয়ে!

কৃষ্ণা আর কাবেরী উদ্বেলিত হয়ে উঠল, ‘ও মা, দেখ এসে। নীল মাসী’

সেতার রেখে নীলিমা তাড়াতাড়ি ঠোঁটে আঙুল ছোঁয়াল, চুপ,

মাঝখানে ছতিন দিন গিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করে এল নীলিমা। তারপর নতুন ইংরেজী মাসের পয়লা তারিখে গিয়ে বলল, ‘হাত পাত।’ সুবিমল অনুমান করল জিনিষটা, তবু বলল, ‘হাত কি আজ এই প্রথম পাতব?’

নীলিমা বলল, ‘প্রথম ছাড়া কি। তোমরা কি কিছু পাততে জানো? কারও আমরা পাতি, হাতও আমরা পাতি।’

তিন খানা নতুন দশ টাকার নোট ব্লাউজের ভিতর থেকে বের করে স্বামীর হাতে নীলিমা গুজে দিল। আঙুলে আঙুলে মেশামেশি করে রইল খানিকক্ষণ। ঝঙ্কারটা সেতারের চেয়ে কম হল না।

নীলিমা বলল, ‘পুরস্কার দেবে না?’

হুবিমল বলল, ‘দেব। ডক্টর কর বলছিলেন, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছি। মাস তিনেকের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাব।’ একটু থেমে সুবিমল স্ত্রীর আনন্দে উচ্ছল দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অন্য কোন পুরস্কার তো এখন আর হাতে নেই।’

নীলিমা বলল, ‘মনে থাকলেই হবে।’

প্রথম প্রথম কিছু দিন বার-তের বছরের দেবর হুকোমল আসত নীলিমার সঙ্গে। রায় সাহেবের বাড়ির কাছাকাছি এসে ফিরে যেত। ফেরার পথে আবার এসে দাঁড়াত ট্রাম ষ্টপেজটার কাছে। দিন কয়েক পরে নীলিমা তাকে রেহাই দিল। বলল, ‘থাক, আর তোমাকে পথ দেখাতে হবে না সুকু। তুমি তোমার পড়া করো গিয়ে!’

সুকু রসিকতা করে জবাব দিত, ‘ভয় ক’রবে না তো বউদি? হারিয়ে যাবে না তো?’

নীলিমা সস্নেহে দেবরের গাল দুটি টিপে দিয়ে জবাব দিয়েছিল, ‘ন গো না, হারাই-ই যদি খুঁজবার লোক তো আমার রয়েইছে?’

গান শিখিয়ে ফেরবার সময় নীলিমাকে পুরন্দর আজ বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিল, বলল, ত্রিবেদীজীকে আমি বলেছিলাম। ‘তিনি রাজী হয়েছেন।’

নীলিমা একটু হাসল, ‘কিন্তু আমি যে রাজী হব একথা আপনি কি করে জানলেন?’

পুরন্দর বলল, ‘রাজী হ’লেই তো লাভ৷ না হয়ে লাভ কি?

নীলিমা বলল, ‘আপাততঃ দেখছি তো লোকসান। অত গুরু- দক্ষিণা কোথায় পাব।’

পুরন্দর বলতে যাচ্ছিল, ‘সেজন্য ভাববেন না,’ কথাটা তাড়াতাড়ি বদলে দিয়ে বলল, ‘সকলের কাছ থেকে দক্ষিণা তিনি নেন না। তা ছাড়া আপনার কথা আমি তাঁকে সব বলেছি।’

নীলিমা বলল, ‘কিন্তু যেখানে গুরু হয়ে যাচ্ছি, সেখানে শিশু হব কি করে, ছাত্রীদের কাছে মান যাবে যে।’

পুরন্দর বলল, ‘ছাত্রীদের বাড়িতে কেন। আপনাকে একেবারে খোদ গুরুপার্টে নিয়ে উপস্থিত করব। তাহ’লে তো আর কোন আপত্তি থাকবে না।’

নীলিমা ট্রামে উঠতে উঠতে বলল, ‘আচ্ছা, ভেবে দেখব আপনার কথা।’

পুরন্দর বলল, ‘হ্যাঁ, দয়া ক’রে একটু ভাববেন।’

নীলিমা ভালো করে ভেবে দেখল। এই সুযোগে সেতারটা শিখে নিতে পারলে সত্যিই মন্দ হয় না। বাজনা জানা থাকলে টুইশানিতে আরো বেশি টাকা পাওয়া যায়। আর টাকার তো এখনো কত দরকার। সংসারে কিছু দিতে হবে। না হলে শ্বশুর মনে করবেন কি? স্বামী যদি উপার্জনের সমস্ত টাকা তাঁর জন্য ব্যয় করতেন তখন শ্বশুর-শ্বাশুড়ী যা ভাবতেন এখনো প্রায় তাই-ই ভাববেন। তা ছাড়া তিন মাস পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলে সুবিমলকে কি কলকাতার এই বদ্ধ গলির মধ্যে ভরে রাখবে না কি নীলিমা! অন্ততঃ দু-এক মাসের জন্যও ভালো কোন স্বাস্থ্যকর জায়গায় পাঠিয়ে দেবে চেঞ্জের জন্য। আর সেই চেঞ্জের টাকা এই ভাবেই সংগ্রহ ক’রতে হবে নীলিমাকে। কেবল গলায় আর হারমনিয়মে সে টাকা উঠবে না, তার জন্য সেতার দরকার।

নারায়ণ ত্রিবেদীর বরস ঘাটের কাছাকাছি, বয়সের অনুপাতে শরীর বেশ শক্তই আছে। হিন্দুস্থানী ব্রাহ্মণ, ঋজু উন্নত চেহারা। মুখে শান্ত প্রসন্নতা। শোনা যায় অনেক শোক-তাপ পেয়েছেন জীবনে। পুত্র-কন্যার অকালমৃত্যু হয়েছে, নিরুদ্দিষ্টা স্ত্রী সম্বন্ধেও নানা রকম বিষয় চিন্তা আছে। কিন্তু সে ইতিহাস লোকের চোখের সামনে ধরে রাখেননি। নিজের অন্তরের মধ্যেই তা তিনি প্রচ্ছন্ন রেখেছেন। মাঝেমাঝে গভীর রাত্রে সেতারের আলাপে কেবল তার আভাস পাওয়া যায়৷ অন্য কোন আলাপ আলোচনায় ধরা যায় না।

প্রৌঢ়া একটি বালবিধবা বোনকে নিয়ে তিনি থাকেন হরীশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটের পুরোনো একতাল। বাড়ীর দুখানা ঘর নিয়ে। পুরন্দর নীলিমাকে এক দিন বিকালে নিয়ে এল সেখানে।

নীলিমা পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে ত্রিবেদী স্মিত মুখে আশীর্ব্বাদ জানালেন, বললেন, ‘কোন ভাবনা নেই। সব তিনি শুনেছেন পুরন্দরের কাছে।’

নীলিমা বিদ্যাভ্যাস আরম্ভ করল, টুইশানিতে আসবার আগে আসে এখানে। কিছুক্ষণ বসে বসে বাজায়; ত্রিবেদী চেয়ে চেয়ে দেখেন। মাঝে মাঝে কেবল হেসে মাথা নাড়েন, হোল না।

অদ্ভুত ধৈর্য। কোন বিরক্তি নেই, তিরস্কার ভৎসনার আভাস নেই, এমন সহিষ্ণুতা সাধারণতঃ দেখা যায় না।

কিন্তু ধৈর্য্য নেই নীলিমার নিজের। প্রায়ই প্রশ্ন করে আর কত দিন বাকি। কত দিনে অন্ততঃ কাজ চালাবার মত বিদ্যাটা আয়ত্তে আসবে। টাকা রোজগার করতে পারবে ছাত্র-ছাত্রীকে শিখিয়ে।

ত্রিবেদী হাসেন, বলেন, ‘যা আনন্দের জিনিষ তাকে তুমি এত তাড়াতাড়ি প্রয়োজনে লাগাতে চাচ্ছ। আনন্দকে ছাপিয়ে প্রয়োজন তো এক দিন বড় হয়ে উঠবেই, কিন্তু তা আজই কেন ?’

নীলিমা চুপ করে থাকে। তিরস্কারের জন্য দুঃখ করে না। ত্রিবেদী কি করে বুঝবেন তার প্রয়োজনের কথা, যার সঙ্গে আনন্দের কোন ভেদ নেই কিংবা যা আনন্দের চেয়েও অনেক বড়৷

অনেক ইতস্ততঃ করে নীলিমা কিছু টাকা ধার চেয়ে পুরন্দরের কাছে একটা সেতার কিনবে বলে। পরে শোধ করবে।

পুরন্দর জবাব দিয়েছিল, ‘ভুল করেছেন, আমি মহাজন নই। নিতান্তই অভাজন মাত্র। টাকা নেই তবে একটা জিনিষ আছে সেট। ধার দিলেও দিতে পারি।’ বলে পুরন্দর একটু হাসল।

নীলিমা শঙ্কিত হয়ে উঠল, পাছে পুরন্দর বেফাঁস কিছু বলে ফেলে।

পুরন্দর তার বিবর্ণ মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘ভয় করবেন না, বাজে অকেজো জিনিষ রাখবার মত বাড়তি জায়গা আপনার নেই তা জানি, সে সব কিছু নয়। আমার সেতারটাই নিন, আপনার কাজে লাগবে।’

নীলিমা কিছুক্ষণ মুখ নীচু করে রইল; তারপর বলল ‘কিন্তু আপনি কি ৰাজাবেন?’

পুরন্দর একটু হাসল, ‘সে জন্য ভাববেন না। যা না বাজালেও বাজবে।’

এমন জিনিষ রইল, এর পর এ টিউশানি রাখতে আর সাহস করল না নীলিমা। ইতিমধ্যে আরো দুটি টিউশানির খোঁজ এসেছিল। নিজেই একটু অগ্রসর হয়ে সে ছুটিকে নিয়ে নিল। কিন্তু সেভারটা পুরন্দরকে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে চক্ষুলজ্জায় বাধল। কিংবা হয়তো কেবল চক্ষুলজ্জাই নয়। সেতারটা রয়ে গেল তার হাতে।

নীলিমা ভাবল, রইলই বা। হাতের জিনিষ বেশির ভাগ সময় জিনিষ হয়ে হাতেই থাকে মালিক হয়ে মনে গিয়ে পৌঁছায় আর কত দিন কতক্ষণ। ইচ্ছা করে চেষ্টা করে বিশ্বতিকে ডেকে আনতে হয় না, সে আপনিই এসে দেখা দেয়৷

নীলিমা সুবিমলকে গিয়ে এক দিন বলে আসল ভার চেঞ্জের পরিকল্পনার কথা।

সুবিমল হেসে বলল, ‘বেশ তো।’

না, বেশ তো নয়। সুবিমলকে সত্যি সত্যি দেখিয়ে দেবে তার সাধ্যের সীমা কতখানি। খুঁজে খুঁজে নীলিমা সেতারের টিউশানিও নিল। চেষ্টা করল রেডিয়োতে। প্রোগ্রাম-ডিরেক্টর বললেন, ‘কিন্তু আমরা তো নতুন শিক্ষার্থীদের তেমন সুযোগ দিতে পারিনে, টাকা দেওয়াও সম্ভব হয়ে ওঠে না।’

নীলিমা অম্লান মুখে বলল, ‘কিন্তু আমার কথা শুনলে আপনি না ক’রতে পারবেন না।’

স্বামীর জন্য শুধু প্রোগ্রাম-ডিরেক্টর শুনলেন এবং সত্যিই আর না করলেন না। অদ্ভুত উত্তেজনায় পেয়ে বসল নীলিমাকে। হাসপাতালের খরচই নয় তার চেঞ্জের টাকাও সংগ্রহ করতে হবে। যত্র তত্র সে গান শেখাতে লাগল। সেতার শেখাতে গিয়ে কোন কোন জায়গায় অপদস্থও হল, তবু হটল না।

নারায়ণ ত্রিবেদী বললেন, ‘অত অধীর হয়ো না মা। অকালে শক্তির অমন অপচয় কোরো না। তাকে সঞ্চয় কোরো নিজের মধ্যে। ভবিষ্যতেও তার প্রয়োজন হবে।’

তিন মাসের পর আরো মাস দুই গেল৷ তারপর সুবিমলের সত্যিই ছাড়া পাবার দিন এল। একটি দিন মাত্র মধ্যে। এদিকে শ-তিনেক টাকার মত প্রায় জমিয়ে তুলেছে নীলিমা। আর পঁচিশটা টাকা হ’লে সংখ্যা পূর্ণ হয়। আপাততঃ এতেই হবে। সুবিমল বাড়ী এলে টাকার তোড়াটা তাকে উপহার দেবে নীলিমা, বলবে, ‘দেখ পেরেছি কি না।’

পঁচিশটা টাকার কথা ভাবছে নীলিমা এই সময় আমন্ত্রণের চিঠি নিয়ে এল উত্তর কলকাতার এক দল ছেলে। রঙ-মহল থিয়েটার ভাড়া নিয়ে তারা এক জলপার অয়োজন করেছে। টাকাটা যাবে বন্যাপীড়িত দুর্গত-সেবার তহবিলে। সহরের বড় বড় সব শিল্পীরা আসবেন। তাদের সঙ্গে নীলিমারও ডাক পড়েছে।

নীলিমা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এঁদের মধ্যে আমাকে কেন? আমার কোন্ যোগ্যতা আছে’

দলপতি গোছের কয়েক জন এগিয়ে এল, মধুর হেসে বলল, আছে। সেবার অধিকার তো সকলেরই। তাছাড়া এ ক্ষেত্রে বিশেষ দাবীও আছে নীলিমার। সে নিজেকে যতখানি ছোট বলে মনে করে তা সে নয়।

এদের মধ্যে দু-একজন রেডিয়োতে দেওয়া নীলিমার ছ-একটা গানের কথা উল্লেখ করল। ছোট একটি পেশাদারী জলসায় তার সেতার না কি অদ্ভুত হয়েছিল শুনতে।

অদ্ভুত, হ্যা অদ্ভুতই লাগল নীলিমার। প্রথম প্রথম স্বামীর রোগের কথা শুনে লোকে তাকে অনুকম্পা করে টাকা দিয়েছে। মাঝে মাঝে একটু খোঁচা লাগত মনে, ক্রমে সেটাই তার অভ্যাস হয়ে এসেছিল। যেখানে এ রকম পক্ষপাতিত্ব তার জুটত না নৈপুণ্যের অভাব দেখে লোকে তাকে তুচ্ছ করত, অনাদর করত, সে সব জায়গায় নীলিমাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এসে স্মরণ করিয়ে দিত বিদ্যায় তার দীনতা থাকলে কি হবে অন্তরে সে সমৃদ্ধ। সে টাকা তুলছে দুঃস্থ যক্ষ্মা রোগগ্রস্ত স্বামীর জন্য, নিঃস্ব অর্দ্ধভুক্ত পরিবারের জন্য। তাতেও টাকাও আসত, নিজের শিল্প-কুশলতার অভাবের জন্য ক্ষোভ এবং গ্লানিও কম হোত। মাঝে মাঝে উপরি পাওনা হিসাবে কোন জায়গা থেকে প্রশংসা অবশ্য এসেছে, কোন কোন মুহূর্তে গুনগুন করে গাওয়া পরিচিত গানের একটি কলি মনকে আচমকা দোলা দিয়ে গেছে; মনে হয়েছে এর সঙ্গে আর কিছুর তুলনা হয় না, সমস্ত কর্তব্য এর কাছে মিথ্যা, সকল উদ্দেশ্য এর কাছে অর্থহীন। কিন্তু মনের এই মোহকে নীলিমা বেশিক্ষণ প্রশ্রয় দেয়নি। আদর্শের পথে কর্তব্যের পথে বাধা বলে ত্যাগ করেছে। তাছাড়া শুধু আদর্শ আর কর্তব্যই তো নয় হৃদয়ের দাবী, প্রেমের দাবী তার মনকে একাত্ম করে অধিকার করেছে। কিছুতেই অন্যমনস্ক হ’তে দেয়নি।

কিন্তু আজ যখন ক্ষুদ্র সিদ্ধি তার করায়ত্ত প্রায় তার ছোট হৃদয়ের আর ক্ষমতার মাপে মাপা, তখন এল বৃহত্তর জগতের আহ্বান, মহত্তর সার্থকতার সম্ভাবনা।

নীলিমা শুনল, তার কৃতিত্ব আছে, নৈপুণ্য আছে, তার গান অনেকের সত্যি সত্যিই ভাল লেগেছে, তার সেতার অনেকের মনেই অনুরণন জাগিয়েছে। আর শুধু তাই নয় তার এই দক্ষতা আরও বড় কাজে লাগছে, ব্যাপকতার সেবায় ব্যয়িত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। সেখানে আসবেন দেশের বড় বড় শিল্পী, যাদের অনেকের সে কেবল নামমাত্র শুনেছে। তাঁদের সে আজ স্বচক্ষে দেখবে, গান শুনবে, গান শোনাৰে৷

উদ্যোক্তাদের কাছে সবিনয়ে সম্মতি জানাল নীলিমা। বলল, তার যোগ্যতা যদি সত্যিই কিছু থাকে তবে তা দেশের কাজে লেগে ধ হোক।

সুবিমল আসবে কাল বাড়ি। এক হাতে নীলিমা ঘর গুছাল, ঘর সাজালো, কিন্তু আর এক হাত রইল তার সেতারের তারে। ঘর কন্নার ফাকে ফাকে সেতারে তুলতে লাগল তার সর্বশ্রেষ্ঠ সংগীত, তার শিল্প-কুশলতার চরম নৈপুণ্য। কাল জগৎ তার যথার্থ পরিচয় পাবে। সে ছোট নয়, দীন নয়, অকৃতার্থ নয়।

পরদিন থানিকটা বেলা হ’তে না হতেই সুবিমল এসে পৌঁছল। বাড়িতে তার আগে থেকেই উৎসব শুরু হয়েছে। ভাইবোনদের বাপ এলেন, রুক্ষ কঠিন তার মুখ, কিন্তু ভিতরের ছুটোছুটির অন্ত সেই। আনন্দ তবু যেন চাপা থাকছে না। মা এলেন গৃহদেবতা নারায়ণের আশীর্ব্বাদ নিয়ে, মনের আনন্দ চোখের জলে টলটল করছে। প্রতিবেশীর। এসে খোঁজ নিয়ে গেলেন৷

কাছের বন্ধুরা খবর পেয়ে এল দেখা করতে।

এক ফাকে নীলিমাকে নির্জনে পেল শুবিমল, বলল, ‘সবচেয়ে তোমার কৃতিত্ব বেশি।’

নীলিমা বলল, ‘আস্তে, কেউ শুনে ফেলবে।’

সুবিমল হাসল, ‘কারো যেন শোনার বাকি আছে। তার পর তোমার সেই টাকার তোড়া কই? সেই চেঞ্জে পাঠাবার তোড়া।

মন্ত্রগুপ্তি ঠিকমত রাখতে পারেনি নীলিমা। হাসপাতালে এক দিন কথায় কথায় খুসির ঢেউয়ে গোপন কথা ভেসে এসেছে।

নীলিমা মুখ স্নান ক’রে বলল, ‘তোড়া পূর্ণ হয়নি। গোটা-পঁচিশেক টাকা কম আছে।’

সুবিমল হাসল, ‘মাত্র! কিন্তু তোড়া পূরাবার পঁচিশ টাকার চেয়েও বেশি দামী জিনিষ এখানে আছে বলে আমার বিশ্বাস।’

কিন্তু দুপুরের পর বিকাল, বিকালের পর সন্ধ্যা যত এগিয়ে আসতে লাগল নীলিমার মন ততই চঞ্চল হয়ে উঠল। মাঝে মাঝে এক একবার সেতারের কাছে গেল আবার ফিরে এল।

সুবিমল লক্ষ্য করে বলল, ‘ব্যাপার কি।’

নীলিমা কুণ্ঠায় সংকোচে অৰ্দ্ধস্ফুট কণ্ঠে বলল, ‘একটু বাইরে যেতে হবে।’

সুবিমলের মুখখানা যেন কেমন হয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই কি মনে প’ড়ে যাওয়ায় হাসিমুখে বলল, ‘ক্ষেপেছ, এত কাল বাদে আমি এলাম ঘরে আর তুমি যাবে বাইরে! টিউশনি-টানিতে আর কাজ নেই। তিনশো টাকায় ঘরে ব’সে দিব্যি তিন মাস খাব আর ঘুমাবো।’

নীলিমা বলল, ‘টিউশানি নয়৷’

সুবিমল বলল, ‘তবে কি জলসা-টলসা গোছের কিছু নাকি? তার আর দরকার নেই। তারা এতক্ষণে নিশ্চয়ই জেনেছে নীলিমা বাইজীর ভূতপূর্ব স্বামী এসেছে ফিরে, যমের দুয়ার থেকে, যমের হাত থেকে যমদণ্ড কেড়ে নিয়ে। আজ কেবলমাত্র একটিমাত্র জলসা হবে, কেবল তোমাতে আমাতে। তুমি একমাত্র গীত-সরস্বতী। আমি গুণমুগ্ধ নারায়ণ।’ একটু হেসে ‘ধরো, এই নাও।’ বলে নিজেই সুবিমল সেতারটা স্ত্রীর হাতে তুলে দিল। তারপর দোর দিল ভেজিয়ে।

নীলিমা কাতর স্বরে বলল, ‘আজ থাক।’

সুবিমল বলল, ‘না নীলিমা, আজই। রোগের বীজ আজ হয়তো চাপা আছে, কালই যে আবার ভেসে উঠবে না তার ঠিক কি? ডাক্তারের কথায় অত সহজে ভুলো না।তুমি বাজা ও নীলিমা, আমি আজই একটু শুনব। তোমার সুর বেচে কেবল তুচ্ছ টাকাই এত দিন দিয়েছ, আজ অত অল্পতে ভোলাতে পাবে না। আজ তোমার সেই আসল সুর আমাকে শোনাতেই হবে৷ এত দিন তো হাত পাততে সংকোচ করিনি, আজ হৃদয় নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছি বলেই কি তোমার এত দ্বিধা, এত কার্পণ্য।’

সুবিমল থামল। নীলিমার সেতার বাজতে লাগল। সেই সুর, যা আজ ছদিন ধরে মনের মধ্যে গুন-গুন করে ফিরছে, সেই সুর যা সে দেশের গুণিজনকে শুনাবে ভেবেছিল, তারে তারে ঝঙ্কার দিয়ে উঠল সেই রাগিণী। হঠাৎ এক সময় চমকে উঠল নীলিমা। কানে গেল সদর দরজার কড়া নড়ছে।

কান পেতে একবার শুনে নিল নীলিমা। নিজের সেতারের বাজনার চেয়েও যেন মধুর আর অপূর্ব ঐ কড়ানাড়ার নিক্কণ।

সুবিমল বলল, ‘বাঃ, চমৎকার হচ্ছে, বাজাও, থেমো না।’ নীলিমা থামল না।

প্রচ্ছদ পেইন্টিং : মকবুল ফিদা হুসেন


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২৫ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন