২০১৭ সালে মুক্তি পায় অভিনেত্রী শ্রীদেবীর শেষ ছবি ‘মম’। ছবিটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার। মুভিটিতে তিনি দেবকী সাবরওয়াল নামে এক জীববিজ্ঞানের শিক্ষিকা এবং এক সজাগ মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। ফার্ম হাউসে পার্টি করতে গিয়ে এক রাতে বাড়ি ফেরে না কন্যা আর্যা। পরদিন ভোরের আলোয় যখন আর্যাকে উদ্ধার করা হয়, ততক্ষণে তার উপরে হয়ে গিয়েছে নৃশংস অত্যাচার। চার অভিযুক্ত ধরা পড়লেও প্রমাণের অভাবে তাদের বেকসুর খালাস করে দেয় আদালত।
এরপর শুরু হয় কন্যার জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। মেয়ের ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মা অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। অপরাধীদের একজনকে শাস্তি দেওয়ার জন্য হেলথ ড্রিঙ্কসের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় গুড়ো করা প্রচুর আপেলের বীজ। শেষ পর্যন্ত ছেলেটির মৃত্যু হয়।
অবাক হচ্ছেন! যেখানে বলা হয় “An apple a day keeps the doctor away”, সেখানে আপেলের বীজে প্রাণঘাতী বিষ! লাল টুকটুকে রসালো আপেলে কামড় দিতে কম বেশি সকলেরই ভালো লাগে। খাওয়ার সময় বীজ জিভে পড়লে অনেক সময় ফেলে দেওয়া হয়, কখনো অজান্তেই পেটে চলে যায়। কিন্তু এই আপেলের বীজ থেকে কি ক্ষতি হতে পারে তা অনেকেরই জানা নেই।
আপেলের বীজে থাকে অ্যামিগডালিন নামক একটি যৌগ যেটি পেটের ভিতর উঠে উৎসেচকের সংস্পর্শে এসে তৈরি করে সায়ানাইড। চিনির সঙ্গে মিশে যা পরিণত হয় হাইড্রোজেন সায়ানাইডে (HCN)
যা মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। যদিও চিকিৎসকেরা বলে থাকেন ভয় পাওয়ার মত কিছু নেই। অবশ্যই আপেল খান সতর্ক হয়ে। তাদের মতে আমরা দিনে যদি একটি বা দুটি ভুল করে চিবিয়ে খেয়েও ফেলি তা থেকে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি হয়, তার পরিমাণ খুবই কম। শরীর তা এডজাস্ট করতে পারে।
এছাড়া ভিটামিন-বি-টুয়েলভ-এর জন্য কিছুটা হাইড্রোজেন সায়ানাইড লাগে, শরীর সেটা সাপ্লাই করে। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ আপেলের বীজ চিবিয়ে খেলে সমস্যা হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিটি আপেলের বীজে গড়ে ০.৪৯ মিলিগ্রাম সায়ানোজেনিক যৌগ থাকে।একটি আপেলে গড়ে ৭- ৮টির মতো বীজ থাকে। অর্থাৎ গোটা আপেলে মোট সায়ানাইডের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৩.৯২ মিলিগ্রাম। বিশেষজ্ঞদের মতে ৭০ কোজি ওজনের কোনও ব্যক্তির পেটে কমপক্ষে ১৪৩টি বীজ গেলে নিশ্চিত মৃত্যু। এ জন্য লাগবে ১৮-২০টি আপেল। সেখানে বাচ্চারা একসঙ্গে ৪-৫টি আপেলদানা চিবিয়ে খেয়ে ফেললেই ভয়ানক। তাই ভুলেও বীজশুদ্ধ আপেল চিবিয়ে খাবেন না এবং বাচ্চাদের আপেল দেওয়ার অবশ্যই আপেলের বীজ বাদ দিয়ে খেতে দিন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন খুব সামান্য পরিমাণ সায়ানাইড হার্ট ও মস্তিষ্ক অচল করে দিতে পারে। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে পড়া, হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
আরে, এত ভয় পাবেন না। আপেল খেতে গিয়ে যদি বীজটা গিলে ফেলেন, সেটি পরিপাকনালী হয়ে মলদ্বার দিয়ে আস্ত দানা হিসেবেই বেরিয়ে যাবে। আপেলের বীজের কঠিন আবারণ ভেদ করে সায়ানাইডের বাইরে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয় বলেই বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকে না। বিপদ ঘটবে বীজে কামড় পড়লে।
এবার আসি আপেলের গুনাগুন প্রসঙ্গে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ দিনে ১০০ গ্রাম আপেল খেতেই পারেন। আপেল ফাইবার, ভিটামিন-সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সহ পুষ্টির একটি ভাল উৎস যা স্বাস্থ্যকর হজম, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। প্রমাণ রয়েছে যে আপেল ক্যান্সার, হৃদরোগ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিস-সহ কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগের বিরুদ্ধেও শরীরকে লড়াই করার ক্ষমতা জোগায়। ৯ বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন এক বা একাধিক আপেল খান তাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যারা আপেল খাননি তাদের তুলনায় 28% কম।
আপেলের পেকটিন জাতীয় উপাদান কোলন ক্যান্সার রোধ করে। ফুসফুস ও লিভার ক্যান্সারের প্রতিরোধ সাহায্য করে। আপেলে থাকা ফাইটো নিউট্রিয়েন্ট উপাদানগুলি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আপেল খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি হজম করতে সাহায্য করে, শরীর ঠান্ডা রাখে, শরীরে জলশূন্যতা দূর করে, হাড় শক্ত করে, আলঝাইমার রোগের আশঙ্কা কমায়। মুখে ব্রণ,কালো দাগ দূর করে ত্বকের বয়সের ছাপ পড়তে যায় না দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখতে, ডায়রিয়া সারাতে ছাড়াতে সাহায্য করে এবং মাসল টোন করে। আপেলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের ডোপামিন উৎপাদনকারী স্নায়ু কোষের ভাঙ্গন প্রতিরোধ করে। ফলে পার্কিনসন রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

অনেক ক্ষেত্রে বলা হয় লাল আপেলের চেয়ে সবুজ আপেল বেশি উপকারী। আসলে লাল আপেলের নিকট আত্মীয় হলো সবুজ আপেল। সবুজ আপেলে সুগার ও শর্করার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং বেশি থাকে ভিটামিন কে আয়রন ও পটাশিয়াম, ফাইবারে পরিমাণ বেশি থাকে সবুজ আপেলে। আর অন্যদিকে লাল আপেলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর পরিমাণ বেশি।
অনেকেই আপেলের খোসা ছাড়িয়ে খান কিন্তু মনে রাখবেন ডাইটেরি ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাবনয়েড বেশি থাকে আপেলের খোসাতে। তবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য অনেক সময় আপেলের গায়ে সিনথেটিক ওয়াটার স্প্রে করা হয়, যেটি শরীরের পক্ষে খারাপ। ওয়াক্সযুক্ত আপেল খেলে অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই কারণে আপেল বাজার থেকে কিনে আনার পর তার গরম জলে ধুয়ে নিতে পারলে সব থেকে ভালো।
অনেক সংস্কৃতিতে আপেলের ধর্মীয় এবং পৌরাণিক তাৎপর্য আছে, এদের মধ্যে নর্স, গ্রীক এবং ইউরোপীয়ান খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য অন্যতম। সাধারণত আপেলের জাতগুলি মূলের কলমের মাধ্যমে তৈরি করা হয়, যা ফলস্বরূপ গাছের আকার নিয়ন্ত্রণ করে। আপেলের প্রায় ৭,৫০০ টির বেশি পরিচিত প্রজাতি রয়েছে। জানা যায় আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট সর্বপ্রথম ৩২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে কাজাখস্তানে খাটো প্রজাতির আপেল খুঁজে পান তা তিনি মেসিডোনিয়াতে নিয়ে যান। ভারতে হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলা আপেল এবং ঈশ্বরের দেশ হিসাবেও পরিচিত। জম্মু ও কাশ্মীর আপেলের জন্য বিখ্যাত। বিশ্বে ভারত আপেল উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

বাজারজাত আপেল জুসে কেবল আপেলের রস থাকে না, অনেক ক্ষেত্রেই মেশানো হয় চিনি, প্রিজারভেটিভ, বা অন্যান্য উপাদান। এই আপেল জুস বিভিন্ন আকারে পাওয়া যায়, যেমন — স্বচ্ছ আপেল জুস (ফিল্টার করা, পরিষ্কার), মেঘলা আপেল জুস (আনফিল্টার করা, কিছু আপেলের পাল্প থাকে), এবং আপেল সিডার (কিছু দেশে আপেল জুসের একটি আনফিল্টার করা সংস্করণ)।
২০১৫ সালে আপেলের রসের উপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে বাণিজ্যিকভাবে উপলব্ধ পণ্যগুলিতে অ্যামিগডালিনের পরিমাণ কম থাকে, প্রতি মিলিলিটারে ০.০১ থেকে ০.০০৭ মিলিগ্রাম (মিগ্রা/মিলি)। বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে এতে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে রস তোলার আগে আপেলের বীজ অপসারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
চিকিৎসক এবং পুষ্টিবিদ, সকলেই আপেল খাওয়ার কথা বলে থাকেন। ওজন কমানো থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো — এই ফলের উপকারিতা বহু। টিফিনে হোক কিংবা সকালের ডায়েটে — নিয়ম করে আপেল খান। তবে খাওয়ার আগে মনে রাখবেন আপেলের বীজ ফেলে খেতে হবে। শুধু তাই নয় খাবার পর অতি অবশ্যই মুখ ধুয়ে নেবেন কারণ আপেলের অ্যাসি়ডিক উপাদান দাঁতের সংস্পর্শে এসে ক্ষতি করে।