ভারত পথিক রামমোহন রায়ের অস্তিত্ব টিকে থাকার প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। ২৫২ তম জন্মবার্ষিকীতে রামমোহনের বসতবাড়ি, স্মৃতি সৌধ, সতীদাহ শশ্মান, আমবাগান সবই আজ ধ্বংসের দিকে। ক্ষোভ জনমানসে, হতাশ পর্যটকরা। সরকারের রঙ বদলেছে। নেতা ও মন্ত্রীরা কথা দিয়েছেন উন্নয়নের। শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে কেউ কথা রাখেনি।
উল্লেখ করা যেতে পারে রাধানগরের জন্মস্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মস্তিষ্কপ্রসূত নকশায় তৈরি স্মৃতিসৌধ আজ ধীরে ধীরে তার জৌলুস হারাচ্ছে। মন্দির, মসজিদ ও গির্জার আদলে নকশায় তৈরি সৌধ আজ কেবলই ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ কারও নেই। একইভাবে রাধানগরের পাশে রঘুনাথপুরে রামমোহনের বসতবাড়ি আস্তে আস্তে কালের কপোলতলে হারিয়ে যাচ্ছে। যা বাঙালির কাছে লজ্জার। বসতবাড়ির ইঁট খসে খসে পড়ছে। আগাছায় ভরেছে বসতবাড়ির দেহ। পাশেই রামমোহনের হাতে লাগানো উন্নত জাতের শতাধিক আমগাছ, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় সবই হারিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। অথচ এই বাগান থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকার আম বিক্রি হলেও তার কোনো হিসাব থাকছে না। এমনকী সাতাশ একর জায়গা ঘিরে পার্ক থাকলেও সেই পার্কের টাকা নেতাদের দৌলতে নয়ছয় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একদিকে টাকা নয়ছয়। অন্যদিকে পার্কে দুষ্কৃতিদের আড্ডা আর যুবক — যুবতীদের নোংরা প্রেমলীলার খেলাঘর হয়ে উঠেছে। এদিকে কারও নজর নেই। ডানবাম সব দলের নেতারা এসেছেন। কথা দিয়েছেন উন্নয়নের। এমনকী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ইন্দিরা গান্ধী রাধানগরে এসে কথা দিয়েছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে। উন্নয়ন হবে। বাম আমলে একাধিক মন্ত্রী এখানে এসেছেন । একাধিক বিষয়ের উন্নয়নের শিলান্যাস করেছেন। টেকনিক্যাল কলেজের সেই শিলান্যাস সবুজ ঘাসে ঢেকেছে। পরবর্তী মা মাটি মানুষের সরকার এসেছে। উন্নয়নের জন্য নেতা মন্ত্রীরা এসেছেন। কথা দিয়েছেন। সুখের কথা এই যে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৌলতে হেরিটেজের তকমা পেয়েছে। উন্নয়নের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা অনুমোদন হয়েছে। ওই পর্যন্ত। রামমোহনকে ঘিরে উন্নয়নের বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
যা বাঙালির হৃদয়ে দাগ কেটে থাকবে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের অভিযোগ, কেউ কথা রাখেনি।
প্রসঙ্গত,ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থান খানাকুলের এই রাধানগরে ক্ষণিকের অতিথি হিসাবে যাঁরা এসেছেন বিশেষত, যাঁরা এখানে আসার আগে রামমোহনের জীবনীগ্রন্থ একটু আধটু নাড়াচাড়া করে এসেছেন। এখানে পৌঁছেই তাঁদের খুব বড়ো একটা সমস্যায় পড়তে হবে। সমস্যাটি হল এখানকার ভৌগোলিক পরিবর্তন। প্রথমত, খানাকুল, কৃষ্ণনগর, রাধানগর এই অঞ্চলটি আগে বর্ধমান চাকলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে ইংরেজ আমলে জেলার সৃষ্টি হলে এই গ্রামগুলি বর্ধমান জেলার মধ্যে পড়ে যায়। বর্তমানে কিন্তু এরা হুগলি জেলার অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, এক সময় রাধানগরের ভৌগোলিক বর্ণনায় যে বিস্তীর্ণ ‘রত্নাকর’ নদীর কথা পাওয়া যায় আজ ‘রড়ার’ খাল নামে সে কেবল তার অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছে। এছাড়া বিস্তীর্ণ নদীটির আর কোনো চিহ্নও পাওয়া যাবে না এখন। রামমোহনের স্মৃতিবিজড়িত যা কিছু এখানে আছে তা আর রক্ষিত অবস্থায় নেই। হুগলি জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে ‘রামমোহন স্মৃতিস্বত্ব সংরক্ষণ সমিতি’। এরা যতটুকু উন্নয়ন করেছে তাতে খুশি নন এলাকার মানুষ। হতাশ পর্যটকরা।
সামান্য উদ্যোগ নিলেই খুব যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা যেত সবকিছু, এমনকি ভ্রমণকারীদের বিনোদনের ব্যবস্থাও করা যেত ভরপুর। এখানকার গ্রাম্য সৌন্দর্য, অনাড়ম্বর আঁকাবাকা মোরাম পথ, ইউক্যালিপটাস কিংবা কৃষ্ণচূড়ার সবুজ হাতছানি আর দিগন্তরেখা ছুঁয়ে যাওয়া অসীম প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়ার আহ্বান এখনও মুগ্ধ করবে সকলকে । এখানেই
রামমোহনের জন্মবেদি ।
এটাই রামমোহনের পিতৃপুরুষের ভিটে। ঠিক এই জায়গাটায় ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে) ২২ মে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই জন্মস্থানটি চিহ্নিত হয়েছিল ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। রামমোহনের জন্মস্থানটিকে তীর্থভূমি বলে মনে করতেন এমন একজন ইংরেজ রেভারেল্ড জেম্স লঙ সেই সময় এখানে আসেন। তাঁরই উদ্যোগে স্থানীয় বর্ষীয়ান মানুষদের সহযোগিতায় রায় পরিবারের সুতিকাগারের অবস্থান নির্ণয় করে স্থানটি চিহ্নিত করা হয়।
সেই জায়গাটুকুও সরকারের নজর এড়িয়ে গেছে। পাশেই রামমোহন মেমোরিয়াল হল ।
জন্মবেদির থেকে চোখ তুললেই আমরা দেখতে পাব ‘রামমোহন মেমোরিয়াল হল’ (রামমোহন স্মৃতি সৌধ)। দৃষ্টিনন্দন এই স্মৃতিসৌধটির নকশা তৈরি করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমনভাবে এই নকশা তৈরি হয় যাতে মন্দির, মসজিদ এবং গির্জা এই তিন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের রূপ প্রকাশিত হয় সৌধটির মধ্যে। দুঃখের বিষয় অর্থাভাবের জন্য শেষপর্যন্ত সৌধটির নির্মাণ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শ্রীমতি হেমলতা ঠাকুর। তিনি রামমোহনের জ্যেষ্ঠপুত্র রাধাপ্রসাদের কন্যা চন্দ্রজ্যোতির কন্যা এবং রবীন্দ্রনাথের জেষ্ঠভাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠপুত্র দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ভিত্তিস্থাপন হলেও নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে। আনুমানিক ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এর কাজ হয়। আসলে এতো খরচ হয়ে গিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত দেনা মেটানোর জন্য সরকারি নির্দেশে নিলামে বিক্রি করে দিতে হয় এই সৌধটিকে। যতীন্দ্রনাথ বসু তখন এটি কিনেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে এপ্রিল হুগলি জেলা বোর্ড বর্তমানে যাকে জেলা পরিষদ বলা হয় তাকে দলিল বলে এই সম্পত্তি হস্তান্তর করেন যতীন্দ্রনাথ। বর্তমানে এই সবকিছুর দায়দায়িত্ব হুগলি জেলা পরিষদের হাতেই ন্যস্ত।
এখানেই আছে রামমোহন নামাঙ্কিত লাইব্রেরি। অন্যান্য পুস্তক পুস্তিকার সঙ্গে বিশেষত রামমোহন সম্পর্কিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গবেষণাপত্র বা গ্রন্থ এখানে স্থান পাবে বলে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন।আজও তার কোনও সাড়া নেই । এছাড়াও রঘুনাথপুরে রামমোহনের উপাসনাবেদি এবং সতীর বেদি এখনও দেখতে পাওয়া যাবে সেখানে। এখানে বিশাল আমবাগান। এক অংশজুড়ে চড়ুইভাতি করবার সুন্দর আয়োজন। বাকি জায়গা জুড়ে পার্ক, শিশুউদ্যান, বোটিং করবার জন্য পরিখা মিলে জমজমাট সহাবস্থান। পাশেই সতীর বেদি ও রামমোহনের বাড়ির
ভগ্নাবশেষ । বাড়ির সামনেই রামমোহনের ব্রহ্মোপাসনার বেদি। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে রামমোহনের বড়ো দাদা জগমোহন রায়ের স্ত্রী অলকমঞ্জরীদেবীকে যেখানে সহমরণে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল সেই জায়াগায় একটি স্মৃতিবেদি নির্মিত হয়েছিল। এই সময়েই রামমোহন সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের সঙ্কল্প গ্রহণ করেন। অতীতের নারকীয় সেই কুপ্রথার স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে এই সতীর বেদি। এখানে নির্জনে কান পাতলে এখনও সেই অসহায় রমণীর আর্তচিৎকার শোনা যাবে কি না কে জানে। রামমোহনের বাড়ি এবং উপাসনা বেদি,
দুদিকে বাগান, মাঝখান দিয়ে নুড়িবিছানো পথ ধরে কয়েক পা এগোলেই রামমোহনের বাড়ির ভগ্নাবশেষ। তার অস্তিত্ব ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে । পিতৃভূমি থেকে বিতাড়িত রামমোহন বাড়িটি করেছিলেন। বহুকাল আগের স্মৃতিবহনকারী এই বাড়িটি অনাদরে অবহেলায় ভেঙে পড়ছে ক্রমশ।
উল্লেখ্য, এরই মধ্যে আরামবাগে ভোট প্রচারে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, রামমোহনকে নিয়ে সরকার ভেবেছে এবং সমস্ত রকমের উন্নয়ন এখানে হয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী মিথ্যা কথা বলেছেন।এখানে রামমোহনের জন্য কিছু হয়নি। পর্যটকরা বিমুখ হচ্ছেন। আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক দেবাশিস শেঠ বলেন, উল্লেখযোগ্য ভাবে কোনো সরকার কিংবা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রামমোহনের উন্নয়নের জন্য এগিয়ে আসেনি। ভারতের আধুনিক নবজাগরণের স্রষ্টার প্রতি সহমর্মিতা কেউ দেখায়নি। রামমোহন রায়ের আজ ২৫২ তম জন্মবার্ষিকীতে রামমোহন অবহেলিত। এটা ভাবতেই বাঙালী হয়ে লজ্জাবোধ করছে। রামমোহন ভারতের প্রথম রেলযাত্রী হয়েও ,অথচ তাঁর জন্মস্থানেই রেল চলাচল শুরু হয়নি। এমনকী যে রামমোহন মেলা অনুষ্ঠিত হত তাও আজ বন্ধ।