আজ ভোটের দিন। দেবদারু গাছের নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম ট্যাক্সির জন্যে। যদিও দেবীলাল তার সমর্থকদের জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। এবারের শহরের সাধারণ নির্বাচনে সে নির্দল প্রার্থী। দেবীলাল আমার মত গয়ংগচ্ছ ভোটদাতাদের নিয়ে একটু সংশয়ে থাকে। তার আরেক দুশ্চিন্তা অন্য দলের দান করা এক এক বোতল বীয়ার নিয়ে। এই পানীয়টির লোভে তার অনেকগুলো ভোট নিশ্চিত হাতছাড়া হয়ে যাবে। এইসব সংশয়-সন্দেহ, জল্পনা-কল্পনা নিয়েই ভোটের দিন এগিয়ে আসে। প্রত্যেক প্রার্থী সেই বিশেষ দিনটিতে ভোটারদের জন্যে নির্দ্বিধায়, উদারহস্তে গাড়ির ব্যবস্থা করে। বার্লোগঞ্জের পাহাড়ী রাস্তায়, দূরের ভোটকেন্দ্রে যাবার জন্যে গাড়ি ছাড়া অন্য উপায় নেই।
উত্তরাখণ্ডের এই ছোট পাহাড়ি শহরটি দেয়াল লিখনেও পিছিয়ে থাকে না। এখানকার বেশিরভাগ নিরক্ষর মানুষের কাছে পৌঁছতে মোটরগাড়ি, রেডিও, মোরগ, বাঘ, ল্যাম্প, গোরুর প্রতীকচিহ্নই সহজতম পন্থা। গরীব, পাহাড়ী শিশুরাও পয়সার লোভে গলি গলি তে আওয়াজ তোলে, ‘রেডিও ছাপে ভোট দিও না। গাড়ি চিহ্নে ভোট দাও। বাঘকে দিন একটি ভোট। মোরগকে একটিও ভোট নয়। গোরুকে আপনার ভোট দিন…’ ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এবার ভোটের দিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। যেকোনো সময় বৃষ্টিপাত হতে পারে। দেবীলালের গাড়ি এসে থামল আমার সামনে। গাড়ি প্রায় ভর্তি। জায়গা নেই বললেই চলে। কোনোরকমে ঠেসেঠুসে পিছনের সীটে বসতে পেলাম। সেখানে আগে থেকেই স্থানীয় রেশন দোকানের হৃষ্টপুষ্ট মালিক তার মাখনের তালের মত মালকিনকে নিয়ে জায়গা জুড়ে বসে আছেন। সামনের সীটে ড্রাইভারের পাশেই বিনোদ। এই ছেলেটি গরীব ঘরের। তার মলিন জামাকাপড়েই তার অবস্থান স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু সে সদাহাস্যময় তরুণ। দারিদ্র্য তার হাসির ঔজ্জ্বল্যকে কেড়ে নিতে পারেনি।
আমাকে দেখে বত্রিশ পাটি বে’র করে সে নমস্কার জানালো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— তুমি এখানে কি করছ?
— ব্যস বন্ড সাহেব, আপনারই মত।
— কিন্তু, তোমার তো একটা চাকরি ছিল। সম্ভবত স্কুলে গেমবয়ের চাকরি!
— হ্যাঁ, সে তো গত মাসেই…
— ও, সে চাকরি আর নেই!
— তারা জবাব দিয়ে দিয়েছে।
ট্যাক্সি ইতিমধ্যেই ঢালু রাস্তায় স্পীড নিল। ড্রাইভারকে আরো কয়েকটা ট্রিপ দিতে হবে। এই সুযোগে তারও কিছু রোজগার হবে। এদিকে পাহাড়ের ঢালু রাস্তায় গাড়ির গতিতে শেঠনীর মোটা শরীর টাল সামলাতে পারছে না। গোছা গোছা চুড়ি আর আংটি পরা মোটা হাত দিয়ে আমাকে সে বারবার পাকড়ে ধরছিল।
শেঠ-শেঠনী দু-জনে দেবীলালকেই নিশ্চিত ভোট দেবে। তারা দেবীলালের স্বজাতি। বিনোদ চাকরীর আশায় দেবীলালকে সমর্থন করছে। আমি দেবীলালকে পছন্দ করি কারণ মানুষটা কর্মঠ এবং সাহসী। রাস্তার আলো, নর্দমা পরিষ্কার, অতিরিক্ত করের বোঝা নিয়ে আমাদের দাবিদাওয়ায় সে কান দেয়।
লম্বা-হিলহিলে, পানের ছাপ লাগা দাঁতে দেবীলালের চেহারায় কোনো হেভীওয়েট নেতার গ্ল্যামার নেই। তবে তার উপস্থিতিকে বার্লোগঞ্জের লোক সম্মান দেয়।
বার্লোগঞ্জের ভোটার সংখ্যা মোটে হাজার। নির্বাচনী প্রচার ব্যক্তিগত স্তরেই সীমিত। প্রার্থীদের ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হয়। তাদের নানারকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবেই তারা ভোট পাবার আশা করতে পারে।
উত্তরাখন্ডের এই ছোট্ট শহরটির নাম কেন বার্লোগঞ্জ হল, তা নিয়ে একটু খোঁজাখুঁজি করতে জানা গেল বার্লো ছিলেন একজন ব্রিটিশ সার্ভেয়ার। তিনি সম্ভবত এই পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট শহরতলীতে একটি শিকারের কুঠি বানিয়েছিলেন। একটি পুলিশ থানা, ছোট চার্চ, একটি বীয়ার কারখানা নিয়ে গড়ে ওঠে বার্লোগঞ্জ। শহরের একদিকে এখনো ব্রিটিশ স্থাপত্যের কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে। এছাড়া এলোমেলো ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে বাজার-দোকান, মানুষের বসতি।
এসব ভাবতে ভাবতেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের ব্যস্ত হর্ণে আমার চটকা ভাঙল। গাড়ি তার শেষ বাঁকে পৌঁছেছে। আর মাত্র কয়েক গজ দূরেই আমাদের পোলিং বুথ।
বার্লোগঞ্জ আজ উৎসবের চেহারা নিয়েছে। বাজারে প্রচুর লোক। পোস্টারে পোস্টারে ছয়লাপ। চায়ের দোকান রমরমিয়ে চলছে। সাতজন নির্বাচন প্রার্থী, কিন্তু অনেকেরই নাম আজ আমি প্রথম শুনলাম।
একটি স্মার্ট, ইংরেজী বলিয়ে স্কুলের ছাত্র আমাকে পাকড়াও করে বলল, ‘দেবীলালকে ভোট দেবেন না স্যর। সে অত্যন্ত অসৎ। যতীন্দ্রকে ভোট দেবেন। ওর চিহ্ন তীরধনুক।’
অন্য আরেকটি এজেন্ট এগিয়ে এসে বলল,
— আপনি কিন্তু কংগ্রেসকেই ভোটটা দেবেন।
— আমিতো তাকে চিনিই না।
— দরকার নেই, আপনি তো কংগ্রেস পার্টিকে ভোটটা দিচ্ছেন।
দূর থেকে দেখছি দেবীলালের দলবল আমাকে আর বিনোদকে কিন্তু সমানে লক্ষ্য করে যাচ্ছে। আমি তাদের চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে ভোটারদের লাইনে দাঁড়ালাম। বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ তারা। দোকানদার, কেরাণী, শিক্ষক, বাড়ির কাজের লোক, দর্জি, ধোপা। তাদের প্রত্যেকের ভোটই বড় মূল্যবান।
সমস্ত নিয়মকানুন মেনে, আঙুলে কালির দাগ লাগিয়ে আমি ভোটটা দিয়ে এলাম। বুথ থেকে বেরোতেই দেবীলাল আমাকে পাকড়াও করল, ভোটটা আমাকেই দিয়েছেন তো? আমাকে কিছু বলতে হল না। তার আগেই পোড় খাওয়া, ঝানু লোক আমার চোখের ভাষাতেই সবটা বুঝে গেল।
বিনোদ আর আমি আবার একসঙ্গে ফিরছি। হাসিখুশি বিনোদকে যেন আরো বেশিই আত্মতৃপ্ত দেখাচ্ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— ভোটটা দেবীলালকেই দিয়েছিস তো? মোরগের ছবিতে ছাপ মারলি?
— না তো! আমি গোরুকে দিয়েছি।
— সেকি! তুই না একটা গাধা! দেবীলালের চিহ্ন তো মোরগ, গোরু নয়!
— আমি জানি তো। কিন্তু আমার গোরুকেই বেশি ভালো লাগে।
বিনোদের কথা শুনে আমি হতবাক! ভাগ্যিস ট্যাক্সিতে আমাদের কথোপকথনে কেউই মনোযোগ দেয় নি। তাহলে বিনোদকে অতটা পাহাড়ি পথ হয়তো হেঁটেই ফিরতে হত। তবে বিনোদের মত এমন অনেক প্রতারণা সত্ত্বেও দেবীলাল কিন্তু সেবার জিতে গিয়েছিল। আর বিনোদ? সে প্রতিবারের মত নিজের জন্যে ছোটখাটো একটা কাজ আবার জুটিয়ে নিতে পেরেছিল। দেবীলালের অনুমোদনের দরকার পড়েনি।

অনুবাদক নন্দিনী অধিকারী