এক কানকাটার লজ্জা অবশিষ্ট আছে। তাই সে রাস্তার পাশ দিয়ে যায়। কিন্তু দু-কানকাটা লজ্জাহীন। সে জানে, লজ্জা-ঘৃণা-ভয় তিন থাকতে নয়। তাই সে চলে রাস্তার মাঝখান দিয়ে। লোকে বিদ্রূপ করবে? করুক। ফিসফিস করে গালাগালি করবে? করুক। মুচকি হাসি হাসবে? হাসুক। কিসসু যায় আসে না তার। যদি বিশ্বাস না হয়, বিজেপিকে দেখুন, সে দলের নেতাদের কথা শুনুন, তাদের কার্যকলাপ দেখুন। হাতে হাতে প্রমাণ পাবেন। আর এটা জানতে হলে আপনাকে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে হবে না। রাজনীতির কোন জ্ঞানেরও দরকার নেই। বুদ্ধির ঘরটাকে খোলা রাখলে, সাধারণ জ্ঞানের খোপটাকে সচল রাখলেই মালুম হবে। আমি হলপ করে বলতে পারি, ভারতবর্ষের আর কোন রাজনৈতিক দলের এরকম দু-কানকাটা হবার নজির নেই।
আপনারা তো শুনেছেন, প্রত্যেকের ব্যাঙ্কে ১৫ লক্ষ টাকা ঢুকে যাবার গপ্পো। আপনারা তো শুনেছেন কালো টাকা ধরার জন্য নোটবন্দির গপ্পো। আপনারা তো শুনেছেন বছরে ২ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের গপ্পো। বিকশিত ভারতের গপ্পো শুনতে শুনতে কান আপনাদের পচে গেছে নিশ্চয়ই। ভারতের, থুড়ি নরেন্দ্র মোদির বিশ্বগুরুর ঘোষণা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। গরুর দুধে সোনা, গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি, সুপ্রাচীন ভারতে বিমানের ব্যবহার, গোমুত্রে করোনা সারাবার নিদান, করোনার হৃদপিণ্ড ফাটাবার জন্য মোমবাতি জ্বালাবার নির্দেশ, যুদ্ধে পাকিস্তানকে কচুকাটা করার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। দু-কানকাটাদের এসব আজগুবি কথায় আপনারা মুচকি হেসেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যঙ্গ করেছেন। কিন্তু কোন প্রশ্ন করেন নি, প্রতিবাদ করেন নি।
তাই দু-কানকাটারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আদানি আম্বানিদের হাতে তুলে দিচ্ছে দেশের সম্পদ। ব্যাঙ্কের কোটি কোটি টাকা লুঠ করে বিদেশে পালিয়ে যাবার সুযোগ করে দিচ্ছে পুঁজিপতিদের। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের তাঁবে নিয়ে আসছে। পাল্টে দিচ্ছে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান। পাল্টে দিতে চলেছে সংবিধান। প্রতিবাদ করলেই লেলিয়ে দিচ্ছে এজেন্সিকে। হিন্দু রাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে, অন্য দলের নেতা-বিধায়ক-সাসংদ ভাঙিয়ে ক্ষমতা দখল করছে একের পর এক রাজ্যে। নির্বাচন কমিশনকে লাগিয়ে অন্য দলের জ্যান্ত ভোটারকে মৃত বলে দাগিয়ে দিচ্ছে, কিংবা ঘুষপেটিয়ার নামে তাদের বাদ দিয়ে চলেছে।
এসব তো আমরা নিত্য দেখছি। বুঝতে পারছি। শুধু মুখে কুলুপ এঁটে রাখছি। কেন?
কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখতে পেলাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সেই বিখ্যাত কবিতাটি। ‘উলঙ্গ রাজা’। ‘উলঙ্গ’ শব্দটি মার্জিত। প্রয়াত নীরেন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলি, কবিতাটির যথার্থ নাম হবে ‘ন্যাংটো রাজা’। তখনকার দিনে রাজতন্ত্র ছিল। তাই রাজার কথা। এখন গণতন্ত্র। তাই রাজার বদলে মন্ত্রী। কবিতাটি নতুন করে পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম। কি আশ্চর্য মিল এখনকার সঙ্গে। কবিতাটি প্রতীকী। কবি বলেই রেখেছেন :
‘নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়’।
কবিতার প্রথম স্তবকে আছে :
সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ (ন্যাংটা ), তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে, শাবাশ, শাবাশ।
‘সবাই’ হচ্ছে জনগণ, আমরা; ‘রাজা’ হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহ বা তাঁদের নামজাদা কেউ। তাঁদের কার্যকলাপ জেনে-বুঝেও আমরা হাততালি দিই। শাবাশ বলছি। বিজ্ঞানীদের সভায় নরেন্দ্রদামোদর যখন ঘোর অবৈজ্ঞানিক কথা বলেন, তখন সেখানকার দর্শকদের তালি বাজানোর উচ্ছ্বাস আমরা দেখেছি অনেকবার। অনৈতিহাসিক বা ইতিহাসবিরুদ্ধ বক্তব্য যখন তাঁদের কেউ অবলীলাক্রমে পেশ করেন, তখন দর্শদের একই উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। কেন এরকম করি আমরা? কবিতায় তারও ব্যাখ্যা আছে :
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়,
কেউ বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে;
কেউ বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক;
কেউ বা ভাবছে রাজবস্ত্র অতীব সূক্ষ্ম, চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়।
মিলছে কি আমাদের সঙ্গে? মিলছে, ভীষণভাবে মিলছে। অনেকের সংস্কার আছে। সনাতনী সংস্কারের কথা তো আমরা প্রায়ই শুনি। এঁরা অন্ধভক্ত। এঁদের এতটা দোষ দেওয়া যায় না। এঁরা নিজের বুদ্ধি অন্যের কাছে বন্ধক রেখেছেন। এঁরা মনে করতেই পারেন যে রাজা যা বলছেন তা আপাতত অলীক মনে হলেও পরে সত্য হতে পারে। কিন্তু যাঁরা জেনে-বুঝে ভক্ত সাজেন, তাঁরা সাংঘাতিক। জেনে-বুঝে ভক্ত সাজেন কেন? কারণ তাঁরা যে পরান্নভোজী, কৃপাপ্রার্থী, উমেদার। অফিসার হতে পারেন, প্রফেসার হতে পারেন, বিজ্ঞানী হতে পারেন, লেখক হতে পারেন, সম্পাদক হতে পারেন, সাংবাদিক হতে পারেন, গায়ক হতে পারেন, খেলোয়াড় হতে পারেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনি উমেদার, কৃপাপ্রার্থী। অথবা আপনি আপাদমস্তক ভিতু। তাই রাজাকে ন্যাংটো দেখেও আপনি হাততালি দিয়ে যান।
না মশাই, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে অথবা বিচারালয়ের দিকে তাকিয়ে অথবা ‘ঈশ্বর এদের ক্ষমা করবেন না’ — স্তোকবাক্যে বিশ্বাস করে কোন পরিবর্তন আসবে না। রাস্তায় নামতেই হবে। গণতন্ত্রের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে আছে যে দলতন্ত্র, তাকে সমূলে বিতাড়িত করেই নামতে হবে পথে। দু-কানকাটা রাজার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হবে :
রাজা তোর কাপড় কোথায়?
চোখ ঘোরালে রাজনীতির জগতে কানওয়ালা দল,ব্যক্তি চোখে পড়ে না।
কবিকে শ্রদ্ধা জানাই তিনি লিখেছেন রাজা তোর কাপড় কোথায়?
উনিশ শতকের গোড়ায় (১৮৩৭) হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন “The Emperor’s New Clothes” রূপকথার আকারে প্রকাশ করেন এবং সেটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়, শিশুদের মধ্যে মজার জন্য আর পূর্ণ বয়স্কদের কাছে শ্লেষ আর ব্যাঙ্গের উপাদান হিসেবে মোসাহেবদের উদ্দেশ্যে।
পরবর্তীকালে একই ভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীর উলঙ্গ রাজা কবিতাটি।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, হিস্টরি রিপিটস ইটসেলফ, একবিংশ শতাব্দীতে ও সেই বালক কে খুঁজছি আমরা যে জোরে জোরে বলবে,”এমা রাজা তুমি ন্যাংটো!”
অত্যন্ত জরুরী আজ সেই বালকের আগমন।