গত কিস্তিতে যে স্তবকে আমার অনুবাদ শেষ করেছি, সেটা নিঃসন্দেহে নবাবের ব্যাপারে কোম্পানির অবস্থান সম্পর্কে আমজনতার চলতি ধারণা। কিন্তু ওই স্তবকে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। পলাশীর যুদ্ধে প্রমান হল, ইংরেজ শক্তির প্রকাণ্ড সমর্থন নিয়ে, গভর্নর থেকে শুরু করে কনিষ্ঠতম কর্মকর্তা পর্যন্ত (উইলিয়াম বোল্টসের মত মানুষদের লেখা ইতিহাস নির্ভর করে নিঃসন্দেহে এই তরল সময়কাল সুচারুভাবে উপস্থিত করা যায়। কলকাতা থেকে প্রশাসনিকভাবে ধাক্কা দিয়ে বোল্টসকে শেষ পর্যন্ত ইওরোপে পাঠানোর পর তিনি একটা অস্ট্রিয় কোম্পানিতে যোগ দেন। রিচার্ড বারওয়েলের চিঠিপত্রের খাতা, যা বর্তমানে কলকাতা হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির কাছে আছে, দেখা যায় যে বারওয়েল কীভাবে সব ধরনের বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে নিজের তাঁবেতে বিপুল বিশাল ধনসম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন; আর এই বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে তিনি ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে হাত খুলে ঘুষের বন্যা বইয়ে নিজের পদোন্নতির ভাগ্য নিশ্চিত করলেন। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের [আগেই বলেছি নবাবের দেওয়া দস্তক, অর্থাৎ রাহদারি, অর্থাৎ পথকর না দিয়ে শুল্ক মুক্ত দেশিয় বাণিজ্যে বহুকাল নাক অবদি ডুবে বিপুল সম্পদ সংহত করছিলেন কোম্পানির উচ্চপদের আমলারা, ছোট কর্মকর্তারা বাণিজ্য করতেন না এমন নয়, কিন্তু তার পরিমান তুলনামূলকভাবে খুবই কম ছিল। বড় কর্তারা নিজেদের পর্দারা পিছনে লুকিয়ে রেখে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য অপারেশনের দায় তাদের প্রত্যেকের চয়েস করা দাদনি বণিকদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন; কোম্পানির আমলাদের এই ছুতারুস্তমি কারনামা কিন্তু নিজামতের কর্তাব্যক্তিদের জানতে বাকি ছিল না; এই নিয়ে মুর্শিদকুলি খানের আমল থেকেই বাঙলার নিজামতের সঙ্গে বানিয়া কোম্পানির বিরোধ কখনও কখনও তুঙ্গে পৌঁছে যেত এবং নবাবেরা তাদের হুমকি দিতেন দেশ ছাড়া করার — অনুবাদক] বিষয়টি রাজনীতির জ্বলন্ত বিষয়ে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারন ছিল কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত লোভ — বিশেষ করে দেশিয় বাণিজ্য এবং ভ্যান্সিটার্টের ব্যক্তিগত বাণিজ্য, প্রকৃত বিব্রতকর পরিস্থিতি উদ্ভব করেছিল), কোম্পানির বেশিরভাগ কর্মচারী, বৃহৎ পরিসরে ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছিলেন, কখনও কখনও এমনকি একে অপরের সাথে বাণিজ্য করার জন্য কোম্পানি গঠন করতেন এবং সীমান্ত জেলাগুলিতে ইউরোপীয় এজেন্ট নিয়োগ করতেন, যে জেলাগুলির মানচিত্র কয়েক বছর আগেও কোনো প্রকাশিত মানচিত্রে অঙ্কিত ছিল না। (উদাহরণস্বরূপ, বার্থোলোমিউ প্লেস্টেডের ‘জার্নি ফ্রম ক্যালকাটা বাই সি টু বুসেরা, অ্যান্ড ফ্রম দেন্স অ্যাক্রস দ্য গ্রেট ডেজার্ট ইন ১৭৫০’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত মানচিত্রটি দেখুন। লন্ডন, ১৭৫৭। এই মানচিত্রটি ‘বেঙ্গল : পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’, চতুর্থ খণ্ডে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।) এপ্রিল, ১৭৬২ সালে, তৎকালীন কাউন্সিলের সদস্য ওয়ারেন হেস্টিংস লিখেছিলেন:
“ইংরেজ নামের ছত্রছায়ায় এবং নবাবের প্রজাদের প্রতিরোধের সাহসের অভাবে যে অত্যাচার নামিয়ে আনা হচ্ছে… আমি নিশ্চিত যে এই ধরণের অপকর্ম সারা দেশে এমন লোকেরা করছে, যারা মিথ্যাভাবে আমাদের সিপাহীদের পোশাক পরে অথবা নিজেদের আমাদের, প্ররথাত কোম্পানির নিয়োজিত গোমস্তা বলে পরিচয় দেয়… আমি নদী পথে যাতায়াতের সময় বেশ কয়েকটা জায়গায় ইংরেজ পতাকা উড়তে দেখে খুবই অবাক হয়েছি। আমার মনে হয় না যে আমি একটাও নৌকা দেখেছি যেখানে [ব্রিটিশ] পতাকা ছিল না। যে নামেই এগুলো ব্যবহার করা হোক না কেন (কারণ আমি তৃতীয় ব্যক্তিকে প্রশ্ন করার জন্য না থেমে, কেবল আমার চোখের দেখা তথ্যের উপরই নির্ভর করেছি), আমি নিশ্চিত যে এগুলোর আধিক্য নবাবের রাজস্ব, দেশের শান্তি বা আমাদের জাতির সম্মানের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না, বরং স্পষ্টতই এগুলোর প্রত্যেকটিই আমাদের সম্মান হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। আপনি জানেন, স্যার, এই ধরনের ছোটখাটো অনিয়ম থেকেই, যা হয়তো জনসাধারণের অভিযোগের জন্য খুব তুচ্ছ, এবং যা ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, দেশের মানুষ আমাদের সরকার সম্পর্কে সবচেয়ে প্রতিকূল ধারণা পোষণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এর ফলে ইংরেজদের সুনাম এমন বিষয়গুলির চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা নবাব এবং আমাদের মধ্যে বিতর্কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।” (Vansittart: A Narrative of the Transactions in Bengal, vol. II, pp. 80-81)
অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের বিতর্কিত বিষয়ে একটা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে, ভ্যান্সিটার্ট, হেস্টিংসকে সাথে নিয়ে অক্টোবর, ১৭৬২-তে মুর্শিদাবাদে নবাবের সাথে মুখোমুখি সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকে, এই বিষয়ে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত পরিকল্পনা আলোচনা হয়েছিল এবং তাতে সকলে সম্মতও হয়েছিল; কিন্তু কলকাতার কাউন্সিল গভর্নরের কার্যক্রমের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য কোমর বাঁধে অবিলম্বে। মীর কাসিম খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পারেন তিনি ক্লাইভের সাথে নয়, বরং ভ্যান্সিটার্টের সাথে আলাপ আলোচনা সারছেন। তিনি স্পষ্ট বুঝলেন কলকাতা কাউন্সিল তাকে ঘেন্না করে, এবং আরও বড় কথা হল, তাদের সম্মতি ছাড়া গভর্নরের প্রত্যেক প্রস্তাব একান্তই মূল্যহীন, অবাস্তব। এই বাস্তব অবস্থায় নবাব ক্ষোভে ফেটে পড়ে ভ্যান্সিটার্টকে লেখেন “আপনার কর্মচারী এবং অন্য নীচ চরিত্রের লোকজনের” কথা, এবং অন্য এক চিঠিতে লেখেন, “আপনার মতোই, আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করার মতো অভিব্যক্তি ব্যবহার করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই।” এরপর, মীর কাসিম আরব্য রজনীর গল্পের অনুকরণে লিখলেন, কিভাবে এক বিশ্বস্ত দাসী তার প্রভুর দরজার আঁকা খড়ির দাগ অদৃশ্য করতে সেটি মুছে না ফেলে প্রত্যেকটি দরজায় একই রকম খড়ির দাগ এঁকে দিয়েছিল। ইংরেজদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের উপর শুল্ক মওকুফ করার জন্য বলা হলে, মীর কাসিম ইউরোপীয় ও ভারতীয় সকলের জন্য দুই বছরের জন্য সমস্ত শুল্ক মওকুফ করে দিলেন। [বিশ্বের রাষ্ট্র কাঠামোর ইতিহাসে এই প্রথম বা এই শেষবারের জন্য কোনও সরকার সার্বিকভাবে শুল্ক মকুব করল। ব্রিটিশ কোম্পানির ক্ষমতায় আসার আগেই যদি এই পরিমান অত্যাচার নামিয়ে আনে, এই পরিমান দখলদারি ছড়িয়ে দেয়, তাহলে ক্ষমতায় এলে তাদের অত্যাচার কোন স্বরূপ ধারণ করবে এটা আন্দাজ করার জন্য ভবিষ্যতদ্রষ্টা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না — অনুবাদক] এই ধরনের খবর ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল বিস্ময় আর ক্ষোভের সাথে গৃহীত হওয়ার পরপরই গয়া থেকে প্রকাশ্য হিংসার সংবাদ আসতে শুরু করে; জানা যায় যে ঢাকার নায়েব তার জেলার মধ্য ইংরেজদের সব ধরণের পণ্য পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ নিষিদ্ধ করেছেন। অবিলম্বে যুদ্ধ ঘোষণা না করে, কাউন্সিল, মিস্টার অ্যামিয়ট এবং হে-কে প্রতিনিধি হিসেবে নবাবের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই দুই ভদ্রলোককে হত্যা করা হয়, এবং শুরু হয় রক্তাক্ত ঘটনাবলীর এক ধারা, যা পাটনায় ইংরেজদের গণহত্যার মধ্যে দিয়ে চরম আকার ধারণ করে — এটা এমন এক মর্মান্তিক ঘটনা যা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটলেও, অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতাকে এই কাণ্ড ম্লান করে দেয়। এই অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মেকলে লিখেছিলেন, “Nothing in history or fiction, not even the story which Ugolino told of the sea of everlasting ice, after he had wiped his bloody lips on the scalp of his murderer, approaches the horrors which were recounted by the few survivors of that night.।” (“ইতিহাস বা কল্পকাহিনীতে এই ঘটনার কাছাকাছি তুলনীয় কিছুই পাওয়া যায় না, এমনকি উগোলিনো [Dante-র Inferno-র Ugolino-র কাহিনী – অনুবাদক] তার খুনির মাথার চামড়ায় রক্তাক্ত ঠোঁট মোছার পর চিরস্থায়ী বরফের সমুদ্রের যে গল্প বলেছিলেন, তাও সেই রাতে কয়েকজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মানুষের ভয়াবহতার কাছাকাছি পৌঁছায় না।”) [প্রসঙ্গত বলে রাখি অন্ধকুপ হত্যার বয়ান মিথ্যে প্রামান করেছিলেন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজউদ্দৌলা গ্রন্থে। কিন্তু এ নিয়ে আলাদা গবেষণা করে ১৯৩৮-এ বই প্রকাশছেন মুজিবর রহমান, ‘অন্ধকূপ-হত্যা’-রহস্য’ নামে অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ সেন এবং হেমচন্দ্র রায়ের নির্দেশনায় এবং কবি মৌলবী মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফার [কবি, অনুবাদক এবং শিক্ষাবিদ ফরিদা মজিদের নাতনি] সাহায্যে — অনুবাদক]।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ