মীর কাসিম খানের বাংলা সুবা সরকার পরিচালনা শুরুর সময়টা ছিল উজ্জ্বল, সম্ভাবনাময় এবং প্রতিশ্রুতিতে পরিপূর্ণ। অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন নবাব ইংরেজ পাওনাদারদের বিপুল বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করলেন। ফলে ফোর্ট উইলিয়ামের কর্তাব্যক্তিরা আড়াই লক্ষ টাকা মাদ্রাজে পাঠাল এবং এই বিপুল পরিমান অর্থ সেখানে ব্যবহার হল “অত্যন্ত সময়মতো পণ্ডিচেরির সেনাবাহিনীর সেবার জন্য”। বাস্তবে, নবাব মীর কাসিম রাজস্বের উৎসগুলোর উপর অসম্ভব রকমের চাপ সৃষ্টি করলেন; এবং সম্ভবত মসনদে আরোহণের প্রথম মুহূর্ত থেকেই তিনি পরিকল্পনা করছিলেন বাংলা থেকে যে কোন উপায়ে ইংরেজদের তাড়ানোর সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি করতে। যদিও তিনি ইংরেজ গভর্নরের সুবাদেই নবাব হতে পেরেছিলেন, কিন্তু মীর কাসিম খুব ভালো করেই জানতেন ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের সদস্যদের অধিকাংশই তার ঘোর শত্রু এবং কমিটিতে একমাত্র ওয়ারেন হেস্টিংস ছাড়া তার পক্ষে দাঁড়াবার জন্য আর কোনো বন্ধু ছিল না। ভেরেলস্ট বলেছিলেন, “মীর কাসিমের পক্ষে আমাদের সমর্থন নির্ভর করে সরকার চালানো অসম্ভব ছিল।” (ভেরেলস্ট : ভিউ, ইত্যাদি। পৃষ্ঠা ৪৭।) মীর কাশিমের এই উপলব্ধিতে উপনীত হওয়া, আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন সময় গড়ানোর সাথে সাথে ব্রিটিশদের সঙ্গে তার মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া অবশ্যম্ভাবী ঘটনা হবে বলে মনে হচ্ছিল; ফলে নবাব নিজেকে নিয়োজিত করলেন সম্পদ সঞ্চয় করারা উদ্দেশ্যে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার কঠোরতা মাত্রা ছাড়া করতে।[ফ্রান্সিস (মিনিটস, ইত্যাদি, পৃষ্ঠা ২৩) মীর কাসিম সম্পর্কে তিনি লিখছেন : “বলা হয়, তার নীতি ছিল প্রজারা যা কিছু রাজস্ব দেবে তার প্রতি পাইপয়সা সরকারের সম্পত্তি হবে; এই নীতির ফলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদারি কাঠামোকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হল। কর্মকর্তারা নবাবের নীতি বাস্তবায়িত করতে কাজ শুরু করল। হিসাব রাখায় তার দক্ষতা এবং তার সরকারের রাজস্ব আদায়ের কঠোরতার জন্য প্রজারা মীর কাশিমকে এতটাই চূড়ান্ত রকম ভয় পেত যে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে রায়তেরা তার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাধ্য হত; ফলে আংশিকভাবে জমির প্রত্যক্ষ উৎপাদন থেকে এবং আংশিকভাবে জরিমানা ও বাজেয়াপ্তির মাধ্যমে, অনেকেই মনে করেন, দু’বছরে মধ্যেই তিনি সারা দেশ থেকে পূর্ববর্তী আমলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় করলেন। তার সংক্ষিপ্ত শাসনকালকে শাসনব্যবস্থা না বলে বরং নিয়মতান্ত্রিক লুণ্ঠনের কাল বলাই অধিকতর শ্রেয়।” ১৭৭৩-এর সিক্রেসি কমিটির চতুর্থ প্রতিবেদনে (পৃষ্ঠা ৩) বলা হয়েছে যে, ১৭৬০-এ মীর কাসিম “মূল রাজকীয় রাজস্বের উপর দেড় আনা বা ৩/৩২ অংশের অতিরিক্ত রাজস্ব আরোপ করেন; এবং এই অতিরিক্ত রাজস্বের পরিমাণ সিক্কা রুপি ৪,৫০,১৬৪-২-৯ নির্ধারণ করা হল, যা পূর্ববর্তীকালের রাজস্ব ১,৩২,৮২,৯৬০-২-১৭-১ এর সাথে যোগ করে তার সময়ে মোট রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় ১,৩৭,৩৩,১২৪-৫-৬-১ বা ১,৭৯২,১৭২ পাউন্ড স্টার্লিং।” এই শেষ অঙ্কে পৌঁছানোর সময় সম্ভবত এই বিষয়টি ভুলে যাওয়া হয়েছিল যে, যদি আলীবর্দী খানের সময়ে ১,৩২,৮২,৯৬০-২-১৭-১ টাকা মোট রাজস্ব হয়ে থাকে, তবে মীর কাসিম মসনদে বসার সময় চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর এবং বর্ধমানের রাজস্ব ইংরেজদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, এবং সেই কারণে মীর কাসিমের মোট রাজস্ব নির্ণয়ের জন্য তার বৃদ্ধিকে আলীবর্দী খানের রাজস্বের সাথে সরাসরি যোগ করা যায় না]।
ক্লাইভ এবং তাঁর সিক্রেট কমিটি, ১৭৬৭-র ২৪শে জানুয়ারি, লন্ডনের কর্তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো চিঠিতে, মীর কাসিমের শাসন আমলে কোম্পানির সমস্যার প্রধান কারণগুলো বর্ণনা করেছেন। তাঁরা কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে লিখেছিলেন, “আমরা এখন দেশের মধ্যে চলতে থাকা বাণিজ্য সংক্রান্ত আপনাদের নির্দেশনার বিষয়ে আলোচনায় আসছি, যাকে আপনারা অত্যন্ত ন্যায্যভাবেই বাংলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া সমস্ত রক্তপাত, গণহত্যা এবং বিশৃঙ্খলার ভিত্তি বলে মনে করেন।” (ভেরেলস্ট: ভিউ, ইত্যাদি, পরিশিষ্ট, পৃষ্ঠা ৪৪।) দেশের ভেতরের কোম্পানির আমলাদের বাণিজ্য নিয়ে ভ্যান্সিটার্টের সংজ্ঞা হল: “এটা এমন এক বাণিজ্য যা কোম্পানির ব্যক্তি আমলারা নিজেদের পুঁজি আর উদ্যম ব্যবহার করে দেশের উৎপাদিত পণ্য ক্রয় করেন এবং সেই দেশেই আবার সে সব পণ্য বিক্রি করেন। এই ব্যক্তিগত বাণিজ্যে এমন সব পণ্য থাকে যা রপ্তানি বাণিজ্যের উপযুক্ত নয়, কিন্তু সে সব পণ্য দেশের মধ্যেই আবার বিক্রি হয়; অথবা এই বাণিজ্যতে এমন কিছু জিনিসপত্র থাকে যা থেকে পাওয়া অর্থ দেশের সরকারের (অর্থাৎ নবাবের) কোষাগারে জমা পড়ে।” (ভ্যান্সিটার্ট: অরিজিনাল পেপারস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা xxvii) এই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সাথে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরাসরি সম্পর্ক থাকার কথা না। কোম্পানিকে দেওয়া বিশেষ সনদে, তাকে এদেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানির বিশেষাধিকার দেওয়া হয়েছিল, সেই অধিকার কোনওভাবেই কোম্পানি বা তার কর্মচারীদের দেশের মধ্যে ব্যক্তিগত বাণিজ্য করার অধিকার দেয় না, তাই ভ্যানসিটার্ট জোর দিয়ে বলেন : It never could be intended by the Mogul King that private foreign merchants should be upon a better footing than private native merchants. If any set of foreign merchants could deal in all goods produced in the country, and sold in any part of the same country, free from all duties, while at the same time all duties were paid by the natives, the foreigners must, in consequence, keep the whole trade to themselves, and also the Government of the country must lose the whole of the duties।” লুক স্ক্র্যাফটন, ক্লাইভের পরিকল্পনায় ওমিচাঁদকে (আমিরচাঁদ) প্রতারণার চক্রান্তে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন এবং পলাশীর যুদ্ধের পর তিনি মুর্শিদাবাদে রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন, তিনি ‘অবজারভেশনস অন মিস্টার ভ্যান্সিটার্টস ন্যারেটিভ’ গ্রন্থে লিখছেন : “এই সময়ে কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে প্রচলিত সাধারণ ধারণা ছিল, পলাশীর যুদ্ধ কেবল আমাদের কলকাতা দখলের আগের পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে এনেছে; সুবাদারকে আগের মতোই স্বাধীন বলে মনে হচ্ছে, এবং ইংরেজরা ফিরে এসেছিল তাদের পুরোনো কাজ, বাণিজ্য সম্পাদনের ভূমিকায়। তাদের পক্ষে পরিস্থিতির একটামাত্র পরিবর্তন ছিল যুদ্ধে ক্ষতির জন্য পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাওয়া এবং সামান্য কিছু ভূখণ্ড লাভ, যা দিয়ে তাদের গ্যারিসনগুলোর সামরিক ব্যয় নির্বাহ করা যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, কারণ এই ব্যয়ভার কেবল তাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থেকে বহন করাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ছিল; সুবাদারের বিপদে কখনও কোনওভাবে সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হতো, তবে সেটা করতে হত কোম্পানির নিজের খরচেই।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ