রবীন্দ্রনাথের জীবনের যে ইচ্ছা পূরণ হয় নি, সনজীদা খাতুনের ক্ষেত্রে সেটা হল। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যেন শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীর মাটিতে সমাধিস্থ করা হয়। কবির সে ইচ্ছা পূরণ হয় নি। তাঁর মৃত্যুর পর পরিজনেরা হিন্দু ধর্মীয় রীতি মেনেই নিমতলা শ্মশানে তাঁর দেহ দাহ করেছিল।বিশ্বকবির সৃষ্টিতে যিনি নিজের জীবনকে নিবেদিত করেছিলেন সেই সনজীদা খাতুনের শেষ ইচ্ছা বাংলাদেশে সম্মানিত হয়েছে। গানে গানে তাঁকে অন্তিম সম্মান জানিয়েছে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা। গান গেয়ে গেয়েই তাঁকে বিদায় জানিয়েছে তাঁর পরিবারের সদস্য, ছাত্রছাত্রী ও অনুরাগীরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা ও পঠনপাঠনের স্বার্থে তাঁর দেহ দান করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে। আয়ুবশাহীর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কপালের যে টিপকে অস্ত্র করে নিয়েছিলেন তিনি যৌবনে, অন্তিম যাত্রায়ও কপালে সেই টিপকে ধারণ করেই তিনি বিদায় নিয়েছেন।
সনজীদার মৃত্যুর পর বোঝা গেল যে এ দেশের বাঙালি যারা সুচিত্রা কণিকা দেবব্রত হেমন্তকে চেনে তাদের সিংহভাগ সনজীদা খাতুনকে চেনে না। বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত বললে তারা বোঝে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকেই। ফলে আমাদের বিস্ময় আবর্তিত হয়েছে এই ভেবে যে, একজন মুসলিম রমণীর মৃত্যুর পর সকলে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে, তাঁর কপালে আমৃত্যু একটি টিপ, যাঁর দেহ কবর না দিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বার্থে দান করা হল। এই ‘আমরা’টি হচ্ছে এপারের হিন্দু বাঙালিদের অধিকাংশ। হয়ত এপারের মুসলিম সহ অ-হিন্দু বাঙালিরাও তাই। সামাজিক মাধ্যমে সনজীদার অন্তিম শ্রদ্ধার অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচারের মন্তব্যের সারণিতে ধর্মান্ধ লোকেদের মন্তব্যের প্লাবন দেখে আমাদের এপারের ‘হিন্দু বাঙালি’-রা ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। এমন ভান করছেন যেন এই ধর্মান্ধতা বাংলাদেশের একারই কলঙ্ক কিংবা সামাজিক গণমাধ্যমের মন্তব্যের এই প্লাবনটিই হচ্ছে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিচয়।
সনজীদার মৃত্যুর পর তাঁর বাঙালিত্বের সাধনাকে ফেসবুক পাড়ার বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা যেমন হিন্দুয়ানী বা ভারতীয় সংস্কৃতি বলে অভিহিত করেছে, সেটা অবচেতনে হয়ত এপারের হিন্দু বাঙালিদের একাংশও মনে করে। এবং মনে করে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি নিয়ে। মনে করে এভাবে ‘ওদের’ অন্তত একজন ‘আমাদের’ মত হয়ে গেল।!আমাদের ভাবের ঘরের চুরিটা এখানেই। আমরা আরো বুঝি না বা বুঝতে চাই না যে, ইরানের স্বাধীনতাকামী নারীর হিজাব খুলে ফেলা বা পাকিস্তানী আমলের পূর্ব বাংলায় লাল শাড়ি, কপালে টিপ পরা আর ভারতের কর্ণাটকের বিজেপি সরকারের হিজাব নিষিদ্ধ করাটা যে কোনোভাবেই সমগোত্রীয় নয়। হিজাব পরতে বাধ্য করা এবং খুলতে বাধ্য করা একই পয়সার দুটো পিঠ। দু’টোই মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। দু’পারের এই সংকীর্ণমনা মানুষদের ধারণা বা প্রতিক্রিয়াকে মান্যতা দেওয়ার প্রশ্নই নেই, তবে বঙ্গভঙ্গের দিনে রবীন্দ্রনাথ কথিত ব্যাধির প্রতিকারার্থে একে ধর্তব্যের মধ্যে অবশ্যই রাখতে হবে। যারা সংকীর্ণমনা রক্ষণশীল বা মৌলবাদী নন, তাঁদের তরফেও সনজীদার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বলা কথাগুলি তাঁর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের কাছাকাছি পৌঁছয় না।
মুসলিম সমাজের কোনো মুক্তচিন্তার মানুষের মৃত্যু হলেই আমাদের একটি প্রবণতা রয়েছে, প্রথমেই তাঁকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে আখ্যায়িত করার। এর মধ্যেও একটা সাম্প্রদায়িক গন্ধ আছে। কারণ হিন্দু সমাজের কোনো মুক্তচিন্তার মানুষকে কখনোই ‘অসাম্প্রদায়িক’ আখ্যা প্রদান করা হয় না। যেন হিন্দু সমাজে অসাম্প্রদায়িকতা স্বতঃসিদ্ধ এবং মুসলিম সমাজে ব্যতিক্রম। খুব বেশি পেছনে না গিয়ে আলোকায়নের উনিশ শতক থেকে প্রযুক্তিগত বিস্ময়ের সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে চোখ রাখলে এমন ধারণার কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধর্মভীরুতাকে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা মানেও ধর্মদ্রোহ নয়। একইসঙ্গে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অসাম্প্রদায়িকতা বা অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্ব কথাটির আবার একটি সাংস্কৃতিক-রাজনীতিগত বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মুসলিম বাঙালির আত্মপরিচয়গত একটি বিদ্যমান ধারণার প্রতিকল্পে এই ধারণাটি গড়ে উঠেছিল একটি ধারাবাহিক লড়াই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এই মুহুর্তের বাংলাদেশের যে বিপদ সেই বিপদটি যতটা সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা বিষয়ক, তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের বিপদ। বাংলাদেশে সরকারি স্তর থেকে এই ধারণাটির উপর এই মুহূর্তে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক এই দুই থেকেই আক্রমণ নেমে এসেছে। এই বিষয়টি আপাতত মুলতুবি রেখে ফিরে আসি মুক্তচিন্তার মানুষদের সনজীদার খণ্ডিত মূল্যায়নের প্রসঙ্গে। সনজীদা যে মুসলিম সমাজের একটি ঐতিহাসিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ঘটনাপর্বের উত্তরাধিকার জ্ঞানত বহন করেই তাঁর আমৃত্যু রবীন্দ্রচর্চা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করেছেন সেই বিষয়টি খুব বেশি আলোচিত হয় নি। উনবিংশ শতকের বাংলার আলোকায়নের পর্বের প্রতি একটি ন্যায়সঙ্গত সমালোচনা রয়েছে যে এই আলোকচ্ছটা বাংলার মুসলিম সমাজকে স্পর্শ করে নি। বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত ওই পর্বে হিন্দু পুনরুত্থানবাদিতার ধারারও সুস্পষ্ট উপস্থিতি ছিল। প্রথম যৌবনে রবীন্দ্রনাথও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, যদিও তিনিই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগ দিয়েও পরে এই আন্দোলন থেকে সরে এসে এর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক অবস্থান গ্রহণ করেন। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস তাঁর এই প্রতিবাদী সত্তার সাক্ষ্য বহন করছে। সেই সময়ের অভিঘাতেই বাংলার মুসলিম সমাজের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পৃথকত্ব ও ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টা লক্ষিত হয়। এর বিরুদ্ধেই ‘ঘরে বাইরে’-র নিখিলেশ বা উপন্যাসের শেষ পর্বের ‘গোরা’-র মতই সমাজ সংস্কারের বার্তাবাহক হয়ে বাঙালি মুসলিম সমাজের আলোকায়নের ব্রত নিয়ে ১৯২৬ সালে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের মুসলিম ছাত্র শিক্ষকদের একটি গোষ্ঠীর উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ করে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর সংগঠন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও তাদের মুখপত্র ‘শিখা’। ১৯২৬-এর ১৯ জানুয়ারি আচার্য মহম্মদ শহীদুল্লাহ-র সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সভা থেকে গঠন হয় এই সংগঠনের। এই উদ্যোগের মূল সংগঠক ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন ও সনজীদার পিতা কাজী মোতাহার হোসেন। পত্রিকার নামকরণটিও তাৎপর্যপূর্ণ নানাভাবে। ওই সময়ে বাঙালি মুসলমানদের উদ্যোগে যে সাময়িকীগুলি প্রকাশিত হত তার মধ্যে ছিল ‘ইসলাম’, ‘আহমদী’, ‘হাফেজ’, ‘নূর আল ইমান’, ‘আহলে হাদিস’ ইত্যাদি। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্রের নামকরণটিই একটি ভিন্নতার বার্তাবহন করে। এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় লেখা থাকত, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। প্রথম সংখ্যাতেই যে নিবন্ধগুলি ছাপা হয় তাতেই এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। সেই নিবন্ধগুলি থেকে কিছু উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। যেমন :
১। বুদ্ধির মুক্তি না হলে ধর্ম শিক্ষা হতে পারে না। ধর্মের আদেশ বা নিষেধ পালন করার জন্য বুদ্ধির দরকার। বুদ্ধির অভাবে আমাদের ভিতর প্রকৃত ধর্মভাব লোপ পেয়েছে। এখন গোঁড়ামিই আমাদের ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। (বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক গলদ- আনোয়ারুল কাদির)
২। মাতৃভাষাই ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে সহজে আয়ত করিতে পারে। অতএব আরবি পার্শী না বুঝিয়া পড়িলেও পুণ্য সঞ্চয় হয়। এই কুসংস্কার ত্যাগ করিয়া, এই সকল বিজাতীয় ভাষা ছাড়িয়া দিয়া যদি ছেলেমেয়েদিগকে একমনে বাংলা শিক্ষা দেওয়া হয় তাহা হইলে তাহারা এই অল্প সময়েই…কর্ম ধর্ম নীতি জ্ঞান লাভ করিতে পারে। (শিক্ষা সমস্যা- মমতাজউদ্দীন আহমেদ)
৩। ধর্মের অনুশাসন অভিনয়ের বিরুদ্ধে থাকিতে পারে, কিন্তু সমাজের বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য অভিনয় করা দরকার। (নাট্যাভিনয় ও মুসলমান সমাজ- আব্দুস সালাম খাঁ)
এই গোষ্ঠীর তরুণরা অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন একই সঙ্গে বাংলা ও তুরস্কের নবজাগরণ থেকে। এঁদের আদর্শ ছিলেন একদিকে রামমোহন, রবীন্দ্রনাথ, অন্যদিকে কামাল আতাতুর্ক। গ্যেটের দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন এঁদের গোষ্ঠীর অগ্রনী ব্যক্তিত্ত্ব কাজী আবদুল ওদুদ। এক অর্থে বলতে গেলে এই তরুণেরা বিংশ শতকের দুইয়ের দশকের ঢাকা শহরে এক নতুন নবজাগৃতিরই সূচনা করেছিলেন। তাঁরা আশীর্বাদধন্য ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও। কবিগুরু ওদুদকে বিশ্বভারতীতে বক্তৃতার জন্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে এই নবজাগৃতির শিখায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকার গোঁড়া মুসলিম সমাজ। মোল্লা মৌলবীরা কাজি আবদুল ওদুদের ‘সম্মোহিত মুসলমান’ নামের প্রবন্ধে রুষ্ট হয়ে বলে এই লেখা ইসলাম এবং নবীর অবমাননা করেছে। ১৫ দিন ধরে মুখোমুখি বিতর্কের পর ও মৌলবাদীরা ওদুদের লেখার মর্মবাণী বুঝতে অস্বীকার করেন। ওদুদকে মুচলেকা দিতে হয়। এই ধরনের আঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলা এই সাময়িকী পাঁচ বছর পর বন্ধ হয়ে গেলেও এই আন্দোলনের অভিঘাত সুদূরপ্রসারী ছিল। তিরিশের শেষ থেকে শুরু করে গোটা চল্লিশের দশক বাঙালি মুসলিম মানস দ্বিজাতি তত্ত্বের কারাগারে ধীরে ধীরে বন্দী হয়ে গেলেও, মাঝে মাঝেই এই কারাগারের অর্গল ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে মুক্ত বাতাস। কট্টরপন্থা, দ্বিজাতি তত্ত্ব আর দেশভাগের ফলে শিখা পত্রিকার ভাবাদর্শ কিছুদিন হয়ত চাপা পড়েছিল। কিন্তু ভাষা সংগ্রামের সূত্র ধরেই পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের নির্মানের কর্মযজ্ঞে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘শিখা‘ পত্রিকার ভাবাদর্শ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মকাণ্ডের ওই পর্ব সম্পর্কিত গবেষক আবদুল হক এই আন্দোলন সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে-কারণে বাঙালি মুসলমান তার প্রতিবেশী হিন্দুর তুলনায় পশ্চাদগামী সেই একই কারণে জ্ঞান-চর্চা থেকে পিছিয়ে পড়ে তারা হিন্দুবিদ্বেষী। বাঙালি হিন্দু যেমন প্রতিবেশী মুসলমানকে না জেনে মুসলমানবিরোধী – অনুরূপভাবে বাঙালি মুসলমান জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে প্রতিবেশীর হৃদয়ে প্রবেশ করতে না পেরে বঞ্চিত। এভাবেই শিক্ষা-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্যের পরিণতি হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা’।
পারস্পরিক অজ্ঞানতার পরিসরটিকে ভরাট করে বাঙালিকে এক অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে হাত ধরাধরি করে হাঁটার পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল এই সংগঠন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হল এই সংগঠনের যিনি স্বপ্নদ্রষ্টা সেই আবুল হোসেন ছিলেন যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না। অথচ ১৯২৯ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশন শেষে গ্রহণ করা হয়েছিল সমাজ সংস্কারের এমন একটি পাঁচ দফা প্রস্তাব :
“১। এই সভা বাংলার মুসলমান নর-নারীকে বিশেষভাবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত বাংগালীকে কোরানের সহিত পরিচিত হইবার অনুরোধ জানাইতেছে।
২। এই সভা বাংলার পল্লীর বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠাগার ও গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠায় বিশেষভাবে উদ্যোগী হইবার জন্য দেশের কর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানাইতেছে।
৩। এই সভা বাংলার বিভিন্ন মক্তব ও মাদ্রাসায় যাহাতে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যায়াম শিক্ষার ব্যবস্থা হয় তজ্জন্য গভর্নমেন্টকে অনুরোধ জানাইতেছে।
৪। এই সভা বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের নেতৃবৃন্দকে পর্দাপ্রথা দূরীকরণার্থে আদর্শ স্থাপন করিতে অনুরোধ জানাইতেছে।
৫। এই সভা সাহিত্য সমাজের কর্মীবৃন্দকে মুসলিম ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মবিষয়ক আরবী ও ফার্সি গ্রন্থ সমূহ অনুবাদ করিবার জন্য একটি অনুবাদ কমিটি গঠন করিতে অনুরোধ জানাইতেছে।”
কাজী মোতাহার হোসেনের দ্বিতীয় বর্ষের কার্য বিবরণীতে পাওয়া যায় : “আমরা চাই সমাজের চিন্তাধারাকে কুটিল ও পঙ্কিল পথ হইতে ফিরাইয়া প্রেম ও সৌন্দর্য্যের সহজ সত্য পথে চালিত করিয়া আমাদের দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে। এক কথা আমরা বুদ্ধিকে মুক্ত রাখিয়া প্রশান্ত জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা বস্তু জগত ও ভাবজগতের ব্যাপারাদি প্রত্যক্ষ করিতে ও করাইতে চাই।” মুসলিম সাহিত্য সমাজের লক্ষ্য ছিল ধর্মান্ধতার দ্বারা প্রভাবিত মুসলমান সমাজের অংশটিকে বৈজ্ঞানিক যুক্তির ভিতের উপর দাঁড় করাতে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের তরফে নিজেদের করণীয় সম্পর্কে বলা হয়: “মুসলিম সমাজে অনেক গলদ ঢুকিয়াছে। মিথ্যা হাদিস দ্বারা ঐ সবের সমর্থন চলিতেছে; অনেক সময় লোকেরা নিজেদের মতলব হাসিল করার জন্য হাদিস সৃষ্টি করিয়াছে; যে সমস্ত হাদিস বুদ্ধির দ্বারা সমর্থিত নহে তাহা মানিতে হইবে না; কুরআনের ব্যাখ্যা যাহা হইয়া গিয়াছে তাহা ব্যতীত আর হইতে পারিবে না, ইহা ঠিক নহে; কাল ও অবস্থা ভেদে ইহার নতুন ব্যাখ্যা দিতে হইবে।”
খুবই স্পষ্ট, এই সংগঠন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ছিল, ধর্মের বিরোধী ছিল না। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলার মুসলিম বাঙালি সমাজে যে সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে ওঠে তা মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও ‘শিখা’ পত্রিকার আদর্শের উত্তরাধিকারই বহন করেছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলিম লিগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লিগ এবং পরিশেষে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লিগে পরিবর্তন এরই সমান্তরাল রাজনৈতিক উত্তরণ। ১৮১৬ সালে ‘আত্মীয় সভা’ গঠনের মধ্য দিয়ে রাজা রামমোহন রায় যে আলোকায়নের সূচনা করেছিলেন বাঙালি হিন্দু সমাজের অভ্যন্তরে ১১০ বছর পর ঠিক সেই কাজটিই বাঙালি মুসলিম সমাজের অন্দরমহলে।সনজীদা শুধু কাজী মোতাহার হোসেনের সন্তান ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর পিতাদের ওই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনেরই উত্তরাধিকারী। একেই তিনি ধারণ করেছেন আমৃত্যু। শুধু সনজীদা একা নন, বাহান্ন থেকে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ, ছায়ানট থেকে রমনা বটমূলের নববর্ষ উদযাপন, সারা পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মীয় উৎসবের বাইরে গিয়ে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষ সকলের অভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে নববর্ষের নতুন সংজ্ঞায়ন, সারা বাংলাদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন পরিষদ নামের সংগঠনের প্রতিষ্ঠা- এই উদ্যোগের সাথে যারাই ছিলেন তারাই মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও ‘শিখা’ পত্রিকার উত্তরাধিকারকেই বহন করেছেন। যারা কাজী আবদুল ওদুদকে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করেছিল তাদের উত্তরসূরীরাই বাহান্নর ভাষা আন্দোলন ও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে হিন্দুয়ানী বা ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন বলে বিরোধিতা করেছিল। এরাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। পরবর্তীতে এদের উত্তরসূরীরাই পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের আন্দোলন করেছে যাদের সাথে শেখ হাসিনা সমঝোতা করে নিজের শাসন বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। শেখ হাসিনার দুর্নীতি, অত্যাচার, গুমখুনের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে এই শক্তিই এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসেছে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম মরণোত্তর দেহদান করেছিলেন বরিশালের মানুষ বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী আরজ আলী মাতুব্বর। ধর্মভীরু মাতুব্বর মায়ের মৃত্যুর পর ধর্মান্ধ মৌলবীদের যুক্তিহীন আচরণের প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়ে প্রথম ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্নমুখর হন। বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রামের ধর্মভীরু মাতুব্বর মুক্তচিন্তার নিরীশ্বরবাদী হতেন না, যদি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ওই বাংলায় না হত। সনজীদা সম্ভবত নাস্তিক ছিলেন না, আবার ধর্মীয় গোঁড়ামির দ্বারা আচ্ছন্নও ছিলেন না। ধর্মে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী মিলে নানা ধর্মের এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বাংলাদেশে ছিল তাঁর গভীর আস্থা। তিনি আজীবন সেনানী ছিলেন এই আদর্শের। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে হাসপাতালে শুয়ে সনজীদা বলেন, “আমার অনেক দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশটাতো এমন ছিলো না। কি হয়ে গেল?” তাঁর এই আক্ষেপ, এই দুঃখের কথা বলার মধ্যে হয়ত মৌলবাদী ধর্মান্ধদের কাছে পরাস্ত হয়ে মুসলিম সমাজ ও শিখা পত্রিকার ১৯৩৬-এ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়কালীন তাঁর পিতা কাজী মোতাহার হোসেনদের হতাশার বাক্যই ফিরে এসেছে। সেদিন আর বিদ্যমান সময়ের মধ্যে তফাৎ, তখন যারা বিরোধিতা করেছিল তাদেরকে মৌলবাদী ধর্মান্ধ বলে চিহ্নি করতে আমাদের অসুবিধা হয় নি। কিন্তু বিদ্যমান সময়কালে যারা অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের সনজীদাদের আদর্শের বিরোধিতা করছে তাদের মধ্যে অনেকেরই পরিচয় আমাদের কাছে প্রগতিশীল বলে। এখন আমাদের দেশে, বাংলাদেশে, ইউরোপে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান নির্বিশেষে এই অতি দক্ষিণপন্থী মৌলবাদী ধর্মান্ধতা কোথাও কোথাও আধুনিকতার নামে, অগ্রসরশীল চিন্তার নামে হাজির হয়েছে। যদি সনজীদার জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হয়, যদি তাঁর অন্তিম সময়ের দীর্ঘশ্বাসকে সম্মান জানাতে হয়, তবে ধর্মান্ধতার এই সার্বিক মুখব্যাদানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেই হবে।