বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি হয়ে গেল তবুও কালবৈশাখীর দেখা নেই। হাওয়া-বাতাসহীন সন্ধ্যেটা যেন দিনের থেকেও বেশী হাঁসফাঁসে গরম। তারই মধ্যে ঝুপ্ করে লোডশেডিং সন্ধ্যের অন্ধকারকে যেন আরও ঘন করে তুলল।
এই সময়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রসাতলে গেলেও মিতুর কানে কিচ্ছুটি পৌঁছায় না। দরজা জানলা বন্ধ করে এসির ঠাণ্ডা হাওয়ায় আরাম করে টিভি সিরিয়ালে মগ্ন থাকে ও।
হঠাৎ লোডশেডিংয়ে টিভিটা বোবা হয়ে যাওয়ায় ঘরের অন্ধকারে নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধেছে। মিতু উঠে ঘরের পূবদিকের জানলটা খুলে দিতেই পাশের বাড়ির রীতাবৌদির চিৎকার যেন আছড়ে পড়ল ঘরের ভেতর।
রীতাবৌদি চিৎকার করছে, “যত্তোসব অলপ্পেয়ে অপোগণ্ডের দল, রোজ রোজ আমার বাড়ির সামনে ঝগড়া মারামারি। আমার আর ভালো লাগে না।”
মিতু ঘর থেকে বেরিয়ে আধো-অন্ধকারেই
এঘর ওঘর ঘুরে বুঝতে পারল রীতাবৌদির রাগের কারণ।
মিতু পইপই করে ফোচাকে বারণ করেছে ঐ বাড়ির ত্রিসীমানায় না ঘেঁষতে। তবুও কে শোনে কার কথা! সন্ধ্যে হলেই ওর টিভি দেখার সুযোগ নিয়ে ফোচা রোজই পগারপার।
ফোচাকে খুঁজতে খুঁজতে মিতু বাড়ির বাগানের দিকে আসে। দেখে বারন্দায় দাঁড়িয়ে রীতাবৌদি তখনও চেঁচামেচি করে চলেছে, “হতভাগা কটকট্ মস্তানি করার আর জায়গা পায় না; বেরো বলছি এখান থেকে।”
মিতু বাগানে দাঁড়িয়েই রীতাকে জিজ্ঞাসা করে, “কি হল বৌদি, এত রাগ করছ কেন? আমার ফোচা বুঝি তোমার ওখানে গেছে?”
— “আর বলো কেন মিতু, তোমার ফোচাকে নিয়ে তো আমার কোনো সমস্যা নেই, যত বদমাশ ওই কটকট্। হবে না! যেমন মা তেমনি ছা।”
মিতুর বাড়ির পশ্চিমদিকের একতলা বাড়িটায় প্রায় বছরখানেক হল ভাড়া এসেছেন রমলা কাকীমা। নিঃসন্তান কাকীমার সারাদিনের সঙ্গী একপাল বিড়াল। তাদের দেখভাল করেই ওনার দিন কাটে।
রীতাবৌদির কথা শেষ হতে না হতেই ওদিক থেকে রমলা কাকীমা একটু সুর করে কথা ছোঁড়েন, “তা বলি, ও দেমাকী, তোমার ভেবলিই বা কেমন চরিত্তিরের মেয়ে! ছাতের আলসে থেকে যকনতকন আওয়াজ দেয়। জানলার ধারে উদাস হয়ে বসে নিজের রূপ ছড়ায়; তা আমার কটকটেরও তো সোমত্ত বয়স, এ বয়সের ছেলেরা একটুআধটু এদিক ওদিক তো করেই, না কি! পার তো তোমার ভেবলিকে শেকলে বাঁধ। কথায় কথায় অমন ঢেকুর তুলে আমার বাছাকে গাল পেড়ো না।”
রমলার কথায় গা জ্বলে যায় রূপার। মিতুকে বলে, “দেখেছ কেমন ট্যাঁকস ট্যাঁকস কথা। তোমার ফোচার যাতে কোনও ক্ষতি না হয়, তাই তোমাকে সাবধান করছি মিতু।”
এসব কথার মাঝখানে পড়ে মিতুর শরীর অস্থির করতে থাকে। মিতুর ছেলে টুপাই দোতলার বারন্দা থেকে এতক্ষণ ধরে সবকিছু দেখছিল। এসব বেতাল বাচলামি আর সহ্য করতে না পেরে ওপর থেকেই মাকে ডাকে। বলে, “মা ভেতরে এস।”
মিতু অসহায় দৃষ্টিতে দেখে ওর ফোচা লেজ তুলে কটকটের দিকে তাকিয়ে রাগে গরর্ গরর্ করছে। ওর সারা গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। আর ওদিকে কটকটও হিংস্র দৃষ্টিতে ওকে দেখতে দেখতে গরর্ গরর্ করছে। আর ভেবলি গুটিসুটি বসে গম্ভীর হয়ে ওদের দেখছে।
মিতু ডাকে, “ফোচা চলে আয়।”
ফোচা পাত্তাও দেয় না ওকে।
মিতু একে নরম মনের মেয়ে তায় খানিকটা ছিঁচকাদুনি। ঘরে এসে ছেলের কাছে কেঁদেই ফেলে, “কি হবে বল্ তো টুপাই! ফোচাকে মেরে ফেলবে না তো কটকট্?”
মায়ের কথায় টুপাই হেসে ফেলে। বলে, “অত ভেব না তো। কিচ্ছু হবে না। করুক মারামারি। কেটে ছড়ে গেলে ওষুধ লাগিয়ে দেব। আর ঠ্যাং ভাঙলে ডাক্তার দেখাব। তুমি চিন্তা কোরো না। ফোচা আজকাল বড্ডো অবাধ্য হয়েছে। ওর একটু শিক্ষা হওয়া দরকার।”
রাত আটটা বাজে। নিমাই অফিস থেকে ফিরেই আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। লক্ষ্য করেছে, বউ মিতুর মুখটা আজ যেন খানিকটা শুকনো।
মিতু চায়ের কাপটা হাতে ধরিয়ে দিতেই নিমাই জিজ্ঞাসা করে, “কি হয়েছে?”
ছিঁচকাদুনে মিতু কোনো কথা বলার আগেই ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। নিমাই তো হতভম্ব।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মিতু বলে, “ফোচা এখনও বাড়ি ফেরেনি।”
— “ফিরবে চিন্তা কোরো না।” নিমাই বলে।
মিতু আজ সন্ধ্যেয় ঘটে যাওয়া ঘটনা সবিস্তারে নিমাইকে বলে।
ওর কথা শুনে নিমাই হাসতে থাকে। বলে, “সাবাশ! আমাদের ফোচা বড় হয়ে গেছে। এখন তো মেনি ভেবলিকে পছন্দ হতেই পারে।”
— “কিন্তু রমলা কাকীমা! ওনার বাক্যবাণ যে বড় সাঙ্ঘাতিক।” মিতুর গলায় একরাশ উদ্বেগ।
“ওনার কথা তোমাকে আর বেশীদিন সইতে হবে না।” নিমাই আশ্বস্ত করতে চায় মিতুকে।
“মানে?” মিতু অবাক হয়।
নিমাই বলে, “আমি পাড়ায় শুনেছি যে ওনার কথার জ্বালায় ওনার বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়ার এগ্ৰিমেন্ট আর রিনিউ করেননি। সামনের মাসেই ওনারা এই বাড়ি ছেড়ে দেবেন।”
কথাটা শুনে মিতুর মনখারাপের ভার অনেকটা যেন হালকা হল।
কয়েকদিন পর মাস শেষ হতেই রমলা কাকীমা তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেল।
পাশের বাড়ি থেকে রীতাবৌদির চিৎকার ভেসে এল, “ও মিতু শুনছ, আজ আমার হাড় জুড়োলো। ভেবলিকে আর চোখে চোখে রাখতে হবে না। এবার থেকে ফোচাই ওর খেয়াল রাখবে।
পরদিন সকাল। মিতু স্নান সেরে বাগানে নিত্যপূজোর ফুল তুলতে গেছে। হঠাৎই পাঁচিলের কোণা থেকে করুণ আওয়াজ, ‘ম্যাও’।
এ তো ফোচার আওয়াজ নয়, মিতু ভাবে। এগিয়ে যায় ও। দেখে পাঁচিলের ধার ঘেঁষে কটকট্ বসে আছে। মিতুর দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে আবারও ডেকে ওঠে, “ম্যাএএও”।
মিতু বুঝতে পারে যে রমলাকাকীমা তার সংসার পুরো গুটিয়ে নিয়ে চলে গেলেও কটকট্কে ফেলে রেখে গেছে। রীতাবৌদির ওপর প্রতিশোধ নিতেই এমনটা করেছে।
মনটা কেমন যেন তেতো হয়ে যায় ওর। ভাবে, মানুষ কতটা নীচু মনের হলে পরে একটা অবলা প্রাণীর প্রতি এতটা নির্দয় হতে পারে। কটকটকে দেখে ভীষণ মায়া হয় ওর। হয়তো বেচারার কাল থেকে কিছু খাওয়াই হয়নি।
কটকট্ আবার ডেকে ওঠে, ম্যাও।
“দাঁড়া আমি আসছি”, বলে মিতু বাগান থেকে ঘরে গিয়ে বাটিতে করে কিছুটা দুধ নিয়ে আবার বাগানে আসে। কটকটকে দেয়। যেন এক নিঃশ্বাসে পুরো দুধটা শেষ করে ও।
ওকে দেখে মিতুর চোখে জল আসে। কিন্তু ওকে তো বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ফোচাকে যে সহ্যই করতে পারে না ও। ভেবলিকে নিয়ে দুজনের মধ্যে মারামারি লেগেই থাকে।
মিতু ভাবে, “যাক্, পরে এসব নিয়ে ভাবা যাবে। এখন কটকটের পেটটা ঠাণ্ডা করতে পেরেছি এই ঢের।”
সারাদিনের কাজের ফাঁকে মিতু লক্ষ্য রাখে কটকটের ওপর। কটকট্ বাগান ছেড়ে নড়েনি। এমনকি ফোচা একবার বাগানে বেরিয়ে ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করলেও কটকট্ নিরুত্তাপ। শুধু শুকনো মুখে চেয়ে আছে।
দুপুরবেলায় মিতু দুটো বাটিতে খাবার নিয়ে বারন্দায় দুজনকে পাশাপাশি খেতে দিয়েছে। খাওয়ার পর ফোচা নিজের অভ্যেসমতো একলাফে ঘরে ঢুকে গেল। কিন্তু কটকট্ বারন্দাতেই চুপ করে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর মিতু খালি বাটিগুলো তুলতে এলে কটকট্ দৌড়ে এসে ওর পায়ের কাছে বসে মুখটা তুলে মিতুর দিকে তাকিয়ে বড় করুণ সুরে ডাকে, “ম্যাএএও”।
“যা ভাগ্, তুই বড় জ্বালাস আমার ফোচাকে।” মিতু ঘরে চলে যায়।
ফোচাকে রাতের খাবার দেওয়ার সময় আবার মনে পড়ে কটকটের কথা। বাগানের দিকের বারন্দায় যেতেই কটকট্ দৌড়ে এসে মিতুর পায়ের কাছে বসে ছোট ছোট থাবা দিয়ে মিতুর পরনের নাইটিটা ধরে টানতে থাকে। আর শক্ত থাকতে পারে না মিতু। কোলে তুলে নেয় ওকে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “চল্ ঘরে চল্। আজ থেকে ফোচার সাথে মিলেমিশে থাকবি কেমন!”
কটকট্ কি বোঝে কে জানে। আদুরে গলায় ডেকে ওঠে, “মাআআআউ”।
এখন ভেবলিকে নিয়ে ফোচা আর কটকটের ঝগড়া লাগে না। হুলো ফোচা মাঝে মাঝে মেনি ভেবলির বাড়ি গেলেও কটকট্ ভুলেও ও পথ মাড়ায় না। রীতাবৌদিও ভেবলিকে পছন্দের পাত্র ফোচার দায়িত্বে দিয়ে খুশী।
তবে মিতুর দখলদারী নিয়ে ফোচা আর কটকটের ঝগড়া ইদানীং আবার শুরু হয়েছে। মিতুর এখন একা শুয়ে বসে থাকার জো নেই। ওকে বসতে দেখলেই একজন কোলে তো আর একজন পেটের ওপর উঠে বসে থাকে।
মিতুও ওদের ঝগড়া থামানোর হাল ছেড়ে দিয়ছে, বরং আজকাল ওদের খুনসুটি বেশ উপভোগ করে।
লেখিকার কি এভাবে সবটুকু নিয়ে লেখা উচিত হচ্ছে? নামটি পর্যন্ত অজ্জিন্যাল!! যাই হোক। গল্পটি বেশ উপভোগ্য।