সকলের কাছে পরিচিত ‘রিভার মুন’ নামে। আসল নাম নদীয়াচাঁদ মুর্মু। তিনি প্রায় ৪১ বছরের শিক্ষক জীবনে ছাত্রছাত্রীদের হৃদয়ে দাগ কেটেছেন। যা আজও অমলীন। যাঁর কাছে স্কুল মন্দির। আর সেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পড়াশোনার সংসার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরের দিনটিকে মেনে নিতে পারেননি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীরা। চোখের জলে বিদায় জানালেও স্কুলে ফিরে আসার আবেদনে না করতে পারেননি রিভার মুন। তাই এখনও স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসার টানে ছুটছেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে কেবল শিক্ষক নন, বাড়ির অভিভাবকদের মতো। তিনি রিটায়ার্ড কিন্তু টায়ার্ড নন।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নদীয়া চাঁদ মুর্মু-র কথায় দেখতে দেখতে ৪১ বছর শিক্ষকতার জীবন কেটে গেল। আরামবাগের মানুষ তাঁকে আদর্শ শিক্ষক বলে চেনেন। পড়ুয়াদের কাছে তিনি প্রিয় বন্ধু। দুঃস্থ, অনাথ ও স্কুলছুটদের কাছে অভিভাবক। তিনি ছাত্রছাত্রীদের বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখান। আরামবাগের আরাণ্ডি-২ পঞ্চায়েত এলাকার পুড়া হাইস্কুলের শিক্ষক নদীয়াচাঁদ মুর্মু। বাঁকুড়ার খাতরা মহকুমার ঝারি গ্রামের সাঁওতাল পরিবারে জন্ম। শৈশবে জঙ্গলে গোরু চড়াতেন। নিরক্ষর বাবা-মা সংসারের হাল ধরতে ছোটবেলাতেই কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। গোরু চরাতে চরাতেই নদীর বালির চর, ফাঁকা মাঠের নরম মাটিতে অ আ লিখে পড়াশোনা শুরু। পড়াশোনা শেখার অদম্য ইচ্ছায় খালি গায়ে গামছা পরে জঙ্গল পেরিয়ে দু’ কিলোমিটার দূরের স্কুলে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সাঁওতালি ছোট ছেলেটিকে স্কুলের শিক্ষকরা সেদিন স্বাগত জানিয়েছিলেন। স্কুলের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তপ্তদান্ডি বনমালি বিদ্যালয়ে স্কুলের পড়া শেষ করে শিলদা চন্দ্রশেখর কলেজ ভর্তি হন। স্নাতক হন ১৯৯২ সালে। এই সাফল্যে বন্ধুরা কুর্নিশ জানিয়ে তাঁর নামকরণ করেছিলেন রিভার মুন। পুড়া হাইস্কুলে শারীরশিক্ষার শিক্ষক হিসেবে ১৯৯৬ সালে২৬ জুন যুক্ত হন। শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দিয়েই দুঃস্থ অনাথ স্কুলছুটদের স্কুলে আনা শুরু করেন তিনি।আজ তারা প্রতিষ্ঠিত।

আবার প্রতিকূলতার বাধা কাটিয়ে আগত নতুন পড়ুয়াদের তিনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। পুঁথিগত পড়াশোনার মধ্যে আটকে না রেখে পড়ুয়াদের নিয়ে এলাকার রাস্তার খানাখন্দ সংস্কার করেছেন। গাছ লাগিয়েছেন। বড় হওয়ার এক অন্য পাঠ শিখিয়েছেন। মাতৃভাষা সাঁওতালির উন্নতির জন্যেও ‘সহাগ দুলাড়’, ‘মালিনচাম্পা’-র মতো নাটক লিখেছেন। সাঁওতালি সমাজের শিক্ষিত মানুষের কাছে ইতিমধ্যেই সেই নাটক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সমাজ সংস্কার, নারী কল্যাণের মতো কাজেও তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

স্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে উনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে উনি খুবই জনপ্রিয়। সহকর্মী হিসেবে ওঁকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। অবসর মেনে নিতে পারিনি। স্কুলে আসার অনুরোধ করেছি। এলাকার ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা বলেন, সকলের কাছে রিভার মুন নামে জনপ্রিয় ছিলেন। নদীয়াবাবু আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানোর যে কাজ করেছেন তা দৃষ্টান্তস্বরূপ। ১৯৯৬ সালে পুড়া হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বিদ্যালয়ের চেহারা বদলে গিয়েছিল। নদীয়া বাবুর কথায় নিজের একটি সংসার আছে। আরোও একটি বড় সংসার হচ্ছে আমার স্কুল। আমার ছেলে – মেয়েকে যে চোখে দেখি, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদেরও প্রতি ছিল সমদৃষ্টি। সুবিধা ও অসুবিধা ভাগ করে তাদের পাশে থাকতাম। আমি যখন স্কুলে যোগদান করি তখন মাত্র ২২৮ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। লজ্জা লাগত। কারণ এত কম ছাত্রছাত্রী।

এলাকার মানুষকে বুঝিয়ে ১৯৯৮ সাল থেকে ছাত্র ও ছাত্রী সংগ্রহ করতাম। শারীরিক শিক্ষক হয়েও স্কুলের সব ক্লাসে উপস্থিত নজর কেড়েছে। তাই তাঁর আর একটা পরিচয় হল ‘সর্ব ঘটের কাঁঠালি কলা’। তাই এই শিক্ষক আজও সমাজে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। যা চিরশাশ্বত হয়ে থাকবেন।