৩০. সিমলা ব্যায়াম সমিতির অতীন্দ্রনাথ : দুর্গাপূজায় হাত
অতীন্দ্রনাথ বসু (১৮৭৩-১৯৬৫) ছিলেন কলকাতার জোড়াবাগানের বসু পরিবারের সদস্য। অপূর্বকৃষ্ণ বসু তাঁর বাবা। কিশোর বয়েস থেকে তিনি জড়িত ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে। প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে তিনি ‘মহেশালয়’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৫ সালে তিনি ‘ভারত ভাণ্ডার’ নামে সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন।
যুগান্তর বিপ্লবী দলের সঙ্গে যোগ ছিল তাঁর। বাঘা যতীন বা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন তিনি। ছিলেন অরবিন্দ ঘোষের অনুগত শিষ্য। ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ১৯১৬ থেকে থেকে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেন। তাঁর ছেলে অমর বসু (১৮৯১-১৯৭৫) তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অতীন্দ্রনাথ মুক্তি পান ১৯২০ সালে।
তারপরেই তাঁর মাথায় আসে দুর্গাপূজার পরিকল্পনা। বাড়ির দুর্গা পূজা নয়, বারোয়ারি বা সার্বজনীন দুর্গা পূজা। হুগলির গুপ্তিপাড়ায় অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপূজার প্রচলন হয় বলে মনে করা হয়। তবে অতীন্দ্রনাথের সার্বজনীন দুর্গাপূজার উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কলকাতার সিমলা ব্যায়াম সিমিতিতে এই সার্বজনীন দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে কলকাতার প্রথম বারোয়ারি পূজা হয় ১৯১০ সালে। ১৯১৯ সালে নেবুবাগান ও বাগবাজার স্ট্রিটের মোড়ে এক সার্বজনীন দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল; ১৯২৪ সালে সেই পূজা সরে গিয়ে হয় বাগবাজার স্ট্রিট ও পশুপতি বোস লেনের মোড়ে। বাগবাজারের নামের আগে ‘সার্বজনীন’ কথাটা থাকলেও তা স্থানীয় মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সিমলা ব্যায়াম সমিতির পূজার মতো ব্যাপকতা ছিল না। ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল বীরাষ্টমী উৎসবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় সিমলা ব্যায়াম সমিতি। শরীরচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। বীরাষ্টমীর প্রবর্তক ‘সঞ্জীবনী সভা’র সদস্য সরলা দেবী চৌধুরাণী। বীরাষ্টমী হল দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিন পালিত এক ব্রত। এর পৌরাণিক ব্যাখ্যা আছে। এই দিনে দেবতারা দেবী দুর্গাকে বিভিন্ন অস্ত্র প্রদান করেছিলেন অসুর নিধনের জন্য। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই ব্রতটিকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখতেন।
সিমলা ব্যায়াম সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন : শরৎচন্দ্র বসু, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ডাঃ মাখনলাল সেন, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়, বিধানচন্দ্র রায়, কিরণশঙ্কর রায়, রাধারমণ মিত্র, হেমন্তকুমার বসু, প্রভুদয়াল হিম্মতসিংকা, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ঊর্মিলা দেবী, মোহিনী দেবী, ইলা সেন, কল্পনা দত্ত, আশালতা দাস, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, শান্তি দাস, সুভাষচন্দ্র বসু।
অতীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে কুস্তি, ব্যায়াম, লাঠিখেলা ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। সুভাষচন্দ্র বসুর পরামর্শে অতীন্দ্রনাথ সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে সার্বজনীন দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। ১৯২৬ সালে। দেবী দুর্গাকে দেশমাতৃকারূপে পূজার সঙ্গে চলত বিপ্লবী কাজকর্ম, এই পূজা উপলক্ষে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের বিপ্লবীরা সেখানে সমবেত হতেন।
একচালার ধাঁচে তৈরি হয় প্রতিমা। হোগলাপাতার বেড়া দিয়ে তৈরি হয় পূজার মণ্ডপ। প্রতিমা তৈরি করেন নিতাইচরণ পাল। পূজার পুরোহিত ছিলেন চপলাকান্ত ভট্টাচার্য।
পাপেট শো ও পোস্টারের মাধ্যমে তুলে ধরা হত সিপাহি বিদ্রোহ, বাঘা যতীনের বালেশ্বর যুদ্ধ, মাতঙ্গিনী হাজরার সাহসিকতা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, আগস্ট বিপ্লব –এই সব। পোস্টারে থাকত নানা উ দ্ধৃতি, যেমন :
ক] বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
খ] রক্তাম্বুদি আজি করিয়া মন্থন তুলিয়া আনিব স্বাধীনতার ধন
গ] সময় হয়েছে নিকট এখন বাঁধন ছিঁড়িতে হবে
ঘ] হে ভারত ভুলিও না তোমার নারী জাতির আদর্শ
১৯৩০ সাল। পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়েন নারায়ণচন্দ্র দে ও ভূপাল বসু। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান টেগার্ট। কিন্তু ধরা পড়েন দুই বিপ্লবী। শুরু হয় ডালহৌসি বোমা মামলা। খোঁজ খবর নিয়ে পুলিশ জানতে পারে যে ওই দুই বিপ্লবী সিমলা ব্যায়াম সমিতির সঙ্গে যুক্ত।
১৯৩২ সালের ৭ অক্টোবর পুলিশ সিমলা ব্যায়াম সমিতিকে বেআইনি ঘোষণা করে। ফলে পূজা বন্ধ হয়। ১৯৩৪ সালে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। তারপর থেকে সিমলা ব্যায়াম সমিতির দুর্গাপূজা আবার শুরু হয়। সে পূজার নাম হয় ‘স্বদেশি পূজা’।