ঝকঝকে তকতকে চারদিক। মাপ মেনে স্থান কাল বুঝে একটি একটি গাছ বসানো। প্রত্যেক গাছ সভয়ে ডালপালা গুটিয়ে রাখে। কারণ তারাও বোঝে পরিষ্কার এই অঙ্গনে পাতা ঝরাবার বা ডালপালা প্রসারিত করবার অধিকার তাদের নেই। তাদের যে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এইই তাদের কাছে অনেক। সেই গাছেরাও আজ অবাক হয়ে দেখছে সকাল থেকে ঝকঝকে ফাঁকা জায়গায় কাঠকুটো জঞ্জাল জড়ো হচ্ছে, কারণ আজ চাঁচড়। কাল দোল আর তার পরের দিন হোলি। আজ কাঠকুটো জড়ো করে একটা ‘বুড়ির ঘর’ সাজানো হল। সাজানো আবাসনগুলোতে সবকিছু পালন করা হয় বেশ নিয়ম নিক্তি মেনে ও মেপে।
সে ছিল একদিন আমাদের…। ‘বুড়ির ঘর’ আক্ষরিক অর্থে বুড়িরই ঘর। গোটা পাড়ায় যত যেখানে শুকনো পাতা-নাতা, কাঠ-কুটো, ডাল-পালা, নারকেল পাতা, বাগলো সব জড়ো করে সাজানো হত বুড়ির ঘর। একটি দরজার মত ফোঁকর রাখা হত। আর তাতে রাখা হত নতুন ওঠা আলু। দুষ্টু ছেলের দল কাঁচা বেলও রাখত। চারপাশে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। যাতে বুড়ির ঘরে আগুন লাগালে সেই আগুনের আঁচ কারো বাড়িতে না পড়ে। ততটাই ফাঁকা জায়গা তখন ছিল। আর ছিল চিৎকার করে গান — ‘আজ আমাদের নেড়াপোড়া কাল আমাদের দোল/পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বলো হরিবোল’। সেই গানের উল্লাসে মাখামাখি হয়ে হাতের মুঠোয় এসে যেত আবীর। কাল যে দোল।
মাঠ নেই, ফাঁকা পড়া পতিত জায়গা, যেটা কয়েক বছর আগেও চোখে পড়ত, এখন সব কংক্রিটের জঙ্গল। ঝকঝকে আবাসনে অবশ্য ফাঁকা জায়গা থাকে, বাঁধানো। আর সেখানেই নিয়ম রক্ষা হয়। সুরাপ্রেমীদের লম্বা লাইন পড়ে মদের দোকানের সামনে। অটো টোটো এই দুদিন প্রায় নেই হয়ে যায়। বেশির ভাগ দোকানে ঝাঁপ ফেলা। দোলের সকালে প্রভাতফেরি থেকে শুরু করে, গান, নিক্তি মেপে আবীর মেখে, ঠান্ডাই, মিষ্টিমুখ করে একটা রঙের দিন উদযাপনের মধ্যে কেটে যায় কিছুটা সময়। এখনও কোনও কোনও বাচ্চা বড়দের পায়ে হঠাৎ করে আবীর দিয়ে ঢিপ করে প্রণাম করে ফেললে খুব অবাক হয়ে বড়রা তাকিয়ে থাকেন বিস্ময়ে। ভাবতে থাকেন, প্রণামটা তাহলে এখনও আছে!

সে ছিল একদিন কী কষ্ট আমাদের… বিজয়ার পর আর দোলের সময় কত চেনা অচেনা মানুষকে যে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করতে হত আমাদের। নিচু হয়ে আর মাথা তোলার সুযোগই পাওয়া যেত না। সেই সময় প্রণাম বাধ্যতামূলক হলেও ছোটরা যে খুব ভালবেসে সকলকে প্রণাম করত এমন ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং বহু গুরুজনের পায়ে প্রণামের বদলে একটু চিমটি কাটতে পারলেই তারা ঈষৎ শান্তি লাভ করত। কিন্তু তখন বাবা মায়ের অবাধ্য হওয়াটাই ভয়ানক অবাধ্যতা ছিল, আর কোনও বাচ্চার গুরুজনের কথার প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না। এখনকার বাচ্চারা সেই স্বাধীনতার স্বাদ কিন্তু পেয়েছে তাদের পরাধীন পিতা মাতার কাছেই। সত্তরের দশকের বাচ্চারা যে সুযোগ পায় নি সেই স্বাধীনতা এই প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন। কিন্তু অতিরিক্ত স্বাধীনতা পেয়ে এই প্রজন্ম আবার সবেতেই প্রতিবাদ করবে এইটা বোধহয় তাঁরা ভাবেন নি।
তবু আজও বসন্তের আগমনে রঙের আবির্ভাব ঘটে। কেউ বলেন প্রেমের মাস, প্রেমের উৎসব, কেউ বলেন রঙের উৎসব, কেউ বা বলেন এটা মিলনোৎসব, রঙটা অনুষঙ্গ হিসাবে আসে। আর অবাঙালিরা বলেন হোলি। গায়ে রঙ মাখিয়ে তাঁরা বলেন ‘বুরা না মানো, আজ হোলি হ্যায়।’ ততক্ষণে আপনি রঙে এতটাই রঙিন যে আপনজনেরা আপনাকে চিনতে পারছেন না এবং আপনি নিজেকেও চিনতে পারছেন না আয়নায়। তবু কিচ্ছু বলতে পারছেন না কারণ অবাঙালি প্রতিবেশী আগেই বলে রেখেছেন এক অসামান্য বাক্য। ‘বুরা না মানো, আজ হোলি হ্যায়।’
এখন এই হোলি কথাটি কোথা থেকে এল? অবাঙালিরা দোল বলেন না কখনও। আমাদের দোলযাত্রার পরের দিন ওঁদের হোলি উৎসব। দোল অর্থাৎ ফাগুন পূর্ণিমায় রাধা-কৃষ্ণের আবীর খেলা। বৃন্দাবনে সেই কোন দ্বাপরে কদম বা শিমুল বৃক্ষের ডালে বাঁধা হয়েছে দোলনা। সেই দোলনা ফুলে ফুলে সাজিয়ে রঙিন করে তুলেছে রাইকিশোরীর সখীর দল। তাঁদের কেউ বিশাখা, কেউ ললিতা, কেউ বা ইন্দুলেখা। সকলেই মনে মনে সর্বস্ব কৃষ্ণপদে সমর্পণ করে বসে আছে। তবু দোলনায় কৃষ্ণ পাশে দোলবার অধিকার শুধু শ্রীমতীর। কৃষ্ণ-রাধাকে আজও বৃন্দাবনের মানুষ হৃদয়ে ধরে রেখেছেন এই দোল বা হোলি উৎসব পালনের মাধ্যমে। বৃন্দাবনের হোলি চলে একমাস ধরে। ঠিক দ্বাপর যুগের মত রাধাকৃষ্ণকে দোলনায় দুলিয়ে, ফুলে ফুলে সাজিয়ে, আবীর কুমকুমে রাঙিয়ে শোভাযাত্রা সহ হোলি পালিত হয়। সঙ্গে থাকে কীর্তন — রাধাকৃষ্ণের অমর প্রেমগাথা। এই ঝুলা বা দোলনায় দোলার জন্য এই উৎসবের নাম দোলযাত্রা হয়ত।

তবে হোলি নামকরণ সম্ভবত এসেছে হোলিকা দহনের মাধ্যমে। পূর্ণিমার রাতে শুকনো ডালপালা আর ঘুঁটের মালা পরিয়ে হোলিকার গায়ে আগুন ধরানো হয়। এই সময় ঘুঁটের মালা প্রচুর বিক্রি হয়। ফাঁকা জায়গায় বা রাস্তার মোড়ে হোলিকা দহনের সময় সকলে হোলিকাকে প্রদক্ষিণ করে নারকেল, ফল আহুতি দেন পরিবারের মঙ্গল কামনায়। এখন কে এই হোলিকা? হোলিকা হলেন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর বোন। এক সময় হোলিকা তপস্যায় ব্রহ্মাকে তুষ্ট করে বর চেয়ে নেন যে যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি কারো ক্ষতি করছেন ততক্ষণ পর্যন্ত হোলিকাকে কোনো অগ্নি স্পর্শ করতে পারবে না। অর্থাৎ হোলিকা আগুনে পুড়ে মরবেন না। কিন্তু বর পেয়ে হোলিকা কারো ক্ষতি না করার কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। দাদা হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ বিষ্ণুভক্ত। দৈত্যরাজ পুত্রকে শেষ করতে বদ্ধপরিকর। বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার দায়িত্ব নিলেন পিসি হোলিকা। প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করতেই ব্রহ্মার শর্ত ভঙ্গ হল, আর হোলিকা পুড়ে মরলেন। বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদ বেঁচে ফিরলেন। রাখে হরি মারে কে?।
অথর্ব বেদে একটি শ্লোকে বলা হচ্ছে ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা রাত্রির নাম ‘হোলাকা’। এছাড়াও খ্রিষ্টপূর্ব যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছিল সেখানেও অনেক স্থানে ফাল্গুন পূর্ণিমার উৎসব হিসাবে হোলাকার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ফাল্গুনের পূর্ণিমার আর এক নাম রাকা। তাই একে রাকা হোলাকাও বলা হয়। এই হোলাকার অনুষ্ঠানে যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হত তাতে শীতকালীন শস্য আহুতি দেওয়া হত। বিশেষ করে ডাল জাতীয় শস্য। এখনও চাঁচড়ের সময় ছোলা মটর আলু আহুতি দেওয়া হয়। পূর্বে এই আহুতি দিত কুমারী মেয়েরা। সৌভাগ্য কামনায় বা উপযুক্ত সুদর্শন স্বামী লাভের উদ্দেশ্যে। সুতরাং বসন্তবাতাস গায়ে মেখে কুমারী মেয়েরা স্বামী লাভের জন্য যে ব্রত করে সেখানে প্রেমের আগুন ও রঙ লাগা বাধ্যতামূলক। তাই নয় কি?

ভারতের প্রায় সমস্ত প্রদেশেই হোলি এবং হোলিকা দহনের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা তো বটেই এছাড়াও মধ্যভারতের কিছু অংশ, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানাতেও ফাল্গুনের পূর্ণিমায় একটি উৎসব পালিত হয়। এখানে একটির বদলে দুটি বুড়ি বা হোলিকা প্রস্তুত করা হয় শুকনো কাঠকুটো ও ডালপালা দিয়ে। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে প্রেমের দেবতা মদনদেবের এবং অন্যটি মদন পত্নী রতিদেবীর। মহাদেবকে বাণ মারতে গিয়ে মদনদেব নিজেই মহাদেবের ক্রোধাগ্নিতে ভস্মীভূত হয়েছিলেন। মদনদেব তাই দেহহীন বা অনঙ্গ। এখানেও তাই পঞ্চশরের অধিকারীকে সস্ত্রীক অগ্নিতে ভস্মীভূত করা হয়। দক্ষিণে এই দহনের নাম কামদহনম।
এখন এই নেড়াপোড়ার সঙ্গে হিরণ্যকশিপুর ভগিনী হোলিকা বা কামদহনমের কী যোগসূত্র আছে সেটা খুব ভালো করে বুঝিনি। তবে ঘুঁটে পোড়ানোর সঙ্গে চিকিৎসার একটা যোগাযোগ বোধহয় ছিল। বসন্ত যেমন প্রেমের, রঙের, ফুলের এবং কোকিলের কুহুতানের মাস, তেমনি নানান অসুখবিসুখেরও মাস। প্রাচীন কালে চিকিৎসকদের ধারণা ছিল ঘুঁটে পুড়িয়ে সেই গরমে অসুস্থ ব্যক্তির যে স্বেদন বা ঘাম হয় তাতে জ্বর ও অসুখের নিরাময় ঘটে। ওই যে কথায় আছে না – ঘাম দিয়ে জ্বর সারল। এরই অপর নাম হোলাক স্বেদ। এই ঘুঁটের ধিকিধিকি ধোঁয়ায় বসন্তের অসুখ নিরাময় হত ঘামের মাধ্যমে। আর হোলিকাকে রাক্ষসী বানিয়ে তোলার পিছনেও মনে হয় এই বসন্তের অসুখবিসুখ। মূলত অসুখবিসুখকে দূরে রাখতেই অগ্নি জ্বালিয়ে তাতে আহুতি দেওয়া হত সন্তানের মঙ্গল কামনায়। আর তারসঙ্গেই শীতকালের শুকনো পাতা আর ডালপালা সব পুড়ে শুদ্ধ হত পৃথিবী। আর সবকিছুর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন হিন্দুদের সবথেকে প্রিয় দেবতা বা প্রেমিক পুরুষটি — কৃষ্ণ। সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন প্রেমিকা রাধা এবং গোপ নরনারী। এরপর বসন্তের বাতাসে আবীর রঙ আর ফুলের উৎসব মিলে হল দোল বা হোলি।