জলপথের সঙ্গে আবাল্য সখ্য রবীন্দ্রনাথের। জলপথের প্রতি তাঁর এই সখ্যতা বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে বেশ কয়েকবার জলপথে ভ্রমনের সময় গ্রামবাংলার গ্রাম্যজীবন ও প্রাকৃতিক রূপ দেখার অনুভবে।
‘পিতৃস্মৃতি’ বইতে তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘কত না গ্রাম্য জীবনের দৃশ্য যুগের পর যুগ যার কোন পরিবর্তন নেই-নির্বিকার,শান্ত, সমাহিত অথচ শ্রমশীল।’ রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘রবীন্দ্র জীবনী’ ও প্রশান্তকুমার পালের লেখা ‘রবীজীবনী’ বইয়ের সূত্রে জানা যায় ওড়িশায় পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনা করতে রবীন্দ্রনাথ তিন তিনবার মেদিনীপুরের নদী ও খালপথ ধরে ওড়িশা গিয়েছিলেন কখনও স্টিমারে কখনও নিজস্ব বোটে চেপে। তৃতীয় ও শেষবার ১৮৯৭ সালে রবীন্দ্রনাথ বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুরের হিজলি টাইডাল ও ওড়িশা কোস্ট ক্যানালের খাল পথ ধরে।
বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে এর আগে জলপথে বোটে করে শিলাইদহ, কখনও পতিসরে গিয়ে জমিদারির কাজ, পাটের ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি আর সাহিত্য সৃষ্টির অভিজ্ঞতার মধ্যেই বড় হচ্ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহ, পতিসর প্রভৃতি জায়গায় জলপথে ভ্রমণের সময় প্রকৃতির সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথের কবিমনকে যেমন নাড়া দিত আবার অবারিত প্রান্তরে রবীন্দ্রমনের উত্তরণ বিস্ময় জাগায়। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের — ‘একি আকুলতা ভুবনে’, ‘তুমি রবে নীরবে’, ‘কে উঠে ডাকি’ — রবীন্দ্রনাথের উচ্চগ্রামে বাঁধা মনের স্পর্শ মেলে তাঁর গানে, কবিতায়। জমিদারির কাজে এসব অঞ্চলে আসা কিশোর রবীন্দ্রনাথের কতটা মূল্যবান হয়েছিল তার কোন হিসাব করা যায়না। সেই সময়ে লেখা কবিতা নিয়ে ১৮৯৬ সালে তাঁর ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।
বাবার নির্দেশে ১৮৮৯ সালে ওড়িশার জমিদারি দেখভালের দায়িত্ব পেয়ে কবিগুরু ১৮৯১, ১৮৯৩ ও ১৮৯৭ সালে তিন বার জলপথে ওড়িশা যান জমিদারি তদারকি করতে। প্রথমবার ১৮৯১ সালের আগষ্ট মাসে স্টিমারে চেপে ওড়িশা যান। খালপথের থেকে নদীপথই যে রবীন্দ্রনাথের বেশি পছন্দের তা ‘ছিন্নপত্রের ২৯ নম্বর চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন। ৯১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তিনি লেখেন, — ‘একটা আক্ষেপ থেকে যায়, এটা একটা কাটা খাল বৈ নয় — এর জল কলধ্বনির মধ্যে অনাদি প্রাচীনত্ব নেই, এ কোন দূর দুর্গম জনহীন পর্বতগুহার রহস্য জানেনা — কোন প্রাচীন স্ত্রী নাম ধারণ করে অতি অজ্ঞাতকাল থেকে দুই ধারের গ্রামগুলিকে স্তনদান করে আসেনি…’।

খেজুরিতে বর্তমান হিজলি টাইডাল ক্যানাল, এই খালপথ ধরেই রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে জলপথে প্রথম কয়েকদিনের জন্য ওড়িশায় গিয়েছিলেন। ওড়িশা পৌঁছানোর পর পান্ডুয়ার কুঠিবাড়িতে বসে রবীন্দ্রনাথ ‘চিত্রাঙ্গদা’ লেখার কাজ শেষ করেছিলেন। এরপর ১৮৯৩-র ফেব্রুয়ারিতে দ্বিতীয়বার ওড়িশা যান। এবারে তিনি স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন বলে বাবা দেবেন্দ্রনাথকে জানিয়ে রেখেছিলেন। কথাটা স্ত্রীকেও এক পত্রে (২৮ অগ্রহায়ণ লেখা) জানিয়েছিলেন কবি। কিন্তু কোন কারণে কবির সেই আশা পূরণ হয়নি। কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর বদলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ দাদা বীরেন্দ্রনাথের ছেলে কবির অতি প্রিয় ভাইপো বলু — বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথমবারের মত দ্বিতীয়বারেও স্টিমারে করে জলপথে কটকে গিয়ে মেজদা সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু জেলা-জজ বিহারীলাল গুপ্তের বাসায় ওঠেন। কটকে আসার পরেই ভাইপো বলুকে নিয়ে জমিদারির কাজের জন্য বালিয়াতে যান। সেখানে কয়েকদিন থেকে ফের কটকে ফিরে আসেন। বিহারীলাল গুপ্তের বাসায় ব্রাহ্ম সমাজের একটি সম্মিলনও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হতে ও তাঁর গান শুনতে ওড়িশার ব্রাহ্ম সমাজের উৎসাহী সদস্য ও র্যাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও কবি মধুসূদন রাও-সহ কিছু বিশিষ্ট মানুষজন ও কয়েকটি ব্রাহ্ম পরিবার উপস্থিত ছিলেন। পরের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি বিহারীলালের পরিবারের সঙ্গে কটক থেকে পুরীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
জমিদারির কাজ দেখতে ভাইপোকে নিয়ে দ্বিতীয়বার ওড়িশা গিয়ে এক মাসের বেশি সময় থেকে জমিদারির কাজ দেখাশোনা ছাড়াও নানা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছাড়াও পুরী, ভুবনেশ্বর, খন্ডগিরি ভ্রমণ করে ১০ মার্চ ‘উড়িষ্যা’ জাহাজে করে কলকাতা ফেরার পথে বৈতরণী নদীর উপর রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্বনৃত্য’ কবিতা খানি লেখেন। তার আগে ৪ মার্চ ওড়িশার পান্ডুয়া থেকে তালদন্ডা যাওয়ার খালপথে নৌকায় বসে ‘অনাদৃত’ ও ৫ মার্চ লেখেন ‘নদীপথে’ ও ‘দেউল’ নামে আরও দুটি কবিতা। কবিতাগুলি পরবর্তীতে ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত হয়।
কাকা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাহিত্য অনুরাগী ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ওড়িশা থেকে ফিরে ১৮৯৩ সালেই ‘সাধনা’ পত্রিকায় ‘উড়িষ্যার দেবক্ষেত্র’, ‘কনারক’, ‘খন্ডগিরি’, ও ‘প্রাচীন উড়িষ্যা’ নামে চারটি প্রবন্ধ লেখেন। যেগুলিতে সাহিত্য অনুরাগী বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পরসের পরিচয় প্রকাশ পায়। রবীন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথের এই ওড়িশা ভ্রমণ স্মৃতি হিসেবে পরবর্তীতে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে বাংলা সাহিত্য।
রবীন্দ্রনাথ এরপরে ১৮৯৭ সালে জমিদারি পার্টিশনের কাজে আবার খালপথে নিজস্ব বোটে করে ওড়িশা যান। তৃতীয়বার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হিসেবে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ যান বলে ‘রবিজীবনী’ বইয়ের লেখক প্রশান্তকুমার পালের ধারনা।
খালপথে সেই ওড়িশা যাত্রার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ১৩০৯ বঙ্গাব্দের ‘কুন্তলীন’ পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। কুন্তলীন পত্রিকার তথ্য সুত্র অনুসারে রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতা থেকে রাজগঞ্জ (সাঁকরাইল) আসেন। পরদিন রাজগঞ্জ থেকে উলুবেড়িয়া খালে প্রবেশ করে দামোদর পর্যন্ত আসেন। ২০ অক্টোবর দিন ভর বৃষ্টির মধ্যেই রূপনারায়ণ নদী বেয়ে মেদিনীপুরের গেঁওখালিতে আসেন। ২১ তারিখ গেঁওখালি থেকে মহিষাদলের ভেতর দিয়ে হলদি নদী পর্যন্ত হিজলি টাইডাল ক্যানালের ২৯ মাইল দীর্ঘ খালপথ ধরে তেরপেখ্যা হয়ে নন্দীগ্রাম, খেজুরির মধ্যে দিয়ে কালীনগরে আসেন। কালীনগরে রসুলপুর নদী পেরিয়ে ওড়িশা কোস্ট ক্যানালের খালে এসে পৌঁছান। ওড়িশার বালেশ্বর পর্যন্ত ৩৬মাইল দীর্ঘ ওড়িশা কোস্ট ক্যানালের খালপথে পূর্ব মেদিনীপুরের সাতমাইল, বারোমাইল, পানিপারুল ও রামনগরের উপর দিয়ে ওড়িশায় পৌঁছান রবীন্দ্রনাথ। ২১ অক্টোবর হিজলি টাইডাল ক্যানালের খালে বোটে থাকার সময়েই রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধ সাহিত্য গ্রন্থ ‘অবদান শতক’-এর কাহিনি প্রভাবিত হয়ে ‘শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা’ কবিতা যেমন লিখেছেন ২২ অক্টোবর তেমনই ওড়িশা কোস্ট ক্যানালের খালপথে বোটে বসে মারাঠি গাথা অবলম্বনে ‘প্রতিনিধি’ কবিতাটি লেখেন। এছাড়াও ওড়িশায় প্রবেশ করে কবিগুরু ‘পতিতা’, ও ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতা দুটি লেখেন। কবিতাগুলি পরে রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’ গ্রন্থে গ্রন্থিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের নদী ও খালপথে তিন তিনবার ওড়িশা ভ্রমণের নানা পর্বের নানা লেখা বাংলার কাব্য, পত্র-সাহিত্য সহ বাংলার সাহিত্য ভান্ডারের যেমন সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে তেমনই ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে চিনতে সাহায্য করেছে।
তথ্য ঋণ :
১। রবীন্দ্রনাথ-সুপ্রিয় ঠাকুর
২। নানা অনুভবে রবীন্দ্রনাথ-ড.প্রবালকান্তি হাজরা
তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।