বর্ধমান।
১৭৫৮-র এপ্রিল থেকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্ধমান আর নদীয়ার রাজাদের জেলাগুলিতে রাজস্ব বরাদ্দ বা তনখা অধিকার [মুঘল ভারতবর্ষের ইতিহাসে তনখা Tankha জায়গীরদার, মনসবদার বা জমিদারদের বেতনের পরিবর্তে নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার বোঝাত। ব্যবস্থাটি সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল, যা তাদের পদমর্যাদার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হতো। তনখা অধিকারের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল — ১) জমিদার/জায়গীরদাররা তনখা বা বেতনের সমপরিমাণ অর্থ জমি বা এলাকা থেকে রাজস্ব হিসেবে আদায় করতেন। ২) তনখা জায়গীর সাধারণত জমিদার/জায়গীরদারদের বরাদ্দ এলাকা (ওয়াতন) থেকে ভিন্ন হতো। ৩) সপ্তদশ শতাব্দী থেকে, জমিদারী অধিকার প্রায়শই ‘মিলকিয়াৎ’ বা বংশগত মালিকানার মতো বিবেচিত হতো, যা জমিদারদের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করত। ৪) মুঘল সম্রাটদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে এই অধিকার ভোগ করা যেত। সংক্ষেপে, তনখা ছিল উপনিবেশপূর্ব ভারতে জায়গীরদারদের বেতনাশ্রিত রাজস্ব অধিকার, যা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কাঠামোর সাথে প্রাদেশিক জমিদারদের জুড়ত। — অনুবাদক] লাভ করল। বর্ধমানের রাজা তিলক চাঁদের আমলে, তাঁর সাথে কোম্পানির কর্মচারীদের পলাশীর যুদ্ধের আগের সময়ে বেশ কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। (১৭৫৫-এ বর্ধমানের রাজা তাঁর জেলার মধ্যে কোম্পানির সমস্ত কুঠি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন, লং: সিলেকশনস, নং ১৪৭ ও ১৫১) এখন কোম্পানির আমলারা রাজার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে, কারণ নতুন ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা নির্মাণের কাজে বিপুল পরিমান শ্রমিক সরবরাহের জন্য তারা তাঁর উপর নির্ভরশীল ছিল। প্রেসিডেন্সি থেকে বর্ধমান জেলা সহজ প্রবেশযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বর্ধমান রাজ জমিদারিতে ইংরেজ বাণিজ্যিক কেন্দ্র না থাকায়, প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিল সেখানে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের পাঠানোয় অনিচ্ছুক ছিল এবং তাদের আশা ছিল যে জেলার কোম্পানি প্রশাসনের প্রায় পুরো ভারটাই তারা রাজার হাতে ছেড়ে দিতে পারবে। ১৭৫৯-এর জুলাই মাসে, মি. হিউ ওয়াটস, বরাদ্দকৃত রাজস্বের কাজে বর্ধমানে গিয়েছিলেন, সেখানকার আইনশৃঙ্খলার অভাবের পরিস্থিতি আবিষ্কার করে গভর্নর হলওয়েলকে লেখেন :
মাননীয় মহাশয়,
পূর্বের চিঠিতে আমি আপনাকে রাজার বাহিনীর ঔদ্ধত্য সম্পর্কে অবহিত করেছি। গত কয়েকদিন ধরে ইজারাদারদের (ইজারাদার, অর্থাৎ রাজস্ব আদায়কারী এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যিনি চুক্তির মাধ্যমে অন্য কারো (ইজারাদাতা) সম্পত্তি বা অধিকার নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ভাড়ার বিনিময়ে ভোগ-দখল বা ব্যবহারের অধিকার লাভ করেন। এটি সাধারণত জমি, জলাশয়, হাট-বাজার বা ব্যবসা পরিচালনার জন্য করা হয়। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে এরা প্রধানত রাজস্ব সংগ্রাহক ছিলেন — অনুবাদক) আটক করা এবং কাছারিতে নিয়ে আসার সময় কোষাগারের অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার তাদের চেষ্টা কেবল আমাকে প্রচণ্ড সমস্যায় ফেলেছে তা নয়, বরং আমায় কোম্পানির হয়ে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহে বাধা দিয়েছে। গত পরশু তারা গোকুল মজুমদারের পালকি থামিয়ে তাকে বন্দী করার হুমকি দিচ্ছিল। আজ সুখ লাল নামে একজন জমাদার, শহরের মধ্যে আমার এক সিপাহীকে হত্যা করেছে, সে তখন নিরস্ত্র ছিল। আমি কারণ জানতে লোক পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি, তাই আমি তাকে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য ৩০ জন সিপাহীসহ একজন সুবেদার পাঠাই কোথাও কোনো গোলমাল না করার নির্দেশ দিয়ে। তার বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই দেখে সেখানে ৭০০ বা ৮০০ সৈন্য মোতায়েন আছে, এবং আমার সিপাহীরা এগিয়ে যাওয়ার সময় তারা তাদের দিকে বন্দুক তাক করে। এই খবর পেয়ে আমি সুবেদারকে রাজার কাছারিতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিই এবং লেফটেন্যান্ট ব্রাউনকে সম্ভব হলে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়ে ২০০ জন সৈন্যসহ তার সাহায্যে পাঠাই; কিন্তু মিস্টার ব্রাউন তাদের সাথে কথা বলার আগেই তারা গুলি চালানো শুরু করে। এর ফলে সংঘর্ষ শুরু হয়; যাতে, দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, আমরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, সার্জেন্ট এবং প্রায় ৫০ জন সিপাহী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন, মিস্টার ব্রাউন এবং আরও কয়েকজন সামান্য আহত হয়েছেন। আমাদের বাহিনী তাদের ব্যারাকে ফিরে আসার পর আমি খবর পেয়েছি যে শত্রুপক্ষের সংখ্যা ৫,০০০-এ পৌঁছেছে এবং তারা কোষাগার দখল করে একটা প্রকাশ্য বিদ্রোহের পূর্বপরিকল্পনা করছে। এরা হল রাজার বেতন না পাওয়া অসন্তুষ্ট সৈন্য এবং অন্য দুষ্কৃতি, যারা এখানকার বাসিন্দাদের হয়রানি করছে এবং এই প্রদেশের শান্তি বিঘ্নিত করছে। বর্তমানে সবকিছু শান্ত আছে এবং আমি বিশ্বাস করি শান্তি এমনই বজায় থাকবে। আমি আজ রাতে আপনাকে এর চেয়ে বিস্তারিত বিবরণ দিতে পারছি না, তবে আগামীকাল আবার লিখব।
ইতি, ইত্যাদি।
হিউ ওয়াটস।
চিঠি পড়ার পর কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয়ে জানায়, “১৩৯ জন ইউরোপীয় এবং ৩০০ জন সিপাহীর দল বর্ধমানের দিকে অগ্রসর হবে এবং নদীর অপর প্রান্তে অবস্থানরত লেফটেন্যান্ট নোলিকিন্সের অধীনে থাকা ৩০০ জন সিপাহীর একটা দলের সাথে মিলিত হবে।” (লং : সিলেকশনস, নং ৪৬৮।)
কোম্পানিকে বর্ধমান হস্তান্তরে মীর কাসিমের জারি করা সনদ ১৭৬০-এর ১৭ই নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট আর কাউন্সিলের কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ আছে। এর সরকারি অনুবাদ নিম্নরূপ :
“বর্ধমান পরগনা ইত্যাদির জমিদার, কানুনগো, তালুকদার, প্রজা, কৃষক এবং প্রধান গ্রামবাসীগণ, অর্থাৎ সুবা বাংলার জেলাসমূহের অন্তর্গত রাজা তিলক চাঁদের জমিদারীর প্রতি,
জ্ঞাতব্য যে, যেহেতু বিভিন্ন দুষ্ট লোক বিশ্বাসঘাতকতার সাথে প্রজাদের লুণ্ঠন করতে এবং রাজকীয় রাজত্বের পরিবেশ নষ্ট করতে হাত বাড়িয়েছে, এই কারণে উক্ত পরগনা ইত্যাদি ইংরেজ কোম্পানিকে তাদের খরচের আংশিক পরিশোধ এবং পাঁচশত ইউরোপীয় অশ্বারোহী, দুই হাজার ইউরোপীয় পদাতিক এবং আট হাজার সিপাহীর মাসিক ভরণপোষণের জন্য প্রদান করা হলো, যাদেরকে রাজকীয় রাজত্ব রক্ষার জন্য নিযুক্ত করা হবে। উপরিউক্ত কর্মকর্তাগণ যেন শান্তভাবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে ইংরেজ কোম্পানির নিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান করেন এবং সকল বিষয়ে তাদের কর্তৃত্বের কাছে নিঃশর্তভাবে বশ্যতা স্বীকার করেন; ইংরেজ কোম্পানির কালেক্টরদের কার্যালয়ের কাজ নিম্নরূপ :—
তারা জমিদার ও প্রজাদের স্ব স্ব পদে বহাল রাখবে, নিয়মিতভাবে জমির রাজস্ব সংগ্রহ করবে এবং কোম্পানির খরচ ও উপরিউক্ত সৈন্যদের বেতন প্রদানের জন্য মাসিক ভিত্তিতে তা জমা দেবেন, যাতে তারা সর্বদা সানন্দে ও উদ্যমের সাথে বাদশাহের কার্য সম্পাদনে প্রস্তুত থাকতে পারে। এটি যথাযথভাবে পালন করা হোক। তারিখ ১৪ই রবিউল আউয়াল, প্রথম সন, যা বাংলা ১১৭৬ সালের কার্তিক মাসের সমতুল্য।” (ঐ, নং ৪৮১। আইচিসন, পূর্বোক্ত, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৬-১৭। শাহ আলমের অনুমোদনের জন্য, ১২ই আগস্ট, ১৭৬৫ দেখুন ঐ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২২৮। সনদটি পরগনার জন্য ছিল, কিন্তু যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা ছিল চাকলা। হলওয়েল: ইন্ডিয়া ট্র্যাক্টস, পৃষ্ঠা ৮৪।)
এই সময়ে রাজা তিলক চাঁদের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। রাজস্বের দাবি মেটানোয় রাজার অক্ষমতার জন্য হিসেবে মীর জাফরের তাঁকে নির্লজ্জ শোষণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন হলওয়েল, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে একথা বলার মাধ্যমে হলওয়েল মীর জাফরের পরিবর্তে মীর কাসিমকে নবাবি পদে বসানোর নীতি সমর্থন চাইছিলেন। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগের কয়েক মাস ওডিসা শাসন করা মারাঠাযসেনা বাংলা পশ্চিমাঞ্চলগুলোয় নিয়মিত হানা দিচ্ছিল, ফলে এই হামলার প্রাবল্যে বর্ধমান জেলা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ১৮ই ডিসেম্বর কাউন্সিলকে পেশ করা রাজার হিসাব অনুযায়ী, শাহজাদার সেনাবাহিনী ও মারাঠাদের ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭,৯৩,০৮০ টাকা ৩ আনা ৯ পয়সা।
১৭৬০-এর ৭ই নভেম্বর গভর্নর, তিলক চাঁদকে তাঁর হিসাবপত্র নিয়ে প্রেসিডেন্সিতে আসার নির্দেশ দেন (On 7th November, 1760, the Governor ordered Tilak Chand to repair to the Presidency and bring with him his accounts)। (Calendar of Persian Correspondence, Imperial Record Department, No. 559) আট দিন পর রাজাকে হুমকি দিলেন, যদি তিনি নিজের উদ্যমে না উপস্থিত হন, তাহলে তাকে বলপ্রয়োগ করে আনতে সৈন্য পাঠানো হবে; এবং আবারও দু’দিন পর তাকে জানানো হল, তার অবাধ্যতার ফলে, কোম্পানি তার জমিদারি কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। (ঐ)
ইতিমধ্যে নবাব ঘোষণা করেন বর্ধমান আর বীরভূমের রাজারা একইভাবে অবিশ্বস্ত থেকেছেন বলেই, তিনি তাদের শাস্তি দিতে মনস্থ করেছেন, এবং তিনি “বর্ধমানের পুরোনো জমিদারকে ডেকে এনে তাঁর পূর্বপুরুষদের পদে অধিষ্ঠিত করতে চান।” (ঐ) তবে মাসের শেষে, তিলক চাঁদ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য প্রেসিডেন্সিতে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন এবং জানান যে তাঁর নিজের আগমনও বেশি বিলম্বিত হবে না। কাউন্সিলের তখনও আশা ছিল নবাব রাজাকে শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পালন করবেন। তারা ডব্লিউ. বি. সামনারকে হিসাবপত্র তদন্তের জন্য বর্ধমানে পাঠায় এবং জেলায় শান্তি রক্ষার জন্য সৈন্য সরবরাহ করে। একই সাথে তারা রাজাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে, যদি তিনি “উপযুক্ত এবং নির্দেশিত পথে চলেন এবং বর্ধমানের বিষয়গুলো নিষ্পত্তির দিকে মনোযোগ দেন,” তবে তার কোনো ভয়ের কারণ নেই। (ঐ) বিয়া রাম নামে জনৈক স্থানীয় কর্মকর্তাকে রায় রায়ানের থেকে বর্ধমানের কাগজপত্র গ্রহণ করার কথা ছিল এবং রাজস্ব সরাসরি কলকাতা সরকারের একজন কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার কথা ছিল। এই সমস্ত ব্যবস্থা অবশ্য গ্রহণ করা হয়নি, কারণ ডিসেম্বরে আমরা দেখতে পাই ইংরেজরা তখনও সৈন্য পাঠানোর কথা বলছে, এবং সেই মাসের ১৯ তারিখে গভর্নর রাজাকে “তাঁর পূর্ববর্তী কু-পরামর্শদাতাদের কথায় কান না দেওয়ার জন্য” এবং তাঁর “সংশোধিত আচরণের জন্য” অভিনন্দন জানান। (ঐ)
১৬ ডিসেম্বর বর্ধমানের আইনজীবী রাজচন্দ্র রায় প্রেসিডেন্সিতে আসেন এবং দুই দিন পরে হিসাব পরিষদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। রাজার ভবিষ্যতের অর্থ প্রদানগুলো নিম্নলিখিতভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল: (Long: Selections, No. 487)
আগামী চার মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

বোর্ডের সর্বসম্মত মত ছিল যে এই বন্দোবস্ত বর্ধমান জমির প্রকৃত মূল্য নয়, কিন্তু তারা এতেই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ ‘বহু জমিদার শাহজাদার বাহিনীতে অংশ নেওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিল এবং বর্ধমানঅকে হয়ত একই পথ অবলম্বন করতে অনেকটাই রাজি করানো গিয়েছিল। (“how many of the zemindars have taken part with the Shahzada, and how near Burdwan was being persuaded to take the same course.”)’

চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ