আকর্ষণীয় বিষয় হল, ১৭৬১-র ১৭ই সেপ্টেম্বর সিলেক্ট কমিটি, একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সমাধান করার লক্ষ্যে আলোচনা চালাচ্ছিল, “মারাঠা বর্গিদের বাংলায় অতীতের মত ধ্বংসযজ্ঞ চালানো প্রক্রিয়া আটকানোর উপযুক্ত পদক্ষেপ কি তাদের নিজেদের দেশে উজিয়ে গিয়ে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া?” এই আলোচনার ফলস্বরূপ, তারা পাটনার মি. হে’কে চিঠি লিখে জানাল :
‘মহাশয়,
‘আজ অনুষ্ঠিত সিলেক্ট কমিটি বৈঠকে, বর্ষাকালে আমাদের বাহিনী নিয়োগের অবস্থা এবং পদ্ধতি আমাদের বিবেচনাধীন ছিল। আমরা যে খবর পেয়েছি, তাতে এ বিষয়ে খুব কমই সন্দেহ করার অবকাশ আছে যে, যদি মারাঠাদের প্রতিরোধ করার জন্য কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে তারা এই দেশে অতীতের মত প্রবেশ করে চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী প্রবল ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সুযোগ পাবে। আমরা মনে করি যে, এই উদ্দেশ্যে এবং সেইসাথে তাদের ওপর পালটা দুর্দশা চাপিয়ে দিতে এবং নিজেদের অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করতে আমাদের হাতে সব থেকে কার্যকর পদক্ষেপ হল কটকে মারাঠাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা।’
‘অতএব, আমরা চাই যে আপনি নবাবের সাথে পরামর্শ করুন এবং জলেশ্বর আর কটকের মধ্যবর্তী অঞ্চলের রাজস্বের মূল্য সম্পর্কে তাঁর কাছারি থেকে তথ্য জানুন, এবং এটাও জানুন যে এই ধরনের অভিযানের সমর খরচ মেটানোর জন্য তিনি কোনও অংশ কোম্পানিকে হস্তান্তর করতে ইচ্ছুক হবেন কি না; এই অভিযানের সাফল্য নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, এবং এই অভিযান কেবল তাঁকে, বাংলার সুবাহগুলোর সম্পূর্ণ পূর্বাধিকারই সুরক্ষিত করবে না, বরং তাঁর রাজস্বের ভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ঘটাবে এবং মারাঠাদের ভবিষ্যৎ আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।
আমরা ইত্যাদি’।
তবে, ১৭৬২-র ৮ই এপ্রিল সিলেক্ট কমিটি কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে লিখল :—
“মহোদয়গণ,
“আমাদের শেষ চিঠিতে আপনাদেরকে কটকে মারাঠাদের বিরুদ্ধে আমাদের সমর অভিযানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সংকল্পের কথা জানিয়েছিলাম, সে সম্পর্কে বলতে চাই নবাব তাঁর প্রতিশ্রুত সৈন্য পাঠাননি এবং অভিযানের খরচের প্রতিদানের জন্য আমাদের যথেষ্ট আশ্বাসও দেননি, এবং মারাঠারাও এ বছর অন্তত আমাদের প্রশাসনিক জেলাগুলিতে কোনো গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেনি, তাই আমরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নিজেদের প্রধান পক্ষ হিসেবে জড়ানোটা সমীচীন মনে করিনি, বরং আমরা নবাবকে লিখেছিলাম, যখনই তিনি মারাঠাদের হাত থেকে কটক প্রদেশ পুনরুদ্ধারের সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা তাঁকে তাঁর অনুরোধ অনুযায়ী সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকব এই শর্তে যে তাকে সমস্ত সমর খরচ বহন করতে হবে।
“আমরা আপনাদের বিশ্বস্ত,
“পি. অ্যামিয়াট,
“জন কারনাক।”
গভর্নর ভেরেলস্ট তাঁর শাসন আমলে মারাঠাদের সাথে আলোচনা করেই নিশ্চিতভাবে কটক দখলের উদ্যম একটা নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর কটক অধিকার সফল হলে উত্তর সরকারের অঞ্চল বাংলার সাথে সহজেই জুড়তে পারত, মাদ্রাজ পর্যন্ত স্থলপথে নিরাপদ যোগাযোগের ব্যবস্থা সুগম হত এবং বঙ্গোপসাগরে জাহাজডুবির শিকার নাবিকদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সুরক্ষা বলয় তৈরি করা যেত। (উপকূলের এই অংশে একটা জাহাজডুবির বিবরণের জন্য Genuine Memoirs of Asiaticus দেখুন। পুনর্মুদ্রণ, ১৯০৯)
১৭৬৫-তে গ্রাহাম, লর্ড ক্লাইভের সামনে এমন এক আশ্চর্যজনক আদায় করা উদ্বৃত্ত অর্থের বিবরণ পেশ করেন—যা দেখে ক্লাইভ স্বভাবতই উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তাঁর পূর্বসূরি গভর্নর কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্যদের যে কোনও ছুতোয় দোষী সাব্যস্ত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ পেলেই তিনি সর্বদা উৎফুল্ল হয়ে উঠতেন। গ্রাহামের সেই বিবরণে রাজস্ব আদায় এবং বর্ধিত বেসামরিক ব্যয়ের খাত থেকে অবৈধভাবে অর্জিত অতিরিক্ত আয়ের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছিল। তবে, বক্ষ্যমাণ নথি বা দলিলে এমন কোনো উপায় বা সূত্র পাওয়া যায় নি, যা দিয়ে গ্রাহামের এই অভিযোগের সত্যতা আদৌ যাচাই করা সম্ভব হয়। (মেদিনীপুর জেলা রেকর্ডস ছাড়াও, ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ড ডিপার্টমেন্টের “হোম মিসেলেনিয়াস”-এর ৭৩৭ নম্বর নথিটি দেখা উচিত।)
[প্রতি এইচ. ভেরেলস্ট]..
দমদমা, ২৯শে ডিসেম্বর, ১৭৬৫।
প্রিয় মহাশয়,
আমি খুব ভালো করেই জানি যে বর্ধমানের রাজার থেকে ১,৫০,০০০ টাকা আদায় নিয়ে মিস্টার সিনিয়রের কী অবস্থা হয়েছিল, এবং তিনি মিস্টার গ্রাহামের মাধ্যমে সেই অর্থের একটা অংশ পেয়েছিলেন; আমার সূত্র বলছে, মিস্টার গ্রাহামও সমান্তরালভাবে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এক লক্ষ টাকার বেশি আদায় করেছেন। রাজা আপনাকে এই বিষয়গুলো জানাতে পারেন, এবং আমি চাই যে আপনি এগুলো সম্পর্কে জানুন, কারণ এই ধরনের ঘটনা যদি অন্য কোনো কাজে না-ও লাগে, তাহলেও কোম্পানি সম্পর্কে লোকেদের কর্তব্যপরায়ণ করে তোলার জন্য কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমি শুনেছি জনৈক ভদ্রলোক আমাদের সমস্ত কার্যকলাপের উপর নজর রাখার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করেন—বিশেষ করে আপনার এবং সাইকসের উপর, কিন্তু আমরা তাদের সাথে সেই আচরণ করতে পারি যেমনটা সিপিয়ো, হ্যানিবলের পাঠানো গুপ্তচরদের সাথে করেছিলেন — দিনের বেলায় সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগের মধ্যে দিয়ে তাদের ঘুরিয়ে তাদের বিদায় দিয়ে বলতে পারি তারা যেন দরবারে পৌঁছে তাদের মনিবকে যা জেনেছে সব বলতে পারে।
আমি, প্রিয় মহাশয়,
আপনার স্নেহপ্রবণ বন্ধু ও সেবক।
ক্লাইভ।
১৭৭২-এর বছরটায় সার্কিট কমিটি মেদিনীপুর পরিদর্শনে যায় নি, কিন্তু সেই বছরের আগস্ট মাসে রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড বেবারকে মেদিনীপুর আর জলেশ্বর অঞ্চলের জমি ইজারার জন্য প্রস্তাব আহ্বান করে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার নির্দেশ দেওয়া হল। তিনি উত্তর দিলেন (১লা সেপ্টেম্বর, ১৭৭২):
‘বিজ্ঞাপনটির সাথে সংযুক্ত বিধিমালায় আমি লক্ষ্য করছি যে, কালেক্টরের কর্মচারী এবং সকল শ্রেণীর নির্ভরশীলদের জমি ইজারা নেওয়া বা এ ধরনের কোনো সম্পর্ক রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমি জানতে চাই যে, প্রদেশের বর্তমান জমিদারদের কি কৃষক হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে? কারণ, যদি তাদের অনুমতি না দেওয়া হয়, তবে দেশে প্রস্তাব দেওয়ার মতো আর কেউ থাকবে না, যেহেতু সমগ্র এলাকা বংশানুক্রমিক জমিদারদের হাতে রয়েছে – তারা তাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া মূল সনদ থেকে জমিদারির অধিকার লাভ করেছেন। এই প্রদেশগুলো সম্পর্কিত এই বিশেষ পরিস্থিতি সম্ভবত আপনার বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। লর্ড ক্লাইভের শাসনামলে সিলেক্ট কমিটিরও এই জমিগুলো ইজারা দেওয়ার একই উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু এই কারণেই তা কার্যকর করা হয়নি।
১৭৭৩-এ জেলাগুলো থেকে ইংরেজ কালেক্টরদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে মেদিনীপুরের প্রশাসনিক পরিবর্তনের সূচনা হয়; জেলাকে তখন বর্ধমানে নবগঠিত প্রাদেশিক রাজস্ব পরিষদের এখতিয়ারে আনা হয়, ১৭৭৪-এ এর রেসিডেন্টকে বদলি করা হয় এবং স্থানীয় কাজের দায়িত্বে একজন দেশীয় কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়, যার পদবি ছিল নায়েব (১৭৭২-এ ডিসেম্বরে, সরকার রেসিডেন্টের কাজ কিছুটা হালকা করে : “আপনার জেলার জমিদার ও তালুকদারদের মধ্যে বেশ কয়েকজন খাজনা সরাসরি খালাসখানায় জমা দেওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করায়, আমরা তাদের অনুরোধ মঞ্জুর করেছি এবং ফলস্বরূপ তাদেরকে আপনার আদায় কার্যক্রম থেকে আলাদা রাখার নির্দেশ দিচ্ছি।” এই ব্যবস্থায় রেসিডেন্ট অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন)। তিন বছর পর, অবশ্য, রেসিডেন্টের পদ পুনরুজ্জীবিত করে মি. জে. পিয়ার্সকে মেদিনীপুরে পাঠানো হয় এবং কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বার্থ দেখার দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে একজন পৃথক বাণিজ্যিক রেসিডেন্ট নিযুক্ত করা হয়। ১৭৭৮-তে মেদিনীপুরকে বর্ধমান প্রদেশ থেকে আলাদা করা হয়। ১৭৮১-তে প্রাদেশিক পরিষদগুলো বিলুপ্ত করা হলে স্থানীয় দেওয়ানি আদালতের কাজকর্ম একজন পৃথক ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
মেদিনীপুর রাজস্ব সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিবৃতিটি ভেরেলেস্টের বই থেকে নেওয়া হয়েছে :

চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ