‘কবি সম্মেলন’ কথাটা নিয়ে আমার একটু আপত্তি আছে। প্রথাগত কবি সম্মেলন আমার কাছে একটি বিরক্তিকর ব্যাপার মনে হচ্ছে আজকাল। তার কারণটা আমি প্রথমেই বলে রাখি-আমি মূলত কবিতা খুব একটা লিখি না। যা লিখি তা একটু-আধটু প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তবুও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশের সুবাদে কবি সম্মেলনে ডাক আসে। আমি তার কয়েকটিতে যোগদান করি অনেকটা অনিচ্ছাকৃতভাবে — শুধুমাত্র কথা রাখার জন্যই। আবার নাম ঘোষণা হলেই একটা কাগজের টুকরোতে লেখা কবিতা বা অনেক সময় মোবাইল ফোনের নোটপ্যাডে টুকে রাখা কবিতার পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটি। কমন কবিরা থাকলে বুঝে যাবেন এ ব্যাটা সব জায়গায় একই কবিতা পড়ে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ গল্পের কথক সুকুমার যেমন একটি সর্বার্থসাধক বক্তৃতাই রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী থেকে বনমহোৎসব পর্যন্ত সব জায়গায় চালিয়ে দিতেন, তেমনি আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তাই নামি-অনামি কবির ভিড়ে আমি সত্যিই দিশেহারা হয়ে পড়ি। বাধ্য হয়েই তাই অনেক আগের লেখা একটা কবিতা পড়েই মঞ্চ ছাড়তে বাধ্য হই।
প্রবন্ধ-নিবন্ধ যে পাঠ করব তার আর উপায় নেই। এটা তো কবি সম্মেলন, প্রবন্ধিক সম্মেলন তো নয়! গদ্য যারা লেখেন, তারা শুধুমাত্র যাবেন ওই একখানা মেডেল, উত্তরীয় আর গালভরা দু চারটে বক্তৃতার ফানুস ওড়াতে। প্রবন্ধ পাঠের সময় তারা পাবেন না। এমনকি মঞ্চে রীতিমতো ঘোষণা হচ্ছে একটার বেশি কবিতা বলবেন না, আরো অনেক কবি রয়েছেন, সকলকে সুযোগ দিতে হবে। কিছু কবি সম্মেলনে তো আবার রথে দলে কবিরা এসে যোগ দেন শুধুমাত্র একটি কবিতা আবৃত্তি করতে। তবে হ্যাঁ, নিজের বই এর প্রচারও একটা ব্যাপার থাকে। মঞ্চে উপস্থিত কিছু গুণিজন অথবা যার ডাকে তিনি সম্মেলনে যোগদান করেছেন তাদের কয়েকজনকে নিজের লেখা বই উপহার দিয়ে ভাব জমান, আবার নিজেও হয়তো অন্য কোনো ‘লোকাল’ কবির কাছ থেকে কিছু বই উপহারস্বরূপ পান। এভাবেই কবি সম্মেলনগুলি বেশ জমজমাটি হয়ে ওঠে। কিছু কিছু কবি সম্মেলনে আবার দ্বিপ্রাহরিক আহারের ব্যবস্থাও থাকে। কি মজা!
তবে অনেক পত্র-পত্রিকা মাসিক সাহিত্য আড্ডার ব্যবস্থা করেন। এটাকে ঠিক কবি সম্মেলন বলা যাবে না। যে যে কবি, সাহিত্যিকরা উপস্থিত থাকবেন, সকলের নিজ নিজ সৃষ্টিকর্ম উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন, তা সে কবিতাই হোক, প্রবন্ধই হোক আর গল্পই হোক। উপন্যাস, চিত্র, নাটক, সঙ্গীতও চলতে পারে। পাশাপাশি চলবে আড্ডা, তবে এ আড্ডা হবে জমজমাট, নিটোল ও সুবিন্যস্ত।তাছাড়া সেখানে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট বিষয় দেওয়া থাকবে, আলোচনা চলবে, প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে। পূর্ব নির্ধারিত ব্যক্তিবর্গ, পণ্ডিত, বিদগ্ধ মানুষ সকলের ছাড়পত্র থাকবে এই মাসিক আড্ডায়। এখানে যেতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এখানে নিজেকে গায়ের জোরে কবি হতে হয় না। সম্মাননা, মেডেল, উত্তরীয় — এগুলো তো তুচ্ছ ব্যাপার। এসব নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। নিজের মনের খোরাক, জ্ঞানের খোরাক যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে আমি একশো বার যাব। এইসব মাসিক সাহিত্য আড্ডায় এই জ্ঞানের খোরাক মেলে। করিমপুরে ‘দর্পণ…মুখের খোঁজে’ পত্রিকার তরফ থেকে অনুষ্ঠিত মাসিক সাহিত্য আড্ডায় আমি বেশ কয়েকবার গেছি। যোগ দিয়েছি কবিতার কর্মশালাতেও। অনন্য এক অভিজ্ঞতা হয়েছে।
আবার চাপড়ার ‘আনন্দম্’ পত্রিকাও প্রতি মাসে সাহিত্য আড্ডার আয়োজন করে-যদিও সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার এখনো হয়নি। তবে এই ধরণের আড্ডায় আমি বেশি করে যাব। কবিতার আড্ডা চলুক, চলুক কর্মশালা, কীভাবে কবিতা লিখতে হয়, যুতসই শব্দ, ছন্দ, অন্ত্যমিল আর অলংকার দিয়ে কীভাবে কবিতার কায়া নির্মিত হয়, সেগুলো নিয়ে চলুক আলোচনা। কিন্তু শুধুমাত্র একটা কবিতা বলার জন্য পঞ্চাশ-ষাট কিমি পথ পাড়ি দিয়ে পোডিয়ামের সামনে গিয়ে ফুটেজ খাওয়ার জন্য কবিতা বলে লাভ নেই। কবিরা যে কবিতাটা বলছে, তার সমালোচনাটাও হওয়া দরকার, নতুবা কবিতার উন্নতি হবে কীভাবে? আজকের দিনে কতজন কবি কবিতা লেখার পর চেক করান কোনো অগ্রজ কবিকে দিয়ে? হয়তো করেন কেউ কেউ। তবে তার সংখ্যাটা নিতান্ত হাতে গোনা। অনেকে ভাবেন এটা করলে হয়তো তার কবিসত্ত্বা অন্যের কাছে বন্ধক থেকে যাবে।
এসব নানা দোষে আজকের সাহিত্য সমাজ কলুষিত হচ্ছে। মোদ্দা কথা হচ্ছে ‘কবি সম্মেলন’ না হয়ে হোক ‘সাহিত্য সম্মেলন’। তাহলে কবিতা বলার কোনো বাধ্যবাধকতা সেখানে থাকবে না। যে যার ইচ্ছে মতো সৃষ্টিকর্ম উপস্থাপন করবে। তারজন্য অবশ্য আমন্ত্রিত অতিথি, কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে উপস্থিত সকলেই কিছু না কিছু উপস্থাপন করতে পারে। এই ধরনের সাহিত্য আড্ডা চলুক বেশি বেশি করে, কবি-সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিকরা নিজেদের লেখাকে আরো শান দিয়ে নিক, সমালোচনাটাও হজম করতে শিখুক-তবেই তো লেখা মজবুত হবে। তাই শুধুমাত্র ‘কবি সম্মেলন’ করেই বাংলা কবিতার উন্নতি করা যাবে না, এর জন্য চাই নিখাদ এক সাহিত্য আড্ডা।
সাহিত্য আড্ডা হলো সাহিত্যিক, লেখক, পাঠক ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষদের একটি মিলনমেলা, যেখানে সাহিত্য, শিল্প, ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা, আড্ডা ও মতবিনিময় হয়। এই মত বিনিময় স্বতঃস্ফূর্ত ও অবাধ। এতে সৃজনশীলতার বিকাশ যেমন হয় তেমনি বৌদ্ধিক আদান-প্রদানও হয়। সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়। নিখাদ সাহিত্য আড্ডায় মনের খোরাক পাওয়া যায়, সমৃদ্ধ হওয়া যায়, নিজেকে আরো ঝালিয়ে নেওয়া যায়। আবার রসিকতাও চলে তবে সেটা যেন শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। জোড়াসাঁকো থেকে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা প্রকাশিত হত। সাহিত্য সভাও বসত। এই সভায় কখনও কখনও সাহিত্যিকদের জুতো ওলোটপালোট হয়ে যেত। কখনও জুতো চুরিও হত। একদিন সভায় এসেছেন শরৎচন্দ্র। জুতো চুরি হবার ভয়ে খবরের কাগজে জুতো মুড়ে নিয়ে সভায় ঢুকলেন। খবরটা রবীন্দ্রনাথের কানে গেল এবং রবীন্দ্রনাথ বললেন, “ওহে শরৎ, তোমার বগলে ওটা কীসের পুঁথি?” শরৎচন্দ্র তো রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। এরকম প্রচুর ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের অনেককিছু শেখায়। কিন্তু আজকের কবি সম্মেলন মানে উপরে দর্শনধারী কিন্তু ভিতরে অষ্টরম্ভা। শেখার জিনিস খুবই কম। ঝা চকাচক মঞ্চ, আলো, ঝালর, চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ, ফুলদানি, জলের বোতল, আগত কবিদের আপ্যায়ন, মাঝে মাঝে চা এর আনাগোনা, টিফিন হিসাবে মিষ্টির প্যাকেট বা অনেক সময় মধ্যাহ্ন ভোজন-এ সব দিয়েই এখনকার কবি সম্মেলন বেশ জমকালো হয়ে ওঠে। যাক আর বেশি বলব না, তখন আবার উদ্যোক্তারা আমার উপর রে রে করে তেড়ে আসবেন। আপনি কে মশাই? গায়ে পড়ে এত কিছু কথা বলছেন! আপনার ভালো না লাগে আপনি আসবেন না, ব্যাস! আমাদের নিয়ে এত মাথাব্যথা কীসের? আচ্ছা, ঠিক আছে কলম থামালাম। কিন্তু কবি সম্মেলন কথাটা যতদিন না সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে ততদিন আমার কলম চলবে।