লৌকিক দেবতা ঘেঁটুকে নিয়ে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে এবারেও মাতল বাসিন্দারা। চর্মরোগের দেবতা ঘন্টাকর্ণকে সন্তুষ্ট রাখতে ফাল্গুনের সংক্রান্তিতে ভোরবেলায় বাড়ির গিন্নিরা ঘেঁটুফুল ও পুরনো পোড়া মাটির হাঁড়ি সাজিয়ে পুজো করেন। একটাই উদ্দেশ্য পরিবারের সকল সদস্য যেন চর্মরোগ থেকে সুস্থ থাকেন। দেবতা ঘন্টাকর্ণকে পালকিতে সাজিয়ে আবার সন্ধ্যায় পাড়ার বাচ্ছা ছেলেমেয়েরা ঘর ঘর হাজির হন। গান শুনিয়ে তুষ্ট করেন পাড়া প্রতিবেশীদের। বিনিময়ে জোটে চাল-ডাল, আলু ও নগদ পয়সা। আজও এ লৌকিক প্রথা চলে আসছে।
প্রসঙ্গত, ঘেঁটু পূজা হলো ফাল্গুন মাসের সংক্রান্তিতে পালিত বাংলার এক প্রাচীন লৌকিক অনুষ্ঠান। মূলত চর্মরোগ (খোস-পাঁচড়া) থেকে মুক্তির কামনায় ‘ঘেঁটু’ বা ঘণ্টাকর্ণের উদ্দেশ্যে পূজা করা হয়। এই পূজায় কোনো পুরোহিত লাগে না; মহিলারা মাটির হাঁড়ি ও ঘেঁটু ফুল দিয়ে পূজার আয়োজন করে অশুভ রোগ-বালাইকে বিদায় জানান। ঘেঁটু বা ঘণ্টাকর্ণ হলেন চর্মরোগের দেবতা, যিনি শিবের অনুচর এবং বিষ্ণুর বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। ঋতু পরিবর্তনের সময় (বসন্তকালে) খোস-পাঁচড়া বা চর্মরোগ দূর করতে এই পূজা করলে ঘরে রোগ ছড়ায় না।
উল্লেখ্য, পূজার শেষে মাটির পাত্র বা হাঁড়ি ভেঙে ঘেঁটু ঠাকুরকে বিদায় জানানো হয়, যার অর্থ হলো রোগ-বালাইয়ের বিনাশ।
এই পূজায় ঘেঁটু ফুল, গোবর পিণ্ড, কড়ি, এবং তেল-হলুদ মাখানো সুতো ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত গ্রাম বাংলার মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা রক্ষার সাথে জড়িত একটি জনপ্রিয় বাৎসরিক উৎসব। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া জেলায় বাঙালি হিন্দুসমাজে ঘেঁটুপূজা হয়ে থাকে।

উল্লেখ্য, ঘেঁটু মূলত গ্রামবাংলার অবহেলিত ফুল গাছ। ফুল দেখতে সাদা হলেও ফুলের চারদিকে কিছুটা লালের আভা থাকে। ফলের ব্যস আধা ইঞ্চির কাছাকাছি হয়ে থাকে। তবে চ্যাপ্টা ধরনের এবং দেখতে বেশ কালো।
বাঙালি হিন্দুসমাজে ঘেঁটুপূজার গানগুলো সকলের নজর কেড়েছে। যেমন —
‘ঘেঁটু যায়, ঘেঁটু যায়, গৃহস্থের বাড়ি।
ঘেঁটুকে দাও গো চাল-পয়সা কড়ি।”
আবার যেমন—
“ঘেঁটু গাই, ঘেঁটু গাই, গৃহস্থ বাড়ি।
খোস পাঁচড়া করে দৌড়াদৌড়ি।”
এছাড়াও
“আলোর মালা চাল দাও,
নয় খোস পাঁজোড়া দাও,
যে দেবে ধামা ধামা,
তারে ঘেটু দেবে জরির জামা।”
বাচ্চাদের গলায় এও শোনা যায় —
“আয়রে ঘেঁটু নড়ে, হাতির পিঠে চড়ে।
হাতির পিঠে গুরগুড়ি বাজে,
তা সইতে ভোঁদড় নাচে।”
এই গানগুলো গেয়ে ছোটরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চর্মরোগ থেকে মুক্তির জন্য ঘেঁটু ঠাকুরের উদ্দেশ্যে চাল, ডাল বা পয়সা ভিক্ষা করে।
প্রসঙ্গত, ঘেঁটু গান হল প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী বাংলা লোকসঙ্গীতের একটি রূপ। প্রতি বছর ফাল্গুনের সংক্রান্তির সকালে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজার জন্য আলাদা করে পুরোহিতের দরকার হয় না, গৃহস্থ পুরুষ-মহিলারাই করতে পারে। পূজার জন্যে লাগে মুড়িভাজার পুরোনো ঝুলকালিমাখা একটি মাটির খোলা (‘কেলে হাড়ি’), তেল হলুদে চোবানো অব্যবহার্য ছোট বস্ত্রখণ্ড, তিনটি কড়ি, ছোট ছোট তিনটি গোবর দিয়ে পাকানো পিণ্ড, ঘেঁটু ফুল, সিঁদুর, ধান ও দূর্বা ঘাস। প্রথমে ব্রতিনীরা এলোচুলে বসে বাম হাতে মাটির খোলাটা নিকোনো জায়গায় বসিয়ে দেন। তার উপরে তিনটি গোবরের পিণ্ড লাগিয়ে সেগুলি কড়ি, সিঁদুর ঘেঁটু ফুল দিয়ে সেটি সাজানো হয়। খোলার উপরে বস্ত্রখণ্ডটি বিছিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির সামনে উঠোনে বা একটু দূরে রাস্তার তিনমাথা, চারমাথার ধারে জনতার মাঝে এটি সম্পন্ন হয়। ছড়া কাটা হয় —
“ধামা বাজা তোরা কুলো বাজা
এলো এলো দ্বারে ঘেঁটু রাজা।”
পূজার শেষে অল্পবয়সী ছেলেরা মোটা বাঁশের লাঠি দিয়ে খোলাটা ভেঙে দিয়ে হরিবিদ্বেষী ঘেঁটু দেবতাকে অপমান করে, তারপর দৌড়ে পুকুরের জলে হাত পা ধুয়ে আসে যাতে তাদের চর্মরোগ না হয়। এরপর মহিলারা ওই বস্ত্রখণ্ডটি এনে বাচ্ছাদের চোখে বুলিয়ে দেন এবং খোলার ঝুলকালি কাজলের মতো পরিয়ে দেন যাতে চোখ ভালো থাকে।

এই ঘেঁটু ঠাকুরকে বিদায় করে হরিনাম কীর্তন বা হরিযশ গাওয়া হয় —
“ভাগ্যমানে কাটায় পুকুর চণ্ডালে কাটে মাটি
কুমোরের কলসী, কাঁসারির ঘটি
জল শুদ্ধ, স্থল শুদ্ধ, শুদ্ধ মহামায়া
হরিনাম করলে পরে শুদ্ধ হয় আপন কায়া।।”
এরপর সন্ধ্যেবেলা ছোট ছোট ছেলেরা রঙীন কাগজ ও কঞ্চি দিয়ে ছোট্ট ডুলি বানিয়ে তাতে ঘেঁটু ফুল ও প্রদীপ দিয়ে ঘেঁটু ঠাকুরকে সাজিয়ে তা কাঁধে করে বাড়ি বাড়ি ঘোরে এবং ঘেঁটুর গান গেয়ে চাল পয়সা ভিক্ষা করে।
পুরান ও শাস্ত্রীয় মতে, এই লৌকিক দেবতা দেবকুমার স্বর্গে থাকা অবস্থায় বড়সড় অপরাধের কারণে বিষ্ণুর অভিশাপে পিশাচ কুলে ঘণ্টাকর্ণ নামে জন্ম হয়। খোস-পাঁজরা, চুলকানি-র মত নানান চর্মরোগের অপদেবতা হিসেবে। কথিত আছে এই ঘণ্টাকর্ণের পূজা করলে নানান চর্মরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় মনে করা হয়। এই রোগের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যই ঘেঁটু ঠাকুরের পুজোর উদ্ভব বলে ধরে নেওয়া যায়।