১৮৪২ সালের ৯ জানুয়ারি। খেজুরি বন্দর দিয়ে জাহাজে করে কালাপানি পেরিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর বিলেতে। তার আগে পরাধীন আমলে ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করে ব্যাঙ্কের সঙ্গে বাঙালির যোগসূত্র গড়ে তোলা, ভারতে প্রথম রেলপথ স্থাপনের স্বপ্ন দেখা’র পাশাপাশি তিনি বিশ্বাস করতেন, ইংরেজের দাসত্বের বদলে তাদের সহযোগিতায় এদেশে শিল্পোদ্যোগ তৈরি করা। বঙ্গদেশে বাঙালির শিল্পোদ্যোগ প্রতিষ্ঠিত করতে বিলেত গিয়ে তিনি যে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সমাদর পেয়েছিলেন তা অন্য কোনও ভারতীয় কোনওদিন পেয়েছেন কিনা সন্দেহ। লন্ডনের মেয়র তাঁকে সংবর্ধিত করা ছাড়াও স্কটল্যান্ডের এডিনবরা মহানগরীর নাগরিক অধিকার তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। এমনকী ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়া স্বয়ং তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ছিলেন। তিনি আর কেউ নন, তিনি জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। যে দ্বারকানাথের দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রখর ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সুদূর প্রসারি ভাবনাচিন্তা আর কর্মকুশলতায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে বিত্ত, অর্থ আর প্রভাব প্রতিপত্তির বিপুল সমাগম ঘটেছিল, সেই দ্বারকানাথকে পুত্র দেবেন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের কেউই মনে রাখেননি। ঠাকুর পরিবারের ‘ব্রাত্যজন’ হিসেবেই রয়ে গেলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ। এটাই বোধহয় ঠাকুর পরিবারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় সুদূর অতীতে কনৌজ থেকে পাঁচ ব্রাহ্মণ প্রথম বঙ্গদেশে এসেছিলেন বাঙালি ব্রাহ্মণদের আদি পুরুষ হিসেবে। ঠাকুর পরিবার সেই পাঁচ ব্রাহ্মণের অন্যতম ভট্টনারায়ণের বংশধর। বর্ধমান জেলার কুশ গ্রামে ঠাকুর পরিবারের বসবাসের জন্য তাদের আদি কৌলিক পদবী ছিল কুশারী। জীবন জীবিকার জন্য কুশ গ্রামের কিছুজন পরে পাড়ি দিয়ে ছিলেন পূর্ববঙ্গের খুলনাতে। খুলনার পিঠাভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারী ছিলেন ঠাকুর পরিবারের আদি পুরুষ। জগন্নাথ কুশারীর ছেলে পুরুষোত্তম বিদ্যাবাগীশ সুপন্ডিত ছিলেন। ‘যবন সংসর্গে’র অপবাদে কুশারীদের যে পিরালি ব্রাহ্মণ বলা হত তা জগন্নাথ ও তার ছেলে পুরুষোত্তম থেকে তা শুরু। জগন্নাথ না তার ছেলে কার জন্য ‘পীরালি দোষ’ তা নিয়ে আজও বহু বিতর্ক আছে। পুরুষোত্তমের অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ পঞ্চানন কুশারী।

১৮৪২ থেকে ১৮৪৫ পর্যন্ত ইউরোপে থাকাকালীন অবস্থায় রানী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।
তখনও পত্তন হয়নি কলকাতা শহরের। গঙ্গার ধারে সে জায়গায় তখন কলিকাতা, সুতানটি আর গোবিন্দপুর নামে তিনটি গ্রাম ছিল। পারিবারিক কোন কারনে পূর্ববঙ্গের যশোহর থেকে কাকা শুকদেবকে নিয়ে গোবিন্দপুরের গঙ্গাতীরে এসে বসবাস শুরু করেন পঞ্চানন কুশারী। গোবিন্দপুর গ্রামে তখন কয়েক ঘর জেলে ও মালো পরিবারের বাস। পঞ্চানন ও শুকদেবের বলিষ্ঠ ও দেবতুল্য চেহারার জন্য জেলেরা তাঁদের ‘ঠাকুর মশাই’ বলে ডাকত। গোরা সাহেবরা সেই নাম অনুকরণ করতে গিয়ে ঠাকুর বিকৃত হয়ে দাঁড়াল টাগুর বা টেগোর। পঞ্চানন কুশারীর নতুন পদবী যোগ হল ঠাকুর।
পঞ্চাননের বংশধরেরা ব্যবসা-বাণিজ্য আর ইংরেজদের কর্মচারী হিসেবে বেশ কিছু সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। পঞ্চাননের নাতি নীলমণি ঠাকুর তখনকার দিনে জোড়াসাঁকোতে কিছু জমি দানে পেয়ে জোড়াসাঁকোতে উঠে এসে ১৭৮৪ সালে নীলমণি ঠাকুর জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির পত্তন করেন।
নীলমণির ছেলে রামমণি ঠাকুরের চতুর্থ ও কনিষ্ঠ সন্তান দ্বারকানাথের জন্ম ১৭৯৪ সালে। জন্মের এক বছরের মধ্যেই মা মেনকার মৃত্যু হলে দ্বারকানাথকে রামমণির দাদা রামলোচন ঠাকুর দত্তক নেন। দ্বারকানাথের তেরো বছর বয়সে রামলোচনের মৃত্যু হলে দ্বারকানাথ প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত রামলোচনের স্ত্রী অলকাদেবীই ঠাকুর বাড়ির বিষয় সম্পত্তির দেখভাল করতেন। সতেরো বছর বয়সে দ্বারকানাথের যশোহরের রামতনু রায়চৌধুরীর কন্যা দিগম্বরী দেবীর বিয়ে হয়। দেবেন্দ্রনাথ সহ পাঁচ পুত্র তাঁদের। দুই পুত্র নরেন্দ্র ও ভূপেন্দ্র অল্প বয়সেই মারা যান। দ্বারকানাথ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বিষয়-সম্পত্তির ভার নিলেন সেদিন থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে শুরু হল অকল্পনীয় সম্পদ বৃদ্ধির সূত্রপাত। এক ইংরেজ আইনজীবীর কাছে শিক্ষানবিস আইনজীবী হিসেবে থাকার পর ১৮১৫ সালে সফলভাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পরে ১৮২২ সালে হিজলির নিমক মহালের সল্ট এজেন্ট প্লাউডেনের দেওয়ান নিযুক্ত হন। ইংরেজদের অংশীদার হিসেবেই তাঁর ব্যবসার গোড়াপত্তন হয় সে সময়কার ‘ম্যাকিনটস’ নামে এক বিখ্যাত ইংরেজ রফতানি কোম্পানির অংশীদার হয়ে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এদেশে কোন পাবলিক ব্যাঙ্ক ছিলনা। ১৮২৯ সালে দ্বারকানাথ ষোলো লক্ষ টাকা মূলধন নিয়ে নিজে এদেশে প্রথম পাবলিক ব্যাঙ্ক হিসেবে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। উইলিয়াম কার নামে এক ইংরেজ ব্যবসায়ী আর দ্বারকানাথ ঠাকুর এরপর যৌথ উদ্যোগে ‘কার অ্যান্ড টেগোর’ কোম্পানি খুলে জাহাজের ব্যবসা, কয়লা খনি, রেশম, চা, নীলের চাষ থেকে হেন কোন ব্যবসা নেই যা তারা করেননি। দ্বারকানাথকে এরপর কোনও দিনই আর পেছনপানে তাকাতে হয়নি। অগাধ ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন দ্বারকানাথ। ১৮৩৪ সালে হিজলির নিমক মহালের বারো বছরের দেওয়ানী ছেড়ে খেজুরিতে লবণ ব্যবসা শুরু করে অগাধ অর্থ উপার্জন করেন। দ্বারকানাথের অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি আমোদ-প্রমোদ ও খানাপিনা’য় বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বাগানবাড়ি বা ‘বেলগাছিয়া ভিলা’য় সাহেবদের নিয়ে প্রায়শই খানাপিনা চলত। সাহেবদের কাছে বেলগাছিয়া ভিলা ছিল ‘পারফেক্ট প্যারাডাইস’।

দ্বারকানাথ ও তাঁর চেয়ে বাইশ বছরের বড় রাজা রামমোহন সমসাময়িক ও বন্ধু হলেও দুজনে দু’প্রান্তের মানুষ ছিলেন। দ্বারকানাথ নিজে নিষ্ঠাবান হিন্দু হয়েও তিনি রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনায় নিয়মিত উপস্থিত হতেন। রামমোহনের সতীদাহ নিবারণের কাজে সঙ্গী ছাড়াও সমাজ সংস্কার, রাজনীতি সব কিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজা রামমোহন প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ‘সংবাদ কৌমুদী’র সম্পাদক ছাড়াও ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘বেঙ্গল হেরল্ড’, বাংলা ‘বঙ্গদূত’ কাগজ বের করা ছাড়াও তাঁর আর্থিক সাহায্যে ‘ইন্ডিয়া গেজেট’, ‘বেঙ্গল হরকরা’ ও ‘ইংলিশম্যান’ প্রভৃতি সংবাদপত্র বার হত। ১৯৪২ সালে প্রথমবার বিলেতে গিয়ে যে সমাদর পেয়েছিলেন তা আর অন্য কোনও ভারতীয় কোনওদিন পেয়েছেন কিনা সন্দেহ। ১৮৪৫ সালের ৮ মার্চ দ্বারকানাথ খেজুরি বন্দর দিয়েই দ্বিতীয়বার বিলেতে গিয়ে অসস্থ হয়ে লন্ডনের কাছে সারেতে ১ আগষ্ট মাত্র ৫১ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। লন্ডনের কেনসাল গ্রিন সমাধিক্ষেত্রে দ্বারকানাথকে রাজকীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
দ্বারকানাথের বেহিসাবী রাজকীয় আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন আর উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের ব্যবসায়িক মন্দার কারনে কোম্পানি ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে দ্বারকানাথের বিপুল দেনা হয়ে গিয়েছিল যার বোঝা তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দেবেন্দ্রনাথের কাঁধে এসে পড়ে। সেই পিতৃঋণ শোধ করে গোটা ঠাকুর পরিবারকে দায়মুক্ত করতে দেবেন্দ্রনাথের গোটা জীবন কেটে যায়। দ্বারকানাথের বেপরোয়া আড়ম্বরপূর্ণ জীবনধারা যেমন স্ত্রী দিগম্বরীদেবী মানতে না পেরে দ্বারকানাথকে নিজের জীবন থেকে ব্রাত্য করে ঠাকুর পরিবারে ছিলেন তেমনই মৃত্যুর পর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ সহ জোড়াসাঁকোর গোটা ঠাকুরবাড়ি ও পরিবারের কাছে মৃত দ্বারকানাথও ব্রাত্যজন হয়েই রইলেন। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস।
তথ্য ঋণ —
১| রবীন্দ্রনাথ — সুপ্রিয় ঠাকুর
২| কথা সাহিত্যের ফাঁপা দুনিয়া — ইমানুল হক